নো ম্যানস ল্যন্ড

প্রশান্ত গুহ মজুমদার

নো ম্যান্‌স্‌ ল্যান্ড। এক পাশে সারি সারি পিলার, অন্য পাশেও। মাঝখানে শূন্য ধূসর, আবাদি জমি, জলা, উলুখাগড়া। মাঝখানে মনুষ্য নেই আর। ছিল, এখন আর নেই। ভাঙা ভিটের শ্যাওলা দেওয়াল, মায়াজড়ানো বটবৃক্ষ। মনুষ্য নেই। না থাকা-ই নিয়ম। নো ম্যান্‌স্‌ ল্যান্ড। মানুষ থাকে কি প্রকারে! এখন এমন জমির দু প্রান্তে বেয়নেট, জেগে থাকা পিলার। গোল গোল ঘুরে ঘুরে কিলোমিটার ঘুরে ঘুরে উঠোন পাকঘর আমকাঠাল কিংবা হৃদয়ের বরফ আড়াআড়ি ছিন্ন করে চলে গেছে তারা। কাঁটাতার সত্য এখানে। কাঁটাতার তীক্ষ্ণ। কাঁটাতার নিরপেক্ষ। কাঁটাতার নির্বিকার। সহসা তৎপরতায় সেখানে ঝুলে থাকতে পারে কিশোরীর লাশ। বেওয়ারিশ প্রাণীর, একদা সাঁঝালের উপযুক্ত, বিক্ষত শরীর। ওদের এন্তেজাম করার দায় আর কারো নেই। ঐ না মানুষের রিক্ত সাদায় কি আর করার থাকতে পারে আমার! শব্দ সাজাই। শব্দ উচু করে ধরি। আরো উঁচু। আলো প্রয়াস করি তাঁদের মাথায়। যদি সে আলোয় জেগে থাকে মানুষ। যদি মিথ্যাগুলি বুঝে নিতে পারে। কি আর করতে পারি এই নির্জনে। মনে পড়ে। শুধু মনে পড়ে।
এক পাড়ে পিতৃভূমি, মাতৃভূমি। অন্য পাড়ে জন্মভূমি, কর্মভূমি। ও পাড়ে ফরিদপুর রাজশাহী। ও পাড়ে রংপুর, দিনাজপুর। অন্য পাড়ে বহরমপুর, আরো যে কত ভূমি। তারা লালন করেছে, ভাত দিয়েছে, সঙ্গ দিয়েছে, স্বপ্ন দিয়েছে। আর ছেড়েছে বহুবার, বহু ভাবে। যেন শিকড়টাই তুলে হাতে দিয়েছে। যাও তুমি, যেভাবে যেখানে তোমার মন, বসবাস করো। এমনে প্রথমে মুক্তির বাতাস, নির্ভার বাঁচা। ক্রমে ক্রমে সে মুক্তির বাতাসে অন্ধকার, সে নির্ভার যাপনে ক্রমে কঠিন দেওয়াল।
খুব মেঘ। ঈশান থেকে নৈঋত থেকে মেঘ। ঠিক মাথার উপরে। নেমে আসছে নিচে। দ্বিধাহীন নিশ্চিত সে আসা। এলো চুলে অপেক্ষা করছে নদী। মুহূর্তে সে উঠে দাঁড়াবে। ভাসিয়ে দেবে। দিক। ভাসিয়ে দিক এ পাড় ও পাড়। চোখের জলে যা ভেসেছে, এবার গাঙ্গের জলে।
তদবধি আমি দাঁড়াই। কোন পাড়েই নয়। যে জন আছে মাঝখানে, তেমন। কোন পক্ষেই নয়। আর থাকবেই বা কেন! এক দিক হারিয়েছে র‍্যাডক্লিফে। অন্যটা নিজের কর্মদোষে। সুতরাং এখন আমি এই একা। নো ম্যান্‌স্‌ ল্যান্ড-এ। তুমুল বৃষ্টিতে চরাচর। সেখানে অশত্থ একা। সেখানে ঝোপড়া লেজের শেয়াল, একা। আরেক একা মাথাটুকু তুলে জলে হিলিবিলি, সামান্য ডাঙ্গা খুঁজছে। এক জনের কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। অপরের ঘর টইটম্বুর। এবার আমি ছড়িয়ে দেব এই নগ্ন দুই হাত। মাথাটা তুলে দেব ঐ অন্ধ আকাশের দিকে, যেখানে খরসান বিদ্যুৎ, যেখানে অনাবিল ডমরু। ছড়িয়ে দেব দুই হাত। ‘ভালমানুষ’-এর কেয়া চক্রবর্তী-র মত। বাস্তুচ্যুত হওয়ার লজ্জ্বা ভেঙে, কাঁটাতারের অশ্লীল ঔদ্ধত্য উড়িয়ে। হাহাকার আমার ছুঁয়ে যাক আমার মাতৃভূমি, আমার পিতৃভূমি, আমার ভাত জোগানোর থালা, এ যাবত আমার অহংকার আর শরমের গুজরান করা দিন। এরা একবার জানুক আমার পাওয়া-না চাওয়ার সালতামামি। আজ আর শরনার্থী নই। মানুষের না-জমি থেকে এই গোলকের চরাচরে এখন আমি। আমার উড়ানে আর কোন পূর্বশর্ত নেই। বাস্তু নেই আর এখন। মিতি বিষয়টাই এখন অবান্তর। কোথাও অবচ্ছিন্ন না আমি। দুই কাঁটাতারের বেড়া আমাকে দিয়েছে এমন অপূর্ব অবন্ধন।
-----------------