যে জন আছে মাঝখানে...

কেয়া মুখোপাধ্যায়

সন্ধে নেমেছে অনেকক্ষণ। গোটা উপত্যকাকে চারদিক থেকে ঘিরে থাকা উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি শেষ হয়ে ঢালু হয়ে গেছে যেখানে, প্রত্যন্ত গ্রামের সেইখানটাতেই থানা। ৪ নম্বর রাজপুতানা রাইফেলস-এর আর্মি অফিসার মেজর ওপিন্দার সিং-এর জিপ এসে থামল। কয়েক ধাপ সিঁড়ি তাড়াহুড়োতে টপকে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন ডিউটি অফিসারের সামনে। ভারতের সবচেয়ে উত্তরের এই প্রদেশটির পীর পঞ্জাল রেঞ্জ-এ তখন বরফ পড়ার সময়। সেখান থেকেই সোজা নেমে এসেছেন মেজর। ভেজা বুটজোড়া থেকে জল ঝরে থানার মেঝে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। ডিউটি অফিসারের দিকে তাকিয়ে মেজর বললেন,
- কাল রাতে বর্ডারের ওপার থেকে তিনটে টেররিস্ট ঢুকে পড়েছিল মাচিল সেক্টরে। আমাদের ছেলেরা শেষ করে দিয়েছে।
এফ.আই.আর. লেখার খাতাটা টেনে নিয়ে পুলিস অফিসার জিজ্ঞেস করলেন,
- বডিগুলো? সেগুলো কোথায়?
- যেখানে গুলি করা হয়েছে, পুঁতে দেওয়া হয়েছে সেখানেই।
গাড়ির চাবিটা ঘোরাতে ঘোরাতে দ্রুত সিঁড়ি ভেঙে নেমে গেলেন মেজর ওপিন্দার। জিপ স্টার্ট দিয়ে থানার চৌহদ্দি থেকে বেরিয়ে গেলেন হুড়মুড়িয়ে।
সেটা ছিল ২০১০-র এপ্রিলের শেষের দিক। এফ.আই.আর এর ভিত্তিতে শুরু হল ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন।
“বডি দেখার জন্যে জোরাজুরি করলেন না কেন?” “আইডেন্টিটি ভেরিফাই করেছিলেন?”
সাংবাদিকদের চোখা চোখা প্রশ্নের উত্তরে পুলিস অফিসার বার বার বললেন,
“এখানে সব সময় ওভাবে কাজ হয় না। এসব আকছার হচ্ছে। এটা তেমন কোনও বিশেষ ঘটনা নয়”।
ভারতের কাশ্মীর উপত্যকার খুব চেনা ছবি এটা। ভূস্বর্গ কাশ্মীর। পর্যটক আর তীর্থযাত্রী- দু’দলেরই বড় প্রিয়। বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সুন্দর সীমান্ত। লাইন অফ কন্ট্রোল বরাবর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কিছু গ্রাম। ওপিন্দার সিং-এর মাচিল সেক্টর সেরকমই এক জায়গা। লাইন অফ কন্ট্রোল এর খুব কাছেই পাটান, উরি, ক্রিরি, বনিয়ার, তাং মারগ, সোপোর, রাফিয়াবাদ আর বারামুল্লা নামের আটটা তহশিল নিয়ে বারামুল্লা জেলা। এ জেলার গুলমার্গ-এর নয়নাভিরাম শোভায় মুগ্ধ দেশ-বিদেশের পর্যটক। উলার লেকে পাখির মেলা। পাশাপাশি, সুন্দরের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে আছে ভয়াবহ দিকটি।
১৯৪৭-এর বিভাজনের পর থেকেই কাশ্মীর বড় ভীতিপ্রদ, গোলযোগপূর্ণ। শুধু গত দু’দশকে এখানে নিহতের সংখ্যা আনুমানিক ৭০ হাজার। কাশ্মীরের প্রতি ১৭ জন বাসিন্দার জন্য নিয়োজিত একজন আধাসৈনিক কিংবা সৈনিক। হঠাৎ হঠাৎ এখান থেকে হারিয়ে যায় মানুষ। একেবারে উবে যায় যেন! পরিবার পরিজনের কাছে কোনও খবরই পৌঁছয় না আর। যদি বা খোঁজ মেলে, পুলিসের খাতায় মানুষটি তখন প্রাণহীন ‘বডি’।
৩০ শে এপ্রিল ২০১০। মাচিল সেক্টরের ঘটনা নিয়ে কাশ্মীরের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলছিলেন সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র লেফটেন্যান্ট কর্ণেল যে এস ব্রার। মেজর ওপিন্দার সিং-এর মত একই কথা শোনা গেল তাঁর মুখে। মাচিল শ্যুট আউটে মারা গেছে তিন পাকিস্তানি উগ্রপন্থী। কী কী উদ্ধার হয়েছে, তার লিস্টও তৈরি। তিনটে এ.কে ৪৭, একটা পাকিস্তানি পিস্তল, আরও কিছু অস্ত্রশস্ত্র, কিছু চকোলেট, সিগারেট আর খেজুর, দু’বোতল জল আর হাজার খানেক পাকিস্তানি টাকা। মৃতদেহের কোনও হদিশ নেই।
“শ্যুট আউটে পাকিস্তানি টেররিস্টরা মরেছে। এ একেবারে সোজাসাপ্টা, ওপেন-শাট্ কেস। এ নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ নেই”।
সমস্যাটা শুরু হল ক’দিন পরে। মাচিল থেকে মাইল তিরিশ দূরে পাঞ্জালা পুলিস স্টেশন। কাছের নাদিহাল গ্রাম থেকে তিনটি পরিবার অভিযোগ জানাল থানায়। ঊনিশ বছরের মোহাম্মদ, কুড়ি বছরের রিয়াজ আর সাতাশ বছরের শাহজাদকে পাওয়া যাচ্ছে না। মোহাম্মদ এর বাবার আপেলক্ষেত। রিয়াজ এর বাবা ভেড়া চড়ান আর শাহজাদের বাবা শ্রমিক। এপ্রিলের ২৮ তারিখ থেকে বাড়ি ফেরেনি তাঁদের ছেলেরা। কেউ দেখেওনি তাদের। কোথায় গেল তারা? থানার ডিটেকটিভরা কিছুতেই বুঝিয়ে ঠান্ডা করতে পারছিলেন না মধ্যবয়সী মানুষগুলোকে।
বাড়ির একটা জলজ্যান্ত ছেলে হঠাৎ নিরুদ্দেশ হয়ে গেলে বাড়ির মানুষগুলো কি শান্ত, নিস্তরঙ্গ জীবন কাটাতে পারে? পরিবারের ছোট ছেলে মোহাম্মদ। ক’দিন পরেই তার জন্মদিন। তার আগেই হারিয়ে গেল! বড্ড আমুদে ছিলো ছেলেটা। হাসি আনন্দে মাতিয়ে রাখত সকলকে। ছেলের নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকে সারাদিন থানায় গিয়ে ধর্ণা দেন বাবা। ক্ষেতের কাজ বন্ধ। থানা, পুলিশ সামলে সন্ধেয় ভাঙা মনে আবার ঘর-মুখো। আরো একটা দিন কেটে গেল। কিন্তু ঘরের মানুষটার জন্যে ভাল খবর নেই কোনও। দুঃস্বপ্ন দেখার ভয়ে রাতে ঘুমোতে পারেন না বাবা-মা। রিয়াজ আর শাহজাদের পরিবারের ছবিটাও খুব আলাদা নয়। শোকে বিহ্বল মা-বাবারা গভীর রাতেও আদরের ছেলেদের শোকে বিলাপ করে কেঁদে ওঠেন। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া না করায় অসুস্থ হয়ে পড়েন রিয়াজের মা। ছেলের ছবি নিয়ে দাওয়ায় বসে সবসময় বিড়বিড় করে কী যেন বলতে থাকেন শাহজাদের বাবা। ভয়াবহ কষ্ট বুকের ভেতর। তার মায়ের মনে হয়, আহারে, ছেলেটা তো একা ঘুমোতে ভয় পায়। না জানি কোথায় শুয়ে আছে আজ! পরিবারগুলোর স্বাভাবিক জীবন হারিয়ে গেল চিরকালের মত। টাকা-পয়সা নয়, ক্ষতিপূরণ নয়, এই অসহায় বাবা-মা-রা শুধু জানতে চান, ছেলেটা কি বেঁচে আছে? নাকি সে মৃত? যদি মারাই গিয়ে থাকে, তবে সেই মৃত শরীরটা একবার ছুঁতে চান তাঁরা। এই দ্বন্দ্ব নিয়েই জীবন-মৃত্যুর মাঝামাঝি এক অসহায় যাপন তাদের।
মানুষ বোধহয় বড় সস্তা! তাই মিডিয়ার এতো সময় থাকে না পুরনো ঘটনা মনে রাখার। নিত্যনতুন খবরের চাপে হারিয়ে যায় পুরনো খবর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ধুলো জমে থানার ফাইলে। কিন্তু সব দুঃখের স্রোত সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষীণ হয়ে আসে না। কিছু নিদারুণ যন্ত্রণা আজীবন ক্ষত হয়ে থেকে যায়। পরিবারের প্রাণচঞ্চল এক তরুণের হারিয়ে যাওয়া সেইরকম এক ক্ষত। গোটা পরিবারের অস্তিত্বকেই সেই ক্ষত খাদের কিনারে এনে ফেলে। তবু প্রবল দুঃখ, কষ্ট হতাশার মধ্যেও ন্যায় বিচার পাওয়ার একটা ক্ষীণতম আশা থেকে যায় কোথাও। কিন্তু কে দেবে ন্যায় বিচার?
একজনের খোঁজ পাওয়া গেল শেষ অবধি। কথাগুলো পৌঁছল পারভেজ ইমরোজের কানে। কে এই পারভেজ ইমরোজ? কাশ্মীরের সবচেয়ে পরিচিত মানবাধিকার বিষয়ক আইনজীবী। সবচেয়ে নাছোড়বান্দা। শেষ না দেখে যিনি থামেন না কিছুতেই। যেসব পরিবার অভিযোগ করেন, তাঁদের আত্মীয়রা নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে থাকাকালীন উধাও হয়েছেন, তাঁদের হয়ে আইনি লড়াই চালান ইমরোজ। ভারতীয় সেনাবাহিনী যখন জোর দিয়ে বলে, নিখোঁজরা কন্ট্রোল লাইন পার হয়ে পাকিস্তানে পালিয়ে গেছে। তার জবাব দিতে আইনের সাহায্য নেন ইমরোজ। গত বিশ বছরে কাশ্মীর হাইকোর্ট কয়েক হাজার হেবিয়াস কর্পাস (habeas corpus)-এর দরখাস্ত করেছেন তিনি। সোজা কথায় তাঁর দাবী, ‘Produce the body’, নিখোঁজদেরকে সশরীরে হাজির করা হোক। মোহাম্মদ, রিয়াজ কি শাহজাদের মত হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের পরিবারের হয়ে লড়েন ইমরোজ। কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে এরা? এখান ওখান থেকে খবর যোগাড় করে ইমরোজ একটা হিসেব বানাতে পেরেছেন। সেনাবাহিনীর হেফাজত থেকে অন্তত ৮০০০ মানুষ নিখোঁজ! কী হল তাদের? কোথায় গেল তারা? এদের কেউ কি আদৌ বেঁচে আছে আর?
নতুন তথ্য অধিকার আইনের সাহায্য নিয়ে ইমরোজ জানতে পারলেন শ’য়ে শয়ে সেনার বিরুদ্ধে খুন, ধর্ষণ, অত্যাচারের অভিযোগ। কিন্তু একট কেসও এগোয়নি এতটুকু! কারণ? Armed Forces Special Powers Act অনুযায়ী সেনা আর প্যারামিলিটারি-বাহিন র আছে বিশেষ আইনী রক্ষাকবচ। প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের ছাড়পত্র না পেলে তাদের ট্রায়াল হবে না। অথচ, অন্যদিকে Jammu and Kashmir Public Safety act অনুযায়ী, যে কোনও লোকের ওপর সন্দেহ হলেই তাকে দু’বছর অবধি আটকে রাখা যায় অনায়াসে। অভিযোগ? আছে তো- আজ করেনি বটে, কিন্তু তাই বলে ভবিষ্যতে কি তারা অপরাধ করতে পারে না! এরকমভাবে জেলে আটক আছেন আনুমানিক ২০ হাজার নাগরিক।
প্রতিবাদের পথে হাঁটলেন ইমরোজ। দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন ইউনাইটেড নেশনস-এর। তবে, সবল প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াই বড় সহজ কথা নয়। দু’পা এগিয়ে, চার-পা পিছিয়েও আসতে হয়। এ লড়াইয়ে পাশে কাউকে পাওয়াও প্রায় অসম্ভব। তবু এগিয়ে এসেছিলেন যাঁরা, তাঁদের জীবনও নিরাপদ রইল না। ইমরোজের কয়েকজন সহকারী আইনজীবী নিরাপত্তা এবং সামরিক বাহিনীর মোকাবেলা করার মূল্য দিলেন প্রাণ দিয়ে!
বার বার কঠিন বাধা পথে। তবু মনের জোরে সেসব বাধা পেরিয়ে গিয়ে বান্দিপোরা, কুপোয়ারা আর বারামুল্লা জেলার অন্তত ৫৫-টি গ্রামে ছড়িয়ে পড়লেন ইমরোজ আর সহকর্মীরা। এর আগে, ২০০৫-এ ইমরোজকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার পুরস্কার দেওয়ার কথা হয় রাষ্ট্রসঙ্ঘের তরফ থেকে। এই পুরস্কার পেয়েছেন নেলসন ম্যান্ডেলা। কিন্তু পুরস্কার গ্রহণ করতে যেতে পারেননি ইমরোজ। ভারত সরকার তাঁকে পাসপোর্ট দিতে সম্মত হননি। কিন্তু পুরস্কারে কী এসে যায়? দিনে দিনে কাশ্মীরের গ্রামগুলিতে তাঁর প্রতি বাড়তে থাকল মানুষের আস্থা, বিশ্বাস। বারামুল্লার যে নাদিহাল গ্রাম থেকে তিন তরুণ নিখোঁজ হয়েছিলেন, সেই গ্রামসহ আরো নানা জায়গায় গ্রামবাসীরাই সঙ্গে করে নিয়ে গেল তাঁদের। দেখাল, পাইনের জঙ্গল আর ফলবাগানের মধ্যে মাটির ছোট ছোট গর্ত, শেওলা পড়া ঢিবি। অজানা, অচিহ্নিত গণকবর। খুঁজতে খুঁজতে গণকবরের সংখ্যা বেড়েই চলতে লাগল দিনে দিনে- ২৭০০, ২৯০০, ৩০০০...! সেসব কবরের আশি শতাংশ দেহেরই পরিচয় মেলে না। অশনাক্ত থেকে যায়।
এরা কারা? কে মারল এদের? কেন মারল এমন নৃশংসভাবে? এরা কি যুদ্ধে মৃত? তাদের কবর দিল কে? এরকম অনেক প্রশ্ন। উত্তর মেলে না!
প্রায় ৬০০০ কবরের খোঁজ পাবার পর একদিন শোনা গেল, এসব কবরের মধ্যেই নাকি থাকতে পারে হারিয়ে যাওয়া কিংবা সেনাবাহিনীর তুলে নিয়ে যাওয়া নিখোঁজ মানুষের দেহ! ভারতীয় আইন অনুযায়ী প্রতিটি সহিংস মৃত্যুর তদন্ত করা এবং লাশ শনাক্ত করার দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু বাইমিয়ার গ্রামে চুল পেকে যাওয়া বৃদ্ধ আতা মোহাম্মদ খান যে বললেন অন্য কথা! সেই বৃদ্ধ এগিয়ে এসে ইমরোজদের বলেছিলেন, কীভাবে রাতের অন্ধকারে ২০৩টি অশনাক্ত লাশ সমাহিত করতে বাধ্য করা হয়েছিল তাঁকে!
এবার সরকারী মানাবাধিকার কমিশনকে হুঁশিয়ার করে দিতে চাইলেন ইমরোজ। ধামাচাপা দেওয়া বিষয়টির রিপোর্ট প্রকাশ পেল। ইমরোজ স্পষ্ট বললেন,
‘আমরা সন্দেহ করছি কাশ্মীরের সব নিখোঁজ ব্যক্তিদেরকে এসব গোপন স্থানে পুঁতে ফেলা হয়েছে।’
ব্যস! আগুনে ঘি পড়ল যেন! একদিন রাতে আক্রমণ হল তাঁর বাড়িতে। গুলিতে খুন হয়ে গেল তাঁর ভাইয়ের ছেলে। আশেপাশের এলাকার লোকেরা যখন ছুটে এসেছিল তাদের বিপদের বন্ধু ইমরোজের পরিবারকে সাহায্য করতে, তারা পালিয়ে যেতে দেখল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স এবং স্পেশাল টাস্কফোর্সের একটা সাঁজোয়া গাড়ি আর দুটো জিপকে। ইমরোজ ও তাঁর পরিবারের ওপর এই হামলার পরে ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’ ভারতকে আহ্বান জানাল,
‘পুরস্কারবিজয়ী মানবাধিকার আইনজীবী পারভেজ ইমরোজকে আপনারা নিরাপত্তা দিন।’ ইউরোপীয় পার্লামেন্টে উঠল বিষয়টি। পরিবার বলল, অনেক হয়েছে, আর নয়। এবার এসব থেকে বিরত হোন ইমরোজ। আর ইমরোজ বললেন,
‘আমি বড় ভয়ের মধ্যে ছিলাম। ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম। কিন্তু চুপ করে থাকাও তো এক ধরনের অপরাধ!’
না, থামা নয়। থামার বদলে ইমরোজ আর তাঁর সহকারীরা প্রচেষ্টা বেড়ে গেল কয়েক গুণ। ইমরোজের সহকর্মী খুররম পারভেজ। Association of Parents of Disappeared Persons (APDP)-র প্রোগ্রাম কোওর্ডিনেটরও তিনি। খুঁজতে খুঁজতে পারভেজ একসময় চলে গেলেন নাদিহাল গ্রামে। দেখা হল নিখোঁজ তিন তরুণের বন্ধু ফায়াজ ওয়ানির সঙ্গে। সে জানাল, তার তিনজন বন্ধুকেই নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মাচিল-এর আর্মি ক্যাম্পে। স্পেশ্যাল পুলিস অফিসার বাশির লোনই তত্ত্বাবধান করেছিল পুরো ব্যাপারটার। বলা হয়েছিল, সেনাবাহিনীতে ওদের কাজ দেওয়া হবে। তিনজনের হাতে কিছু নগদ টাকাও দেওয়া হয়েছিল।
তিনটি পরিবার এবার সরাসরি অভিযোগ জানাল স্পেশ্যাল পুলিস অফিসার বাশির লোনের বিরুদ্ধে। চাপের মুখে সব স্বীকার করল বাশির লোন। জানা গেল আসল সত্যি। আর্মির বিশেষ পুরস্কার পাবার জন্যে তিনটি ছেলেকে গুলি করেছিল খুন করেছিল ন’জন সেনার একটা টিম। তারপর রিপোর্ট করেছিল, তিনজন উগ্রপন্থী গুলিতে নিহত। উগ্রপন্থী হত্যার পুরস্কারের লোভে ফেক এনকাউন্টার!
২৮ শে মে ২০১০। নামহীন, অশনাক্ত কবর থেকে তুলে আনা হল তিনটি তরুণ দেহ। আগে যাদের পাকিস্তানি উগ্রপন্থী বলা হয়েছিল। মোহাম্মদ, রিয়াজ আর শাহাজাদের পরিবার শনাক্ত করল প্রাণহীন দেহগুলো। এতদিনের আশঙ্কা আর নিদারুণ যন্ত্রণার দিন যাপনের পর ভেঙে পড়লেন অসহায় বাবা-মা-রা।
খবর ছড়িয়ে পড়ল নিমেষে। সেনাবাহিনীর প্রতি ঘৃণায় ফেটে পড়লেন কাশ্মিরী তরুণরা। রাগে, ক্ষোভে ইট পাথর ছুঁড়তে লাগল সেনাবাহিনীর উদ্দেশে। উত্তর এল বুলেটে।
শতাধিক নিহত। শিশুরাও বাদ নেই। ৫০০০ এর ওপর গ্রেপ্তার। তারপর- অকথ্য অত্যাচার বন্দীদশায়। ইমরোজ আর তাঁর সহকর্মীরা রিপোর্ট পাঠালেন ইউনাইটেড নেশনসে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এ। দেখা গেল, প্রতি ৬ জন কাশ্মীরির ১ জন অত্যাচারের শিকার।
বড় নাটকীয় শুনতে লাগছে এইসব ঘাত-প্রতিঘাত? কিন্তু এসবই ঘোর বাস্তব। বড় নির্মম বাস্তব।
এই তো সেদিনও একসঙ্গেই ছিল ভারত-পাকিস্তান! দু’দেশের মধ্যে কবে তৈরি হল এমন অনতিক্রম্য দূরত্ব? সাতচল্লিশের একটা কাঁটাতারে ভাগ হয়ে গেল সব কিছু! অবশ্য সাতচল্লিশের পর থেকে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে তিন তিনবার যুদ্ধ। ১৯৬৫, ১৯৭১, ১৯৯৯। প্রথম আর শেষ যুদ্ধদুটির কারণ- কাশ্মীর। দু’ দেশই মনে করে কাশ্মীর তাদের অংশ। সর্বশেষ যুদ্ধ ১৯৯৯ সালে। সেসময় ‘লাইন অব কন্ট্রোল’ পেরিয়ে ভারতের কার্গিল এলাকা দখল করে নিয়েছিল পাকিস্তান। পরে ভারতীয় বাহিনী সরিয়ে দেয় প্রতিপক্ষকে। শুধু ১৯৮৯ থেকে আজ অবধি এখানে প্রাণ দিয়েছেন প্রায় সত্তর হাজার মানুষ। দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্পর্শকাতর সীমান্ত কাশ্মীর। ভারতের অভিযোগ। পাকিস্তানের পাল্টা অভিযোগ। কখনো ভারত আবার কখনো পাকিস্তান বলে তাদের সেনাসদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে অন্যদেশের সেনাবাহিনী। এক দেশের বিদেশ মন্ত্রকের অভিযোগ উড়িয়ে দেয় অন্য দেশ। অস্বীকার করে। দক্ষিণ এশিয়ার গণতান্ত্রিক দুটি দেশ ভারত আর পাকিস্তান। পারমাণবিক শক্তিধর দুটি দেশও। দুটি রাষ্ট্রের মধ্যে বিশ্বাসের জায়গা নেই বললেই চলে। উত্তেজনা ও পারস্পারিক অবিশ্বাসের বাতাবরণ আগাগোড়া। ১৯৪৭-এই কি এর সূচনা? কাশ্মীরের জন্যে?
সাতচল্লিশের ভারত-বিভাজনের অন্যতম শর্তই ছিল, ভারতের দেশীয় রাজ্যের রাজারা হয় ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দিতে পারবেন, অথবা তাঁরা স্বাধীনতা বজায় রেখে শাসনকাজ চালাতে পারবেন। ভারতের স্বাধীনতার সময়ে কাশ্মীরের স্বাধীন রাজা ছিলেন হরি সিং। ১৯৪৭ সালের ২০ অক্টোবর পাকিস্তানের সমর্থনে অনুপ্রবেশ ঘটল কাশ্মীরে। তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করলেও গভর্নর-জেনারেল লর্ড মাউন্টব্যাটেনের কাছে সাহায্য চাইলেন হরি সিং। মাউন্টব্যাটেন শর্ত দিলেন, কাশ্মীরের রাজা হরি সিং ভারতভুক্তির পক্ষে স্বাক্ষর করলে কাশ্মীরকে সাহায্য করা হবে। ১৯৪৭ সালের ২৫ অক্টোবর হরি সিং কাশ্মীরের ভারতভুক্তির চুক্তিতে সই করলেন। তারপর ভারতীয় সেনা কাশ্মীরে প্রবেশ করে অনুপ্রবেশকারীদের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করে। ভারত বিষয়টি রাষ্ট্রসংঘে উত্থাপন করলে, রাষ্ট্রসংঘ ভারত ও পাকিস্তানকে তাদের অধিকৃত এলাকা খালি করে দিয়ে রাষ্ট্রসংঘের তত্ত্বাবধানে গণভোটের প্রস্তাব দিল। ভারত প্রথমে এই প্রস্তাবে সম্মত হলেও পরে গণভোটে অসম্মত হয় আর পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহারে অসম্মত হয়। রাজা, রাষ্ট্রশক্তি, রাষ্ট্রসংঘ আর তাদের হাজারো টালবাহানার মধ্যে কেউ কি ভেবেছিল কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের কথা? তাঁরা কী চান? স্বাধীন বা আজাদ কাশ্মীরই কি তাঁদের স্বপ্নে ছিল?
একটা সীমানা রেখায় একদিন ভাগ হয়ে গিয়েছিল দুটো দেশ। দেশ ভাগ হবার পর কাতারে কাতারে মানুষ শেষ সম্বল লোটাকম্বল গুটিয়ে হাঁটা দিয়েছিল অদেখা অজানা ভূখণ্ডের দিকে। কেউ পাকিস্তানে, কেউ ভারতে। মাঝে পড়ে রইল কাশ্মীর, সে স্বাধীন থাকতে চেয়েছিল।
কাগজে-কলমে যখন কাঁটাতারের বেড়া আঁকা হল, তখন মানচিত্র আঁকিয়েদের অগ্রাধিকারের তালিকায় একেবারে শেষে ছিল মানুষের জীবন। সে জীবন বিভক্ত হয়ে গেছে কাঁটাতারের এসব বেড়ায়। ঘরেও নয়, পারেও নয়। দু’য়ের মাঝামাঝি নিশ্ছিদ্র ভয়, অপমান, আর শিকড় উপড়ানো অব্যক্ত যন্ত্রণা হয়ে থেকে গেছে মাঝখানের দূরত্বটুকু। ‘নো-ম্যানস্ ল্যান্ড’৷ মাপের হিসেবে সে দূরত্ব সামান্যই। সে দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। তবু মাঝখানে তার অনিবার্য উপস্থিতি শুধু দেশ নয়, কাল নয়- ক্রমশ ব্যবধান তৈরি করেছে দু’পারের অন্তরাত্মায়। ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর উপত্যকা। তার সীমানায় দু দেশের মাঝখানের ‘নো-ম্যানস্ ল্যান্ড। সে যেন আজ ভুল-স্বর্গ। ভুল করে সেখানে চলে গেলে, সে অনধিকার চর্চার দায় বড় কম নয়! বেশিরভাগ সময়েই জীবন দিয়ে চোকাতে হয় সে ভুলের মাশুল। ভুল করে ওই মাঝখানে চলে গেলে সরল গ্রামের ছেলেকে দেগে দেওয়া হতে পারে কট্টর উগ্রপন্থী বলে। যে উগ্রপন্থী জেনে বুঝে ঝুঁকি নেয়, কাঁটাতার ঘেরা ওই মাঝখানটুকু কেড়ে নেয় তার প্রাণ। ও পার যে নিষিদ্ধ, ও পারে যাওয়া যে বারণ- তার আগাম সতর্কবার্তা জারি করে মাঝের এই পরিত্যাজ্য এক টুকরো নামহীন, ঠিকানাহীন জমি। অমোঘ উপস্থিতিটুকুই তার সত্তা। আর প্রতিনিয়ত সে সত্তা জানান দেয় আমাদের, সাধারণের সীমাবদ্ধতার।
কিন্তু শুধু এটুকুই নয়। আরো আছে। এ পার ও পারের দ্বন্দ্বের মাঝে পড়ে আছে এক অন্য কাশ্মীর। ‘এক ফুল দো মালি’ কি 'কাশ্মীর কি কলি' কিংবা আরো অনেক হিন্দি ছবির মুঠো মুঠো খুশি ছড়ানো ভূস্বর্গ কাশ্মীর এ নয়। এই কাশ্মীরে অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যে লেগে থাকে অনেক মানুষের হাহাকার, রক্ত, অপমান, বেদনাতুর স্মৃতি। এই কাশ্মীরে অপেক্ষায় থাকে এক একটি পরিবার। স্বামীর অপেক্ষায় স্ত্রী। বাবার অপেক্ষায় সন্তান। ছেলের অপেক্ষায় মা। হঠাৎ একদিন ঘর থেকে বেরনো মানুষটি আর ফিরে না এলে, এক লহমায় প্রতিটা অপেক্ষারত মানুষের জীবনে এক অদ্ভুত দোলাচল! যে মানুষটি ঘরেও নয়, পারেও নয়- সেই মানুষটির সঙ্গে সম্পর্কের সমীকরণও বদলে যায় কি! সম্পর্কও কি হারাতে চায় ঐরকম এক টুকরো নো-ম্যানস ল্যান্ডে!
মোহাম্মদ, রিয়াজ শাহজাদের পরিবার সন্তানের দেহ দেখতে পেয়েছে। কাশ্মীরের হাজার হাজার নিখোঁজ পরিবারের সদস্যরা তো তাও পাননি! সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি বোধহয় সেনাবাহিনীর বা সরকারের তরফ থেকে অস্বীকার- না, নিখোঁজ ব্যক্তি সম্পর্কে তাঁদের কিছু জানা নেই! এক আশা-নিরাশার দোলাচলে বহু বছর ধরে অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচেন প্রিয়জন। মায়েরা ভাবেন, তাদের সন্তান যদি কখনও ফিরে এলে সন্তানকে চিনতে পারবেন তো! বাবারা প্রার্থনা করেন- সন্তানের শেষ কাজ যেন নিজে হাতে না করতে হয়, তার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়।
কাশ্মীর সীমান্তে অনেক নারী তাদের হারিয়ে যাওয়া স্বামীর খোঁজে এখনও অপেক্ষায়। সমাজ তাঁদের বলে ‘অর্ধ-বিধবা’। এ এক নতুন শব্দের জন্ম দিয়েছে রক্তাক্ত কাশ্মীর। পরিবার বুঝতে পারেন না, তাঁরা কি শোক প্রকাশ করবেন? অস্থির হয়ে ভাবেন, তাঁদের প্রিয়জন কি এখনও নির্যাতন ভোগ করছে, নাকি মেরে ফেলা হয়েছে তাকে? কবরে শায়িত হওয়ার মর্যাদাটুকু অন্তত কি সে পেল? আজকের কাশ্মীর সীমান্তে বহু পরিবার এমন হাজারো প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে আছে।
মৃতদের জন্যে অপেক্ষা থাকে না। আমাদের অপেক্ষা জীবনের জন্যে, জীবিত দের জন্যে। এ এক অনিবার্য সত্য। কিন্তু যারা জীবিত নয়, আবার মৃতও নয় তাদের জন্য আমরা কি করি? যে সন্তান জানে না তার পিতা বেঁচে আছেন, না মারা গেছেন, তিনি কি করবেন? যে স্ত্রী জানে না তার স্বামী মৃত না জীবিত, তিনি কি করবেন? যে পিতামাতা জানেন না তাদের সন্তানের খোঁজ, তারা কি করবেন? কাশ্মীরের এই অর্ধ-অনাথ, অর্ধ-বিধবা আর অর্ধ মা-বাবাদের প্রশ্নের জবাব দেবে কে? এসব মানুষের জীবন চিরকালের জন্যে যেন আটকা পড়ে গেছে এক অদৃশ্য নো-ম্যানস ল্যান্ড-এ!
‘টোবা টেক সিং’-কে মনে পড়ে? নামহীন, ঠিকানাহীন পরিত্যাজ্য সেসব ভূখন্ড, নোম্যানস ল্যান্ডকে ঘিরে অসামান্য কাহিনি বুনেছিলেন উর্দু সাহিত্যের শক্তিমান ছোটগল্পকার সাদাত হাসান মান্টো। এ গল্পে মান্টো যে মানুষদের আমদানি করেন, তাদের স্থায়ী বাসস্থান বহুকাল যাবত্‍ পাগলাগারদ, এ পার ও পার নির্বিশেষে৷ হিন্দুস্তানে না পাকিস্তানে? কোথায় তার ফেলে আসা গ্রাম? এই দ্বন্দ্বে বিভ্রান্ত বিষেণ সিং-এর মৃতদেহটি পড়ে থাকে দুই কাঁটাতারের মাঝখানে নো-ম্যানস্ ল্যান্ডে৷ এই উপমহাদেশ জুড়ে ওই মৃতদেহ ফেলার জায়গাটা হয়েছিল৷ সে জমি কারোর নয়। ঠিক যেমন মৃত শরীরগুলোরও দাবিদার নেই কোনও৷ এ গল্পে দেশ ভাগ, নতুন রাষ্ট্র, নতুন সংবিধান, ধর্মের ভিত্তিতে নির্মিত রাষ্ট্রের সর্বজনগ্রাহ্য পরিচয় – এই সব কিছু সার্বিক উন্মাদনার ধাক্কায় অর্থহীন হয়ে যায়। টিঁকে থাকে কেবল দু’একটি শব্দ। অনেক কাল আগে ফেলে আসা গ্রাম বা দূরতম গ্রহের প্রাণীদের মতো দেশনেতাদের অর্থহীন কিছু নাম৷ পাগলদের মুখে হিন্দুস্তান আর পাকিস্তান নিয়ে স্লোগানগুলির উচ্চারণে দেশভাগের অর্থহীনতা প্রকট হয় আরও৷
এ পার আর ও পারের সীমানায় নো ম্যানস ল্যান্ড। না, পরিত্যক্ত হলেও সে এলাকা খালি নয় কখনওই। বরং বড় বেশি ভর্তি আমাদের সীমাহীন ভয় আর অতল যন্ত্রণার অনুভব দিয়ে। তাকে না করা যাবে সম্পূর্ণ গ্রহণ, না করা যাবে পুরোপুরি বর্জন। মানুষের মন। সে চলে যেতে চায় সব কাঁটাতার টপকে। শুধু ঘর, কি শুধু পারে আটকে থাকতে চায় না সে। সে কি শুধু বুঝেছিল টোবা টেক সিং? তাই সব জয়-পরাজয় ও গ্রহণ আর বর্জনের মাঝামাঝি, সীমান্তের দুদিকে একই ধরণের কাঁটাতারের বেড়ার মাঝখানটুকুতে কারোর অনধিকৃত ভূখন্ডে মুখ থুবড়ে পড়েছিল সে? বাদবাকী আমাদের, দৃশ্যমান বা অদৃশ্য সেই পরিত্যক্ত মাঝখানটুকুর ভার বয়ে চলতে হবে আজীবন।
--------------------------------