আ ডার্ক স্টোরি

পিয়াল রায়

ঘরটা অন্ধকার । অন্ধকারই থাকতো । শুধু মাঝেমাঝে একআধ দিন ছাদের টালির একটা ফুটো দিয়ে চিলতে সুতোর মতো একফালি রোদ ঢুকে পড়ত অবাধ্য । আকাশ এখানে ঘন মেঘেই ঢাকা থাকে । তবু মেঘেরও তো ক্লান্ত লাগা থাকে । থাকতে পারে । পারে না কি ? তাই কোন কোন দিন রোদও সুযোগ পেয়ে যেত আলটপকা আলো দিয়ে ঘরটাকে ভোলাবার । ঢুকে পড়তো ছাদের টালির ফাঁক দিয়ে আর ঝাঁপিয়ে পড়ত ঠিক বিছানার উপরেই যেখানে মানুষটা মুখ গুঁজে পড়ে থাকতো বালিশে । দিনের পর দিন ।হঠাৎ কেউ দেখলে বলে উঠত ,' ও তো মৃত মানুষ । কবেই মরে হেজে গেছে ওর হাত , পা , বুক , বুকের গর্তে চোখ । এখন শুধু অপেক্ষা কবরের । ' কিন্তু মেঘ , রোদ , এই বিছানা-বালিশ , এই ঘরটা ওকে ছাড়তে চায় না । ওরা ওকে ছাড়তে চায় না নাকি ওই ওদের -- এ এক অমীমাংসিত প্রশ্নের মতো বুঝে উঠতে উঠতেই পেড়িয়ে যায় একটা একটা দিন । কবরের গর্ত বৃষ্টির জলে ধুয়ে আসা মাটিতে বুজে যায় । আবার কোন এক শীতের সন্ধ্যায় আবার ঠিকঠিক খুঁড়ে বের করা হয় তাকে । মানুষটা তখন বালিশের ভেতর ডুবে যায় আরো আরো আরো ...

এই গল্পের মানুষটা নারী অথবা পুরুষ যে কেউই হতে পারে । লিঙ্গ ভেদে তো কষ্ট - লজ্জা - যন্ত্রণা ভিন্নত্বর হতে পারে না । পারে কি ? হয় ও বুক ঢাকবে শার্টে অথবা আঁচলে । কিন্তু তাই বলে তো আর বুকের ভিতর হৃদপিণ্ডে জেগে ওঠা ভালোবাসা বা অপ্রেমের ক্ষত একে অপরের থেকে পৃথক মাত্রা পেয়ে যেতে পারে না । জীবনের স্পন্দন দুজনের ক্ষেত্রেই একই থাকে । মেঘ বা রোদের এক সুরে ধ্বনিত হৃদয়ের কাছে আসতে বাধা থাকে না । সেই কবে কোনকালে মা জন্ম দিয়ে বলেছিল , ' দ্যাখো বাছা আজ থেকে এই পৃথিবী তোমার। ' মানুষটা , সেই ছোট্ট সময়ে বুঝে উঠতে পারেনি পৃথিবীটা আসলে কী ? তাকে দেখতে কেমন ? এই পৃথিবী নামক বস্তুটি নিয়ে সে কী করবে ? কী করতে পারে সে ? ইত্যাকার প্রশ্ন নিয়ে যখন সে গেল মায়ের কাছে উত্তরের আশায় , তখন হটাৎই আবিষ্কার করলো তার মা বলে কেউ কোথাও নেই । আসলে ছিল ক্কি কোনদিনও ? অনেক ভেবেও বুঝে উঠতে পারল না মানুষ স্বয়ম্ভূ হতে পারে কিনা । যত বয়স বেড়েছে প্রশ্ন বেড়েছে । কে সে ? কোন অস্তিত্বের উত্তরাধিকার বয়ে নিয়ে চলেছে সে ? সে কি কোন দেবতা ? অপদেবতা ? রাক্ষস ? তার রক্তরস , লালা , ঘাম , মূত্র , বীর্য অথবা ডিম্বাণু , তার শরীর , তার মন , মনের ভিতরে দানা বেধে থাকা প্রশ্নেরা -- এরা কারা ? কোথা থেকে এল ? এদের অস্তিত্বের শিকড় কোথায় ?

মানুষটা তো দেখেছে শিকড় থাকলেই গাছের ইচ্ছে থাকে ফুলেফলে ভরে ওঠার । এটাও দেখেছে শিকড়হীন গাছ কীভাবে দাঁড়িয়ে থকে ন্যাড়া ন্যাড়া বছরের পর বছর । তখন গোরায় শত জল ঢাললেও একটা প্রজাপতিকেও টান্তে পারে না নিজের দিকে । বালিশে চিরকালের মতো মুখ গোঁজার আগে একবার শেষ চেষ্টা যে করেনি তা নয় । সেই নারীকে খুঁজে বের করতে সে চেয়েছিল যার গর্ভ নির্ধারিত ছিল ওর জন্য । নে , ঔরস খোঁজার কথা ভাবেনি সে । এতখানি বিজ্ঞান তাকে জানানোর কথা কারো মাথাতেই আসেনি হয়ত । অস্তিত্বের সঙ্কট তাকে বাধ্য করেছিল রাতের আকাশেরসেই সবকটা তারাদের খুঁজে বের করতে যাদের সে দেখেনি গত রাতে বা আগের আগের রাতগুলোয় । এতসব বাধ্যবাধকতায় ক্রমশ অস্থির হচ্ছিল সে । তা থেকে বাঁচতে চেয়ে প্রথমেই দেশের মাতব্বরদের কাছে । তারা বলেছিল এক নারী এসেছিল পূর্বদেশ থেকে । শান্তশিষ্ট , লক্ষ্মীমন্ত মেয়েটি তখন গর্ভ লক্ষণযুক্তা । একঢাল চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে কালো আয়ত চোখ মেলে বসে থাকত মেঘের দিকে তাকিয়ে । এছাড়া আর নতুনতর ভঙ্গীতে তাকে দেখা যায়নি কোনদিন । তাবৎ মানুষের দল , তাবৎ গোষ্ঠী , তাবৎ সমাজের প্রশ্নের জটিল ধারাবাহিকতা সে এড়িয়ে গেছে নির্বাক । ফলে পূর্বদেশে যাওয়া ছাড়া মানুষটার আর কোন উপায় থাকে না ।

পূর্বদেশটা ঠিক কোথায় ? কতদূরের সে দেশ ? এসব ভিত্তিহীন জিজ্ঞাসা নিয়ে সে বিব্রত হয় নি । হয়ত নিরুদ্দেশ শিকড় খোঁজার তাগিদই তাকে প্রেরিত করেছিল পূর্বদেশের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ার । যাওয়া ভিন্ন আর কোন উপায়ও তো ছিল না তার । সে দেশের শাসকগোষ্ঠী তাকে জানিয়েছিল , সেই মেয়ে , আদৌ যদি তার মা হয়ে থাকে , এসেছিল দক্ষিণ দেশ থেকে । মেয়েটির একমাথা কোঁকড়া কালো চুল এবং ঘন বাদামী চোখ তাকে দিয়েছিল এক অদ্ভুত লাবণ্যময় আলো । যার দিকে তাকিয়ে বহু পুরুষের বুক পুড়ে গেছে নিঃশব্দে । কিন্তু কাউ এগোতে পারেনি তার দিকে । একটা অদৃশ্য কাচের ঘর ছিল তার । সেখানে সে থাকতো নিশ্চল । এসব শুনতে শুনতে বুক ভেঙে যাচ্ছিল মানুষটার । তার কালো অথচ ততটা কালো নয় , ঘন বাদামী রঙের চোখ ঢেকে যাচ্ছিল নিরুপায় অথচ গভীর এক আবেগে । না দেখা মায়ের খোঁজে দক্ষিণদেশ তার হাত ধরে টানছিল দুর্নিবার ।



দক্ষিণদেশে এসে মনের কোন গহন অনুভব থেকে যে তার মনে হয়েছিল , এখানকার মানুষজনই তার চিরপরিচিত আত্মীয়স্বজন , তা সে বলতে পারে না । তাদের আদরে , তাদের যত্নে , তাদের সহমর্মিতায় , দুঃখে সমব্যথী হয়ে ওঠার চেষ্টায় ক্রমাগত এই ভাবনাই তাকে উদ্বেলিত করেছিল যে , তার জন্মদাত্রী জননীর খবর এখানেই রয়েছে আকাশে , বাতাসে, মাটির গভীরতম প্রদেশে অথবা কোন সিংহলী কাঠের সিন্দুকে চন্দনসুগন্ধা হয়ে লুকিয়ে । এখানেই রয়েছে তার শিকড় । কোন এক সান্ধ্য ভোজনে সকলের সঙ্গে যোগদান করে যে জেনে যায় সোনালী চুলের তপ্ত স্বর্ণবর্ণা মেয়েটির নীল চোখ এখনো ভুলতে পারেনি এ দেশের মানুষ । ভুলতে পারার নয় পশ্চিমদেশ থেকে কোন এক শিউলি ফোটা ভোরে মেয়েটি এসেছিল এ দেশে । পশ্চিমের দেশেই তো বাস দেবতাদের -- এমনটাই এতদিন জেনে এসেছে এ দেশের মানুষ । দেবীর মতো এই মেয়েটি যখন ঝাঁপিয়ে পড়তো যে কোন মানুষের কষ্টে তখন কেউ অবাক হয়নি তাই । তার চাঞ্চল্যে , তার কলহাস্যে ভরে থাকতো সমগ্র দক্ষিণ বনাঞ্চল । তার মমতাময়ী হাতের পরশ পায়নি এমন শিশু , এমন বৃদ্ধ , এমন নারী , এমন পুরুষ বিরল । জঙ্গলের পশুপাখিও সমান ভালবেসে ঘিরে থাকতো তাকে । পশ্চিমের জানলা খুলে এক ঝলক হাওয়ার ঝাপটায় যেন ভেসে যেতে থাকে মানুষটার চোখমুখ । এক অনিবার্য আকুতি জেগে ওঠে আবার ভেসে পড়ার ।


সেখানে যাওয়ার নৌকো , পথে বেঁচে থাকার রসদ সব যুগিয়েছিল সেই প্রায় আত্মীয় মানুষগুলো । প্রায় -- আসলে যা হতে হতেও হয় না পুরোটা অথচ হবে বলে হাতটা বাড়ানোই থাকে সদাসর্বদা । যত বেশী সে পশ্চিমের দিকে এগোচ্ছিল সমুদ্রের হাওয়ায় উড়ছিল তার নরম সোনালী চুল আর আকাশের মতো নীলচোখ যাচ্ছিল সমুদ্রের প্রবল জলতরঙ্গে । হৃদয়ের উত্তাল ওঠাপড়ার সঙ্গে ঢেউয়ের নিবিড় সম্পর্কের কথা ভাবতে ভাবতে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করছিল তাড়াতাড়ি তাকে পৌঁছে দিতে সেই সমুজ্জ্বল গাছটার কাছে , যার শিকড়ে বাঁধা আছে জননীর সাথে শিশুর জন্মরহস্য । আসলে সে জানতই না উন্নত ভোগবাদী সমাজের নিজেরই কোন বন্ধন নেই মাটি থেকে জলকণা তুলে নিয়ে পুষ্ট হওয়ার মতো । অবাক হল যখন সে শুনল, পশ্চিমবাসীদের কাছে এসেছিল বটে এক মেয়ে আশ্রয়ের জন্য উত্তরের দেশ থেকে কিন্তু তারপর কোথায় , কখন যে চলে গেছে , কেউ তার খবর রাখে না । তাকে ওরা কেউ চেনেনা । বরফরঙা মেয়েটির খবর রাখার সময় নেই পশ্চিমদেশের মানুষের । হতাশা এবার একটু একটু করে গ্রাস করে নিচ্ছিল শিকড় খুঁজতে আসা মানুষটার রুহ । তার সমুদ্রনীল চোখ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছিল ধূসরতায় । বরফসাদা হয়ে উঠছিল তার কোমল ঠোঁট । হৃদপিণ্ড , ফুসফুস ঢেকে যাচ্ছিল গুঁড়ো গুঁড়ো বরফের আস্তরণে । এত শহর , এত মানুষ , এত এত বিবেক , এত বিবেচনা -- কেউ লিখে রাখেনি কোন এক অন্ধক্ষনে জন্মানো শিশুটির কথা ! সেই জননীর ইতিহাস যে আসলে শিকড় হতে পারতো নাম না পাওয়া এক অন্ধকার ঘরের ততধিক নাম না জানা মানুষের । একটা হিমেল স্রোত নামতে থাকলো মানুষটার শিরদাঁড়া বেয়ে । নামতে থাকলো আর নামতেই থাকলো । থামল না । উত্তরের দেশ মানে তো হিমায়িত প্রান্তর । জীবন সেখানে সিকিভাগ । ধুঁকতে ধুঁকতে মরে চলে কেবল । তবুও সে শেষ চেষ্টা করলো এবং জেনে গেল সেই মেয়ে আসলে উত্তরের দেশের কেউ না । তাকে দেখতে কেমন ছিল , কী ছিল তার ভাব প্রকাশের ভাষা , কী খেত , কীভাবে বাঁচত অথবা আদৌ বাঁচত কিনা কেউ জানেনা । ফলে কবে সে যে বরফের মধ্যে মিশে হারিয়ে গেল তার হদিশ মিলল না কোন ।

এরপর মানুষটা ফিরে আসে আপন ডেরায় । অন্ধকারের গল্পে মানুষটা নারী অথবা পুরুষ যে কেউই হতে পারে । তার বুক ঢাকা থাকে থাক থাক হিমশৈলে । যার খানিকটা দেখা গেলেও বেশিটাই অদৃশ্য বলে বাকি মানুষের কাছে সে মৃত বলে ঘোষিত হয় । বালিশে মুখ গুঁজে থাকতে থাকতে একদিন মানুষটা ঠিক করে ফেলে ছাদের ফুটোটা সারিয়ে ফেলবে শিগগিরি । ফুটো দিয়ে আসা রোদটা তাকে বড্ড জ্বালায় ।