টস্‌

মিলন চট্টোপাধ্যায়

ফুর্‌র্‌র্‌র্‌র্‌ ...

বাঁশি বেজে উঠেছে । ব্রাসিলের মাঠে মিডলাইন বরাবর দাঁড়িয়ে আছে দুই দল । মুদ্রা লাফিয়ে উঠছে শূন্যে । ফোকাসে দুই অধিনায়কের উদ্বিগ্ন মুখ । ভাগ্য নির্ধারিত লাথিতে খেলা শুরু ।

এখনও -- দায়, সংসার, ব্যস্ত জীবনে বিরামহীন দৌড়ের মাঝে কোনো এক অপার্থিব বিকেলে ফ্লাশব্যাকে ফিরে আসে শৈশব; ভেসে ওঠে বাতাস কাটার আওয়াজ,মুদ্রার মাটিতে আছড়ে পড়ার ধাতব শব্দ -- ঠং ন্‌ ন্‌ ন্‌ । মনে পড়ে, কারো পকেটে একটা সিকি থাকলেই বাজিতে মেতে ওঠা জীবন জুয়ার সেই সূত্রপাত; বল্‌ তো - হেড না টেল ?

আমরা সব্বাই প্রায় একটি সিনেমা অবশ্যই দেখেছি - শোলে । সেখানে টসের গুরুত্ব ঠাকুর সাব, জয়, বীরু, বাসন্তি বা ধান্নু'র থেকে কিছুমাত্র কম বলে মনে হয়নি আমার । দুর্দান্ত চতুর, মিতবাক জয় বারবার টস করে আর জিতে যায় । ক্লাইম্যাক্সে টস্‌ নির্ধারণ করে জীবন - মৃত্যুর, বুদ্ধিমান জয় বন্ধুত্ব নামক এক সোনার পাথরবাটির জন্য মরণকে টেনে নেয় বুকে । জানা যায় মুদ্রার দুদিক ! এ মৃত্যু, আত্মহত্যার এক অবিশ্বাস্য দলিল; অন্তত একে আত্মহত্যা ছাড়া কিছুই ভাবা যায় না । সমগ্র অস্তিত্ব জুড়েই বেজে চলে এক মায়াবী মাউথঅর্গ্যান ।

শৈশব থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের জীবন জুড়ে লাফিয়ে চলে টস্‌ । যেন একটা ব্যাঙ ! অবিশ্যি সে ব্যাঙ শীতকালের অপেক্ষা রাখে না । সদ্য কৈশোরে পাড়ার গলিতে পয়সার অভাবে ভাঙা চারি, কিংবা মুঠোয় পাতার খণ্ড রেখে হার জিতের যে পদ্ধতি মফঃস্বলের কিশোররা ব্যবহার করে সেটাও তো টস । ক্রিকেটে টস নিয়ে কত ধুন্ধুমার কাণ্ড, এখন সেসব স্মৃতির কোলাজ । ভাগ্যে চিরকাল অবিশ্বাসী মানুষও বারবার টস হেরে একসময় ভাবে - দৈব প্রবল না থাকলে হেরে যেতে হয়; তবু সে চেষ্টা চালায় পুরুষাকার দিয়ে । চর্মগোলকে প্রথম লাথিটিও দৈবের অধীনস্ত আবার ক্রিকেটে সুপার ওভারে মীমাংসা না হলে টস নির্ধারণ করে হারজিতের । হেরে যায় লড়াই জিতে যায় ভাগ্য ।


আমাদের বৃহত্তম গণতন্ত্রেও টস তার জায়গা ধরে রেখেছে । কোয়ালিশন সরকার যেন সেই টসেরই রকমফের । আবার ভোটে যেখানে দুই যুযুধান পক্ষের 'টাই' সেখানেও টস্‌ ! তার ফলে মাঝে মাঝেই জগঝম্প ব্যাপারস্যাপার, 'হারিজিতি নাহি লাজ' এ কথা দুর্ভাগার সান্ত্বনা ছাড়া আর যে কিছুই নয় সেটাও সুধীজন মনে মনে জানেন এবং ছাগলের তৃতীয় বাচ্চার মত টসের তোষামোদি করতে বাধ্যও হন । ভেবে দেখুন এই টস্‌ আসলে কী নির্বাচকমণ্ডলীকেই চূড়ান্ত অপমান করা নয় ?

অভিধান জানাচ্ছে - টস নানাবিধ অর্থে লাফালাফি করে ! 'হাত দিয়ে ওপরে ছোড়া', 'আন্দোলিত করা' ইত্যাদি ইত্যাদি । আন্দোলিত যে হচ্ছি সেকথা বলাই বাহুল্য আর সে যে মাঝে মাঝেই খাবি খাওয়া সেটাও টের পাচ্ছি ।
অপ্রচলিত একটি শব্দবন্ধ এই প্রসঙ্গে মনে পড়ছে - 'ব্রেস্ট টসিং' । রসিকজনেরা জানেন পেন্ডুলামের দ্বিত্ব চলনে কিঞ্চিৎ আমিষ গন্ধ থাকলেও সে বড় মোহময় । টসের এই টস্‌কে দেওয়াটা ভারি উপভোগ্য ব্যাপার ।

এবার ভাবুন দেখি, টস যদি সবকিছুই নিয়ন্ত্রণ করত কেমন হত !
স্বয়ংবর সভায় সুন্দরী কন্যেটি একটি মুদ্রা নিয়ে দুই এর সরল গুণিতকে ভাগ করে নিচ্ছেন পতিপ্রবর আর সেই সভায় আমন্ত্রিত আমজনতাও । শেষে এসে দেখলেন - রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী যে কন্যাটিকে সমাজের জন্য পাবেন না কোনোদিন ভেবেছিলেন, টসে সেই আপনিই ফাইনালিস্ট এবং শেষাবধি এক কুবের পুত্রকে হারিয়ে লাভ করলেন কন্যারত্ন । মৃত্যুর সময় ড্যাঙস হাতে চার বিদঘুটে যমদূত আপনাকে নিতে এসেছে , আপনার পরিবার বললেন - লেটস্‌ টস্‌ । আর আপনি আবার জিতে এই বিকট গরম, ঘাম প্যাচপেচে জায়গায় থাকার মেয়াদ বাড়ালেন । ব্যাজার মুখে যমদূতেরা ফেরত গেল আর যম ক্ষেপে গিয়ে তাঁদের শাস্তি দিলেন টস্‌ করে -- নেশা তিনমাস বন্ধ । বাজারে দেখলেন ইলিশের বেজায় দাম, পকেট থেকে কয়েন বের করে বললেন - আজ টস্‌ হোক । যদি জিতি ইলিশ আমার, হারলে সব টাকা মেছুরের । অথবা উজ্জ্বল মঞ্চে বিখ্যাত সাহিত্য পুরষ্কার দেওয়া হচ্ছে টস করে । কি সাংঘাতিক ব্যাপার হত সেসব হলে !

জীবন আমাদের জন্য সাজিয়ে রাখে ঘুঁটি, নিরন্তর দাবা খেলে চলে ভাগ্য । শৈশব থেকেই শুধু টস করে চলছি আমরা । মুহূর্তের ভুল আমাদের জন্য প্রস্তুত রাখছে কঠিন থেকে কঠিনতর ময়দান, কেউ কেউ জিতছে আর কেউ কেউ হেরে যাচ্ছে অবিরাম । গীতা থেকে মহাভারত - সবই দৈব নামক টস - উপাখ্যান ! মহাভারতে ইচ্ছামৃত্যু'র অধিকারী পিতামহ শায়কশয্যায় প্রশ্ন শুনছেন পার্থের - ' কেন ইচ্ছামৃত্যু'র অধিকারী, সর্ববিদ্যাবিশারদ আপনার এই অবস্থা ? ' ভীষ্ম উত্তর দিচ্ছেন - ' পার্থসারথি জানেন, পুরুষাকার থাকলেও হেরে যেতে হয় । দৈবই আমাদের নিয়ন্ত্রক ।' এখানেও সেই টস, ভাগ্যের সাথে পুরুষাকারের । যোগ্যতা, প্রতিভা, সততাই শেষ কথা নয় । শেষ কথা বলেন নিয়তি, যার নিয়তি শোলের সেই কয়েনের মত, দু'পিঠেই শেষাবধি হেরে যাওয়া লিখে রাখে - তাকে, আঙুরফল টক্‌ ভেবেই মেনে নিতে হয় পরাজয়ের আড়াল । ' হেড ফর আই উইন, টেল ফর ইউ লস' - এসব বাক্য হয়েই থেকে যায় ।

মুখে বলি -' লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই / লড়াই করে বাঁচতে চাই' । কিন্তু শেষে গিয়ে জেতে সেই ভাগ্য । জীবনের মাঠে আমরা গড়াচ্ছি ফুটবলের মত । কেউ হ্যান্ডবল করেও গোল দিচ্ছে রেফারী নামক ঈশ্বরের বদান্যতায় আবার কেউ যে মুহূর্তে পৌঁছে যাচ্ছে লক্ষ্যের দোরগোড়ায় - ওমনি বেজে উঠছে খেলা শেষের লম্বা বাঁশি ----

ফুর্‌-র্‌-র্‌-র্‌-র্‌ -র্‌-র্‌-র্‌-র্‌-র্‌ ............