ছিটমহল

সাগুফতা শারমীন তানিয়া

দোলকঘড়ির দোলট দুলে চলেছে একটা নিশুন্যি জায়গায়, টিক টিক টিক। সেই শব্দটা আমার কানে বাজে। সেই ওয়ালনাটরঙা দেয়ালঘড়িটা। বাড়ি মানে ছিল দেয়ালের সেই ঘড়ি। বাড়ির আরো অনেক মানে ছিল। স্থাবর-অস্থাবর-জীবিত-ক ্লীব বিবিধ জিনিস মিলে বাড়ির একটা অর্থ দাঁড়াতো।
এখনো বাড়ির অনেক অর্থ। শিশুর চিৎকৃত উল্লাস, বেড়ালদের সক্কালবেলার বায়লজিক্যাল অ্যালার্মক্লক, একফালি বাগানময় বিছুটি ফুলগাছ আর সবজির জয়পরাজয়- এইসব মিলে আমার এই বাড়িটাও রীতিমত বাড়ি। এখান থেকে দূরে কোথাও গেলে পরান আইঢাই করে, ঠিক আগে যেমন আখরোটরঙা দেয়ালঘড়ি-অলা বাড়ির জন্যে করতো। এখানকার কামরাগুলিকে সামান্য সজ্জায় সজ্জিত করে- আসবাবগুলি এদিক সেদিক করে ঘরের একটা চিত্র বিনির্মাণ করা চলে। সেটা আমার ঘর। বা বলা চলে, আপাততঃ আমার ঘর। ঢাকাই শাড়ি আর কপালে সিঁদুর পরে অপেক্ষা করার আঙিনা নয়, নাচতে না জানলে যা বাঁকা হয়ে ওঠে সে আঙিনা নয়, আমার বঁধুয়া আনবাড়ি যাবে যে অঙ্গন সভয়ে ডিঙোতে ডিঙোতে- সেই আঙিনাও নয়, এ হলো ঘর হ’তে যে আঙিনা বৈদেশ সেই আঙিনা, দেয়ালঘড়ি-অলা বাড়িটা থেকে বহুদূরে বিলেতসরকারের তৈরি একখানা কটেজ এটা, আপাততঃ আমার।
ঢাকা আর লন্ডন। এই শহর জানে আমার প্রথম অনেককিছু, ঠিক যেমন করে ঐ শহরও জানতো। ঐ শহর প্রাণের আরাম, এই শহর চিত্তের মুক্তি। এইভাবে দু’ভাগ করে নিয়েছিলাম আমি। প্রথম ঘাসের মাঠে শুয়ে শুয়ে আকাশ দিয়ে উড়োজাহাজের উজ্জ্বল শাদা ফ্লাইটপাথ দেখতে দেখতে আর পিঠের তলায় পাতালরেল যাওয়ার গমগম ধ্বনি টের পেতে পেতে আমি চমকিত হয়েছি এই শহরে (এমন আনন্দ আজন্ম জানতে পারিনি কেন আমার জন্মের শহরে?)। এই শহরে প্রথম গাঙচিলকে খাইয়েছি প্রক্ষিপ্ত রুটি। এই শহরে নবজাত সন্তানকে নিয়ে সকাল হওয়া দেখেছি- চিমনির ধোঁয়ার কুন্ডলী ঐ উঠলো নীল ভোররাতের আকাশে- আরেকটা সকাল, আরেকটা জীবনও। প্রথমদিকে ছিল জন্মভূমি ছেড়ে আসবার সুতীক্ষ্ণ বেদনা। পরে এসেছিল আরেক ভূখন্ডকে নিবিড় ভালবাসবার সচকিত অপরাধবোধ, যেন দয়িতার জন্যে জন্মদাত্রীকে পরিত্যাগ করবার আত্মগ্লানি এতে। আরো পরে যা এসেছিল তা সেই দোলট জানে, আর জানি আমি- একটি নিশূন্যি স্থানে দুলবার দুলে যাবার ক্লান্তিকর যাত্রা। না এ আমার দেশ, ফেলে এসেছি যাকে তাকেও আর আমার দেশ বলে প্রত্যয় হয় না, দেশাত্মবোধ নিয়ে প্রতিদিন কাঁটাছেড়া হয় আমার শরীর আর আমার মনপ্রাণ, সেই শল্যচিকিৎসা এবং বিশ্লেষণ দূরের লোকে করে না, আমার লোকেই করে। আমার দেশেই কি না অভিবাসন মানে একরকমের রাজদ্রোহিতা। আর যেখানে এসেছি সেই দেশে অভিবাসী পরিচয়ের মানে কেবল রুটিকুড়ানিয়া গাঙচিল, চিলচিৎকার ছাড়া আমার কন্ঠ আর কোনো সংগীত উৎপাদন করতে পারে না- হতেই পারে না সেটা। একসময় যেমন একটি আন্তরিক হাহাকারের সাথে মনে হতো, কে আমার প্রিয়জন (কিছুই তো হলো না, সেই সব, সেইইই সব...); পরবর্তীতে তেমনি করেই মনে হতো, কোনটা আমার দেশ, ‘হা হুতোস্মি, সড়কে বেঁধেছি ডেরা’, না চাইলেও বালুচরী আত্মার কেবল মরীচিকাই জুটবে, অতীতচারী হলেও তাই, ভবিষ্যতদ্রষ্টা হলেও তাই।
মহাযুদ্ধগুলিতে যেসব ভারতীয় সৈন্য বৃটেনের জন্যে যুদ্ধে গেছিল, তারা যেভাবে জেনে গেছিল একসময় যে, যতই মহিমময় দেশপ্রেম নিয়ে তারা যোগদান করুক না কেন, এদেশ কখনো তাদের আপন ভাববে না, তেমনি করে অভিবাসীরাও জেনে যায়- একই সত্য। সে আরেক গাছের ছাল। আরেক মাঠের ফসল। যুগপৎভাবে এও সত্য, তার নিজের দেশের মানুষও তাকে আর একই গাছের শাখাপ্রশাখা হিসেবে দেখে না। দৈনন্দিন সুখদুঃখতাপপরিতাপের জীবনে তো সে আর শারীরিকভাবে নেই। হিমবাহের বেগে নিঃশব্দে কবে কখন একটু একটু করে সরে গেছে। আমার নিজের শরীর কেমন করে সেই আদি মহাদেশ থেকে চিরপরিচয় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এলো, কেমন করে তার গভীরে আগ্নেয়শিলায় রয়ে গেল আদি ইতিহাস, অথচ ভূমিক্ষয়ের ফলে বদলে গেল উপরিপৃষ্ঠ- সেইসব দিয়ে একটি মিনি-ভূগোলপাঠ রচনা করা চলে। রুটিকুড়ানিয়া গাঙচিলের হলদে চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে আছে ক্ষুধায়, কন্ঠে তবু সমুদ্রের সংকেত- সে ভোলেনা নোনা দিনগুলি। আমস্টারডামের বাতাস শুঁকলে গন্ধ আসে সুরিনামীজ পিকালিলির, লন্ডনের অনেক গলি ভারী হয়ে থাকে হলুদ-মরিচ-ধনে-জিরের সুবাসী তরকারির গন্ধে। শহরের ভিতরে তাই গড়ে ওঠে উপশহর, এরা সেগুলিকে তাচ্ছিল্যভরে ডাকে ‘ঘেটো’। অদৃশ্য কাঁটাতার দিয়ে আরেক জাতের মানুষের আবাস আলাদা করা।
এইসব নিয়ে দুঃখ করছিলাম অনেক কাল ধরে- একদিন আমার অনুজা প্রজ্ঞাদীপা আমায় জিজ্ঞেস করেছিল, “দিদিয়া, তুই কি নিজভূমে পরবাসী টাইপ কিছু ছিলি না? আমার তো মনে হয় ছিলি!” ফিরে দেখি মায়া-আয়নায়, তখন দেখতে পাই, নিজের দেশে নিজ ভূখন্ডে দিব্য আমি ভেসে থাকতাম, অনেক কিছুতেই আমার আন্তরিক সায় মিলতো না, সায় দূরে থাক, পরান ডাক দিয়ে উঠতো, “এ হতে পারে না!” বলে। বিলেতে প্রথম এসে বাসস্টপগুলিতেও যখন বিবাহপ্রস্তাব নিয়ে যথেচ্ছ ঘুরে বেড়ানো জ্যেষ্ঠা স্ত্রীলোকরা জিজ্ঞেস করতেন, “বাঙালি নি (নাকি)?”, আমি মরিয়া হয়ে জবাব দিতাম, “আই অ্যাম ফ্রম মরিশাস”, আর মনে মনে বিষম চমকে উঠতাম যে এ আমি কি বললাম! নিজের দেশের মানুষের কত দেশাচার আমায় একা করে দিত, তার সবগুলি এক এক করে মনে পড়তে থাকে। সময়ের সাথে সাথে তাদের কোণগুলি ঘষে সামান্য মসৃণ হয়েছে আমার স্মৃতিতে, তবু তারা বেঁধে। তারপর প্রজ্ঞা শুনিয়ে দেয় আমায় আমার ভবিতব্য- “লোকের মাঝে একলা হয়ে বাকি জীবন কাটাবি আর সেই রক্তক্ষরণ দিয়ে পুষে বড় করবি নিজের লেখা, সেটাই তোর জীবন হবে।”
আহা কে জানতো, শ্বাসস্পন্দিত প্রাণীর উষ্ণ রক্ত দিয়ে কেবল মশকডিম্ব পালিত হয় না, শিল্পও এই উষ্ণ শোনিতের ভোগ দাবী করে।

বিচ্ছিন্নতা, একরকমের আলুলায়িত একাকীত্ব, এইগুলি আধুনিক সংবেদনশীল মানুষের মানসিক এবং জৈবনিক উপসর্গ। তার নির্দিষ্ট করে জাতপরিচয় নেই, থাকে না, ফিকে হয়ে আসে জন্মদাগ। মায়ের পোষক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আসবার পর যেমন শিশুর সেই অলৌকিক বেদনা দ্রুত শমিত হয় এবং একসময় চিরবিলুপ্ত হয় সেইভাবে তারও দেশান্তর বা লোকান্তরে যাবার বেদনা হালকা হয়ে আসে। লোপ পায় না। ‘ধিক ধিক করে তারে কাননে সবাই’, কিন্তু মাটিতে বিস্তার লাভ করে নতুন মূলগুচ্ছ, জন্মায় নতুন শাখা, তার ফলের স্বাদও ভিন্নতা পায়।