'ম্যাগনা সিভিটাস, ম্যাগনা সলিচিইডো'

বৃতি হক

এই মুহুর্তে একটি যাত্রীবাহী বাস ছুটে চলে আঁধারের বুক চিরে, রাস্তার পাশের হলুদ দোতলা মেসবাড়িটা সে শব্দে খানিকটা কেঁপে ওঠে। জানালা বেয়ে তীব্র আলোর উৎস হঠাৎ আঘাত করে বারো নাম্বার রুমের টেবিলে বসে থাকা এই আমার মুখে। কিছুটা কুঁকড়ে উঠি, আলো-আঁধারি বুঝি কখনো কখনো শ্রেয়তর।

এই মুহুর্তে স্বপ্নমগ্ন তুমি, ঘুমাচ্ছো আমার কলমের নিবে- জন্ম নেবার জন্য প্রস্তুত। তোমাকে পৃথিবীতে আনবো কি আনবো না- তা নিয়ে দ্বিধান্বিতআমি শাদা পাতায় দীর্ঘক্ষণ আঁকিবুঁকি কাটছি। বিশ্বাস করো, তোমার পৃথিবী অনেক বেশি আলোকিত, তোমার আকাশ অনেক বেশি বিস্তৃত। তুমি প্রাণবন্ত, আমার করোটির ভাঁজে ভাঁজে প্রতিনিয়ত শক্তিশালী হয়ে উঠছ - কিন্তু কি এক অদ্ভুত জড়তায় আমি স্থির থেকে স্থিরতর হয়ে যাচ্ছি! মেরুর বিপরীত বিন্দুতে নিজের অবস্থান বলেই হয়ত।

প্রতিদিন খুব ভোরবেলায় ভব্যতার মুখোশটাকে মুখে আটকে নিয়ে ঘর থেকে বেরোই। কোনো কোনোদিন চারপাশের বাতাসে পঁচাশি ভাগ আর্দ্রতা, অফিসের সামনে আবুল কাশেমের সাইকেল তালাবদ্ধ হয়ে আটকে থাকে খুঁটিতে। আমার পাশ ঘেঁষে রত্নার মা স্যান্ডেলে শব্দ তুলে পান চিবুতে চিবুতে মেসবাড়িতে রান্না করতে যায়। কোচিং শেষে ঠিক তখুনি, পেছনের সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে মুখে হাল্কা গোঁফের আভা সম্বলিত এক লাজুক কিশোর। হাড্ডিসর্বস্ব এক প্রাণী-অবয়ব বসে আছে পায়ের কাছে, পুরুষ না মহিলা বোঝার উপায় নেই। তার হাতের অ্যালুমিনিয়ামের থালাটা সূর্যের আলো নিজের বুকে না রেখে তীরের মত ছুঁড়ে ঝলসে দিলো আমার চোখ। বিকেলে অফিস থেকে ফেরার পথে ডিম-রুটির সাথে নগদ যানজট খরিদ করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই খুলে যায় মুখোশ। মার্কেজের একটি কথা মনে পড়ে, 'ম্যাগনা সিভিটাস, ম্যাগনা সলিচিইডো' - 'যত বড় শহর, তত বেশি একাকীত্ব আর নির্জনতা'। এ এক দৈনন্দিন চিত্র- সমস্ত জীবনের জন্য এক গৎবাঁধা উপন্যাসের পাতায় যেন আটকে গেছি।

'দেশ ছাড়ো। সাগরে ভেসে যাও- এই ভূ-খন্ড কি তোমার?' বাড়ি ফেরার পথে প্রতিদিন বাসের জানালায় আমার চোখের সামনে এই প্রশ্ন লটকে থাকে। উত্তর জানা নেই। এই ভূ-খন্ডের কোথাও অপেক্ষা করে অযাচিত কোপ, কম্প্রেশার পাইপ। এখানে শিশুরা জন্ম নিয়েই বুড়ো হয়ে যায়। আর মৃত আত্মাকে বয়ে নিয়ে বেড়ায় পরিণত ক্লান্ত শরীর। এই যে, মৃত আমি এবং আমরা, অবসরে মেসে বসে রাজা উজির মারি। নিঃস্পৃহচোখে দূরেক্ষণে হত্যাদৃশ্য দেখি। প্রতিবাদগুলো সিগারেটের ধোঁয়া হয়ে ছাদের ভেতরেই ঘুরপাক খায়। পরক্ষণেই সাদী টেবিলের ওপর তবলা বাজিয়ে সঙ্গত করে, আমরা লাল বিষন্ন চোখ মুছে ফেলে সমস্বরে গলা ফাটিয়ে গাই, "এখন অনেক রাত /তোমার কাঁধে আমার নিঃশ্বাস/ আমি বেঁচে আছি তোমার ভালোবাসায়..."

চোখের ওপর এই মুহুর্তে শীতল হাত রাখে কেউ। চোখ মেলতে আমার ইচ্ছে হয় না। হয়ত তুমি! আমার কলমের নিব থেকে অনায়াসে ছিটকে পড়ে সাগুয়ারো সবুজ, নীল জল আর প্রেমের কথকতা। কিন্তু নিজস্ব সমুদ্র নিজস্ব অতল থেকে মাথাচাড়া দেয় যে প্রবালপাহাড়- দু'হাত মুঠোবদ্ধ করে সেই পাহাড়ে আছড়ে পড়ে যে আস্ফালন, সোপ্র্যানোর টেসিচুরায় যে তারকাদ্যুতিতে ক্রমশঃ জেগে উঠছ গর্ভস্থ তুমি- অপ্রকৃতস্থ আমি, মূর্ছিতের মত এক সময় শব্দবাড়ির অশরীরী দুয়ারে কড়া নাড়ি- চোখা চোখা কিছু শব্দ চাই! সত্যিকারের কিছু শব্দ! তোমাকে বিনির্মাণ করার প্রবল ইচ্ছেয় একসময় দেখি, যাদুকরের ইন্দ্রজাল হানা দিয়ে পরিধি ভেঙে বেরিয়ে পড়ছে বর্ণমালা, আমাকে ঘিরে ধরছে ক্রমশঃ!

রাত বারোটা পঁয়ত্রিশ, রিডিং ল্যাম্পটা নিভিয়ে চক্ষুষ্মান অন্ধ আমি শব্দের ঝোলাটা বুকের ভেতর পুরে নির্বাক শুয়ে পড়ি। ছাদের এক কোণে চিলতে ফাটল ধরেছে। সময় হলে ইরেবাস ঠিকই জন্ম দেবে এথারের! আমার ধোঁয়াগুলো একদিন ঠিকই ঐ ফাটল বেয়ে আকাশ ছোঁবে। এক নিঃস্ব শহরে রাজবন্দী এই আমি বরং এই মুহুর্তে অপেক্ষা করি কাংখিত মাহেন্দ্রক্ষণের।

**(Erebus- representing the personification of darkness
Ether- the heavenly light)