নেইমানুষের উৎসভূমি

ইশরাত তানিয়া


মহানগরের সরাইখানার সামনে দাঁড়িয়ে অনিশ্চিতবোধ করে মধ্যবয়সী আগন্তুক। তার জুলফি গড়িয়ে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে। রোদে পোড়া বাদামী ত্বক বেয়ে নেমে যায়। ফাটা ঠোঁটের ওপর শুকনো জিভ বুলিয়ে পরনের আলখাল্লা ঝাড়ে সে। ধুলোর মিহি পর্দা খানিকটা সময় শূন্যে ভেসে বাতাসে মিশে যায়।
সে দীর্ঘ পথভ্রমন শেষে ক্লান্ত শরীর ছেড়ে দেয় বেঞ্চিতে। চোখের কালো মণি ডান থেকে বামে ঘুরিয়ে নেয়। অর্ধবৃত্ত পরিধিতে সামনের অংশ দেখে। ভাঙা কিছু স্থাপনা, দরদালান মুখ ব্যাদান করে দাঁড়িয়ে আছে। সে ঘাড় ঘুরিয়ে দু’পাশ দেখে নেয়। ভাঙা কার্নিশ থেকে দুটো কাক উড়ে গিয়ে বিদ্যুতের তারের খুঁটির ওপর বসে। নির্জন, নিশ্চুপ চারিদিক। সর্বত্র ধূসর বিকেল নেমেছে। শহরের ধূসরতার সাথে নিজের মলিনতার মিল খুঁজে পায় সে।
সরাইখানার দরজায় মরচে ধরা মস্ত তালা ঝুলছে। আলখাল্লার ভেতর থেকে দুটো মুদ্রা বের করে আবার সেখানেই রেখে দেয় সে। জনমানুষ বিহীন শূন্যতায় ঘুম পায় তার। ঠিক তখনি পেটের ভেতর ক্ষুধা মুচড়ে ওঠে। আড়ষ্ট পায়ে ভর দিয়ে সে উঠে দাঁড়ায়। খাবার-পানীয়র খোঁজে সরাইখানা ছাড়িয়ে সামনে হেঁটে যায়।
স্রোতহীন জলাভূমির বুকে নীল আকাশের ছায়া ভাসে। এই তো গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের ব-দ্বীপ, আগন্তুক ভাবে, প্রায় সাড়ে চার হাজার বছরের পুরনো জনপদ। পূর্ব পুরুষের আদি গ্রন্থে এই মতো ভৌগোলিক অঞ্চলকে আগন্তুকের পুণ্য উৎপত্তিস্থল বলা হয়েছিল। দেশের নাম ধানশালিক। গ্রাম্য জনজীবনের বিবরণে ছিল ধান্যশস্য, গবাদি পশু, মৎস্য, নুনভাত। হাস্যরত শিশু, সবল দ্রাবিড় নারী-পুরুষ। সাঁকো পেরুলেই শহর। সে কোনো সাঁকো দেখতে পায় না। জলের ওপর নিজের ভাসমান প্রতিবিম্বের দিকে তাকায়। আলখাল্লার ভেতর থেকে পুরনো গোলমতো কম্পাস বের করে ঝাঁকি দেয়। এর কাঁটা উত্তর দিককে নির্দেশনা দিয়ে আছে।
পুস্তক মোতাবেক শহরের মধ্যখানে মহানগর থাকার কথা। যেখানে কারখানার যন্ত্রের সাথে ঘুরেছিল সভ্যতার চাকা। শ্রমিকের পেশীবহুল হাতের পাশে চিত্রকরের শৈল্পিক হাতের ছবি উৎকীর্ণ ছিল আদি পুস্তকে। বিদ্যাগৃহ, সেবাসদন, চিত্রশালা, উপাসনালয়ের নকশা আঁকা ছিল নগরীর মানচিত্রে। জনপদে সহাবস্থানরত ছিল দরিদ্র কর্ষক, ধনী বণিক, মাতাল, জুয়াড়ী আর জ্ঞানী দর্শনশাস্ত্রবিদ। আগন্তুক ইতোমধ্যে স্মৃতিচিত্রের সাথে বাস্তবের ছিটেফোঁটা মিল না পেয়ে বিচলিত হয়ে ওঠে।
নালা পেরিয়ে সে হেঁটে যায়। ইটের গাঁথুনি দেয়া একটা দেয়ালের কাছে এসে থামে। এখানে সেখানে চলটা ওঠা দেয়ালের চুন-সুরকির ভাঙা গাঁথনি দিয়ে দেখা যায় ওপাশে একটা ডালিম গাছ। পাকা লাল ডালিম গাছে ঝুলছে। দেয়ালের ফাঁক ফোঁকরে পা গলিয়ে ডালিম ধরে টান দিতেই ধারাল ডালে তার ডান কনুই এর অনেকটুকু জায়গা চিরে যায়। মুহূর্তেই কনুই থেকে কবজির দিকে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। সে একবার ক্ষতের দিকে তাকায় কিন্তু ডালিম হাতছাড়া করে না। একটানে ডালিম ছিঁড়ে নেয়। দেয়াল থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে ডালিম ফাটায়। স্ফটিকের মতো দানা মুখে পুরে বীচি সুদ্ধ চিবিয়ে খেয়ে ফেলে। ডালিমের রসে তার শক্ত ধুলো ভরা ঠোঁটের ফাটল নরম হয়ে আসে। শুকিয়ে আসা গলা আর্দ্র হয়।
দূর থেকে একজনকে এদিকে আসতে দেখে ডালিমের খোসা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দ্রুত এগিয়ে যায় আগন্তুক। কিছুটা এগিয়ে হাঁক ছাড়ে- এই যে, শুনছেন? থমকে দাঁড়ায় তরুণ। এখানে সে কাউকে আশা করেনি। আগন্তুক তরুণের সামনে এসে দাঁড়ায়। জানায় সে এ শহরে এসেছে আদিউৎসের সন্ধানে। ধানশালিক নামক দেশে তার পূর্বপুরুষ আবাসস্থল ছিল। তরুণের মনে পড়ে দাদু, দাদু আদরের ডাক। ধানশালিক পাখি। হুশ হুশ উড়ে যায় সে ছোটবেলায়। শীতল পাটির ওপর বসে প্রপিতামহের মুখে ধানশালিকের নাম যেন সে শুনেছিল এক গল্পে। এই নাম অনেক আগে লুপ্ত হয়ে গেছে। তরুণ সন্দেহের চোখে তাকায় আগন্তুকের দিকে তারপর বলে- এ দেশের নাম ভুলভুলিয়া।
ভুলভুলিয়া! নাম শুনে অবাক হয় সে। কিচ্ছা কাহিনীতে দেশের এমন নাম থাকে। সে এক গল্পে ঢুকে পড়ে। তরুণ ছাড়া আর কেউ নেই আশেপাশে। নগরীর অধিবাসীরা কোথাও জড়ো হয়েছে। হতে পারে সবাই কোনো উৎসবে গেছে। এ কথা জিজ্ঞেস করলে তরুণ জানায় সে উৎসব শব্দটির সাথে পরিচিত নয়। আগন্তুক বুঝিয়ে বলে- উৎসব অর্থ আনন্দ উদযাপন করা। কোনো মেলা কিংবা পার্বণ। অদ্ভুত দৃষ্টিতে ছেলেটি আগন্তুকের দিকে তাকিয়ে রয়। এই শব্দগুলো তার অপরিচিত। সে বলে- এই দেশে এমন কিছু হয় না। এই শহর পরিত্যক্ত। এখানে কেউ থাকে না। আমি মাঝে মধ্যে ঘুরতে ঘুরতে এখানে চলে আসি। তারপর কী মনে করে বলে- অনেক কাল আগে এই জায়গাটির একটি নাম ছিল। আমার প্রপিতামহ বলেছিলেন এক সময় জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
আগন্তুকের মনে হলো এদেশে কারো কিছু মনে থাকে না। সবাই সব কিছু ভুলে যায়। কারণ ইতোমধ্যে সে কোথা থেকে এ দেশে এলো তা ভুলে গেছে। এমনো হতে পারে যে যা করে সব ভুলভাল হয়ে যায়। দেশের নাম ভুলভুলিয়া। সে আর কথা বাড়ায় না। তরুণ যদি জিজ্ঞাসা করে সে কোত্থেকে এলো কী বলবে সে ভেবে পায় না। অতএব হাঁটন। দু’জন কথা না বলে হাঁটতে থাকে।
মনে মনে আগন্তুক উত্তর খোঁজে। উত্তর বা দখিনের বরফ উপচানো পাহাড় ডিঙ্গিয়ে সে এসেছে। কেন? পূর্বপুরুষের খোঁজে সে কেন এসেছে? সে দেখতে পায় কোটি কোটি মানুষ অপেক্ষারত কাঁটা তারের ওপারে। পৃথিবী তাদের ভুলে গেছে। বিপর্যস্ত, বিপন্ন সর্বহারার দল। ধন-জন সব কিছু খুইয়েছে তারা এমনকি ক্রুদ্ধতাটুকুও। সে তবে পরিত্রাতা। বিজনভূমিতে অভিবাসীদের পয়গম্বর হয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সে ছদ্মবেশী কাসেদ। মুক্তির গুপ্ত সংবাদ সে লুকিয়ে রেখেছে আলখাল্লার পকেটে।
চারিদিকে খাঁ খাঁ শূন্যতা- এটা স্বপ্নও হতে পারে। সে বেঞ্চির ওপর বসে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সে এখন জেগে নেই, যা কিছু দেখছে সব অবাস্তব। স্বপ্নে যেমন হয়ে থাকে, কখনো বোঝা যায় এটা স্বপ্ন কিন্তু ধূসর, বোধহীন, ব্যথাহীন এবং নিয়ন্ত্রনহীন একটি প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ঘটনা প্রবাহিত হয়। যখনি তার বোধ জাগ্রত হয় স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। বোধের আচ্ছন্নতা থাকে কিছুক্ষণ। আগন্তুকের ক্ষুধাবোধ এবং ব্যথাবোধ অনুভূত হয়েছে। তাই এটি কোনো স্বপ্ন নয়। অথচ স্বপ্নের অধিক স্বপ্নেরও উত্তরণ ঘটতে পারে। হাজার লক্ষ বছর ধরে দেখা বিবর্তিত স্বপ্ন রঙ্গিন, বোধযুক্ত এবং স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে। সে মনে করে স্বপ্নের শেষে সূর্য ঢলবে। পূর্ব পুরুষের বাস্তুভিটায় পদ্মা-ব্রহ্মপুত্রের জল ছিটকে পড়বে। আদি পুরুষের শ্বাস মিশে যাওয়া ব-দ্বীপের বাতাসে দেহ জুড়াবে। হয়তো স্বপ্নের মধ্যেই এমন কিছু অনুভব করে সে কিংবা সে বেঞ্চির ওপর ঘুমন্ত নয়। আদি ভূমি সন্ধানের অনেক আগেই সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। কোথায় শেষ ঘুমিয়েছিল সে মনে করার চেষ্টা করে- একটি ঘর। ঘরের ভেতর তক্তপোষ পাতা। একটা টেবিলের ওপর বইয়ের স্তুপ, চায়ের কেতলি আর দুটো পোকায় কাটা আপেল। সে শুয়ে আছে চৌপায়ার ওপর বুকের ওপর প্যাপিরাসের পাতা নিয়ে। এতটুকু পর্যন্ত সে মনে করতে পারে। প্যাপিরাসের পাতায় লেখা কথাগুলো সে ভুলে গেছে।
প্যাপিরাসের পাতায় ছিল আবহমান কাল ধরে সভ্যতার উত্থান-পতনের চিহ্নসূত্র। সিন্ধু নদের মোহনায় আদি পিতা-মাতা লিখেছিল সভ্যতার গোড়াপত্তনের কথা। অবশেষে সভ্যতা পরিত্যক্ত হলে ধ্বংসের ধারাবাহিকতায় সৃষ্টি হয়েছিল এক নতুন সভ্যতার ভিত। সেই সভ্যতা বর্তমান কালে সঞ্চারিত হয়েছিল। একদা ধানশালিকের দেশ ভুলভুলিয়াতে ধীরে ধীরে স্মৃতিভ্রষ্ট হতে থাকে আগন্তুক। মস্তিষ্কে তার অজান্তে সভ্যতার ইতিহাস ভুলে যাবার প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
লোহার শিক গাঁথা বেড়ার উপর দিকে ইস্পাতের কাঁটা তার বৃত্তাকারে পেঁচিয়ে রয়েছে। শিস কেটে বাতাস বয়ে যায়। অলঙ্ঘ্য তারের ওপর নিঃসঙ্গ একটি গুবরে পোকা কেঁপে ওঠে। পোকাটিকে বড় আপন মনে হয় আগন্তুকের । করুণ সুর বেরিয়ে আসে ডালিম রসে ভেজা তার কন্ঠনালী থেকে। তরুণ ভয় পেয়ে চমকে তাকায়। গুনগুন শব্দকারী আগন্তুককে তার জাদুকর মনে হয়। যে কিনা মন্ত্র পড়ে তাকে বশীভূত করতে পারে। তরুণ জিজ্ঞেস করে- কী মন্ত্র পড়ছিলে?
-ওহ! আমি গান গাইছিলাম। তরুণ বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করে- গান কী? গীত, বাদ্য, নৃত্য এই তিনের মিলনে সঙ্গীত সৃষ্টি হয়, আগন্তুক জানায়, গান কবিতার মতো কিন্তু সুরে গাইতে হয়। তরুণ একের পর এক সম্পূরক প্রশ্ন করে যায় কবিতা আর সুর নিয়ে। উত্তরগুলো ভাবতে থাকে সে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে- কবিতা হলো কল্পনাবিলাসের মাধ্যমে ভাবমাধুর্য প্রকাশ করা। সুর... এক ধরণের ধ্বনি বলা যেতে পারে। ঠিক বোঝাতে পারলাম না মনে হয়।
-তুমি সঙ্গীত এবং কবিতা যাকে বলছ সে নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছে শত শত বছর আগেই।
যা পূর্বে ছিল এখন নেই। অতীত। অতিক্রম করে গেছে যাবতীয় মোক্ষমহৎ। প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত নগরীর প্রান্তে দাঁড়িয়ে তার মনে হয় এখানে মানুষ নেই। অদৃশ্য ফুঁ সঙ্গীতজ্ঞ, রসবোদ্ধা মানুষগুলোকে বহু পূর্বেই নিভিয়ে দিয়েছে। হঠাৎ তার মনে হয় আদি পুস্তক অসম্পূর্ণ এবং ভুল ছিল। কিংবা প্রাচীন পুঁথি অস্তিত্বহীন। সবই তার কল্পনা থেকে উৎপাদিত মর্মন্তুদ ফলাফল। মনোরাজ্যে সে কাল্পনিক পুস্তক রচনা করেছিল। গ্রাম-নগরের আরোপিত দৃশ্যায়ন তাকে ভুলভুলিয়ার কেন্দ্রাভিমুখী করেছে। কল্পনার সূত্র প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ধরে তার মাঝে প্রেরিত হয়েছে। আদিউৎস বলে আদৌ কিছু নেই। পোড়া মাটির দেশ নেই। অফিস, বাজার, স্টেশন নেই। নেই একটা বোকাসোকা ডাকঘরও। এই অদ্ভুত মনুষ্যহীন মৃত অঞ্চল তার দেশ নয়। সে এক প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর দন্তহীন অন্ধকার মুখগহবরে নির্বাসিত হয়েছে। তার উত্তাপ শুষে নেয় দানবের খসখসে শুষ্ক জিভ।
কাঁটা তারের ওপারের মানুষেরা উৎসব চিনে না। আনন্দ জানে না। কবিতা নিষিদ্ধ। কবে-কবে তারা গীত-বাদ্য-নৃত্য ভুলে গেছে। ওরা হয়তো মানুষই নয়। পরস্পর যোগাযোগহীন অগুনতি ছায়ামানব। বুকের মধ্যে অশ্বখুরের দাপানি নিয়ে তরুনের দিকে তাকায় আগন্তুক। এই তরুণ ছায়াতরুণ। তার হাত, পা, চোখের দীর্ঘ পাপড়ি, আলুথালু এক মাথা চুল সকলই মিথ্যে। অলীকপুরী ভুলভুলিয়া এক মায়ারাজ্য। ঘোড়ার খুরের পাড়ায় তার পাঁজরের হাড় গুঁড়িয়ে যায়। সাদা হাড়ের ভেতর থেকে শৈত্যপ্রবাহ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেহে। দেহের সীমানা ছাড়িয়ে আকাশে উঠে যায়। আবার নেমে আসে। আগন্তুকের মাথার ওপর এক খন্ড তীব্র শীতল যন্ত্রণা হয়ে ভেসে থাকে। যেন এক হিমানী আলোকচক্র।
হাঁটতে হাঁটতে তারা শহরের প্রান্তে চলে আসে। দূরে উঁচু মতো অস্পষ্ট কিছু দেয়াল দেখা যায়। দেয়ালে যেন ম্যুরাল দেখতে পায় আগন্তুক।
-এর শাস্ত্রসম্মত নাম ‘আধিপত্য স্মারক’।
সহস্রাধিক প্রাচীন অস্ত্র গেঁথে রাখা হয়েছে দেয়ালে। আধিপত্য স্মারক। সারিবদ্ধ তরবারী আর চাপাতির গায়ে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেঁধে আছে। আদি পিতা-মাতার কথা স্মরণ করে আগন্তুক। বাতাসে তাজা রক্তের নোনাঘ্রাণ পায়। সেক্ষণেই কনুই চেরা ক্ষত থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ে। নিজেকে আর ঈশ্বরপ্রেরিত মহাপুরুষ সে ভাবে না। শরণার্থী সে। অহো! বিভ্রান্ত আগন্তুক। আটকা পড়ে যাওয়া এক আশ্রয়ার্থী। তবে কে রক্ষাকর্তা? তরুণ কে দেখা যায় না। ভোজবাজি হয়ে সে বাতাসে মিশে গেছে।
কে যেন ওর কানের কাছে অশুভ ফিসফিস স্বরে বলে- থামো। সে এগুতে চায় কিন্তু নড়তে পারে না। আধিপত্য তার পায়ে লোহার অদৃশ্য শিকল পরিয়ে দেয়। ঘোলাটে চোখের সামনে বিজলীর চিকন রূপালী রেখা ঝিকিয়ে ওঠে। সে বোঝে না একটি উদ্ধত চাপাতির অংশ বিশেষ দেখতে পেয়েছে। চেতনা লোপ পাবার আগে মাথার ভেতর তীব্র শীতল যন্ত্রণা অনুভব করে সে।
সান্ধ্যকালীন দু’একটা তারা ফোটে আকাশে। নিচে ধূসরের ওপর ছোপ ছোপ কালো দেখা যায়। সেখানে বড় বড় গর্ত হাঁ হয়ে আছে। নিশ্চুপ চারিদিক। অনেক দূরে পাতাহীন ভাঙ্গা ডালপালা নিয়ে এক ঠায় দাঁড়ানো তিনটি শুকনো গাছ। অক্সিজেন যোগান দেয়ার শক্তি হারিয়ে গাঢ় বাদামি রঙ ধারন করা। ধূ ধূ রুক্ষ প্রান্তরে একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে যায় আগন্তুক। বিশাল খোলা প্রান্তরে সে একক সত্ত্বা। নিঃস্ব এবং অসহায়। শূন্যতা তাড়া করে তাকে দাবড়ে বেড়ায়। বিরাটকায় প্রাচীন শকুন তার জীবন্ত মগজ ঠুকরে খায়, বুড়ো শেয়াল খাবলে খায় ডালিমদানার মতো লাল হৃৎপিন্ড। এতটুকু আড়াল পায় না বিচ্ছিন্ন মানব।
সর্বকালের ভেতর হারিয়ে যায় অতীতপুরাণ। আদি পুস্তকে কোনো আশ্বাস ছিল না। ঘটমান বর্তমান পুরাঘটিত হয়। তারপর ভাবীকালে হারিয়ে যায়। সমাধিক্ষেত্রে মলিন আলখাল্লা পড়ে থাকে। শরণার্থীর নিঃশ্বাসটুকু আলখাল্লার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরপাক খায়।

...