জল হাওয়া পূর্ণিমা ও পাথর

শামীম আজাদ


বহুদিন সিথানে সভ্যতা, বাজুবন্দে উল্কার ঘাম ও পরাজয় নিয়ে বসে আছি প্রহর
এ বিধুর কালে ঠোঁটের আঁকে কি একটিও প্রজাপতি দেখা যায় ?


যখন জলে ভাসি তখন জানি এই যে উতলা জলখন্ড তার গভীর অতল লেগে আছে মৃন্ময়ীর তলপেট। মাটি মহামায়া। তুমি আছ তাই ভরসা করে পা ফেলি পানসী থেকে পর্বতে। শিখড় থেকে শিখড়ে। এই ভূধর হইতে ভূধরে। কোন ভয় নাই। পা ফস্কালেই মাটি। কিন্তু আকাশের রূপালী ধাতবে পা ছোঁয়ালে পরে সে যখন পাখির মত উড়ে তখন আমার ভয় হয়। মনে হয় পায়ের নিচে আর মাটি নেই। নেই কোন সলিড পাথর। প্লেনের জানালার ওপাশের এই হাওয়ার হুড়োহুড়ি, মেঘের মন্দাক্রান্তা ধ্বনি, ঐ নিচের রোদের পরত কিছুই আমাকে সেই বোধ দেয় না। আমার বিন্দু এই মহাকালের এক বেওয়ারিশ শব হয়ে থাকে। আমি ক্ষ্যাপা হয়ে খুঁজি মাটির পরশ। কোথাও না কোথাওতো আমাকে রাখতে হবে। তাই আমি যতক্ষন উড়ি প্রাচীণ এপৃথিবীর এ্যান্টেনায় ঝুলে ঝুলে ঝলে থাকি ঐ বহুদূরের অতলের ভাষা দিয়ে, অধিবিদ্যা দিয়ে, গায়ের বাকল দিয়ে, চোখের চশমা দিয়ে, জুতা দিয়ে, স্বাদের আস্বাদ দিয়ে, নতুন চুম্বনে আমার অধিকার জানান দিয়ে উড়ি। কারো না কারোর সঙ্গে এইসব ছায়াবাজী করে হলেও বুঝিয়ে দিই ‘তোমারই মত ঐখানে আমার ও কিছু আছে চাহিবার’। তো মানুষের জন্যইতো মাটি। প্রাণীর জন্যই ধরা। উড়ন্ত সংসার বলে কোন কথা নেই। প্রজাপতি, পতঙ্গ, পাখিও ফিরে আসে যতক্ষন না তার নখে লাগে মাটিতে গেঁথে থাকা গেহ-গাছ।

কিন্তু মাটিতে স্পর্শ লাগলেই তখন শুরু হয় আরেক ভাবনা। সে ভাবনাটা আসলে এক দূর্ভাবনা। আমি যেখানে দাঁড়াতে চাই তার সীমানার আঁক কষে মালিকানার দাগ নিয়ে পাহারাদার নিয়ে খাড়া হয়ে যায় ভিন্ন এক মানব। সে নাকি আমার আগে ঐ স্থানে এসেছিলো অথবা তার পিতা অথবা তার পিতৃব্য দাদা পৈর দাদা। আমি তার ভাষা বুঝিনা কিন্তু দাবী বুঝি। বুঝি এই পার্বত্যভূম বা সমতল বা জলের ও দাবীদার বংশ পরম্পরায় এভাবেই হয়েছে। ভাবি তারাকি এত লট এত ঘট হাড়ি সরা ভান্ড কিছুইকি নিয়েছে সাথে? নেয় নাই। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে পারে নাই। সে তাহলে ছিল এক নোম্যাড। আমেরিকায়তো ছিল রেড ইন্ডিয়ান। এখন তারা নোম্যাড। বেগার্স আর নট চুজার্স। আমি হাত পেতে থাকি শিল্পক্ষুধায়। যাহা পাই তাহাই চেটেপুটে খাই। এডিনবরা ফ্রিঞ্জ ফেস্টিভ্যালের ফাঙ্গাস হওয়া থেকে কস্টা ক্যাফের ফোঁকড়েও কবিতা স্টোরি টেলিং করেছি। শিল্পধর্মের দিক্ষায় দিতে দিতে এতটাই বদলে গেছি যে দেশে আমি আর যথেষ্ট বাংলাদেশী নই- ব্রিটিশ। বিলেতে, নট এনাফ ব্রিটিশ-বাঙালি। সেখানে আমি এক উদ্ভট ঊট। এদেশে আমি এক খয়েরী খাবার কারি।

আড়াই যুগ আগে মোহাম্মদপুরে আড়াই কাঠা থান ছিলো। অনুপস্থিত মালিক বলে কোন কথা নেই তাই এখন চাঁদা-রাজনীতিবাজদের দখলে সেখানে দেখেছি চারতলা দালান। দীর্ঘদিন ভিন দেশে ভিন নদী তীরে শিল্প ফেরিওয়ালী আমি এখন নিজ বাসভুমে পরবাসী-নোম্যাড। এদেশেও তাই। কবির কাজ কবিতা-দাঁত পরিষ্কার করা আর ক্যারিজের ফুটো বন্ধ করা না।আমি তাই এখন জাবরকাটা অতীতবাটা চোখের কুসুম খোলা এক প্রানী।

কিন্তু আমারও তো তার আগের অতীত আছে। এ পৃথিবী নির্মান কারখানার নৃত্বত্ত আছে। আমার জন্ম আছে, স্বাধীণতার নিসর্গ লিপিবদ্ধ আছে। লিপিবদ্ধতার আগে হোমারের মত মুখ আছে, বাল্মিকীর শ্লোক আছে। কে আর অতীতের খোঁজে আগ্রহী? অতীততো আরেক বিদেশ বিভূঁই। সেখানে নিজের মত কি কি যেন করে তারা নিত্যই। শুধু ক’খানা ছবি ফ্রেমে বাঁধিয়ে ফেলে গেছে এই অব্যাহত যাত্রার ট্রেনে, ঠিক এই খানে, আমার বুকের মাঝে। আমি তাই নিয়ে চলেছি একা এই পঁচিশ বছর। মনে মনে বাতাস, বর্ষা, আকাশ, আশপাশ, নতুন ফুল ও কুঁড়ি দেখি আর বলি আমার অতীতের কোথায় যে দেশ ভাবিয়া না পাই উদ্দ্যেশ। এলপি হার্টলীর লাইন “ দ্যা পাস্ট ইজ এ্যা ফরেন কান্ট্রি; দে ডু থিংস ডিফারেন্টলি দেয়ার।” লাইনটা আমাকে অনেক টানে।

আর আমার বর্তমান সেই অতীতকে টোকা মেরেই তাল্টি ভাল্টি করে রুটি গাজর ডিম যোগাড়। কে যে প্রাচীন আর কে নবীন তার কি কোন দিশা আছে! এখানে ইতিহাস ক্লাশের শিক্ষক পড়ায় কৃতদাসের কাহিনী। কিন্তু ডিয়ার টিচার একবারও কি ভেবেছো তোমাদের ও বহু আগে তারা মুক্ত ছিল। তাদের নিজের ভাষা ছিল। পশু বধের পর পুড়িয়ে খাবার প্রক্রিয়া ছিল। তাদের মাটি তাদেরি ছিল। যাযাবর বানিজ্যে কার নৌকা তীর গাড়ি গুলি মাদল বা পদতল মাটি ছুঁতে পারবে তাও বলা কঠিন। তবে তিষ্টাবার প্রথম কৌশলই ভাষা। বা সংযোগ স্থাপন। ভাষাবীজ অভিবাসীর প্রথম বপন। এমনকি গত শতাব্দীতে হারিয়ে যাওয়া আমার মাও সেটা বুঝেছিলেন।


সেবার আম্মা তার লন্ডন সফর কোটা শেষে বুজানের কাছে টেক্সাস যাবেন। একাকী প্লেনে মহাসাগর পাড়ি দিতে পথে তার পানি, ওষুধ, বাথরুম, ব্যাগ, খুচরা পয়সা, চা কত কিছু লাগবে! আবার সেখানে পৌঁছলেই তার চাকার পা মাটিতে লাগা মাত্রই ধুম শুরু হবে আম্মার কাছে সেস্থানে তার সন্তানের আগে আসা অভিবাসিতের অত্যাচার। তার কাছে থেকে সে দেশের অফিসার মুটে মজুর ব্যবসায়ী তেল বিক্রেতা ঘর নির্মাতা মাংসের দোকানদার পাহাড়ের পাণ্ডার কতকিছু চাইবার থাকবে। কি ভাবে এই মহিলা সে সব ব্যাপারগুলো সারছেন- বা সারবেন! জিজ্ঞেস করতেই তিনি তার হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটি পুরানো নোট বই বের করে দেখালেন তিনি তার ভ্রমণকালীন অত্যাবশ্যকীয় বস্তু ও ইংরাজী সংলাপগুলো বাংলায় বানান করে লিখে রেখেছেন! দরকার মত বই দেখে ব্যবহার করে করে দেশগুলো টপকে বেড়াচ্ছেন। সব দেশেই তার পৌত্র পৌত্রী আছে তারাই তার ঠিকাদার। ভাবা যায়! ভাষার গুলাইল মেরে মেরে আকাশেও মাটি খুঁজে নিয়েছেন মহিলা।


আম্মার ছিল পাকা পেয়ারার মত সোনালী গায়ের রঙ, দেহ দারুচিনির গন্ধ ভরা, কপালে গোলাপের আভা- যেমন সব মায়ের থাকে। আব্বার প্রয়াণের পর আমরা চার ভাইবোন চার মহাদেশে বসবাস করতে শুরু করার পর এক আজব ভোরে তার কথা ভেবে অবাক হয়ে গেলাম। তিনি কখন তার প্লাস্টিক হাঁটু ও হার্টের গোটা তিনেক বাইপাস গেরো নিয়ে হুইলচেয়ারে নিত্য আকাশে আকাশে উড়ে উড়ে এক ওয়াইডলি ট্রাভেল্ড ওম্যান-বিশ্ব পরিব্রাজক হয়ে গেছেন! তাকে এয়ারপোর্ট থেকে আনতে গিয়ে লক্ষ্য করি ঝাঁকে ঝাঁকে সুন্দর সুন্দর বুড়ো-বুড়িরা সমান কারণে হুইল চেয়ারে ঈটির মত উড়ছে। এখন তাদের সংখ্যা হুইল চেয়ার ধরবার আগেই দ্বিগুন হয়েছে। বেড়েই চলেছে। সন্তানদের সূত্র ধরে দখল করছেন ভিন দেশের মাটি বালি জল ও পাথর। আর আমরা তার তেজারতি করছি অবিরল। বিদ্যা বানিজ্য বংশবৃদ্ধিতে- ভাষায় আশায় ভালোবাসায়। সে যে সে মাটি হোক তার প্রতিটি ইঞ্চিতে মানুষ হিসেবে প্রতিটি মানুষেই আছে অধিকার। সেখানে যারা আছে তাদের হাত ধরে হাঁটলে, একসঙ্গে খেলে, কিছুটা দিলে, আচারানুষ্ঠানের আংটা খুলে দিলে, ঘুড়িতে আঠা হয়ে থাকলে, অতীতের অথৈ গল্প করলেই কেবল করলেই তিষ্টে থাকার কালে অন্তত আধিকারটা জন্মায়। সে শূন্যে হলেও।

সেখানেও কথা আছে। অন্তর্জ্বালা আছে। তুমি তোমার ইচ্ছে মত মানুষের হাত ধরতে পারবে না। ধরে মাটিতে দাঁড়াতে পারার অধিকার পাবে না। তোমার যৌণতা জীবন জগত বর্ণ গন্ধ ঠিক করে দেবে সেখানের আগে আসা আগে ভূমিষ্ঠ হওয়া সমাজ শাসিত পুরুষ ও পুরোহিত, মক্তব ও মোল্লা, পিতা ও পাদ্রী।

পাখির কোন পাশপোর্ট বা পুরোহিত লাগে না। ভিসা বা ভষ্ম মাখতে হয় না। ডিঙি নাও লাগে না। তারা একসঙ্গে উড়ে- তাদের বর্ডার পুলিশ নেই। মানুষের আঁকে মানুষেরা আটকে যাই। তারকাঁটায়, বৈদূতিন জালে, প্লেনের পাখায়। পিষে যাই চ্যানেল টানেলের চাকার তলায়। ডুবে যাই সাগরে। শুকিয়ে মরি মরুভূমিতে। তারপর কৌশলে যা আদায় করি তা এক মালিকানাহীন মালিকানা। গৃহবিহীন গৃহ। পথহীন পথ। অনাবাসীর আবাস। যতটা যাওয়া যায়- ততটাই যাওয়া যায়।