কয়েকটি মূহুর্ত অথবা একটি শ্রী-হীন গল্প

সাঈদা মিমি

ও পাশে একটা গো শালা আছে, কিম্ভুতিকিমাকার অবস্থা । এখানে ছয়মাথাওয়ালা রাস্তা! দু মাথা, তে মাথা, চৌ মাথা সব ভেস্তে গেছে । সুলভে ফ্ল্যাট বিক্রয়, ভোট দিন, মুক্তি চাই, দন্ত রোগের চিকিৎসা, স্বামী স্ত্রীর গোপন সমস্যার ইউনানী দাওয়াই, অত্যাধুনিক ক্লিনিক, যত্ন সহকারে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পড়ানো হয় ইত্যাকার বিজ্ঞাপনে ছাওয়া অতি ব্যাস্ত রাজপথ এবং একটি গরুর খামার ।

পথের এপাশ ওপাশে কোন সামঞ্জস্য নেই,একপাশে স্বচ্ছ জলের ঝিল,অন্যপাশে এঁদো জলে মশার আস্তানা, সেই ঘুটঘুটে কালো জলের পাড়ে একথোক কুমারপল্লী । বিচিত্র লাগছে? তা লাগতেই পারে, হয়তো ওরা জাতপেশার মায়া ছাড়তে পারেনি, সীমানাচিহ্ন পুঁতে রাখা জমিগুলিতে গাছপালা বাড়ছে, থাকবে না, অনেক গাছই নেই । একসময় যারা জলা কিনে ফেলে রেখেছিলো সেগুলি ভরাট হয়ে গেছে, পেল্লাই সব বাড়ী তৈরি হচ্ছে, আবার হয়নি হয়ে যাবে এমন প্রস্তুতি, কিছু ভূমি এখনও আদিম, ওখানে শরত এলেই কাশফুল ফোঁটে ।

সামনে হাসপাতাল, হর্ণ বাজাবেন না.. তোয়াক্কা করছে কে? এটা ব্যাস্ত রাজপথ, ছটা যাত্রামুখে, শতেক বাস – গাড়ী, স্থায়ী বধিরের সুস্থ হইবার চিকিৎসা বিষয়ক বিলবোর্ডটা কেবল নেই । সামনে সিটিবাস, তারপর অনাবিল, পাশেই তরঙ্গ, এরপর বেঙ্গল সার্ভিস, গোঁয়ারের মত গুতিয়ে গেলো তুরাগ পরিবহন, ওরা সাংঘাতিক খারাপ, কাউকে ধাক্কা না দিলে ওদের ফুয়েল অ্যাকটিভ হয় না । প্রাইভেট কারগুলি প্যাঁ প্যোঁ করছে, গোটা তিরিশ রিকশা ফাঁক ফোকর গলে ঢুকে পড়েছে, ব্যাস… চমৎকার জানজট, কলজে ধড়ফড়, এবার ঝিমাও ।

বেশ একটা সিরামিক বিল্ডিং দেখা যাচ্ছে , প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় । যে দর্শকটি কিঞ্চিত নিরাসক্তি নিয়ে এসব দেখছিলো তার মাথায় একটা উদ্ভট খেয়াল এলো, আচ্ছা টু থাউজেন্ড ইয়ার বিসি তে এই এলাকার চেহারা কেমন ছিলো ! তখন তারা এই ছাউনিবিহীন কালভার্টে বসে কি বিড়ি আর আখের রস খেতো? যাচ্চলে, তখন কি বিড়ির প্রচলন হয়েছিলো! যাত্রীছাউনীর ওপর ছাউনী নেই, রোদে পুড়ে মানুষগুলি শুটকির ঘ্রাণ বিলিয়ে চলছে, সাথে মিশেছে বাঁশপট্টির চোলাই চোলাই গন্ধ । একটু ঝিমাই কোথায়? ভাবতে ভাবতে ছেঁড়া ফাঁটা পলিথিনে ঢাকা চায়ের দোকানটা চোখে পড়লো ।

বাহ বেশ আবেদন আছে তো! এই খাড়া ত্যাদোড় সূর্যটা এর আড়ালে মিচকে রোদ্দুর ঢালতে পারছে না । মাঝবয়সী মহিলাটি চা বানাতে ব্যাস্ত, পুরু লেন্সের চশমাটায় কি চা ওয়ালীকে একটু বেমানান লাগছে? এই মাছি ওড়া সাগরকলা, বাসি বনরুটি, তেলচিমসে গন্ধওয়ালা বিস্কুট, এক কাপ চা.. আকাশে একটা পরিবর্তন টের পাওয়া গেলো, খানিক ধুলো উড়লো, হঠাৎ একদঙ্গল মানুষ ঠেলেঠুলে জায়গা করে নিলো চা খানায়, একঝলক বৃষ্টি, রাজপথ ভিজতে না ভিজতেই বৃষ্টি শেষ, যেন মশকারী করে ঈশ্বর পেচ্ছাব ছিটিয়ে দিয়ে গেলেন।

ভীড় কমছে না, চামড়া ঝলসানো গরম, ‘এই যে, এই এখানে! কেমন আছেন? আমি আপনাকে দেখেই চিনে ফেলেছি…’ বিকল হাফটিকেট । ভদ্রতাহেতু হাই হ্যালো করতে হয়, যেন আরো পেয়ে বসে বয়স্ক নাদানটা, ‘কি করছেন এখানে? কি কেমন আছেন? কই থাকেন? কোথায় যাচ্ছেন? ফেসবুক আইডি আছে? ফোন নাম্বারটা দ্যান…’ আর পারা যাচ্ছে না’ হাত ওঠার আগেই চোখ উঠলো, পাগলেও বোঝে চোখের আগুন কিভাবে ঝরে, পাতি বকচ্ছপটা বিপদ আঁচ করে বান মাছের মত একেবেঁকে ভেগে গেলো।
বাড়ি ফিরতে হবে, এই যানজটের মধ্যেও রিকশাগুলি পঙ্খীরাজ হওয়ার চেষ্টা করে! আরে বাওয়া, ধীরে, আমার জন্য কেউ কেউ তো অপেক্ষায় রয়েছে । শুধু শুধু ট্রাকের চাকার দিকে যাচ্ছো কেনো! দামড়া নগর… ভাবতে ভাবতেই সংযোগ বাঁকের নতুন রাস্তাটা এসে যায় । কি সুন্দর চাকচিক্য! দোতলা? উহু, তিনতলা পথ সমস্ত শহরের বুকে বাহু ছড়িয়ে দিয়েছে । কতগুলি মোড়? রিকসা থামিয়ে গোনার প্রচেষ্টা চলে, ঠিক তখুনি নজরে আসে তিনমুখী পথের মাঝখানের জ্যামিতিক জায়গাটা; নো ম্যানস ল্যাণ্ড? অনেকদিনের চেনা এই জায়গার সবকিছুই ভেঙ্গে নতুন করে গড়া হয়েছে । কেবল নো ম্যানস ল্যাণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে, সেই পুরোনো গৌরাঙ্গ দেবের মন্দির। হেঁটে হেঁটে অন্যজীবনের দিকে যাওয়া যায়! হ্যাঁ, বেশ যাওয়া যায় । এই নুনজল ঝরা ভাদুরে দুপুরে মরিচিকা খেলা করছে । যাবো? কিভাবে? ভালোবাসার হাতগুলি সঙ্ঘবদ্ধভাবে সজোরে আগলে আছে ।