গুহা ছিল প্রথম আয়না

সঙ্ঘমিত্রা হালদার


আমরা হিন্দুস্থানে চলিয়া গিয়াছি জ্যাঠামশায়। ইতি—সোনা...

আমার কোনও দেশভাগের স্মৃতি নেই। আমাদের জেনারেশানের কারোরই হয়ত সেভাবে নেই। অন্তত প্রত্যক্ষভাবে। তবু অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’ যারা পড়েছেন—আমার বিশ্বাস তাঁরা সারা জীবন জুড়ে এই লাইনটা আপ্তবাক্যের মতো ফিরে ফিরে পড়েছেন। বারবার। নানা বাঁকে। ওই যে প্রিয় অর্জুন-গাছটার গায়ে একলা শিশু তার প্রিয় ‘পাগল’ জ্যাঠামশায়ের জন্য আরও অসহায় একটা বার্তা লিখে রেখে গেল। পা বাড়াল, এক অচেনা-অজানা হিন্দুস্থানের দিকে । উপন্যাসে হয়তো কোথাও নেই। কিন্তু কেন জানি না এই লাইনটার কাছে যতবার ফিরে গেছি, একটা ঘাস-জমি-হীন অনাবাদি সাদা বালির জমিতে পায়ের ছোট ছোট ছাপ পড়ে থাকতে দেখেছি। যেখান দিয়ে সোনা হেঁটে গেছিল। সে চাইলে হয়তো এ পারের ছেড়ে যাওয়া জায়গাটায়, সাদা বালি জমির ওপারের অংশটা থেকে কখনও আবার ফিরে আসতে পারবে। কিন্তু এই সাদা বালি জমিটায় দ্বিতীয়বার আর দাঁড়াতে পারবে না। সাদা বালি জমিটা চিরকালের জন্য তার চুরি যাওয়া সময় আর হারানো জীবনের কিছুটা হিসাবে চিরদিন একা দাঁড়িয়ে থাকবে। সব ফিরে পাওয়া গেলেও হারানো সময় কখনও ফেরে না। পৃথিবীর সব ‘নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড’ এই হারানো সময়ের চিহ্ন হিসাবে একা একা পাহারা দেয়। নিজেকে। সে আর কোনও সঙ্গ নিতে পারে না। নিজের চারিদিকে বেড়া তোলে। তেমনি মানুষও শরীর ও মনে বয়ে বেড়ায় নানা শেপের লম্বা-চৌকো সব বেড়া। সে দেশভাগ বা ছেড়ে আসার স্মৃতি থাকুক বা না-থাকুক। সব মানুষেরই মন-মেধা-হাত-পা এই প্রাচীরের কাছে এসে নানা সময়ে বাধা পায়। সে ভাঙার পথ খোঁজে।

এই খেলা-খেলা খেলা...
ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল এই বেড়া আর বেড়া-ভাঙা খেলা? ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল তার উদ্‌যাপন? ভাবি ওই যে শিশুটি টলোমলো পায়ে সবে দাঁড়াতে শিখছে, আর ওই যে চৌকাঠটার সামনে এসে টাল খেল- পড়ে গেল—এটাই কি শিশুর ‘নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড’? শুধু কি শিশু? এই যে একটাই মাত্র নশ্বর জীবন পাওয়া গেছে ভেবে প্রতিবার শুরুর অনেক স্পৃহা নিয়ে বারবার পৌঁছচ্ছি। তবু পৌঁছনোর রেশ দু’পায়ে মাখার আগেই মনে পড়ে যাচ্ছে—আসলে কোথাও পৌঁছোই নি কখনও! একটা জার্নি শুরু হয়েছে, চাইছি জার্নিটা রৈখিক হোক। তবু প্রতিবার ঘুরে ঘুরে নিজেরই কাছে চলে আসছি। সীমার হাড় পরখ করে কেবলই ফেরৎ আসছি। কেবলই ঘুরপাক খাচ্ছি। কী মানে হয় এর? যে মায়াকোভস্কি শুরুর অনেক স্পৃহা নিয়ে প্রেমিকার মোজার হিসাবটাও রাখতে চেয়েছিলেন, তবু পরস্পরের কাছে দাঁড়াবার জায়গায়, পরস্পরের দিকে এগোবার রাস্তায় অলিখিত গন্ডি কেনই বা ঘিরে থাকে তাদের! বুলেটের বারুদ ছাড়া সেই বাধা কেনই বা পেরনো যায় না! কেনই বা বারবার তবু এই চলে যাওয়া? যে পথ ছেড়ে আসতে হয় বলে এসেছি, কেন চাইলেই আর ছোঁয়া যাবে না তাকে?

পৃথিবীর সাপেক্ষে, এই জীবনের সাপেক্ষে বেড়া থাকবেই। সেইসঙ্গে থাকবে বেড়া ভাঙার এক নিরলস প্রয়াসও। এ এক অদ্ভুত জাক্সটাপোজিশান। আমাদের প্রত্যেকের জন্য নির্দিষ্ট খুপরি খুপরি সব চৌহদ্দি। এবং সেই চৌহদ্দি ভাঙার এক খেলা- খেলা খেলাও ততধিক বা তৎসম (তাহার সমান)। যদিও শব্দবন্ধটি ‘নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড’, প্রাথমিকভাবে ভাবলে তা একান্ত মানুষেরই সাপেক্ষে। কিন্তু পর্মুহূর্তেই আমাদের ভাবনার নো ম্যানস্‌ ল্যান্ডটি তার সীমা হয়ত বা কিছুটা টের পেয়ে, অস্বীকার করে সেই বেড়া। বুঝতে পারি— আজ ছিল ডাল খালি/ কাল ফুলে যায় ভরে। তার অনাবাদি জায়গাটা আবাদ করতে চায়। একটা মাছের, এমনকি একটা ব্যাঙাচিরও আছে একটা নির্দিষ্ট প্রাচীর। জল কিংবা বড়জোর পরিত্যক্ত কিছুটা জায়গা। মানুষেরও জন্যও প্রাথমিকভাবে একটা অক্সিজেন প্রাচীর। এমনকি যে ভাষায় আমি কথা বলি, তারও আছে, নির্দিষ্ট কিছু লুপহোল। এই যে ‘নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড’ আমি জীবের সাপেক্ষে বললাম বটে—তবু সে প্রাথমিকভাবে একান্তই মানুষের সাপেক্ষে। আমদের পরিশ্রুত ভাবনারা এই নির্দিষ্টের ভাষায় হোঁচট খেয়ে—তার প্রাচীর টেনে লম্বা করতে চায়। চায় ভেঙে ফেলতে। তাই শব্দবন্ধটির গায়ে সুকৌশলে জুড়ে যায় এক বৃহৎ-এর জীবজগৎ। আর তা যতটা না বস্তুগত তার চেয়ে বেশি চেতনাগত।

‘Behold the believers of all beliefs! whom do they hate most? Him who breaketh up their tables of values, the breaker, the law-breaker- he, however, is the creator.’--- Thus Spake Zarathustra : Nietzsche

কাঁটাতেরের ইতিহাসেরও ঢের আগে আমাদের মর্মে কি গেঁথে ছিল না তার পরম্পরার রেওয়াজ? প্রাকার দৈত্য মাথা তুলে দাঁড়াবার আগেই তো সে টের পেয়েছিল তার সংকেত। সুপ্ত ছিল তাকে ভাঙার বাসনাও। ঠিক কবে? কেন, বিবর্তনের পথে হোমোসেপিয়েন্সে পৌঁছবারও অনেক আগে, যখন সে দ্রতগামী হওয়ার বাসনা পোষণ করল। চার-হাত-পা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল দু-পায়ে ভর করে। মাথার উপরে সুবিশাল ছাউনিটাকে সোজাসুজি দেখার উপক্রম করল। বন-জঙ্গলের মধ্যে থেকে নিজের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ একটা গুহা খুঁজে নিল। প্রথমটা অর্থাৎ চার-হাত-পা ছেড়ে দু’পায়ে উঠে দাঁড়ানো যদি একটা গন্ডীকে অস্বীকার করা হয়, তবে দ্বিতীয়টায় সেই গন্ডীকেই আহ্বান করা! হোক তা নিরাপত্তা বা স্বাচ্ছন্দের খাতিরে। মানুষের প্রথম অপরাধ অর্থাৎ বেড়া ভাঙা যদি জ্ঞানবৃক্ষের ফল খাওয়া হয়, কিংবা আগুন আবিষ্কার হয়, তবে তার প্রাচীর সে নিজেই তুলেছে। বুঝে বা না-বুঝে। দেখা—না-দেখা কুয়াশায়। ফল-মূল, পশু থেকে যখন তার খাদ্যাভাস মাছের স্বাদ নিতে শিখল, তুলনামূলক সুবিধার জন্য সমুদ্রতীর বেছে নিল, ফসল উৎপাদনে হাত পাকালো, বীজের ব্যবহার শিখল, উদ্বৃত্ত ফসল জমাতে শুরু করল আসলে সে তখন নিজের অজান্তেই একটা বেড়ার কাছে, প্রাচীরের কাছে নিজেকে সঁপে দিল। যা আসলে একটা স্থিতু ঘরের ধারণা। যা পরিস্রুত হয়ে আস্তে আস্তে সরে আসবে ‘নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড’-এ! উদ্বৃত্ত ফসলের মায়ায়, নিরাপত্তার স্বার্থে একজায়গায় থেকে যাওয়া—এবং অন্য কোনও গোষ্টীকে ‘অপর’ বলে শনাক্ত করতে পারা, নিজেদের স্বার্থ অরক্ষিত হওয়ার শঙ্কায় উদ্বিগ্ন এক গোষ্টীর ‘অপর’ গোষ্টীকে আক্রমণই খুব সম্ভবত কাঁটাতারের প্রথম ও প্রত্যক্ষ ইতিহাস। রাজ্য-রাজত্ব ও কাঁটাতারের রূপরেখা।

ঠিক এই কারণেই কাঁটাতারের ইতিহাস নিরাপত্তাবোধজনিত এক চর্চার ইতিহাস। সে ক্রমশ প্রবেশ করেছে ফিল্টারের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে। আজকের বিজ্ঞাপনের ‘সুরক্ষার চেয়ে বেশি’ পানীয় জলটির মতো। আর নিরাপত্তার এই বহমান গল্পের শরীরে তার জার্নির অনেকগুলো টুকরো টুকরো গল্প ঢুকে পড়ে। কখনও সে গল্প প্রয়োজনের, কখনও নিরাপত্তার, কখনও বা আকাঙ্ক্ষা, কখনও আবার অধিকারের। হোমোসেপিয়েন্সে উত্তীর্ণ হওয়ার বহু আগে তার প্রধান বাধা- প্রাচীর ছিল, তার শরীর। চার হাত-পায়ে তার গতি ছিল শ্লথ। অন্য জীবজন্তুর থেকে বাঁচতে বা আরও কিছু কারণে তার প্রয়োজন ছিল গতি। প্রয়োজন ছিল প্রাচীর ভাঙা। আর প্রয়োজন ও নিরাপত্তা মিটলে আস্তে আস্তে সে এগোল আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারের প্রাচীর সুনির্দিষ্ট করতে। বলা ভালো প্রাচীরটি বাড়াতে। সেই সূত্রেই একদিন রূপকথা হয়ে উঠল বিশ্বাস আর সুপ্ত আকাঙ্ক্ষার আকর। বিশাল দিগন্ত আর আকাশ ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষাতেই গল্পের পরীর এলো দু-ডানা। অনেক পরে এই আকাঙ্ক্ষাকেই চ্যালেঞ্জ জানালো মানুষ। রাইট ভাইদের হাতে তৈরি হল বিমানের নকশা। অধিকার আর আকাঙ্ক্ষার বাসনায় সে নিজের রাজত্ব চিহ্নিত করল, দুর্গ তুলল। সৈন্য বসাল। অন্যের রাজত্বে হানা দিল। কাঁটাতার বসল। সে তো সুরক্ষাই চেয়েছিল! চেয়েছিল প্রাচীর। অধিকার। তবু ভাবনার প্রাচীর তার সুরক্ষার প্রাচীরে অস্বস্তির ছায়া ফেলে। সে তার বাসনা নিয়ে বারবার প্রাচীরের ওপারটায় উঁকি দিতে চায়। চায় আদান-প্রদান। ফলস্বরূপ রাজ্য আক্রমণ। ব্যবসা-বাণিজ্য। কাঁটাতারের মধ্যে থেকে তাকে ডিঙোনোর এক অবিনব কৌশল।

গুহা ছিল প্রথম আয়না
আগেই বলেছি, এ প্রাচীর ভাঙা, প্রাচীর ডিঙোবার কৌশল যতটা না বস্তুভিত্তিক, তার চেয়ে অনেক বেশি মনোগত। প্রয়োজন আর লোভের ইতিবৃত্তটুকু বাদ দিলে তার জন্য দায়ী মূলত উদ্বৃত্ত সময়। তাও একদম শুরুর দিকে লোভের প্রাকারটি তখনও তত স্পষ্ট নয়, কেননা পরিকল্পিতভাবে দীর্ঘস্থায়ীভাবে তখনও সেভাবে খাবারের উদ্বৃত্ত বা সঞ্চয়ের পদ্ধতি চালু হয় নি। সেই যে শুরুর দিকে মানুষ গুহার গায়ে আস্তে আস্তে রেখাচিত্র ফুটিয়ে তুলতে শিখছে। সারাদিনের পরিশ্রমে যে শিকারটা সে পেয়েছে বা পায় নি তার একটা অবয়ব ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করল। বাস্তবের বেড়া ভেঙে সেই যে একটা বিকল্প-বাস্তবের সন্ধান শুরু করছে। তারপর যখন সে তার শিকারকে শুধু নয়, কেবল তার শরীরের বর্ণনাটুকু শুধু নয়, রেখাচিত্রের মাধ্যমে একটা ধারাবাহিক শিকারবৃত্তান্তজুড়ে নিচ্ছে, তখন আসলে সে নিজেকেও জুড়ে নিচ্ছে। মনে মনে একটা গল্পের আদল খুঁজছে। একটা সংরক্ষণ চাইছে। কোথাও একটা থেকে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা করছে। হয়ত না বুঝেই। সেইসঙ্গে রেখাচিত্রকে আস্তে আস্তে স্বর ও ধ্বনির সঙ্গে জুড়ে নেওয়ার একটা বার্তা রাখছে। সেই কি প্রথম তার ভাবনার পা ঠেকে যাওয়া নয় কোনো একটা প্রাচীরে? তাই কি সে ভাঙতে চাইছে না রেখার একরৈখিকতাকে? রেখার হুবহু অনুকরণে নিজেকে পুরোটা আঁটিয়ে উঠতে পারছে না বলে, সে কি চলে আসতে চাইছে না ভাবনার ধারাবাহিকতায়, বর্ণনায়? আকার-ইঙ্গিতকে একটু একটু করে জুড়ে নিতে চাইছে স্বর ও ধ্বনিতে? যে মানুষ গতির বাধা কাটিয়ে ওঠবার জন্য দু-পায়ে দাঁড়াতে শিখল সে মানুষ আরও একবার গতির বাধা কাটিয়ে ওঠবার জন্য চিত্র’র চেয়ে গতিশীল একটা প্রকাশভঙ্গি খুঁজবে, এটাই তো স্বাভাবিক! আস্তে আস্তে সে পেয়ে যাবে অনেক চর্চার ফলশ্রুতিতে তুলনায় গতিশীল প্রকাশ মাধ্যম। একটা ভাষা। একটা শৃঙ্খলা। যা কিনা নিজেই একটা ঘর। একটা চৌহদ্দির প্রাচীর।

যেন ভাস্কর্য নড়ে উঠবে দেওয়াল থেকে
একজন ভাষাশিল্পী এই ভাষার ঘরের মধ্যে থেকেই তার লিখনভঙ্গিমাটিকে ধরে রাখে। তার যাবতীয় স্থাবর-অস্থাবর, রাগমোচন, কাম-ক্লেদ-ঘাম এই ভাষাতেই ব্যক্ত করে। তবু ভাষাশিল্পী মাত্রই জানেন তাঁর যাবতীয় ব্যক্ততার সফরের সঙ্গে সঙ্গে অব্যক্ততারও একটা চাপ থাকে। বলে বোঝানো যাবে না, তবু আছে এমন অনুভূতি, পরিপার্শ্ব। আছে তার সমূলে ঘা দেওয়ার মতো চাপ। যে অনুভূতি যে পরিপার্শ্বের হুবহু অনুকরণ নেই ভাষায়, এমনকি তার হাত দেখা যায় না, পা দেখা যায় না, ভাষার জলহাওয়া তাকে গায়ে মাখে না—তখন কী করার থাকে একজন লেখকের? বিশেষত একজন কবির? এ অবস্থা বিশেষভাবে একজন কবির কেননা অনুভূতির ঘোলাটে প্রদেশে শেষমেষ তাকেই দড়ি ছাড়া নেমে যেতে হয়। বর্ণনা বা গল্পের বা সম্মোহনী বিদ্যার সবটুকু তার জন্য নয়। তাকে দফারফা করতে হয় এই চেনা ফ্রেমটার বাইরে। সুতরাং প্রাচীরের অবস্থান, প্রাচীরের তৎসংলগ্ন বাধাটা তাকেই ফেস করতে হয়। শব্দের ঘরের মধ্যে থেকে কাজ করতে করতে তাকে প্রায়ই শব্দ আর রঙ, শব্দ আর সুর, শব্দ আর ভাস্কর্যের মাঝের স্পেসটায় ঘোরা-ফেরা করতে হয়। যে যার জন্য বরাদ্দ সীমাটার ঠিক মাঝের স্পেসটায়। কেননা তাকে তো পুরোটা শব্দ থেকে রঙ বা সুরের জন্য বরাদ্দ স্পেসটায় চলে গেলে হবে না। কেননা রঙ সে চাইছে, তার ব্যবহৃত শব্দে ধরতে ঠিক, কিন্তু রঙের ব্যবহার তো সে করতে পারছে না। সুর সে চাইছে ধরতে, কিন্তু স্বরলিপি তো সে পারবে না ফলো করতে। ফলে ওই মাঝের অনির্দিষ্টের প্রতি নির্দিষ্ট স্পেসটায় তাকে ঘোরাফেরা করতেই হয়। যে কোনও শিল্পের ক্ষেত্রেই কথাটা কমবেশি সত্যি। সম্ভবত এই জায়গা থেকেই লোরকা ‘কোরপাটেলিক’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করেছিলেন তাঁর লেখায়। যার মানে কুকুরও নয়, জানালাও নয়। কিছুই নয়। এ যেন সাঁতার কাটতে কাটতে পা ঠেকে গেলে আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা। যেকোনও কাঁটাতার এই গভীরে যাওয়ার চেষ্টাটাকে বাধা দেয়। চায় উৎখাত করতে। চায় বিশৃঙ্খলাকে কড়া হাতে দমন করতে। আর নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড তাকে যোগ্য সঙ্গতটুকু জোগাতে জোগাতেও একটুখানি পা’টা বাইরে বের করে রাখে। দূর থেকে একটুখানি সংকেত মাত্র দেয়। হারানোর প্রতীক হয়েও জিইয়ে রাখে একটুখানি পুনরুদ্ধারের ছলনা। বেড়ার মধ্যে থেকেও একটুখানি উঁকি দেওয়ার প্রশ্রয়। জিইয়ে রাখে প্রাচীরের মধ্যে থেকেও প্রাচীরহীনতার জন্য মনকেমন।