শূন্যতা অথবা ফাঁকা একটা জানলা

প্রশান্ত সরকার

“And new philosophy calls all in doubt, the element of fire is quite put out; the sun is lost, and the earth, and no mans wit can well direct him where to look for it.” – John Donne

এভাবেই এক এক করে হারিয়ে যায় প্রিয়জন, সূর্যের অবকাশ যেরকম... মাথার ভেতর পাক খেতে খেতে বলগুলো রঙিন হচ্ছে। কতগুলো পায়রা নেমে এল বিস্মৃতির গমদানার কাছে। একে আমি শূন্যতা বলে ডাকি। ফুঁ দিতেই ঠাণ্ডা হয়ে আসে বিকেলগুলো। চুমুকে চুমুকে পাত্র খালি হয় ঠোঁটের উপুড়ে, ঠোঁটের কষ বেয়ে নেমে আসে অবাক নামতা। শূন্যতা, যার কোন আগুপিছু নেই, শুধু সম্ভাবনা ছাড়া, তেমন মুহূর্তে কখনও কখনও ফিরে পাবার আশ্বাসটুকু লেগে থাকে আঁশটে গন্ধের মতো।

কেন বারবার একই কথা বলে যেতে হয়? কেন বারবার ফিরিয়ে নিতে হয় মুখ বিদর্ভের মলোটভ ককটেল থেকে? আসলে তো রঙ, যার সবটাই ম্যাজিক, কিংবা সনাতন। শূন্যতা অথবা একটা ফাঁকা জানলা, যে নামেই ডাকো সেখান থেকেই উড়ে যাবে একটা বেজন্মা পর্দার পরত। আরও বেশী বেশী জলকণা ভেসে থাকবে সাবেকী পাতার প্রতিঘাতে।

এরপর আরও একটা দৃশ্য নিয়ে
ভেসে যাবে সফরের রাত। একটানা
সারেঙ্গি বাজিয়ে থেমে যাবে
জাহাজের মতো,
সূর্যের আস্কারা মুছে ক্ষত এঁকে দেবে কোনো প্রিয় হাত
আর উল্কি থেকে উড়ে যাবে পাখিরা
নিচু মাস্তুলের দিকে...

ভাঙা ডানায় প্রতিঘাত লেগে থাকবে সুদূরের ভাঁজে ... নিচু মুখ নিয়ে সন্ধেরা আবছায়া জুড়ে দেবে গাছেদের পিঠে। তবু শূন্যতার একে একে সবটুকু দিয়ে চলে যাবে সদর স্ট্রীট কিংবা অ্যাডহক লেন। শূন্যতা একটা আপাত জনমানবহীন প্রহেলিকা... জীবন ও জীবিতের মাঝামাঝি একটা রূঢ় আলেখ্য যেখান থেকে শুরু হয় গল্প।

একটাই খোলা জানলা আর আকাশ – মুখোমুখি চেনার তাগিদে, তবু অপেক্ষারা স্থির পড়ে থাকে। বিশদে কথা জমে ওঠে ছায়াদের। দেখতে দেখতে কখন যেন মুছে গেছে সবুজের চিহ্নটুকু। পাতার শরীর থেকে মায়েদের ধুয়ে যাওয়া সিঁদুরের শোক গাঁথা – শুধু জন্মান্ধ হলেই কি তাকে জলজ বলা যায়!!!

জন্মান্ধ হলে তাকে বলেছ জলজ
আর সমূহ পাতার দল পুড়েছে বিষাদে

এসব ইউটার্ন-এর পর স্বভাবতই পড়ে থাকে অলীক নামের খুনসুটি। তবু কোথাও না কোথাও এসে দাঁড়াতেই হয় রোজকার মতো। একটা শূন্যতার ভেতর দাঁড়াতে গিয়ে বুঝেছি শূন্যতা আসলে একটা আবহ। দেখেছি পুরো জায়গাটাই কেমন আস্তে আস্তে ভরে গেছে জলে ... একএকটা ভিড়ের কোলাজ পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি নতুন কোনো দরজায়। একটা দরজার পর আরেকটা দরজার মাঝের শূন্যতাটুকু ইটে গাঁথা, প্রয়োজন ছাড়াই। তবু সন্তর্পণে মুছতে চেয়েছি এসমস্ত গেঁথে রাখার বিভাজন। গ্রিনরুমে ঢুকে পড়েছে চাঁদের আরেকটা বিকল্প, আয়নার সামনে রাখা সমূহ স্বীকারোক্তি। আমি পালটাতে পারিনি সেসব দেওয়ালের রঙ। খোলা জানলার থেকে এসব ক্ষেত্রে পেন্সিল ভালো, অন্তত বাকিটা আকাশ দাগ দিয়ে নেয়া যায় পছন্দের মতো পরিসরে। পাখিদের মাপে মাপে এখন বসে যাচ্ছে এক একটা শহরের ধাঁচ – বেঁচে থাকবার সমূহ গঠন আর ফিরে আসবার কথায় জল হয় হাঁটুর গভীরে ডুবে যাওয়া অভাবিত নিয়মানুবর্তিতায় –

এইসব সার্কাসের ভেতর দিয়ে
হাঁটতে হাঁটতে
দেখা হয় স্টেশন মাস্টারের সাথে

তাবু গুটিয়ে নিয়ে ওরা সবে খেতে গেছে এক্ষুনি
ফিরে এলে অন্য পথে হাঁটা যাবে আবার

ততক্ষণ শুধু যাওয়া আর আসার গল্পে
বুঁদ হয়ে থাকা যাক

আমাদের বলতে তো শুধু ওই যাওয়াটুকু
ফিরে আসবার কথা একাই বলে চলে
স্টেশন মাস্টার

হতে পারে সেসবই কথার কথা, হতে পারে কেউই কখনও ফিরে আসবে না আর, বলা ভালো ফিরে আসতে পারবে না সমস্ত শূন্যতা কাটিয়ে কিছুতেই, তবু একা একটা ট্রেন ছেড়ে চলে যাওয়া মানে দৃশ্যত একটা ফাঁকা স্টেশন চরাচর। তার আর কেউ নেই, কিচ্ছু নেই শুধু এই অনিবার্য চলে যাওয়াটুকু ছাড়া। ক্রমশ আরও বেশী একা হয়ে উঠছে গন্তব্য। সন্ধের নাব্যতা ছেড়ে জেগে উঠছে একটা নির্জন প্ল্যাটফর্ম, হয়তো কিছু একটার জন্য আর টেস্ট টিউব বেবির মতো আবারও একটা শূন্যতা জন্ম হয়ে গেল লাইনের পাতে ফেলে রাখা প্রত্যেকটা সমান্তরালে।

আরও কিছুদূর হেঁটে গেলে দেখা পাওয়া যেতে পারে রঙিনের বলগুলো। বিধু’দার চায়ের দোকানে ঝাঁপ নেমে আসছে ধোঁয়াটে, নেমে আসছে ম্রিয়মাণ কার্নিশ থেকে সুসংহত ভেপারের তরল গোধূলি। তবু একটা ঘোর যেন কিছুতেই নেমে আসছে না কোথাও। এতসব ক্লোরোফিলের পড়ে যেটুকু সবুজ পড়ে থাকে তার আর কোনো অভিঘাত নেই, সংলাপ নেই কোনো, শুধু সংযমী কিছু হরিয়ালি আমাদের চেপে রাখা সমতল জুড়ে ইশারা করছে সুসময়ের। হাতে হাতে ফিরে যাচ্ছে আদ্র আলাপের মেঘলারা, মনখারাপের একরত্তি দিনে। যেভাবে ফিরছে জন্মের থেকে এক একটা ছায়া-ট্রাম, এমন দুর্দিনে অথচ ... যেখানে আর কিছু নেই, কিছু থাকবার কথাও নয় শুধু শূন্যতার ভিড়ভাট্টা ছাড়া, এমন প্রান্তিক উঠোন যেখানে কেউ কারো নয়। এমন সম্পর্কও কখনও কখনও অবকাশ হয়ে ওঠে। তুমি ভাবছ হয়তো একটা সুনিবিড় পতঙ্গ উড়ছে আর আমি দেখছি ক্রমশই মরে আসছে ফুল, আদরের প্রতিধ্বনি ছেড়ে। আসলে কেউই কোথাও যায়না, সত্যি সত্যিই একদিন ফিরে আসা সার্থক হবে আমাদের, ফেলে আসা সার্থক হবে সেইসব শুভেচ্ছার সমাহার। শূন্যতার ভেতর আরও একটা শূন্যতা আর প্রতিটা সম্ভাবনার ভেতর চেপে রাখা আরও একটা সম্ভাবনা শুধু প্রস্তাবিত ভাব বিনিময় করবে গার্হস্থ কৌশলে।

একটা ফুল রেখে এসো সেখানে

দেখো, সুপ্রাচীন মাটির গায়ে গায়ে লেগে থাকা
জাগতিক ঘ্রাণ, তোমাকে দেখাবে
প্রতিটা নিবিড় এবং তদ্রূপ আলো

তখনো তোমার চোখেমুখে লেগে থাকা ছাইয়ের সুবাদে
আরও একবার জন্মের কথা বলে দেবে
বলে দেবে প্রতিটা পুনর্জন্মের স্বীকারোক্তি

সহজ রিকসা নিয়ে এখন চলে যাচ্ছে দিনান্তের আলোকথা। এভাবেই হয়তো শূন্যতাগুলো ভরে উঠবে একদিন, প্রত্যন্ত দূতাবাস থেকে ফিরে আসবে স্বগত পাখিরা স্বীয় ব্যবধানে। প্রতিটা চেয়ার আবার দুলে উঠবে পরবর্তী শূন্যতার অপেক্ষায়, অসংলগ্ন এক একটা খুলে রাখা জানলার ধার ঘেঁষে, সংগত।