শূন্য ভূমির ভৌগলিক ম্যাপ

জিনাত জাহান খান

স্বপ্ন চোখে গুঁজে রেখে যখন বেরিয়ে পড়ি পথে.... এক টুকরো মেঘ ডেকে বলে,আমি আছি সাথে,চলতে থাকো...মেঘের ডাক শুনে পেখম খুলে ময়ূর ছুটে আসে,আমা হতে কিছু নৃত্য কৌশল ও পালকের বিচিত্র কিছু রঙ নিয়ে নাও মুঠোয় করে। কোথা থেকে সার্কাস পার্টির এক জোকার লাফিয়ে দাঁত খিঁচিয়ে তেড়ে এসে জোরে জোরে বলে - থাকবে? তুমি থাকবে, সামনের বসন্তকালের সবগুলো দিন আমাদের সাথে? জানি না কেন তবু আমার উদাস চোখ আটকে থাকে শেফালীর ঝোপে বড় বড় গাছের ছায়ায় -

শর্তহীন জন্ম কোনো উদ্দেশ্য বা অভিপ্রায় শেখায় না... যদিও অনুতাপে কিছুটা ভয় আসে, তবু "মহাশূন্যে মিলাবে সবকিছু" - এমন চিন্তার মোহযুক্ত ভৌগলিক ম্যাপকে ভাঁজ করে রেখে দেয়া যেতে পারে যার যার ব্যক্তিগত নীলবাক্সে... যেখানে জমে থাকে রংধনুসহ অসংখ্য গোপন রং! তারপর একদিন যেকোনো একটা ঠিকানা টুকে পাঠিয়ে দেবো.... সেইসব রাহস্যিক ঠিকানায়। জানি, এমন দৃশ্যে ভারী হবে বাতাসের শরীর। অদৃশ্য আসনে বসা চেনা-অচেনা অচিন গন্ধ যা লেগে থাকবে উড়ন্ত ইন্দ্রিয়ের ঠোঁটে....

এইসব দিনরাত্রিতে ছুটছে যেসব প্রাণীকূল, তাদের হৃদয় আজ শূন্য! বলা যায় নো ম্যানস ল্যান্ড। জনমানবহীন ভূমি একা এক বৃক্ষের আকুতিসম। দেখেছি বৃক্ষকেও একটু একটু ক্ষয়ে যেতে -
-বৃক্ষ কি পাথর হয়?
-না, তবু বৃক্ষের হৃদয় আছে জানি

উলঙ্গ বেদেনী বাচ্চাদের মতো বেড়েছে শিশুকাল থেকে, দিয়েছে কি কেউ তাঁতে বোনা তুলোর নির্যাস! ভয়াবহ স্বপ্ন ছিলো - কিছুটা উদ্বেগ মিশ্রিত... কাঠুরিয়ার হাতের কুঠার কিংবা কাঠঠোকরার সরু ঠোঁট সম্বিত ফিরিয়ে দিতো তাকে। অনেক ভেবেছে বৃক্ষ, কিছু পত্রপুষ্প পাঠানো যেতো হাটের জ্যোতিষীর কাছে... গণনাসূত্রে জেনে যেত আয়ু বা রাহুগ্রহের ফল! আসলে এমনতর আর্তির স্যালুট নয় মানচিত্রে যোগ হয় উদভ্রান্তের মতো বাহুল্যবোধ....

ছায়াদের কোনো পাখা নেই, তাই জীবন বৃক্ষ হয়। রাত ও জীবন এক শরীর... তীক্ষ্ণ করাতে চিরে যে রাত আসে চাঁদ সেখানে সত্যান্বেষী গোয়েন্দার মতো থাকে... তার কিছু পরেই আকাশ ভর্তি তারারা হারিয়ে যায় ভোরের আলোয়। এমন চক্রেও কেন ভেতরে ভেতরে ছেয়ে যায় উৎকণ্ঠা সাপের বিষের মতো হাড়ে হাড়ে! অভিজ্ঞতার যে অপেক্ষা অপেক্ষমাণের চোখে, কারণহীন জ্বলছে হলুদ আলোর মতো... তারই অনূদিত পাঠ নিঃশব্দে পঠিত হচ্ছে স্পর্শের মহিমায়।

পথে নেমে পথের রুক্ষতা ভুলতে লিখে যেতে ইচ্ছে করে একটা টলটলে কিংবা নিটোল কবিতা। কিছু শাহরিক শব্দের আনন্দ ঢেলে দেই ঠিক বেড়ে চলা কবিতার নাভিমূলে,দীর্ঘ যাত্রা থেমে যায়।শেষ না হওয়া কবিতা শুরু করে পথ চলা ঈশ্বরের করুণায়,আবার করুণা! হাঁটু গেঁড়ে প্রার্থনাসরূপ গোপন নোটবুক খুলে লিখতে থাকি পিছু ফিরে তাকাবার সময়টুকুতে চূড়ায় উঠে যাওয়ার অভিলাষ। আর ততবারই তিক্তমন মনে করিয়ে দেয় শরীর ভর্তি বেড়ে চলা গহ্বরের করুণ আর্তি!

সময় রূপান্তরিত প্রতিনিয়ত শাশ্বত উপমায় - যেন জনমানবহীন ভূমি অথবা নো ম্যানস ল্যান্ডে.... কেননা ঈশ্বর অন্ধ...