খণ্ডপ্রলয়: টু বি অর নট টু বি

আসমা অধরা

এই যে শহরের মাঝবরাবর আমি থাকি, সে শহরও আমার সাথে জেগে থাকে দিনরাত। আমার আশেপাশে অদ্ভুতদর্শন জীবন, বনতুলসী নেই- নেই পাকুড় অথবা শ্যেওলায় ঢাকা একটাও নিঝুম পুকুর পাড়। সাইবেরিয়ান পাখির মতো একদৃষ্টে চেয়ে থাকি, মুখ গুজতে গেলেই কেমন এক পাথুরে গিরিখাত এসে দাঁড়ায় সন্মুখে। মন খারাপের মন, একলা মন নিয়ে উথাল পাথাল এক জীবন। নিজের মন তাই নিজের ভেতরেই রেখে দিই বেঁচে থাকা অব্দি, যদিও সে এই বেঁচে থাকা আর দিনরাতকে অসহ্য করে তোলে। আমার নির্ঘুম, অসুস্থ আর খারাপ হতে থাকা মন হাত ধরাধরি করে সহোদরা টুইনের মতো একসাথে চলে, না পাওয়া আর অপূর্ণতার পাশাপাশি।
ডেডলাইন এক- আকাশ ভরে ওই যে ডাকাবুকো মেঘ করে আসে, তারপর খুব ঝরে যায়। ব্যালকনির পাশে এক একলা গাছের পাতায় ফোঁটা ফোঁটা টুপটাপ! কোথা থেকে আসে, কোথায় চলে যায়! নিয়ে যায় কি কিছু? বা দিয়েও যায় কি? নিজস্ব আক্ষেপে ভুলে যাই প্রকৃতিরও হয়তো অনেক অপ্রাপ্তি, তার নিজস্ব বিরহ, একাকিত্ব থাকতেই পারে। অথচ সে সবকিছুর পরোয়া না করেই মেঘ সরে যাবার পর কী ভয়ংকর তেজ ছড়ায় চন্দ্রপ্রভা।
ডেডলাইন দুই- ছেলেবেলা থেকে এই ভাবতে ভাবতেই শুরু সে কষ্টের গল্প। মিলনরহিত মিলনের জলে গর্ভফুল জুড়ে সে কী নিষ্পাপ হাসি মুসকানের। চাঁপার অথবা একগুচ্ছ জুঁইয়ের শুভ্রতা দুহাত জুড়ে। যেন নেমে এলো চাঁদ আঁজলে। কোথা থেকে এলো সে? কোথায় যাবে? তার নিজস্ব স্ফুলিঙ্গ বা অগ্নিকুন্ড নিয়ে! এই বর্তুলাকার পৃথিবীর কোন বাইরে।
ডেডলাইন তিন- তারপর ভালোবাসা। উদ্দাম জোয়ারের মতো এসে ভাসিয়ে নিয়ে গেল সব। ওখানে ক্লান্তি ছিলো, জরা ছিলো, দুঃখ বা কষ্টের সাথে ঘৃণাও ছিলো। সব- সবকিছু ভেসে গেলো প্রথম বর্ষার জলে। মাঝে মাঝে নিজের ঘরের চাবি হারিয়ে গেলে এবাড়ি- ওবাড়ি থেকে উঁকি দিয়ে দেখা। না বোঝার যন্ত্রনা সাথে কোনও অপশন যোগ হয়না, হতেও পারেনা। কি হয়নির হিসেব তুলে রেখে কি হতে পারে বা কি হতে পারতো ভেবে যাই। অথচ এসব কিছুই না হয়ে কি হয়ে গ্যালো!
ডেডলাইন চার- ক্ষয়গুলো চরম, ক্ষয়গুলো ক্ষতির। ক্ষয় নিজেও ক্ষয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, রয়ে যায় ক্ষতির খতিয়ান। কিন্তু সেই উঁকি দেবার প্রসঙ্গে ফিরলেই জানি, কেবল আমার জন্যও কেউ এমনি করে একটিবার আঁতিপাঁতি উঁকি দিয়ে যেত যদি, সে বান্ধবের চরণ চুমে যেতাম জীবনভর। যদিও, ‘অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল’, আর আমিও তেমনই কিছু না হতে চাইলেও তার প্রেয়সী হতেই চেয়েছিলাম। এই চেয়েছিল আর চেয়েছিলামটাই মুখ্য ধরে রাখি করতলে। এ থেকেই বোঝা যায় আসলে আমরা কেউ কিছুই হতে পারিনি। কিন্তু এই হতে চাওয়ার প্রশ্নের পরেই প্রচন্ড চিত্তক্ষোভ আর রোষবহ্নির যন্ত্রণায় এখন ভীষন ‘টু বি’ আর ‘নট টু বি’র গোলকধাঁধায় পড়ে খাবি খেয়ে যাচ্ছি।
ডেডলাইন পাঁচ- সমস্ত ডেডলাইনদের পাশ কেটে হাঁটতে থাকি, এ শহরে তেমন দাপুটে নদী নেই বলেই রাজপথের ফুটপাথ। আগের মতো ভাবনারা আর দানা বাঁধে না, সেই সুতো ছিঁড়ে চলে গেছে কাটা ঘুড়ির পেছন পেছন। অথচ কদিন আগেও ভাবনাগুলো খুব সুগন্ধ ছড়াতো ইভনিং ইন প্যারিস বা শ্যানেল ফাইভ এর মতোই। এই রাতে বারান্দার মেঝেতে কান পাতলে জল গড়ানোর শব্দ হয়, সেই শব্দে কান পেতে শুয়ে থাকি অনুচ্চারিত শব্দের মত। গোথিক গীর্জার ঢং ঢং বেলের মতো মোটা লোনা পানি ভরে রাখে অস্পষ্ট চোখ, তখন রেলিংটাকে মনে হয় পাথর আর লাইমস্টোন দিয়ে গড়া কোনও সীমান্ত পীলার।
ডেডলাইন ছয়- এই যে জীবন, বৃষ্টি, ভালোবাসা, ক্ষয় সমস্তই ফাঁকি। উৎপত্তি এবং সমাপ্তি সব শূন্য। তবে কিসের আশা- আশা মানেই যেখানে নিরাশার সম্ভাবনাও থেকে যায় সবচেয়ে বেশী। গড় আয়ুর পুরো অর্ধেক হেঁটে আসার পর সমস্ত মীমাংসায় নিজেকে তো কোথাও খুঁজে পাই না, পাই নি। কাজেই জীবন, ভালোবাসা আর ক্ষয় কোনটিকেই আর ইম্পরট্যান্ট মনে হচ্ছে না। এরা ব্যাকরনের এডজেক্টিভ এর মতো। যা আসলে খুব গুরুত্বপূর্ণ টপিক না। যাঁদের বিশ্লেষন করতে গেলেই প্রশ্ন আসে এদের পজিশান কি আর কোথা থেকে আসে। শূন্য ছাড়া কোনও উত্তর নেই। সম্ভাবনা নেই। এই দোলাচালেই দুলেই নিজেকে দেখতে পেলাম কি অদ্ভুত একা সুনসান গা ছমছমে কোন জায়গায় এসে ঠেকেছি, আলো নেই- জন নেই কেবল খাঁ খাঁ করে গ্রাস করতে ছুটে আসা অন্ধকার। নিজেকে খুঁজে নেবার মতো লোকারণ্য নেই, পথ নেই, শহর-গ্রাম কিচ্ছু নেই। কানের কাছে ফিসফিসে বাতাস যেন বলে যায় নিৎসে’র রেখে যাওয়া বাণী, ‘You have your way. I have my way. As for the right way, the correct way, and the only way, it does not exist.’ জন্ম থেকে উৎপত্তি নেয়ার পর ক্রমেই ছুটে, ডিঙিয়ে, পাশ কাটিয়ে আসা অসংখ্য ডেডলাইন পেরিয়ে আজ এক ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’এ হতবিহ্বল আমি ঠায় দাঁড়িয়ে আছি। যেখানে এসে আর বলতে ইচ্ছে হয়না, ‘শোনো, একবার ফিরে এসো, হাত ধরে নিয়ে যাও আমায় সেই রুপকথার দেশে, ঘুমিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত একটু ছুঁয়ে থাকো’। যেখানে এসে আর মনেই হয়না- Miles to go before I sleep, অথবা, ‘Show me the way to go home’ বরং এখন একটাই গন্তব্য- How can I sleep as soon as possible, and there will be no other chapter for resurrection.