কেউ কোথাও নেই

অধীশা সরকার


মৃত্যুর খুব কাছে দাঁড়িয়ে জীবনের দিকে তাকালে জীবনটাকে অতিরিক্ত ছোট দেখায়। যেমন একটা দৃশ্যকে দেখাতে পারে ফ্ল্যাশব্যাকে। জুম আউট। কলকাতা খুঁজছি আমি পৃথিবীর ম্যাপে। যত বড় হচ্ছে পৃথিবী, তত ছোট হচ্ছে কলকাতা। দূরবীন দিয়ে দূরের জিনিসকে কাছে টেনে আনার মত করে ভালোবাসতে চাইছি আমি। নাকি, এ হল কাছের জিনিসকে দূরে ঠেলে দেওয়া? শিরশির করছে জানলা ভরা শূন্য বিকেল। আমার চিঠিগুলো বয়ে নিয়ে বর্ডার পেরিয়ে যাওয়ার সময়ে সীমান্তরক্ষীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে মেঘদূত। বৃষ্টি নামছে।
সাদাত হাসান মান্টোর ‘টোবাটেক সিং’ গল্পটা হল পাগলাগারদ নিয়ে। ভারত-পাকিস্তান ভাগ হওয়ার পর এই দুই দেশ ঠিক করল তারা যেমন অপরাধী বিনিময় করবে, তেমনই, পাগল বিনিময়েও করা প্রয়োজন। দুই দেশের অ্যাসাইলামগুলোতে সাড়া পড়ে গেল। কে কোথায় যাবে? কে কোথাকার? পাকিস্তানের এক অ্যাসাইলামের পাগলের নাম বিশান সিং। তার গ্রামের নাম টোবা টেক সিং। তারও নাম আস্তে আস্তে হয়ে গিয়েছিল টোবা টেক সিং। সে খালি সবাইকে জিজ্ঞেস করে বেড়ায়, টোবা টেক সিং এখন কোথায়? ভারত না পাকিস্তান? তখন সদ্য বর্ডার আঁকা হচ্ছে দুই দেশ ভাগ করার। ভূখন্ডের ওপর চক পেন্সিল দিয়ে ঘষঘষ করে দাগ টেনে দেশভাগ, মানুষভাগ, গ্রাম-শহর ভাগ। কোন জায়গা যে তখন কোন ভাগে পড়বে কেউ জানে না। এমনকি, এভাবে কিছু যায়গা কি উবে গেল, বেমালুম? টোবা টেক সিং তাই সবাইকে জিজ্ঞেস করে তার বাড়ি কোথায়? ভারত না পাকিস্তান?
এক পাগল নিজেকে বলে ঈশ্বর। টোবা টেক সিং তাকেই গিয়ে ধরে। কোথায় তার গ্রাম, টোবাটেক সিং? ভারতে না পাকিস্তানে? ঈশ্বর বললেন, “টোবা টেক সিং ভারতেও নয়, পাকিস্তানেও নয়। আসলে, সে কোথাওই নেই। কারণ তার অবস্থান সম্পর্কে আমি এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি”।
টোবা টেক সিং তাহলে কোথায়? সে কোথাও না। এই ‘কোথাও না’ থাকার এক্সিসটেন্সকেই বলে নো ম্যানস ল্যান্ড। দুই বর্ডারের মধ্যবর্ত্তি এলাকা। যা কোথাও না। ভারতেও না, পাকিস্তানেও না। এই নো ম্যান্স ল্যান্ডই হল টোবাটেক সিং।
গল্পের শেষে বিশান সিং তার টোবা টেক সিং কে খুঁজে পায় ঐ নো ম্যানস ল্যান্ডে। ওয়াগাহ বর্ডারে পাগল বিনিময়ের অপারেশনের মাঝখানে সে হঠাৎ পাকিস্তান থেকে ভারতে যাওয়ার পথে মাঝরাস্তায় থেমে যায়। দুই দিকে দুই কাঁটাতারের বেড়ার দুপাশে ভারত ও পাকিস্তানের পাগলরা তাকিয়ে থাকে তার দিকে। টোবা টেক সিং তার বাড়ি খুঁজে পেয়ে গেছে। দুই বর্ডারের ওই মধ্যবর্ত্তি জমিই তার ভিটেমাটি। সেই অনাম্নী জমিই তার গ্রাম, টোবা টেক সিং। যা ভারতেও নয়, পাকিস্তানেও নয়। চিৎকার করে উঠে হঠাৎ সে মরে যায়। নিজের মাটির ওপর মৃত্যু নসিব হয় তার।
************************************************************
চিঠিগুলো মাঝপথেই হারিয়ে ফেলছে তাদের অক্ষর। বৃষ্টিতে ধুয়ে যাচ্ছে তারা। আমি মূহুর্তগুলোর শেকল আলগা করে দিচ্ছি। তাদের আর হাজিরা দিতে ডাকছি না বারবার। আলগা করে দিচ্ছি। কিন্তু খুলে দিতে পারছি না এখনো। অতীত আর ভবিষ্যৎ - দুই বোন। জমজ। কোনজন যে ভবিষ্যৎ আর কোনজন অতীত, কেউ জানে না। এই দুইয়ের মাঝখানে ঘটমান বর্তমান বলতে মূহুর্ত। যা প্রতি মূহুর্তেই কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে সরে যাচ্ছে হয় অতীতে নয় ভবিষ্যতে। তবু সে আছে। সে শাশ্বত। কোথাও সে লুকোতে পারছে না, পারদের মত পিছলে যাচ্ছে শুধু। তবু মহাকালের মতই নিশ্চল। আবার ভাবি, এই দুই বোন, অতীত আর বর্তমান, একই মানুষ নয় তো? ছদ্মবেশ বদলের খেলা খেলছে না তো বোর্খার নীচে মিনিস্কার্ট পরা রহস্যময়ী জীবন? দুই সত্বার মাঝখানে যে মাইলকে মাইল জুড়ে অসহায় এক প্রান্তর, সে আমাকে কেবলি হারিয়ে যেতে বলছে। কিন্তু কোথায় যাবো?
কোমল গান্ধারের অনুসূয়া দাঁড়িয়েছে ভৃগুর পাশে, নদীর ধারে, যেখান থেকে বর্ডার দেখা যায়। সে একবার বলে, “এখানকার আকাশটা ধোঁয়া”। তারপর, বর্ডারের ওপারে হাত বাড়িয়ে বলে, “ওখানকার আকাশটাও ধোঁয়া”। ট্রেনটা ছুটে আসছে পাথরের একটা ব্যারিয়ারের দিকে। সংঘর্ষ আসন্ন। ট্রেনের চাকার শব্দে মিশে যাচ্ছে “দোহাই আলি, দোহাই আলি”র সেজদা। সে কি টানাটানি ভেতরে! কি টানাটানি বুক-তলপেট-কপাল জুড়ে! কি টানাটানি! এই টানাটানি টেনে নিয়ে ফেলে দুই কাঁটাতারের মাঝখানে। টেনে নিয়ে ফেলে বাড়ি আর বাসাবাড়ির মাঝখানে। টেনে নিয়ে ফেলে বাপ-পিতেমো’র ভিটে আর রিফিউজি ক্যাম্পের মাঝখানে। মুখ থুবড়ে যে জমিতে পড়লাম আছাড় খেয়ে, তার স্তব্ধতা মহাকাশের সমান। নো ম্যানস ল্যান্ড।
না, এত কিছু ভাবার দরকার নেই। ভালোভাবে বেঁচে থাকার শর্ত হল, কম ভাবো। ভাবনায় দাঁড়ি টানো। প্র্যাকটিস করতে যেও না।
একটা পাগলা-ছাগলা লোক একগাদা মদ-গাঁজা খেয়ে কি বলে গেছে তাই শুনে নাচতে হবে? ড্রেনে তো পড়ে থাকতো। বউও ছেড়ে চলে গিয়েছিল। কুকুরের মত রাস্তায় শুয়ে মরল। মাত্র সাতটা ছবি বানিয়েছিল, কেউ দেখেনি। শুধু তখন দেখেনি নয়, এখনো দেখে না। সব দোষ প্রোডিউসার, আর ইন্ডাস্ট্রি, আর সমাজের, না? প্রোডিউসার কি দানছত্র খুলেছিল, যে একটার পর একটা ফ্লপ ছবিতে টাকা ঢালতেই থাকবে, ঢালতেই থাকবে... বাপের বিয়ে নাকি? সেই নিয়ে কত ন্যাকামো। আর জন্মদিনে \'হায় ঋত্বিক, হায় ঋত্বিক\'। তাও ফেসবুক আছে বলে। ভেবে বলো তো, ফেসবুক না থাকলে ঋত্বিক ঘটকের জন্মদিন, মৃত্যুদিন, হ্যানোদিন, ত্যানোদিন, আর ছবির নাম ক\'টা লোকের মনে থাকত? থাকত না তো? ওই কমলেশ্বরের \'মেঘে ঢাকা তারা\' চারজনও দেখতে যেত না ঋত্বিক বেঁচে থাকলে। মরে গেছে তাই লোকে দেখতে গেছে। মরার পর লোকে সম্মান, ভালবাসা অত মেপেজুপে দেয় না, একটু বেশীই দেয়। আহা... মরা মানুষটা...। তো, এই। এইরকম জীবন চাও নাকি? নর্দমায় মরে পড়ে থাকতে চাও? তারপর তোমার শোকসভায় নাহয় লোকে হাউহাউ করে কবিতা আবৃত্তি করবে... কিন্তু তাতে তোমার কি ছেঁড়া যাবে শুনি?
************************************************************ *
“মোদের কুনো দ্যাশ নাই... মোদের কুনো ভাষা নাই...” “The subaltern cannot speak.”
এটা নেপথ্য। ব্যাকগ্রাউন্ড। আলো নেই। পিচ ডার্ক। শুধু সাউন্ড আসছে। কথা। আমি কোথায়?
মেঝে আছে। তারমানে দেওয়াল আছে। উঠে দাঁড়ানো যাবে? উঠে দাঁড়ানো যাচ্ছে। কোনো ঘর নিশ্চয়ই। খোলা যায়গা হলে এতটা অন্ধকার হত না। খুব ক্ষীণ হলেও আলোর কোনো না কোনো আভাস থাকত। তাছাড়া, সামান্য বাতাসও বইছে না। হাওয়া স্থির। মানে এটা ঘর। মানে, দেওয়াল আছে। আচ্ছা... হাঁটা যাক। একপা-দু\'পা-তিনপা-চারপা সামনে ছড়িয়ে রাখা হাত কিছু ছুঁল না। আচ্ছা... আর একটু হাঁটা যাক। পাঁচপা-ছ\'পা-সাতপা-আটপা নাহ... হাতে কিছু লাগল না... এটা কেমন হচ্ছে? আচ্ছা... আরো একটু হাঁটা যাক...

তুমি কি ভাবছ, চারপাশে যারা দাঁত ক্যালাচ্ছে তারা সেভেন্থ হেভেনে আছে আর তুমিই নরকের ওয়ান-ওয়ে টিকেট কেটেছ? আজ্ঞে না... এটা নরকই, টিকিট দরকারই নেই। এই যারা চাদ্দিকে রংচং মেখে দাঁড়িয়ে আছে, চোখ টিপছে, মুচকি হাসছে, বলছে, \"দেখ, সব ঠিক হয়ে যাবে...\" তারাও, ওই... নরকেই। কিন্তু কাউকে সেটা বলছে না। অথবা, কেউ কেউ আবার জানেও না এখনো। কেউ কাউকে বলে না তো... তাই সবাই জানে যে তারা জানে না তারা নরকে আছে, অথবা তারা সত্যিই জানে না... অথবা... যাকগে। ওই যে বললাম। ভাবনা বন্ধ। মোট কথা, যায়গাটা ভালো না। কিন্তু তুমি যে খারাপ যায়গায় আছো সেটা আবার কাউকে ভেউ ভেউ করে বলে দিতে আছে নাকি রে পাগলা? লজ্জার ব্যাপার না? হ্যাপিনেস ইজ... আ ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। বুঝলে? মোটকথা, স্টেটমেন্ট। তুমি এঁদো গলি\'র ভেতর একতলা বাড়িতে থাকলে বন্ধুদের বাড়িতে ডাকতে? ডাকতে না। কেন? তাদের সঙ্গে সিসিডি যাবার বেলা কি মাঞ্জা মেরে যেতে না... বাবার পকেট কাটতে হলেও? যেতে। কেন? ভেবে দেখো। বরং এইসব ভেবে দেখো। অবশ্য ভেবে যে কিছু শোধরাবে তাও তো না... এত তো ভাবছ... যত ভাবছ ততই... ওই... যা হওয়ার হচ্ছে। আরে বাবা... অভিনয়। দুনিয়াটা নাট্যশালা। ব্যাপারটা সিম্পল। অযথা প্যাঁচালে কি আর ফল ভাল হবে? [page]
হঠাৎ হাত ঠেকল। দেওয়াল। যাক, তাহলে এটা একটা ঘর। দেওয়ালটাও মেঝের মতই মসৃন। সিমেন্ট নয়, অন্য কিছু দিয়ে তৈরী। কি দিয়ে? কাঠ? স্টিল? কিছুতেই বুঝতে পারছি না। পালিশ করা একটা সারফেস। আচ্ছা... দেওয়াল ধরে ধরে এগনো যাক। দেওয়াল যখন আছে, দরজাও আছে। খুঁজে বার করতে হবে দরজাটা। ঘরটা চৌকোই মনে হচ্ছে। তার মানে একদিকের দেওয়াল ধরে হাঁটলে একটা কোন আসবে। এভাবে চারটে কোন। যে কোনো একটা দেওয়ালে দরজা আছে। দরজাটা খুঁঁজে বার করতে হবে। করতেই হবে।
দরজা খুঁজছো তো? এবং পাচ্ছো না...? পাবে কি করে? বললাম না? আগে ভাবা বন্ধ করো? কিচ্ছু ভাববে না। ভেবে কি হবে? বিপদ ছাড়া কিছুই হবে না। হঠাৎ একটা অন্ধকার ঘরে আটকা পড়লে। এবার ভাবছো, কি বিপদেই না পড়েছো। হেহ। বিপদের এখনই দেখেছো কি সোনামনি? বিপদ এখনো অনেক বাকি। একটার পর একটা অভাবনীয় বিপদ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। এবার বলো, কি করবে? লড়াই করবে? হাত-পা ছুঁড়বে? বেশ তো, করো। আমি আরাম করে দেখি। এইসব করতে করতে তুমি ক্লান্ত হবে। হেদিয়ে যাবে। মাটিতে কেলিয়ে পড়ে থাকবে। তাও তোমার বিপদ হবে। হেহ। জানি তো... কওত্তো দেখলাম...। করো, যা করার। নিয়ম, বুঝলে...? নিয়মের বাইরে কেউ না। বেসিক্যালি, তোমার কিছুই করার নেই। যা হওয়ার, হবেই। তোমার জন্য ভালো কি জানো? \'ভালো\' শব্দটাকে ওর মধ্যে ইনসার্ট করে দেওয়া। বলো, \'যা হচ্ছে, ভালো হচ্ছে। যা হবে, ভালোই হবে।\' ব্যাস। আর ভাবা বন্ধ করো। চুপচাপ বসে বসে সময় কাটাও। সময় কাটানোর জন্য কত্তরকম জিনিস আছে। ভাবতে তোমায় বলেছে কে?
এটা চার নম্বর কোন। কোনো দরজা পাওয়া যায় নি এখনো। তা কি করে হতে পারে? যদি ঘরে আমি ঢুকে থাকি, তাহলে ঢোকার রাস্তা আছে। এবং সেটাই বেরনোর রাস্তা। সেই রাস্তাটা কোথায়? আচ্ছা... আমি কি কোনো ভুল করছি? এটাই চার নম্বর কোন তো? অথবা, এমনও তো হতে পারে যে ঘরটা একটা পেন্টাগন কিম্বা হেক্সাগন? আাবার দেখা যাক তো দেওয়ালগুলো? আচ্ছা... এমন নয় তো যে দরজা, বা যাই হোক, সেটা মাথার ওপর? মানে ছাদে? তাহলে তো মুশকিল হল। ওখানে তো হাত পৌঁছবে না...। ঘরের ভেতরে কি কোথাও কোনো উঁচু জিনিস আছে? সেটা খুঁজতে হলে দেওয়ালটা ছেড়ে দিতে হয়। কিন্তু সামনে কি আছে বা নেই কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হোঁচট খেয়ে পড়তে পারি, আছাড় খেতে পারি, বা গর্ত জাতীয় কিছু থাকলে... আচ্ছা... হামাগুড়ি দিয়ে খোঁজা যেতে পারে। পড়ার ভয় নেই। অথবা... দরজাটা তো মেঝেতেও হতে পারে। সেক্ষেত্রে...
কিছুতেই শুনবে না কথা। সেই... ভাববেই। খুব খারাপ করছো হে...। নির্বিরোধী মানুষের বিপদ কম হয়, জানো না? আর চিন্তা এক ধরণের বিরোধ। বিরোধিতা। এই যেমন... তোমাকে খানিকটা যায়গা দিয়েছিলাম। হাত-পা ছড়িয়ে সময় কাটাতে পারতে। কিন্তু... না। যায়গা পেয়েই তুমি হাতড়াতে শুরু করেছ। বেরনোর রাস্তা খুঁজছ। কেন হে বাপু? কি খারাপটা আছো এখানে? কি অসুবিধেটা হচ্ছে? সবাই কি এভাবেই নেই? ওরা যদি থাকতে পারে তুমি পারছ না কেন? তোমার জন্য স্পেশাল ট্রিটমেন্ট হবে নাকি? নিজেকে কি ভাবছো, অ্যাঁ? দেবো বেলুন ফুটো করে? তার ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এই যে এতক্ষন ধরে একটা বিপদের মধ্যে আছো... কোনো সুস্থ মানুষ হলে তো চেঁচাতো, নাকি? চেঁচাতো বা কাঁদত বা ভয়ে কাঁপতো। কিছু একটা করত। এর একটাও কি তুমি করছ? করবে কেন? মাথার দোষ আছে যে। পুরো মেন্টাল কেস। নাহলে কি আর এত ভাবে নাকি কেউ? নাহ... এত জায়গাও দেবো না... এত সময়ও না। দেখবে কিভাবে সব শেষ হয়? শেষটা দেখবে? দি এন্ড? তর সইছে না তো...? আচ্ছা।
এ কি? দেওয়ালটা আমাকে ঠেলছে! মানে??? দেওয়ালটা... কাছে চলে আসছে! আমিও ঠেলছি... কিন্তু দেওয়ালটার সঙ্গে পারছি না! হচ্ছেটা কি? ঘরটা... ছোটো হয়ে যাচ্ছে!!! হ্যাঁ... ওদিকের দেওয়ালগুলোও সামনে এগিয়ে আসছে... বুঝতে পারছি... উঃ... দমবন্ধ লাগছে... ছাদটা... আমার মাথায় ঠেকল! আরো নামছে... আর দাঁড়ানো যাচ্ছে না... চারটে দেওয়ালই গায়ে ঠেকছে এখন...!! কিন্তু... দরজাটা...? দরজা তো একটা থাকবেই... ঢোকার রাস্তা থাকলে বেরনোর রাস্তা তো থাকবেই...
************************************************************ *
মিগুয়েল লিতিন। চিলির বিখ্যাত চিত্রপরিচালক। তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল তাঁর নিজের দেশ থেকে, যখন অগস্তো পিনোচেৎ সালভাদোর অ্যালেন্দেকে সরিয়ে মিলিটারি কূপের মাধ্যমে চিলি দখল করে। তাঁর মত আরো অনেককে, তাঁর বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজনদের, হয় গুলি করে মারা হয়, কারাবদ্ধ করা হয়, নয়তো নির্বাসিত করা হয় সেই সময়ে।
যখন পিনোচেৎ-এর কূপ নেমেছে চিলিতে, তখন লিতিন শ্যুট করছিলেন তাঁর The Promised Land নামক ছবির শেষ দৃশ্য। এই ছবি একটা গ্রামকে নিয়ে, যার অনুর্বর জমিতে ফসল ফলে না কিছুতেই। সেই গ্রামে এসে পৌঁছয় একটি মেয়ে ও তার আরো কিছু সহকর্মী, যারা ঐ গ্রামের মানুষদের শেখায় কিভাবে ফসল ফলাতে হবে, তাদের আরো নানা স্বপ্ন দেখায় আর নিজেরাও জড়িয়ে পড়ে সেই স্বপ্ন সত্যি করতে। শেষ দৃশ্যে ক্ষেতময় সবুজ ফসল ফলেছে, আর অসামান্য সুন্দরী সেই নায়িকা নগ্ন হয়ে একটা সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়ে সেই ফসলের ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে দিগন্তের দিকে - সুররিয়াল একটি দৃশ্য, একটা অলীক রুপকথার ছবি আঁকতে চেয়েছিলেন লিতিন।
কিন্তু সেই রুপকথায় বাস্তব ঢুকে পড়ল। শ্যুটিং চলাকালীন মিলিটারি হেলিকপ্টার নামল সেই ফসলের ক্ষেতে, এবং গুলি চালাতে শুরু করল। ক্রু মেম্বাররা পালাতে লাগল, কিন্তু লিতিন আর তাঁর ক্যামেরাম্যান রয়ে গেলেন। লিতিন নির্দেশ দিলেন, যাই হোক, ক্যামেরা চালিয়ে রাখো। নায়িকা কিছু বুঝতে পারার আগেই তাঁর বুকে গুলি লাগল, তিনি তখন ঘোড়ার পিঠে, ঘোড়া ছুটছে দিগন্তের দিকে। ক্যামেরা ধরে ফেলল সেই দৃশ্য - স্বপ্নের মত এক নগ্ন সুন্দরী সাদা ঘোড়ার পিঠে ছুটে যাচ্ছে দিগন্তের দিকে, তার বুকে এসে লাগল গুলি, ছিটকে পড়া রক্তে ভেসে গেল সাদা ঘোড়ার গা, তার মৃতদেহ নিয়ে ঘোড়াটা ছুটে চলল ডুবন্ত সুর্য্যের দিকে। ক্যামেরা ও রিল নিয়ে লিতিন পালাতে পেরেছিলেন। দৃশ্যটি এভাবেই দেখানো হয়েছিল ছবিতে। এভাবেই, Promised Land শব্দের মানে বদলে দিয়েছিলেন লিতিন, ম্যাজিক আর রিয়ালিটিকে মিশিয়ে দিয়ে। সেইসঙ্গে, ঘটমান বর্তমানকে ইতিহাসের জন্য অমর করে রেখেছিলেন তাঁর ছবিতে।
সেই লিতিন, চিলি থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর ছটফট করতেন ফিরে যাওয়ার জন্য, ওখানকার অনাচারের প্রতিবাদ করতে একটা ছবি বানানোর জন্য। কিন্তু সে ছবি চিলিতে না যেতে পারলে কিভাবে বানাবেন? শেষে, এক দারুন চক্রান্ত রচনা করে ছদ্মবেশে চললেন তিনি চিলিতে। নতুন পরিচয়ে, এমনকি একজন নকল বউকে সঙ্গে নিয়ে, একটা অ্যাড ফিল্মের ডিরেক্টর সেজে, গোটা ইউনিট নিয়ে। কেউ জানত না তিনি আসলে কে, শুধু তাঁর নকল বউ জানত। অ্যাড ফিল্মের শ্যুটিং চলত বিরাট ঘটা করে একদিকে, অন্যদিকে একটা হ্যান্ডিক্যামে লিতিন তুলে চলেছেন আসল ছবি, গোপনে, একজন স্পাইয়ের মত। শেষের দিকে প্রায় ধরা পড়তে পড়তেও পালাতে পারেন। এক রোমহর্ষক সত্যি গল্প। আবার সেই ম্যাজিক রিয়ালিজম। ম্যাজিকের মত রিয়ালিটি। ফেরার সময়ে, প্লেনে একজন লিতিনের পাশে বসেন। লিতিন তাঁর সঙ্গে আলাপ করে বুঝতে পারেন, এ লোকটা মিত্রপক্ষের। তাঁকে গল্পটা বলতে থাকেন লিতিন। সেই লোকটা, যাঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল, তিনি হলেন গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ। প্লেনে শোনানো সেই গল্প নিয়েই লেখা - Clandestine in Chile.
অনেকটা লিখব, লিখতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ সবই গুলিয়ে যাচ্ছে। আর... হবে না’ই বা কেন? কিছুই যে বদলায়নি। একটা করে ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারপর স্লাইড-শোয়ের মত আর একটা ছবি তার যায়গা নেয়... আবার হঠাৎ সবক’টা ছবি একের অন্যের শরীরে সুপারইম্পোজড হয়ে তৈরী করে একটা মাত্র ছবি... না, ঠিক ছবি নয়, একটা হিজিবিজি। একটা মানেহীন, বর্ণহীন বোধ। একটা ভোঁতা হয়ে যাওয়া নিরক্ষর বোধ। একটা বোবা বোধ। আমার মধ্যে এই বোবা বোধটাই ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে, একটা শিশুর মত ঠিক। আল্ট্রাসোনোগ্রাফিতে হয়তো এর আধফোটা শরীরটাও স্পষ্ট দেখা যাবে আমার গর্ভে। আমি তার কথা শুনতে চাই... তাই আমি চুপ করে শুয়ে আছি। ক্রমশ গুটিয়ে নিচ্ছি হাত-পা; একটা দলামত পাকিয়ে নিচ্ছি নিজেকে; যেমন মায়ের পেটে একদিন বড় নিরাপদে ছিলাম।
মিসফিট বলতে যা বোঝায়, আমি তাই। আউটসাইডার। জানলা দিয়ে উঁকি মেরে চিরকাল দেখে গেছি অপরের সাংসারিক উষ্ণতা। আর চেয়ে গেছি ওইটুকুই। শুধু ওইটুকুই। আর কিচ্ছু না। তবে, সেজন্য মিথ্যে বলতে পারিনি। কোনোদিন পারিনি। পারবও না। অথবা... পারব কি? পারতে হবে হয়তো একদিন। না-পারাটা এক ধরণের প্রতিবন্ধকতা। নিজেকে জাস্টিফাই না করতে পারাটা। ‘ঠিক’ কথাগুলো ‘ঠিক’ সময়ে না বলতে পারা। এ কোনো বীরত্ব নয়, সহজ হওয়া। শুধুই অপচয়। চুড়ান্ত, চুড়ান্ত অপচয়।
************************************************************ **
চলে যাওয়ার সময়ে একজন মানুষকে কেমন দেখায়? চলে যাওয়ার সময়ে তার দীর্ঘ ছায়া পড়ে। মনে পড়ে যায় \'ক্যামেরা বাফ\' ছবির শেষ দৃশ্য। আমাদের চলে যাওয়াগুলোকে লং শটে ধরে রাখছে কোন ক্যামেরা বাফ? কেউ জানে না। \'শিপ অফ থিসিয়াস\' ছবিটা না দেখলে অনেক চলে যাওয়ার মানে আমি বুঝতে পারতাম না। \"Where do you end and the environment begins?\" কে এই প্রশ্নের উত্তর দেবে? প্রেম, বন্ধুত্ব, ভালবাসা, যৌনতা - এসব শব্দগুলো নিয়ে জাগলিং করতে করতেই কেটে যাবে একটা নিষ্ফল জীবন। আমার দুটো বেড়াল আছে। তাদের প্রায়ই আমি আদর করতে দেখি। বেড়ালদুটো কি বোকা। ওরা জানেই না, ওরা বন্ধু, নাকি প্রেমিক-প্রেমিকা, নাকি বর-বউ। ওরা শব্দ শেখেনি। ওরা শব্দের জাগলিং জানে না। ওরা বাঁচে, আদর করে, খাবার চায়, খাবার নিয়ে মারপিট করে, তারপর একে অন্যের উষ্ণতায় কুন্ডলি পাকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। ওরা জীবনবোধ ঘেঁটে \'মানুষ\' হবে না কখনো, ওরা কখনো মানুষের মত ভালবাসার গন্ডী চিনবে না। ওরা নিজেদের শরীরের আধিপত্য নিয়ে চিন্তা করবে না। ওরা বেঁচে থাকবে একটু উষ্ণতার জন্য শুধু, যে উষ্ণতার মানে কোনো অভিধানে লেখা নেই। আহা, কি মুর্খ ওরা। আহা, ওরা কি সুখে আছে। Where do you end and the environment begins? আমি যত বই পড়ি, যত সিনেমা দেখি, নিজেকে ততই খুদ্র মনে হয়, ততই অকিঞ্চিৎকর। আর ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসি। রাগে বা দুঃখে নয়, চলে যেতে হলে শান্ত পদক্ষেপে চলে যেতে হয়। তথাগত যেমন পা রেখেছিলেন হঠাৎই চৌকাঠে। অনেক, অনেক দূর যেতে হবে আমায়। পায়ে শিকল পরে সেখানে যাওয়া যায় না।
যে ঘরে আলো ঢোকে না সেখানে আমার এবং আমার অন্ধকারের বসবাস। আর আছে একটা পোষা ময়াল সাপ। হিলহিল করে বয়ে যায় পিচ্ছিল শরীরটা অগোছালো যত বই-খাতাপত্র-সিগারেট-দে শলাই-লাইটার-কাফকা-আখতা রুজ্জামান-কাঁচি-ছুরি-স ুইসাইডনোটের জঙ্গল পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে... কোনো আদিম অভ্যেসে। পাশের বাড়ির অসভ্য রেডিও থেকে \"মেরে মেহবুব কায়ামৎ হোগি\"-র সঙ্গে তাল মিলিয়ে অন্ধকার বাড়ির গর্ভ থেকে ভেসে আসা \"রেন্ডির বাচ্চা... রেন্ডির বাচ্চা... রেন্ডির বাচ্চা...\". রাত বাড়ছে। বাইকগুলোর গতি বাড়ছে। বাড়ির পাশের রাস্তা কেঁপে কেঁপে উঠছে চাকার ধমকে। খাটে শুয়ে পড়াটা ঘুমনোর জন্য নয়। খাটটাকে একটা নৌকো ভেবে নিয়ে চড়ে বসা। ভেবে নেওয়া, এই তো পালাচ্ছি। উত্তাল সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছি, ঢেউয়ের ধাক্কায় উলটে যেতে যেতেও সামলে নিচ্ছি... এই তো বেশ পালিয়ে যাচ্ছি...
মনে কর যেন বিদেশ ঘুরে... মা\'কে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে...
পাশের ঘরে আধখাওয়া চায়ের কাপ, ছড়িয়ে থাকা মুড়ি, চপের টুকরো, গোল করে রাখা চেয়ার-কুশন-মাদুর মোটেও আমার নয়। ওটা বেশ একটা স্টেজ। সাজানো আছে বিভিন্ন প্রপস। আমার অভিনয় শেষ। আমি বেরিয়ে গেছি। প্রপস গোছানো আমার কাজ না। আমি মেকাপ তুলছি। আমার জন্য নৌকোটা অপেক্ষা করছে।
কে যেন বলেছিল, \"hell is other people\"...? মনে পড়ছে না।

গ্রাউন্ড ফ্লোরের মেঝেটা স্টোনচিপস বসানো। ওপরের ঘরগুলো মার্বেলের। গ্রাউন্ড ফ্লোরটা সবচেয়ে আদিম এ বাড়ির, তবে সে তো অবভিয়াস, তাই না? ঠাকুর্দা ঠাকুমাকে নিয়ে সংসার শুরু করেছিল এই ঘরগুলোয়। ভয়ঙ্কর এক সংসার। যাক সে কথা। মেঝেটা স্টোনচিপসের। বাবা পরে রেনোভেট করার সময়ে নিচের তলাটা ভাড়া দেওয়ার জন্য বানিয়েছিল। আমি ভাড়া দিই না। কিন্তু থাকি।
একটা একটা করে চিহ্ন জমে জমে একদিন একটা আদল তৈরী করে... ঘরের আদলে তৈরী হয় সেই ছবিটা। এই তৈরী হওয়াটা এতই স্বতস্ফূর্ত, যে চোখের সামনে ভুল হচ্ছে দেখেও সেই ভুল আটকানো যায় না। কোনোভাবে ক্ষতি থেকে বাঁচার পথ খুঁজতে চায় তবুও সেই মূর্খ। সে জানে, যখন সাইক্লোন আসবে, ভুমিকম্প আসবে, আসবে খরা, আসবে কোর্ট অর্ডার, আসবে প্রোমোটারের দালাল, আসবে সংসারহীনতা, তাকে কেউ রক্ষা করবে না। সে জানে, এই যে তৈরী হচ্ছে এক একটা মুহুর্ত, এক একটা ছোট্ট ছোট্ট মুহুর্ত, এক একটা গল্প, এক এক ফোঁটা চোখের জল আর মৃদু হাসি আর চকিতে তাকানো, এসব একদিন জাস্ট মিথ্যে হয়ে যাবে। সবটাই মনগড়া হয়ে যাবে। ভ্যানিশ হয়ে যাবে এই ঘরটা এক মুহুর্তে। এটা তো কেউ বুঝবে না, যে জানা সত্ত্বেও সেই গড়ে ওঠা ঘরটাকে ঝড় আসার আগেই নিজের হাতে ভেঙ্গে ফেলার ক্ষমতা নিয়ে সে জন্মায়নি। যারা মূর্খ, তারা ধীরে ধীরে এভাবেই মুর্খামির নজির তৈরী করে।
একজন মূর্খ একদিন ভীষন কেঁদেছিল। সে একদিন নিজের মনটাকে নগ্ন করে দিয়েছিল আর একজনের কাছে... এই ঘরের ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করে, না পেরে, আরো কেঁদেছিল। তারপর থেকে সে ক্রমাগত কেঁদে চলে... লুকিয়ে লুকিয়ে, কোনো না কোনো ছুতোয়, যেন কান্নার মধ্যে কোথাও তার ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরটার রেশ লেগে আছে।
মূর্খদের কেউ রক্ষা করে না। এমনকি, দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ফলে এটাও সে জানত।
যে সবই জানত, তার আর কিছু বলার থাকে না। কিন্তু মূর্খ বলে, তখনো আরো অনেক কিছু বলার ছিল তার। সে জানত, তার যা বলার আছে সবই অর্থহীন। সে তার মনগড়া ঘরটার কথা না ভুলতে পারলে সেটা অবশ্যই তার ব্যক্তিগত সমস্যা। সে যদি এখনো না বুঝে থাকে যে \'ঘর\' জিনিসটা কত পলকা, কত ঠুনকো, কতটা ইলিউশন, তাহলে সে কি আদৌ অন্য কাউকে দোষ দিতে পারে?
************************************************************
\"কি ঘর বানাইমু আমি শূণ্যেরও মাঝার/ ভালা কইরা ঘর বানাইয়া কয়দিন থাকমু আর/
লোকে বলে, বলেরে, ঘর বাড়ী ভালা নায় আমার...\"
\"শোনো, ঘরবাড়ি এভাবে হয় না... টাকা জমাও, লোন নাও, একটা ফ্ল্যাট কেনো। তারপর বিয়ে কর। একমাত্র ওভাবেই হতে পারে। ই.এম.আই আর ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইট। একমাত্র এভাবেই হয়। সবার, এভাবেই হয়।\"
“তাই সত্য যা রচিবে তুমি, ঘটে যা তা সব সত্য নয়”।
শাহারজাদী হঠাৎই উঠে দাঁড়িয়ে বলে ওঠে - \"সুলতান, গল্প শেষ।\"
শেষ?
হ্যাঁ, শেষ।
তা কি করে হয়? গল্প শেষ হলে যে তোমার গর্দান যাবে !!
তা যাবে।
তাহলে শেষ করছ কেন?
আমি শেষ করার কে, সুলতান? গল্প কি আমার কথা শোনে? আমি গল্পকে রচনা করি না, গল্প আমাকে রচেছে। সেই গল্প, নিজের মত করেই, শেষ হয়ে গেছে সুলতান... আর একটাও শব্দ বাকি নেই।
কেন? গল্প শেষ হয়ে গেল কেন?
আপনি যে শুরু করলেন না... তাই। কোনো গল্পই শুধু কথকের হতে পারে না সুলতান। আলভিদা...
শাহারজাদী হেঁটে যাচ্ছে বদ্ধভুমির দিকে। মূর্খকে কেউ রক্ষা করে না।

\"ঠাকুর থাকবে কতক্ষন? ঠাকুর যাবে বিসর্জন\" - ঢাকের কাঠি দ্বিগুন উত্তেজনায় পড়তে থাকে, আর মাটির পুতুলটার তখন কি দুর্দশা !! গায়ের শোলার সাজ খসে পড়ছে, জামাকাপড় এলোমেলো হয়ে আছে, চুলগুলো লেপটে আছে মুখময়, দশ হাতের অস্ত্র-শস্ত্র ভেঙ্গে গেছে খানিক, খানিক খোয়া গেছে। নবমী অবধি খাতির ছিল, মন্ডপের প্রধান শো-পিস হিসেবে। মন্ডপ থেকে নামানোর পরই হেনস্থা শুরু। জলেই যাকে ফেলে দেওয়া হবে, তাকে আর অত যত্ন করে কি হবে? দুর্গা তখন দুগগা... ঠিক যেন উড়নচন্ডী দুগগার রোদ্দুরে পোড়া, আলুথালু চেহারা... পাগলি কোথাকার !!
অপুউউউউউউউ......
ঘর ছাড়তেও শিখতে হয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে তথাগতর গোড়ালি আটকে আছে চৌকাঠে, আর বুদ্ধপূর্নিমার চাঁদ ভেসে যাচ্ছে জোয়ারের টানে।

শুরু হয় চিহ্ন দিয়ে। চিহ্নগুলো মুছে ফেলতে হবে। যা মনগড়া, যা আমার মস্তিষ্ক ছাড়া আর কোথাও ঘটেনি, তার চিহ্ন কোত্থাও না থাকলে মস্তিষ্ক নিজেকেও অবিশ্বাস করতে পারে একদিন। কত কিই তো আমরা ভেবে নিই। এক এক সময়ে ঘুম থেকে উঠে দু\'এক মিনিট লাগে বুঝতে, যে কিসের মধ্যে আছি, স্বপ্ন না সত্যি। তাই, চিহ্নগুলো প্রথমেই মুছে ফেলতে হবে। বইটই, আরো যা আছে খুচরো জিনিস, প্যাকেটে পুরে গঙ্গাকে দিয়ে আসা, কারন গঙ্গা আমাদের সব আবর্জনা ধারন করে। ছবি তো কম্পিউটারে, গলার স্বর, প্রিয় গান, সিনেমা, চিঠি, ইমেল, সেসব সরিয়ে ফেলা আরো সহজ। কয়েকটা ক্লিক মাত্র। এভাবে, ধীরে ধীরে চিহ্নগুলো মুছে দিতে পারলে, ছবিটাও কি ফিকে হয়ে আসবে? হয়তো না।
কিন্তু এভাবে অ্যাট লিস্ট নিজের কাছে প্রমান করা যায়, যে ছবিটা মিথ্যে। ওটা ছিলই না কখনো। ঘর বলে কিছু হয় না। ঘর একটা অন্ধবিশ্বাস মাত্র।
আন্দ্রেই তারকোভস্কি’র ‘স্যাক্রিফাইস’ ছবির শেষ দৃশ্য। আবার সেই পাগলটা। কে এ? এ কি টোবা টেক সিং? না, এর নাম অ্যালেক্স্যান্ডার। তবু, কোথায় যেন মুখের মিল আছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিমানের শব্দে পাগল পাগল লাগে এই প্রাক্তন অভিনেতার। সে চায়, যুদ্ধ থামুক। কিভাবে সে থামাতে পারে যুদ্ধ। তার বাড়ির গভর্নেস তাকে বলে এক ভুডু প্রথার কথা। সে হল এক ডাইনি। অ্যালেক্স্যান্ডার যদি একদিন মেয়েটির সঙ্গে যৌনসঙ্গম করে, এবং সেদিনই সে তার বাড়িটা পুড়িয়ে দিতে পারে, তবে সেই স্যাক্রিফাইস পৌঁছবে দেবতার কাছে। তিনি থামিয়ে দেবেন যুদ্ধ। অ্যালেক্স্যান্ডার তার বৌ-ছেলেমেয়েকে পিকনিকে পাঠিয়ে নিজে যায় সেই অভিসারে। মাটির দশ ওপরে উঠে ভাসতে থাকে তারা সঙ্গমকালীন। ফিরে এসে অ্যালেক্স্যান্ডার তার বাড়ির সমস্ত চাদর, বেডকভার, টেবলক্লথ জড়ো করে ড্রয়িংরুমের মাঝখানে রাখা বড় টেবিলটার ওপর। একটা দেশলাই জ্বলে ওঠে ফস করে। সেই দেশলাই ছুঁইয়ে দেয় সে চাদরের এক কোণায়। এর পর আড়াই মিনিট ধরে স্ক্রিনে আগুনের ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য। কিভাবে আগুন একটু একটু করে খাচ্ছে একটা বাড়িকে। অ্যালেক্স্যান্ডারের বাড়িকে।
সাইলেন্স। কমপ্লিট সাইলেন্স। শুধু ব্যাকগ্রাউন্ডে আগুনের চড়চড় শব্দ। আড়াই মিনিটের টানা শট। ফিল্মমেকিং-এর গ্রামারকে চুড়ান্ত চ্যালেঞ্জ করা একটা শট। এক নির্বোধ দর্শকের মনেও ঠিক ততটাই ভাংচুর ঘটাবে ওই দৃশ্য যতটা একজন শিক্ষিত ফিল্ম বাফের মনে। পৃথিবীর আদিমতম শব্দ। আগুনের শব্দ। মাত্র আড়াই মিনিট।
অনেক দূরে দাঁড়িয়ে সেই ডাইনি দেখছে দিগন্তে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়া। নৈস্তব্ধ ভঙ্গ করে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন। অ্যালেক্সান্ডারকে নিতে আসছে ওরা অ্যাসাইলাম থেকে। কোন অ্যাসাইলামে নিয়ে যাবে ওরা তাকে? সেখানেই কি, যেখানে আছে বিশান সিং, ওরফে টোবা টেক সিং?
************************************************************ *
মিথ্যে বসন্তের গল্প বলতে বলতে আমি কি নিজেই একটা গল্প হয়ে যাচ্ছি? না কি গল্প হতে পারছি না, এটাই আমার ব্যর্থতা। জ্যঁ রিসের লেখা ‘ওয়াইড সারগ্যাসো সি’ উপন্যাসের মুখ্য চরিত্রকে চেনেন? সে আন্তোনিয়েত। তাকে আমরা অনেকদিন আগে থেকে চিনি। বিখ্যাত ‘জেন আয়ার’ উপন্যাসের নায়ক রচেস্টারের সেই পাগল বউ, যে চিলেকোঠা থেকে চিৎকার করত। তার গল্পটাই লিখেছিলেন জ্যঁ রিস। তার উৎখাত, তার ডিস্প্লেসমেন্ট, স্পেনের সমুদ্র-অর্কিড-সূর্যাস তের ক্যুলিব্রি এস্টেট থেকে তাকে হিঁচড়ে নিয়ে আসা কার্ডবোর্ডের শহর লন্ডনে, তার আহত হওয়া, তার বিশ্বাস হারানো, পাগল হতে থাকা, বন্দী হওয়া – এসমস্ত কথা লিখেছিলেন জ্যঁ রিস। একদিন আন্তোনিয়েত, কিভাবে ও কেন, তার বরের প্রাসাদে আগুন ধরিয়ে দিয়ে ঝাঁপ দিল ছাদ থেকে, তা বর্ণনা করেছেন। ‘জেন আয়ার’ উপন্যাসে যা ছিল শুধুই ঘটনা। সেই উপন্যাসের পাগলী, যে ছিল নামহীন এবং বক্তব্যহীন, তাকে ভাষা দেওয়ার জন্যই লেখা ‘ওয়াইড সারগাসো সি’।
কি সেই গল্পগুলো, যা আমি কুড়িয়ে বেড়াই? একাকিত্বের, অসুখের, আর্তনাদের গল্প। রক্তক্ষরণের দস্তান। আমি তোমাদের দয়া চাই না। দয়া করো, করুণা চাই না আমি। আরো একা হয়ে যেতে চাই। দেখতে চাই পৃথিবী ধ্বংশ হয়ে যাওয়া কেমন দেখায়। মাইলকে মাইল জুড়ে ছড়িয়ে থাকা জমি’র সমস্তটাই তখন নো ম্যানস ল্যান্ড। কুয়াশায় ঢাকা এক ধূসর উপত্যকা। বর্ডার নেই, নেই সীমান্তরক্ষী, কাঁটাতার।
কেমন হবে সেই শেষ মানুষের অভিজ্ঞতা, যে এই গোটা পৃথিবীটায় একা দাঁড়িয়ে থাকবে, সবকিছু ধ্ব্বংশ হওয়ার পর? তার বুকে জমে আছে অনেক স্মৃতি, গল্প, কান্না। শোনানোর কেউ নেই। সে কি তখন নিজেকেই শোনাতে থাকবে তার যাবতীয় কিসসা? যেমন ঠিক এখন। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি লিখে চলেছি প্রথমত নিজেকে পড়ে শোনাবো বলে। তবে... বলা তো যায় না... কখনো হয়তো এই লেখা পড়বে অন্য কেউ। হয়তো কিছু বছর কেউ আবিষ্কার করবে এই লেখা কোনো পুরনো ডাইরি ঘাঁটতে গিয়ে। হয়তো বহু হাজার বছর পর ভবিষ্যতের প্রত্নতাত্বিকরা খুঁড়ে বার করবে এই ম্যানুস্ক্রিপ্ট। তারা হয়তো বুঝবে না এই বিলুপ্তপ্রায় ভাষা আর। তাদের কাছে এই শব্দগুলো তখন চিহ্নমাত্র।
কিন্তু এসব ভেবে আমার কি হবে? আমার চারপাশের পৃথিবী ধ্বংশ হয়ে গেছে। আমি ভাঙ্গা ইমারত, ধ্বশে-যাওয়া দেওয়াল, মরা গাছপালা, পচাগলা শরীরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছি। আলো কমে আসছে। যা ছড়িয়ে পড়ছে তা কি কুয়াশা, না মারণ গ্যাস। আমার পৃথিবী হয়ে উঠছে আউৎসভিৎজ। গ্যাস চেম্বার। নিরেট কালো আকাশ থেকে ঝরে পড়ছে অ্যাসিড রেইন। হাড় থেকে গলে পড়ছে চামড়া, মাংস, সমাজ, সংস্কৃতি, স্মৃতি, স্বপ্ন। এই মাটিতে আমার শরীর মিশে যাওয়ার আগে শব্দগুলোকে উড়িয়ে দিচ্ছি ঠোঁট থেকে। ওরা বাঁচুক। প্রতিধ্বনি হয়ে। এই নো ম্যান্স ল্যান্ডে। আবার যেদিন এর দুদিকে উঠবে সীমান্তের কাঁটাতার, সেদিন এই শব্দগুলোর প্রতিধ্বনি সেই কাঁটাতার টপকে আমার গল্পগুলোকে বলে আসবে। তাই মরিয়া হয়ে জিভ নাড়ছি। ওরাও মস্তিষ্ক বেয়ে নেমে আসছে দ্রুত। বাঁচবে বলে।
************************************************************ **