অ-পৌরুষেয় অ-মানুষী সীমান্তপার ভূমি

কৌশিক দত্ত

সাড়ে তিন হাতের অতিরিক্ত জমি কারো ব্যক্তিগত নয়। বাউলেরা গেয়ে বেড়ায় শান্তিপুর লোকালে। সাড়ে তিন হাত শরীরও চিরকাল ব্যক্তিগত থাকে না। অন্তিমে শরীর মাটি পায়, অথবা বাতাস বেয়ে ভূমির এদিক-ওদিক ছড়িয়ে পড়ে তার কার্বন, হাইড্রোজেন আর এক আঁজলা ছাই। আসলে শরীর মাটি পায় না, মাটি শরীরকে পায়। ফেরৎ পায়। মাটি মানুষের ছিল না, মানুষ মাটির ছিল। মাটি মানুষের হবে না, মানুষ মাটির হবে। অতীত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই। শুধু ঘটমান বর্তমান মুহূর্তে মাটি মানুষের... একজন মানুষের বা একদল মানুষের। সেই মাটি তারা লিখে নিতে পারে, লিখে দিতে পারে, কিনে নিতে বা বেচে দিতে পারে। স্বত্বাধিকারের এই অপূর্ব মরীচিকার দাম কোটি মুদ্রা অথবা অযূত নরমুন্ড।

নো ম্যানস ল্যান্ড... না-মানুষী জমিন... বিশ্বজোড়া রিয়াল এস্টেট আর রাষ্ট্রব্যবস্থার ফাঁক-ফোকরে ইতস্তত বেওয়ারিশ মাটি... আমার প্রিয় ভূমি। বাকি সব ঘাস কারো না কারো উঠোন-গুদাম-হারেম। বাকি সব ধূলো বিক্রী হয়ে গেছে। বাকি সব পাথর কারো হাতের ক্ষেপণাস্ত্র। সব নদী রক্ত খেয়েছে।

ভাগের পৃথিবী। বিছানার আধাআধি ভাগ। হেঁশেল কতখানি কার, তাই নিয়ে ফাটাফাটি করে ভেন্ন হল দুই জা; শৈশবে তারা সই পাতিয়েছিল। বাড়ির মাঝবরাবর দেওয়াল তুলে ভাগ হল মুখুজ্জে বাড়ি, বড় ভাইয়ের অংশ এখন আর ছোট ভাইয়ের নয়। উঠোন ঘিরে বেড়া। কিন্তু প্রতিবেশী ঘোষালবাড়ি সুযোগ পেলেই বেড়া সরিয়ে এদিকে ঠেলে। হিসেব মতো দাগ নম্বর বাহাত্তরে বিয়াল্লিশ শতক জমি থাকার কথা; ল্যান্ড রেভিন্যু রেকর্ড বলছে। কিন্তু গতকাল আমিন লাগিয়ে মেপে দেখা গেল উনচল্লিশ শতক। আগের প্রজন্মে দুই পরিবারে সম্পর্ক ভাল ছিল। নিত্য যাতায়াত। বেড়া ছিল না। কিন্তু জিগাগাছের চিহ্ন ছিল। জিগাগাছ মরে না, শুকোয় না। মানুষের সীমান্ত আগলে রাখে বিশ্বস্ত। কিন্তু কে বা কারা গোপনে সে গাছ কেটে এবং উপড়ে লোপাট করেছে চিহ্ন। তারপর বেড়া বাঁধার সময় এই জমি চুরি। এবার সরকারি আমিন ডাকিয়ে পিলার বসাতে হবে।

দুই বাড়ির দুই উঠোনের সামনে দিয়ে গেছে বারো ফুটের বড় রাস্তা। দুই পরিবারকেই এক সময় জমি দিতে হয়েছে তার জন্য। রাস্তা কারো ব্যক্তিগত নয়। রাস্তা পঞ্চায়েতের, রাষ্ট্রের। বারোয়ারি। দুই বাড়ির কারো না। গ্রামের কোনো বাড়ির কোনো মাতব্বরের জায়গীর নয়। রাস্তা যেন এক নো ম্যানস ল্যান্ড। সেখানে সবাই পা রাখতে পারে। কিন্তু রাস্তা আসলে একদল মানুষের; এক দেশ মানুষের। রাস্তা রাষ্ট্রের। সেখানে তারাই পা রাখতে পারে, যারা সেই রাষ্ট্রের নাগরিক... স্বাধীন বিচরণের ছাড়পত্র পাওয়া নাগরিক। সেই ছাড়পত্র শর্তসাপেক্ষ। রাস্তা তাই না-মানুষী চারণক্ষেত্র নয়। রাস্তা রাষ্ট্রের জায়গীর। রেল লাইন রাষ্ট্রের। ইচ্ছে হলেই গলা দেওয়া যায় না সেখানে। নদীও রাষ্ট্রের। অথচ তার জল বয়ে যায় সমুদ্রে, এমনকি দেশের জলসীমার বাইরে মহাসাগরে। তার জল উড়ে যায় বাষ্পে, অনায়াসে আকাশসীমা লঙ্ঘন করে।

ওয়াঘা সীমান্তে এক বিকেলে, সবাই যখন মন দিয়ে কুচকাওয়াজ দেখছিল, সেই সময় প্রথম চোখে পড়ল নো ম্যানস ল্যান্ড। বিস্তীর্ণ সবুজ। সেই ভূমি কোনো রাষ্ট্রেরও নয়। তা বলে যে কোনো মানুষ সেই জমিতে পা রাখতে পারে না। কারণ বিনা অনুমতিতে সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহের কোনো একফালি জমিতে পা রাখতে গেলে মালিক হতে হয়, অথবা নাগরিক। যে জমি রাষ্ট্রের নয়, সেখানকার নাগরিক কেউ নয়। তাই সেখানে পা রাখলে ছুটে আসতে পারে, বিঁধে ফেলতে পারে বুলেট। যে কোনো দিক থেকেই তারা আসতে পারে, মারতে পারে, কারণ বুলেটের অধিকার আছে যে কোনো জায়গায় যাবার। বুলেট মানুষ নয়। নাগরিকত্বের সীমা তার গতায়াতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নরহত্যার অপরাধে তার বিচার হবে না, বিশেষত যদি নিহত মানুষটির দেহ পড়ে থাকে না-মানুষী ভূমিতে। সেই ভূমি কোনো দেশের আদালতের এক্তিয়ারভুক্ত নয়। তাছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত সীমা অতিক্রম করা, এমনকি তার শরীরের সীমানা ভেঙে-চুরে গুলি বা ছুরি হয়ে ঢুকে পড়া এমন কিছু বড় অপরাধ নয়। তার চেয়ে অনেক বড় বেআইনি কাজ কাঁটাতার পেরোনো। স্বভূমি মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বেড়া মানুষের পরিচয়। অথচ নিষিদ্ধ ভূমি ছাড়া, বেড়া ছাড়া, রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছাড়াই, মানুষ, কী আশ্চর্য, বহু হাজার বছর বেঁচে ছিল!

মানুষের উঠোন আছে, সীমানা আছে, কাঁটাতার আছে। দেশের আছে আরো বড় সীমানা, আরো অনেকে কাঁটা এবং তার। দেশের জলসীমা আছে সমুদ্রচারী। দেশের আকাশসীমাও আছে বায়বীয় অনস্তিত্বে। সীমান্ত কাল্পনিক বা চুক্তিজাত। সীমান্ত অলঙ্ঘ্যনীয়। সীমান্তকে সীমান্তের সাথে, রাষ্ট্রকে রাষ্ট্রের সাথে, মানুষকে মানুষের সাথে গায়ে গায়ে লেগে থাকতে দেয় না নো ম্যানস ল্যান্ড। অথচ সীমান্তরেখা আঁকার আগেও সেখানে ছিল কারো ঘর। তার উঠোনের উপর দিয়ে চলে গেছে সীমান্ত। তার আজন্ম প্রতিবেশী, জ্ঞাতি ভাই-ভাইবৌ হয়ে গেছে ভিনদেশী। তার গোয়ালের গরু চরতে যেত যে মাঠে, সেই মাঠ এখন পড়শী দেশের অথবা কারো না। ভুল করে সেই মাঠে চলে গেলে গরুর নাগরিকত্ব পালটে যায়, আর তাকে ফেরৎ আনতে গেলে সীমান্তরক্ষীর বন্দুক চিঠি লেখে কানু রাখালের বুকে। সীমান্ত এমনই মায়া।

কেন সীমান্ত মানুষের কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ? প্রশ্নটা রাখি অস্তিত্বের কাছে। অস্তিত্ব বলতে আমরা যা বুঝি, তা খন্ড অস্তিত্ব। যে কোনো মানুষের, যে কোনো জীবের দৈনন্দিন যাপন নানারকম খন্ড অস্তিত্বের ভিত্তিতেই। খন্ডগুলোকে আলাদাভাবে না চিনলে নিজেকে বা অপরকে চেনাই সম্ভব না; মাকড়সার পক্ষেও যেমন, মানুষের পক্ষেও তেমনি। একটা খন্ডের নাম “আমি”, বাকিগুলো এ, ও এবং সে। স্বাভাবিকভাবেই নিজের অস্তিত্বকে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন হয়। সেই সংজ্ঞায়িত অস্তিত্বের নাম identity বা “আত্মপরিচয়”। অস্তিত্ব এক বাস্তব অবস্থা, কিন্তু আত্মপরিচয় এক নির্মাণ। নির্মাণ মানেই যে মিথ্যে, তা নয়। নির্মাণ মানেই যে তা শুধু মানুষের কাজ, তাও নয়। সিংহেরও আত্মপরিচয় আছে। মানুষের ক্ষেত্রে সেই পরিচয় এবং তার নির্মাণ প্রক্রিয়া আরো বেশী জটিল। সব মানুষের আত্মপরিচয় আবার একরকম জটিল নয়। যত এগিয়েছে মানুষের সভ্যতা, তত বহুস্তর, তত জটিল হয়েছে মানুষের স্ব-বোধ, স্ব-পরিচয়, স্ব-ভূমি। ক্রমশ সেই জটিলতার জালে জড়িয়ে গেছে অস্তিত্ব, পরিচয় হয়ে উঠেছে মুখ্য। অস্তিত্বের চেয়েও দামী হয়ে উঠেছে পরিচয়। তাকে বাঁচাতে এমনকি অস্তিত্বকে বিপন্ন হতে হয়।

ঠিক যেমন জল রাখতে হয় পাত্রের মধ্যে, নইলে সে ছড়িয়ে পড়ে এমনভাবে যে তাকে আর চেনা বা চেনানো যায় না, তেমনি আত্মপরিচয়কে রাখতে হয় নির্দিষ্ট সীমানার মধ্যে। এমনকি অতি বিপুল পরিমাণ জলকেও রাখতে হয় পুকুর, নদী বা সমুদ্রের নির্দিষ্ট আকৃতি আর আয়তনের মধ্যে। তেমনি মানুষের ব্যক্তি-ছাপানো অতি বৃহৎ আত্মপরিচয়কেও বেঁধে রাখতে হয় গোষ্ঠী, দল, রাষ্ট্র, কৌম, প্রজাতি, ইত্যাদি কোনো একটা বেড়ার মধ্যে। নইলে পরিচয় বাতাসে মিলিয়ে যায়। আত্মপরিচয়হীনতা অস্তিত্বের মধ্যে বিপন্নতার বোধ সৃষ্টি করে। বরং আত্মপরিচয় বাঁচাতে গিয়ে অস্তিত্বের যে বিপদ, তা বেশী গ্রহণযোগ্য মনে হয়। সীমানা না বাঁচালে, আত্মপরিচয় বাঁচে না। তাই সীমানার এত দাম।

সীমা যে শুধু পরিচয়কেই সংজ্ঞাদান করে বা বাঁচায়, তা নয়। অস্তিত্বের নিজস্ব বেড়া আছে, যা তার টিকে থাকার শর্ত। যেমন শরীরের সীমা আছে চামড়া দিয়ে নির্দিষ্ট। এমনকি এককোষী প্রাণীর অস্তিত্বও কোষপর্দা বা কঠিনতর দেওয়ালে ঘেরা। এমনকি জড়বস্তুর অস্তিত্ব নির্দিষ্ট আকার, আয়তনের সীমায় আবদ্ধ। জড়ের সাথে জীবের পার্থক্য এই যে জীবমাত্রেই প্রতি মুহূর্তে সক্রিয়ভাবে প্রতিবেশের সাথে নিজের পার্থক্য টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে। পাম্প চালিয়ে কোষের ভেতর নিয়ে আসে প্রয়োজনীয় খাদ্য, কোষ থেকে বের করে দেয় বর্জ্য, এমনকি অতিরিক্ত নুন। সীমান্তে এই আমৃত্যু লেনদেন আর অন্দরমহলের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার এই নিরন্তর প্রচেষ্টাই জীবন। এই প্রক্রিয়াই জড়ত্ব থেকে জীবনকে আলাদা করে। জীবের ধর্ম নিজের অস্তিত্বকে নির্দিষ্ট করা, চিহ্নিত করা এবং প্রাণপণ বেঁচে থাকা। বিরোধাভাস জীবনের লক্ষণ। প্রথমে তা ছিল প্রাকৃতিক শক্তির বিরুদ্ধে। ক্রমশ অন্যান্য জীবের বিরুদ্ধে, যে কেউ তার সীমানাকে অগ্রাহ্য করে ভেতরে আসতে চায়, ভেতরকে বাইরের সাথে মিশিয়ে দিতে চায়, অস্তিত্বের চিহ্নগুলোকে মুছে দিতে চায়... তার বিরুদ্ধে।

মনে করুন, রাষ্ট্র বা সীমান্তের সমালোচনা করে বা অহিংসার জয়গান গেয়ে আপনি একটি প্রবন্ধ লিখছেন। ঠিক সেই সময় আপনার ত্বকের সীমানা ভেদ করতে চেষ্টা করছে একটি মশা... অতি ক্ষুদ্র এক স্ত্রী মশা, যে কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালাল নয়, স্রেফ বেঁচে থাকতে এবং ডিম পারতে চেষ্টা করছে। আপনার প্রতিবর্ত ক্রিয়া কী হবে? মশাটিকে আঘাত করবেন, যদিও একথা জানেন যে আপনার থাপ্পড় সহ্য করার শক্তি তার নেই। নেহাৎ জীবহিংসা বিরোধী হলে মশাটিকে উড়িয়ে দেবেন। কিন্তু ভেতরে ডেকে আনবেন কি? শরীরের ভেতরে? রক্তবাহী শিরায় প্রবেশের অধিকার তাকে দেবেন? না দেবার জন্য লজ্জিত হবার কিছু নেই। এই অধিকার না দেওয়া আপনার জৈবিক সুস্থতার লক্ষণ। কিন্তু শারীরিক অস্তিত্ব বাঁচাতে যা সহজ সরল প্রতিবর্ত ক্রিয়া, সেই প্রেরণাই আত্মপরিচয় বাঁচাতে হয়ে ওঠে জটিলতর সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম সম্পূর্ণ অসৎ শয়তানি নয়, কিন্তু তার নির্মাণকে না চিনলে অনায়াসে তা হয়ে উঠতে পারে শয়তানের হাতিয়ার।

প্রথমেই মানুষের প্রয়োজন তার শরীরকে নিজের শরীর হিসেবে চেনা এবং নিজের বলে পরিচিত করা। বুদ্ধিমান প্রাণীর ক্ষেত্রে সেই পরিচয় কেবল চামড়া দিয়ে মোড়া খানিকটা রক্ত-মাংস হতে পারে না, আবার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কিছু হলেও তা কাজের হবে না। তাই শারীরিক চিহ্নগুলো পরিচয় নির্মাণের প্রাথমিক উপাদান। সবচেয়ে সহজ বয়স, রূপ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে নিজেকে চিহ্নিত বা পরিচিত করা। বয়সের ভিত্তিতে পরিচয় তৈরী হয়েই থাকে, কিন্তু সেই পরিচয় এত দ্রুত পরিবর্তনশীল, যে দীর্ঘকাল একরকমভাবে ব্যবহার করা যায় না। একসময় ছিলাম শিশু, তারপর ক্রমান্বয়ে কিশোর, তরুণ, যুবক। যুবক হিসেবে থিতু না হতেই প্রায় মধ্যবয়স্ক হতে চলেছি। কদিন পর বুড়ো হব। এর চেয়ে সুস্থিরভাবে একটা শারীরিক পরিচয় পেলে সারাজীবন কাজে লাগে। যেমন আমি পুরুষ। নিজেকে পুরুষ, স্ত্রী বা তৃতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম কোনো লিঙ্গের মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করার সুবিধে এই যে সেই পরিচয় অনেকের ক্ষেত্রেই স্থির থাকে আমৃত্যু। কিন্তু পুরুষ হিসেবে পরিচিত হলেই আত্মপরিচয় নির্মাণ সম্পূর্ণ হয় না। তাই নিজের শরীরকে সাদা-কালো-বাদামী হিসেবে নির্দিষ্ট করা যায় চামড়ার রঙে। উচ্চতা, ওজন, শারীরিক সক্ষমতা বা অক্ষমতার নিরীখে চিহ্নিত করা যায় নিজেকে এবং অপরকে। ক্রমশ শরীর ছাপিয়ে মন এসে পড়ে পরিচয় নির্মাণে। আসে সমাজ, অর্থনীতি। ভাষা, ধর্ম, শ্রেণী (অর্থনৈতিক বর্গ), জাত (সামাজিক বর্গ), রাজনৈতিক আনুগত্য, জাতীয়তা, ইত্যাদি যেকোনো একটি চিহ্নকে অবলম্বন করে নির্মাণ করা যায় নিজের পরিচয় এবং নিজের সমাজ। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ভাষায় “Imagined communities” বা কল্পিত সম্প্রদায়সমূহ। এইসব পরিচয় ছাড়া সভ্য মানুষ নিজেই নিজেকে চিনতে পারে না।

এই আত্মপরিচয় নির্মাণের একটি দিক সম্বন্ধে আগে আলোচনা করেছিলাম “মুখোশমুখো” প্রবন্ধে (ঐহিকের “মুখ ও মুখোশ” সংখ্যায়)। এই মুহূর্তে আমাদের উৎসাহ আত্ম নয়, তার সীমান্ত নিয়ে... আত্মপরিচয়কে স্পষ্ট করতে এবং বাঁচিয়ে রাখতে যা অপরিহার্য। যেমন ধরা যাক নিজের পুরুষ বা নারী পরিচয়কে ঘিরে তৈরী হয় পুরুষালি বা নারীসুলভ আচরণবিধি, যার নির্দিষ্ট সীমানা আছে। সেই সীমার মধ্যে পুরুষ বা নারী হয়ে থাকতে হয়, নইলে পরিচয়হীনতা বিব্রত করে নিজেকে এবং সমাজকেও। এইভাবে লিঙ্গ-পরিচয় হয়ে ওঠে জৈবিক (sex) থেকে সামাজিক (gender), এবং ক্রমশ এই নির্মিত পরিচয় নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে জৈবিক পরিচয়ের স্বাধীনতা। প্রৌঢ় বা বৃদ্ধ পরিচয়েরও আছে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠা, সম্মান, উপযুক্ত আচরণ এবং সীমানা। ধর্মীয়, দলীয়, জাতীয় পরিচয়ের সীমানাগুলো তো খুবই স্পষ্ট।

প্রত্যেক মানুষ এইরকম নানা পরিচয় মিশিয়ে আসলে নিজের জন্য একটি আত্মপরিচয়ের ঝালমুড়ি তৈরী করে। সেটাকে ঠোঙায় ভরে লেবেল সেঁটে লিখে দেয় নিজের নাম। সেই পরিচয়ের মধ্যে মুড়ি আছে, বাদাম আছে, চানাচুর, নারকেল, লঙ্কা, পেঁয়াজ, তেল, মশলা... সব আছে কিছু পরিমাণে। যেমন আমার আত্মপরিচয়ের মধ্যে আছে আমার পৌরুষ, বিপরীতকামিতা, বাঙালিত্ব, ভারতীয়ত্ব, ইত্যাদি। হিন্দু, অহিন্দু বা নাস্তিক যা হিসেবেই নিজেকে ভাবি না কেন, ধর্ম সংক্রান্ত সেই পরিচয় আমার ঝালমুড়িতে থাকবে। আছে পেশাগত পরিচয়ের মশলা, রাজনৈতিক কাঁচা লঙ্কা। এই সবটা মিলিয়ে আমি, যা আমাকে অন্যান্য সব মানুষের থেকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। শেষ অব্দি ওটাই তো দরকার। পাকিস্তানীর থেকে আলাদা হবার জন্য ভারতীয়, হিন্দীভাষী থেকে আলাদা হবার জন্য বাঙালী, সাদা চামড়া থেকে আলাদা হবার জন্যে বাদামী, উকিল বা শিক্ষক থেকে আলাদা হবার জন্য ডাক্তার। এই সব পরিচয়ের প্রত্যেকটা ঘিরে উঁচিয়ে রেখেছি যে বেড়া, তা আমার অস্তিত্বের মতোই দামী। সেইসব সীমানার কোনো একটি আক্রান্ত হলেই আমি প্রতিরোধ গড়ে তুলি, তুলতে বাধ্য হই। নইলে আমি লীন হয়ে যাব অপরিচয়ে। প্রতিরোধের ক্ষেত্র বদলায়, আর তার সাথেই বদলায় বন্ধু বা শত্রু। সাদা সাহেবের রেসিজমের বিরোধিতায় যে ছিল আমার বাদামী বন্ধু, ওয়াঘা সীমান্তে সে হয়ে যায় পাকিস্তানী। সেখানে যাকে পেলাম ভারতীয় হিসেবে, পরদিন সে হয়ে যায় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী, যে কোলকাতার বাজার দখল করে ফেলছে। বাঙলা বাঁচাও আন্দোলনে যাকে পেলাম পাশে, সে পরদিন হয়ে যায় ডাক্তার ঠ্যাঙানো মস্তান। আত্মপরিচয়ের এক এক সীমান্তে পাওয়া বন্ধু অন্য সীমান্তে অপর হয়ে যায়।

এবার এই পরিচয় অবলম্বন করে আছে আমার সম্পত্তি, আমার জায়গীর। অথবা এই জায়গীর অবলম্বন করেই বেঁচে আছে আমার অস্তিত্ব আর পরিচয়। সেই জায়গীরের সীমাকেও তাই বাঁচাতে হয়। আমার বাড়ি, আমার জমি, আমার বৌ বাঁচাতে বেড়া দিতে হয়। এসব আমার জিনিসকে আমার হিসেবে চিহ্নিত করে না রাখতে পারলে আমি অসহায় হয়ে পড়ব। এ আমার মানুষসুলভ বদভ্যাস নয়। বাঘেরও নিজস্ব বনাঞ্চল থাকে, যেখানে অন্য বাঘের প্রবেশ নিষেধ। সিংহ সগর্জনে আগলে রাখে ব্যক্তিগত সিংহীদের। আমি মানুষ। থাবা দুর্বল, শ্বাদন্ত ক্ষুদ্র, নখ কেটে ফেলি সপ্তাহে দুবার। তাই আমার উঠোন, আমার বৌ, আমার সীমানা বাঁচাতে আমার ভরসা কাগজ। কাগজে থাকে কিছু হাবিজাবি লেখা, যাকে আমি বলি দলিল। সেই লেখার মান্যতা ততক্ষণ, যতক্ষণ আইন বলবৎ থাকে। আইন ততক্ষণ, যতক্ষণ থাকে রাজা বা রাষ্ট্র। রাষ্ট্র আমাকে ততক্ষণ দেখবে, যতক্ষণ আমি তার অনুগত। রাষ্ট্রের প্রতি আমার আনুগত্য ততক্ষণ, যতক্ষণ সে আমার স্বার্থরক্ষা করে... রক্ষা করে আমার পরিচয়, সম্পদ ও সীমান্ত। এভাবে আমি এবং রাষ্ট্র পরস্পরের সীমানা রক্ষায় মদত দিয়ে থাকি। খানিকটা এরকম ভাবেই বজায় থাকে দল, কৌম, সমাজ, ইত্যাদির সাথে পারস্পরিক সম্পর্কগুলোও। এদের সাথে ঝগড়া-ঝাঁটি চলে, কিন্তু শেষ অব্দি সব সম্পর্ক চুকিয়ে দেওয়া যায় না। দেওয়া যেত, যদি আমার না থাকত কোনো সম্পদ বা কোনো পরিচয়। কিন্তু এই নির্মিত বহুস্তরীয় পরিচয় আমার জীবনে, আমাদের জীবনে এতটাই বাস্তব, যে এইসব সম্পর্ক অস্বীকার করা অসম্ভব। অতঃপর অসম্ভব এইসব সীমানা অস্বীকার করা।

সমস্যা সীমানা নিয়ে নয়, সীমান্ত নিয়ে। সীমানার সীমান্ত হয়ে ওঠা নিয়ে। সীমানা চিহ্নমাত্র। নির্দেশক। তার চরিত্র নরম। সেখানে আদান-প্রদান চলে। কিন্তু সীমান্ত কঠোর, যুযুধান। সীমানা যখন সীমান্ত হয়ে ওঠে, তখন অন্য হয়ে ওঠে অপর, অপর হয়ে ওঠে শত্রু। সীমানার গা ঘেঁষে থাকা প্রতিবেশী হয়ে ওঠে সীমান্তবর্তী প্রতিদ্বন্দ্বী। ঘনিয়ে ওঠে বারুদ। ছলকে ওঠে রক্ত। সীমানা অস্তিত্বকে রক্ষা করে; সীমান্ত তাকে করে বিপন্ন।

সীমানারা পাশাপাশি থাকতে পারে গায়ে গায়ে লেগে। সীমান্তরা পারে না। সীমান্ত স্পর্শকাতর। সীমানা যখন সীমান্ত হয়ে ওঠে, তখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিছানায় শুয়ে থাকে পাশবালিশ, দুই ভাইয়ের সংসারের মাঝামাঝি গাঁথা হয় দেওয়াল, ইহুদী আর মুসলমানের মধ্যে এসে দাঁড়ায় রকেট লঞ্চার, ভারত-পাকিস্তানের মাঝখানে দুই সারি কাঁটাতার আর একফালি দীর্ঘ না-মানুষী ভূমিখন্ড। সীমানার দুপাশে মানুষ থাকে। সীমান্তের এধারে-ওধারে থাকে দুই অপর, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী, দুই অ-মানুষ। তাদের তফাতে রাখে না-মানুষী ভূমি। দুনিয়া জুড়ে সবটুকু জমির দখল নিতে গিয়ে এভাবেই মানুষ সৃষ্টি করে এমন এক বিচিত্র জমি, যা কোনো মানুষের নয়।

আকাশের তারারা মিটিমিটি জ্বলে কেন? এই বিষয়ে পদার্থবিজ্ঞানের বইতে প্রতিসরণ সংক্রান্ত যে ব্যাখ্যা পড়েছেন, তা ভুল। ছোট্টবেলায় ঠাকুমার মুখে শোনা কথাটাই ঠিক। তারারা মিটিমিটি হাসে। কেন হাসে? বলুন দেখি কেন? ভাবুন এই বিশাল ব্রহ্মান্ড! তার এক ক্ষুদ্র অংশে ছোট্ট একটা ছায়াপথ, যার নাম মিল্কি ওয়ে। সেই ছায়াপথের এক কোণায় পাত্তা না পেয়ে পড়ে আছে একটা তারামন্ডল, যার মধ্যে নেহাৎ ছোট একটা তারার নাম সূর্য। সেই সূর্যের পাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে কয়েকটা গ্রহ। তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত ছোট তিন নম্বর ছাগলের নাম পৃথিবী। সেই পৃথিবীর চারভাগের একভাগ স্থল। সেইটুকু জমির দখল নিয়ে আজীবন মারপিট করে যে প্রজাতি, তার নাম হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স... এই গ্রহের উন্নততম প্রাণী। সবচেয়ে বুদ্ধিমান। বুদ্ধির এই অসামান্যতা দেখে না হেসে উপায় কি তারাদের? রোজ রাতে ফিক ফিক করে হেসে এক আকাশ তারা আমাদের বলতে চেষ্টা করছে, ব্রহ্মান্ডের প্রায় সবটাই নো ম্যানস ল্যান্ড।

এই বিশ্ব আমার বড় প্রিয়। এই অনন্ত নো ম্যানস ল্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছি। জাতি, ধর্ম, বাজার, রাজনীতি... কোনোকিছুই ধ্বংস করতে পারবে না এতখানি না-মানুষী চারণক্ষেত্র। মানুষ হিংস্র হলেও অতি ক্ষুদ্র। ভাগ্যিস!