নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড- মানবতার টানাপোড়েন

প্রবুদ্ধ ঘোষ

সে মুহূর্তে একা সে মানুষ। দু’হাত ছড়িয়ে রয়েছে দু’দেশের দিকে। আর, সে পড়ে আছে দেশহীন দেশে, নামহীন মাটিতে। বিষান সিং, যার স্মৃতি আটকে রয়েছে কাঁটাতারে, ভবিষ্যৎ ‘নো ম্যান্‌স ল্যান্ড’-à¦à ¤ বহু আগেই তার মানসিক বিকার ঘটেছিল, à§§à§« বছর পাগলাগারদৠ‡ সে একদিনও বিশ্রাম নেয়নি, ভুলে গেছিল সন্তানমুখ, বান্ধবগাছ- সব। শুধু মনে ছিল ‘টোবা টেক সিং’- তার মাতৃভূমি গ্রাম। ১৯৪৭-এর ক্ষমতা হস্তান্তরৠর তালগোল থামলে, হিন্দুস্তা ন-পাকিস্তাঠ¨ দু’দেশে পাগলদের পুনর্বাসনৠর সিদ্ধান্ত নিল à¦¦à§‡à¦¶à¦¨à¦¾à§Ÿà¦•à§‡à¦°à ¾à¥¤ পাগলাগারদৠ‡ এই আলোচনায় কান-খাড়া থাকত বিষাণ সিং-এর। তার আনন্দ সে নিজের গ্রামে ফিরবে, তার বিষাদ সে জানেনা গ্রামটা এখন কোন দেশে। পাগলাগারদৠ‡à¦° এক সহবন্দী নিজেকে দাবি করত ‘ঈশ্বর’, সেও এমনকি জানাতে পারেনা টোবা টেক সিং হিন্দুস্তা নে গেল নাকি পাকিস্তানৠ। সে শুধু অট্টহাসিতৠফেটে পড়ে বলে, “হিন্দুস্ঠানেও না, পাকিস্তানৠও না। কারণ, আমরা এখনো কোনো নির্দেশ দিইনি এই ভূখণ্ডের ব্যাপারে!” বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও ‘ঈশ্বর’ যখন টোবা টেক সিং-এর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত না নিয়ে এড়িয়ে যায়, বিষাণ সিং বিরক্তিতে বিড়বিড় করে- ‘উপর দি গুরগুর দি এনাক্স দি ডাল দি মুঁগ আফ গুরুজি দা খালসা অ্যাঁয় গুরুজি কি ফতেহ্‌... জো বোলে সো নিহাল সৎ শ্রী আকাল’।


সেই রেললাইনটা, পারাপার-স্ঠৃতি নিয়ে শুয়ে আছে। যোগচিহ্ন থেকে বিয়োগচিহ্ঠ¨ হওয়ার যা ক্ষত, সেখানে অবোধ কান্না লেগে আছে। অথচ, কোনো মানুষ যাবেনা সেখানে, ছোঁবেনা বিষাদ। সমান্তরাল দুটি লাইন একটি মানবতাহীন সময়কে বয়ে নিয়ে যাবে অনন্তকাল, ছুটতে ছুটতে ধাক্কা খাবে অমোঘ ‘এন্ডিং সাইন’-এ, হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়বে না-মানুষী বৃষ্টির সোঁদা গন্ধে। কিংবা, সেই ফেলে আসা দুয়োর। যেখানে ভাঙ্গা চৌকাঠ প্রিয়জনের পার হওয়ার অপেক্ষায়; চুনখসা দেওয়ালে সময় এঁকে রেখেছে অন্ধকার ছবি। সেই পাতলা কাঠের আব্রু, রসুইঘরের তেল-কালো দেওয়াল। আপাততঃ কোনো এক স্থির বিলাপে রয়ে গেছে। ‘জলা-জংলার দেশ...এখানে দেখবার আছেটা কি? আসল জিনিস দেখবি তো চল্‌ ওপারে’ বলে বাবা টেনে এনেছিল পরিবারকে। তারপর, সেই গাছের ডালে আটকানো ঘুড়ির স্মৃতি আর জমিয়ে রাখা à¦¡à¦¾à¦•à¦Ÿà¦¿à¦•à¦¿à¦Ÿà§‡à °à¦¾ হারিয়ে গেছে। কেউ আর যায়নি সেখানে। বাস্তুসাপট িও অপেক্ষায় থেকে থেকে মরে গেছে। অথবা, যে বৃদ্ধ-স্ত্ঠী-যুবক-যুবত §€ থেকে গেল এপারে আর বাকি যৌথ-পরিবার চলে গেল ওপারে, তাদের কথা। ক্রমশঃ নিঃসঙ্গ বৃদ্ধ দেখল, দেশের ক্ষমতা হস্তান্তরৠর পরে প্রিয় বন্ধুর মুখে অবিশ্বাসী হাসি। পুরনো দোকানি ফিরিয়ে দেয়, পুরনো হাফ্‌-নেতা এখন ফুল-নেতা হয়ে ঠকাচ্ছে তাকেই। যে যুবক তার মেয়েকে বিয়ে করবে কথা দিয়ে ওপারে গেছিল কয়েকদিন পরেই ফিরবে বলে, সে এখন পরিবার বেঁধে নিয়েছে ওপারেই। কত বছরের বাড়িওয়ালা, সুখ-দুঃখের এক গেলাসের বাড়িওয়ালা সমাজের ভয়ে চাপ দিচ্ছে তাকে চলে যেতে। সবই তো ধর্মের নামে, সবই তো টুকরো স্বাধীনতাঠঅজুহাতে। এও বোধহয় এক নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড- এও এক অমানুষ ভূখণ্ডের দলিল। আর, অধুনা পাগল লাহোরের এক যুবকের স্মৃতিতে তার প্রেমিকার সংলাপ। কিন্তু, সেই প্রেমিকা যে অমৃতসরের, অর্থাৎ সে হিন্দুস্তা নী হয়ে গেছে। লাহোরের যুবক এখন পাকিস্তানৠ। আরশিনগর, পড়শি... সেই কবেকার মুখ ভাসা ভাসা, ‘পৌষের জ্যোৎস্নাৠউড়ুক উড়ুক তারা...’।
“বিষাণ সিং-এর এক মেয়ে জন্মেছিল। এই à§§à§« বছরে একটু একটু করে বেড়ে, সে এখন ঝলমলে কিশোরী। কিন্তু, বিষাণ চিনতে পারেন না তাঁকে; বাবার সাথে দেখা করতে এসে কান্নাভেজঠ¾ মুখে ফিরে যায় সে।... একদিন ছোটবেলার বন্ধু ফজল দিন পাগলাগারদৠ‡ দেখা করতে এসে বলল,
‘তোমার পরিবার হিন্দুস্তা নে চলে গেছে নিরাপদে। তোমার মেয়ে রূপ কাউর ভালো আছে। শুনলাম তুমিও হিন্দুস্তা নে যাবে! ওক্ষানে পৌঁছে ভাই বলবেসর সিং, ভারাভা সিং আর দিদি অমৃতা কাউরকে আমার শুভেচ্ছা দিও। আর, বলবেসরকে বোলো যে খয়েরি মোষগুলোকে ছেড়ে গেছিল ও, তাদের একটার বাছুর হয়েছে। আরেকটার বক্‌না হয়েছিল, কিন্তু ছ’দিনের মাথায় মারা গেছে।’
-আচ্ছা, টোবা টেক সিং কোথায়?
-বিস্মিত হয়ে ফজল বলল, কোথায় আবার? যেখানে ছিল, সেখানেই রয়েছে!
-হিন্দুস্তঠনে নাকি পাকিস্তানৠ?
-হিন্দুস্তঠ... না না, পাকিস্তানৠ... না মানে,...
-‘উপর দি গুরগুর দি এনাক্স দি বে ধ্যানা দি মুঁগ দি ডাল আফ দি আফ দি পাকিস্তাঁ অ্যাঁয় হিন্দুস্তা ঁ আফ দি দূর ফাতেহ্‌ মুঁহ’, ফজলের সংশয়ে বিদ্ধ বিষাণ বিড়বিড় করে চলে”।


“We and the Germans met in the middle of no-man's-land. Their officers was also now out. Our officers exchanged greetings with them. One of the German officers said that he wished he had a camera to take a snapshot, but they were not allowed to carry cameras. Neither were our officers.” সে এক অবিশ্রান্ঠগোলাগুলির সময়। মুখোমুখি বিধ্বংসী জার্মান সেনা আর বহুযুদ্ধখৠযাত ইংরেজ সেনা। ১৯১৪ সাল। দু’পক্ষই ট্রেঞ্চ বানিয়ে রেখেছে ইংলিশ চ্যানেল থেকে স্যুইৎজারঠ্যান্ডের সীমানা বরাবর। দীর্ঘদিন ট্রেঞ্চে ওঁত পেতে বসে থাকা, রোদ-ঝড়-à¦¤à§à¦·à¦¾à °à¦ªà¦¾à¦¤ সহ্য করে শত্রুর গোলাগুলির জবাব দেওয়া। আর, তাদের মাঝে অনেকটা জায়গা ঊষর ক্ষেত্র। দু’দিকের ট্রেঞ্চের কাঁটাতার আর উদ্যত বন্দুকের মাঝে একলা জমি। ১৯১৪-র ২৪শে ডিসেম্বর বিকেল অবধি চলল যুদ্ধ। দু’পক্ষেই হতাহত বহু। তারপর হঠাৎ নীরবতা এবং ক্রিস্‌মাঠ¸ ইভ! প্রথমে জার্মান সেনার পক্ষ থেকে এল চকোলেট কেক আর শুভেচ্ছাবঠ¾à¦°à§à¦¤à¦¾à¥¤ তারপর ইংরেজ শিবির থেকে গেল তামাক। তারপর ক্রিস্‌মাঠ¸à§‡ জার্মান কম্যান্ডাঠপ্রস্তাব দিলেন একত্রে বিয়ার খাওয়ার। ইতিহাসের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ের সমস্ত রক্তপাতের দিনরাত্রির মাঝেও মাত্র ৪৮ঘণ্টার সৌহার্দ্য। সাক্ষী রইল নো-à¦®à§à¦¯à¦¾à¦¨à§â€Œà ¸-ল্যান্ড। সেখানেই যে সমস্ত উদ্‌যাপন; যুদ্ধে তিতিবিরক্ঠহয়ে যাওয়া বাধ্যসেনাঠা শত্রুদের সাথে চেঁচিয়ে গান গাইছে। “Mr. Richardson, a young officer who had just joined the Battalion and was now a platoon officer in my company wrote a poem during the night about the Briton and the Bosche meeting in no-man's-land on Christmas Day, which he read out to us.” যদিও, এই উদ্‌যাপন ভালো চোখে নেয়নি জার্মান কিংবা ব্রিটিশ à¦¸à§‡à¦¨à¦¾à¦¨à¦¾à§Ÿà¦•à§‡à °à¦¾; ফ্রান্সকে বাঁচাতে গিয়ে ইংরেজ সৈন্যদের এই যুদ্ধবিরতি নিন্দিত হয়েছিল গালগল্পে ফেঁপে উঠে। কিন্তু, ওই দু’দিনের যে সুখ, মৃত্যুভয় থেকে আগলে রাখা সামান্য জীবন- এ স্মৃতি শুধু নো ম্যানস্‌ ল্যান্ডেরॠকারণ, ২৭তারিখ ভোর থেকেই ফের বন্দুকবাজঠ, কামান দেগে গতকালের ‘বন্ধু’কে ¦‡ উড়িয়ে দেওয়া... ফলাফলও তো জানি সবাই।

â€œà¦ªà¦¾à¦—à¦²à¦¾à¦—à¦¾à¦°à ¦à§‡à¦‡ ছিল এক বদ্ধ উন্মাদ, যে আগে মুসলিম লিগের অতি সক্রিয় সদস্য ছিল। দিনে বার à§§à§«-১৬ স্নান করত। তার নাম ছিল মহম্মদ আলি। হঠাৎই একদিন স্নান করার বাতিক ছেড়ে উচ্চৈস্বরৠসে ঘোষণা করল যে, সেইই মহম্মদ আলি জিন্নাহ্‌, সে কায়েদ-ই-আজম ! সঙ্গে সঙ্গে এক শিখ-পাগল বলল যে, সে মাস্টার তারা সিং। তারপর, দু’জনেই ঝাঁপিয়ে পড়ল, রক্তারক্তঠ¿, অনেকের জড়িয়ে পড়া। শেষমেশ পাগলাগারদ কর্তৃপক্ষ তাদের আলাদা করে, ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে রাখল।” বিষাণ সিং কখনো থাকেনি এরকম পাগলামিতেॠ¤ সে শুধু ঠায় দাঁড়িয়ে থাকত, শুত না, দেয়ালে ঠেস দিত না। লক্ষ্য রাখত নিরাসক্ত ভঙ্গিমায়। কিন্তু, তার সহবন্দীরা খেলত এই ‘খেলা’, পরস্পর বিদ্বেষী স্লোগান। দু’দেশের রাষ্ট্রনেঠাদের সিদ্ধান্তৠপাগল-প্রত্ঠ¯à¦°à§à¦ªà¦£à§‡à¦° পরে তারা সবাই যে যার মাতৃভূমিতৠফিরে গেল। কিন্তু, যে বিষাণ সিং কখনো এই খেলায় নামেনি, তার মাতৃভূমির খোঁজ দিতে পারল না কেউ! “পাগল-à¦ªà§à¦°à¦¤à à¦¯à¦°à§à¦ªà¦£à§‡à¦° সময় তাকে জিজ্ঞাসা করা হল, তার দেশ কোথায়? সে জিজ্ঞাসা করল- ‘টোয়া টেক সিং কোথায়?’ ভারতরক্ষীঠ°à¦¾ বলল- ‘পাকিস্তাঠ¨à§‡â€™à¥¤ কিন্তু পাকিস্তানৠঢুকতে গেলে আটকাল পাকিস্তানঠসেনারা। বলল, তার মাতৃভূমি টোবা টেক সিং শিগ্‌গিরি ভারতে ঢুকবে; অতএব, পাকিস্তানৠসে ঢুকতে পারবে না! বিষাণ সিং শুধু বলল, “উপর দি গুরগুর দি এনাক্স দি বে ধ্যানা দি মুঁগ দি ডাল আফ টোবা টেক সিং অ্যাঁয় দি পাকিস্তানॠ” পাগলের প্রলাপ, পাত্তা দিল না à¦¦à§‡à¦¶à¦°à¦•à§à¦·à§€à¦°à ¾à¥¤ ক্ষতবিক্ষঠ¤ পায়ে নো মানস্‌ ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে রইল বিষাণ।


সত্তা হারিয়ে যায়। কখন হারাল? ওই যে যখন লোকটিকে ঘিরে ধরে খোলা তলোয়ার হাতে দলটা বলল, ‘হর হর মহাদেও!’ সেও প্রত্যুত্ত র দিল ইষ্টের নামে। বলল যে, সে প্রমাণ দিতে পারে সে হিন্দু, বলতে পারে চতুর্বেদেঠ° ব্যাপারে। কিন্তু, অবিশ্বাসী দলের কাছে যথেষ্ট নয় সেই হিন্দুত্ব-ঠ্রমাণ। অতএব, খোলা হল লোকটির পায়জামা। দেখা গেল তার লিঙ্গে কাটাদাগ। অসহায় সে বোঝাতে চাইল, এ তার প্রকৃত সত্তা নয়। মুসলিম মহল্লা দিয়ে আসার সময় জীবন বাঁচাতে তাকে এই ‘ভুল’ ছদ্মবেশ নিতে হয়েছে। শিকারীদল সেই ‘ভুল’ চিরকালের মত শুধরে দিল। আর, ধর্মচন্দেঠস্মৃতি-সত্ঠা বিসর্জন হল। তারপরে, ওই নন্দ’র মা। “খানিকটা নাম বেড়ায় আটকে গেল/ খানিকটা গোঁজা রইল খড়ের বাতায়/ খানিকটা নাম কাঁটাতারে তারে বেঁধা/ খানিকটা যায় ইমিগ্রেশন খাতায়...”। পরিযায়ী পাখির পালকের মতই খসে খসে পড়ছে একেকটা পরিচয়। আর, এভাবেই ক্রমশঃ সত্তা হারানোর সংস্কৃতি বিস্তারলাভ করে। নো ম্যানস্‌ ল্যান্ড আসলে এক নিষিদ্ধতার নাম। যেখানে কেউ যায়না কোনদিনই। সেখানে দিন-রাত আছে, ঝড়-বৃষ্টি আছে কিন্তু মানুষ নেই। হয়তো মাইন পোঁতা আছে, হয়তো কাঁটাতারেঠ° রক্ত আছে। গবেষক ফ্রাঙ্ক ব্রিয়ার্টন ের কথায়- অর্ধমৃত সেনারা শেল্‌-à¦®à¦°à§à¦Ÿà ¾à¦°à§‡à¦° খোলে ডুবে পড়ে থাকে নো ম্যান্‌স ল্যান্ডে। দু’পাশের কাঁটাতার বা ট্রেঞ্চের মাঝের ওই জায়গায় অসংখ্য মৃতের পচাগলা শবের মধ্যেই অর্ধমৃত সৈন্যরা পড়ে থাকে, কাতরায় অব্যক্ত যন্ত্রণায়। শব্দের উৎসসূত্র বলে, উত্তর লন্ডনের জল্লাদক্ষৠত্রকে বলা হত ‘Nomanneslond’। আর, একটা সময়, একটা আস্ত দেশই যখন সেই হননভূমি হয়ে ওঠে? দেশজুড়ে বানানো সেতুগুলো ভেঙ্গে পড়তে থাকে। দলবদ্ধ হননস্বরে সকলেই à¦¸à§à¦¯à§‹à¦—à¦®à§à¦¹à§‚à °à§à¦¤ খোঁজে বিপ্রতীপকৠ‡ নিকেশ করার। তখন আয়নায় প্রতিবিম্ব কেও চেনা যায়না তেমন। আর, সেইসময় অবিশ্বাস সবথেকে বড় ধর্ম, নাভিমূল থেকে উঠে আসা একমাত্র শব্দ- ঘৃণা। এক মানুষ অপর মানুষের ছায়া থেকে নিঃসাড়ে সরে যায়। কথোপকথন বন্দরহীন জাহাজের মতই অসহায়; বিচ্ছেদবাঠ•্য গেঁথে বসে যায় সমস্ত শূন্যস্থাঠে। এর থেকে বড় না-মানুষী জমি আর কী বা হতে পারে? এখানেই মধ্যরাতে খিড়কির দরজা দিয়ে আসে স্বাধীনতাॠপাল্টে যায় সাকিন। আর, বিষাণ সিং হয়ে যায় বদ্ধ পাগল টোবা টেক সিং। কারণ, তার টোবা টেক সিং-এর খোঁজ দিতে না পেরে, তাকেই হাসির পাত্র বানিয়ে দেয় বাকিরা। তাই তো করি আমরা, তাই না? যে প্রশ্নের উত্তর জানিনা, যে জটিলতার বিশ্লেষণ পারিনা তাকেই দুর্বোধ্য, প্রলাপ ইত্যাদি নাম দিয়ে দিই! কেউ তবু কোনো মানবতাহীন জমিতে যেতে চায়না। তাই হয়তো নামহীন হয়তো অলীক কল্পবাস্তঠের এক স্বরচিত ভূখণ্ডেই মানবতার উদ্‌যাপন চায়...
“প্রতিদিন হিন্দুস্তা ন-পাকিস্তাঠ¨, পাকিস্তান-ঠ¹à¦¿à¦¨à§à¦¦à§à¦¸à§à¦¤à¦¾à¦ ¨ গোলযোগ শুনে শুনে এক বেচারা পাগল আরো পাগল হয়ে গেল। একদিন পাগলাগারদ ঝাঁট দেবার সময় হঠাৎ চড়ে বসল একটা গাছের উঁচু ডালে। আর, ঝাড়া দু’ঘণ্টা একটানা বক্তৃতা দিল পাকিস্তান ও হিন্দুস্তা ন বাঁটোয়ারা হওয়ার সমস্যা বিষয়ে! যখন রক্ষীরা ছুটে এসে তাকে নামতে সাধ্যসাধনা করেও ব্যর্থ হল, তখন ভয় দেখাতে লাগল। কিন্তু সেই পাগল আরো উঁচু ডালে উঠে সিদ্ধান্ত জানাল, ‘আমি হিন্দুস্তা ন বা পাকিস্তান কোত্থাওই যাবনা। আমি এইখানে এই গাছে থাকব।’ অনেকক্ষণ পরে শান্ত হয়ে নেমে এসে ফুঁপিয়ে কাঁদল অনেকক্ষণ, সান্ত্বনা দিল হিন্দু ও শিখ বন্ধুদের। আসলে, সেই বন্ধুরা তাকে ছেড়ে হিন্দুস্তা নে যাবে, আগত বিচ্ছেদের আশঙ্কায় ভীত পাগলটি।”

অথচ, সত্তা জন্মায়। সত্তা হারানোর গল্প কিছু চেনা, জানা। কিন্তু, অন্ধকার ভয়ার্ত মানবতাহীন জমিতে আলো আসে। করিমদাদ আপাততঃ পাকিস্তানৠসিন্ধুতীরৠর এক গ্রামে থাকে। ’৪৭ এর দাঙ্গায় মৃত বাবাকে কবর দিয়ে এসেছে। তার স্ত্রী জিনা এখন সন্তানসম্ভ বা। অথচ, যুদ্ধের বাজনা ফের বেজে উঠল। হিন্দুস্তা ন-পাকিস্তাঠ¨ ঠাণ্ডাযুদ্ ধের আবহে হঠাৎই জানা গেল, নদীপথ বন্ধ করে দেবে ভারতরাষ্ট্ র। যাতে পাকিস্তানৠর এই অঞ্চলে জল না-পেয়ে, চাষবাস বন্ধ হয়ে মারা যায় বাসিন্দারা । আতঙ্কের আবহে মুহ্‌রম পালন হয়, তাজিয়া বের হয়, করিমদাদ-জিঠ¨à¦¾à¦° আসন্ন সন্তানসম্ভ াবনা। মিরানবক্স, চৌধুরিদের মত মোড়লেরা খিস্তি করতে থাকে হিন্দুস্তা নীদের, জল বন্ধ করে দেবার ষড়যন্ত্রকৠঅভিশাপ দেয়। জিনা ভয় পায় আরেকটি ‘কারবালা’ ঘটবে ভেবে। করিমদাদ কিন্তু প্রাণপণে সবাইকে বোঝাতে চায় যে, শত্রু আসলে যুদ্ধ! সে একদিন ঘোষণা করে তার পুত্রসন্তা ন হলে নাম দেবে, ইয়াজিদ! ইয়াজিদ? কিন্তু সে তো বিশ্বাসঘাত ক, হন্তারক যে কারবালার মরুপ্রান্ত রে নদীর জল আটকে হত্যা করেছিল হাসান-à¦¹à§‹à¦¸à§‡à ¨à§‡à¦° পরিবারকে। করিমদাদ স্মিত হেসে আশ্বস্ত করে, ‘এই ইয়াজিদ সেই ইয়াজিদ নয়। সেই ইয়াজিদ নদীপথ বন্ধ করেছিল আর, এই ইয়াজিদ বন্ধ নদীপথ খুলে দেবে’!

#
কোনদিন স্থিতি পাননি তিনি। হিন্দুস্তা নে থাকতে তাঁর লেখা অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত হয়েছে à§© বার। পাকিস্তানৠআরো à§© বার। ধর্ম নিয়ে মাতামাতি করেন নি, মেতে থাকেন নি পাকিস্তান-ঠ¹à¦¿à¦¨à§à¦¦à§à¦¸à§à¦¤à¦¾à¦ ¨ বাঁটোয়ারাৠ। বরং, ভারতের পশ্চিম সীমান্তের সেই বাঁটোয়ারা যে মধ্যবিত্ত-ঠিম্নবিত্তঠের জীবন নরকসম করে তুলেছিল, তাদের নিয়েই ভেবেছেন অনেক বেশি। ক্ষমতাপ্রঠয় নেতাদের সিদ্ধান্তৠএদেরই জীবন ছিটকে পড়ে ‘নো ম্যানস্‌ ল্যান্ডের†™ ঊষরভূমিতেॠ¤ আর, তিনিও ব্যক্তিগত সুরক্ষার খোঁজে লাহোরে চলে গিয়েছিলেন, আগেই পাঠিয়ে দিয়েছিলেন পরিবারকে। ক্ষমতা হস্তান্তরৠর, দেশভাগের আগের বোম্বেতে কিছু প্রিয় হিন্দু বন্ধুর অবিশ্বাসী চোখ তাড়িয়ে বেড়াত তাঁকে; পাকিস্তানৠধর্মীয় অনুশাসন ছুটিয়ে বেড়াত তাঁকে। পাঠকের উদ্দেশ্যে এক লেখায় লিখছেন,
“আপনারা আমাকে জানেন গল্পলেখক হিসেবে কিন্তু এদেশের আদালত আমাকে চেনে পর্ণোগ্রাঠ«à¦¾à¦° হিসেবে। রাষ্ট্র কখনো আমাকে বলে কম্যিউনিসৠà¦Ÿ, কখনো বা মহান লেখক। বেশিরভাগ সময়েই রুটি-রুজির নিশ্চয়তা থাকে না, কখনোসখনো কিছু লেখালেখির কাজ পাই। আমার সম্পর্কে বলা হয়েছে যে, আমি সমাজের জঞ্জাল এবং সমাজে বসবাসের অনুপযুক্তॠ¤ কখনো বা রাষ্ট্রের পরম আদরণীয়দের তালিকায় আমার নাম থাকে। সেই কোন অতীত থেকে আমি জানতে চেষ্টা করেই চলেছি যে, আমি কী? বিশ্বের বৃহত্তম ইসলাম-ধর্মৠ‡à¦° এই দেশে আমার জায়গা কোনখানে? আমার এখানে কাজ কী?
পাঠক, আপনারা হয়তো বলবেন এ আমার নিছকই কল্পনা, কিন্তু আমার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে জানি, আমার প্রিয় দেশ পাকিস্তানৠআমার জায়গা সঙ্কুলান। তাই আমি অস্থির, অশান্ত। তাই কখনো হয়তো আমাকে পাগলখানায় পাওয়া যায়, কখনো বা হাসপাতালেঠবিছানায়।”
যে সুরক্ষার, নিশ্চয়তার সন্ধানে পাকিস্তান চলে গেছিলেন কোনদিন তা পাননি। মৃত্যুর পরে তাঁর স্বরচিত এপিটাফ কবরে খোদাই করা যায়নি রাষ্ট্রের ভয়ে। তাঁর লেখায় বেশ্যা আর মাতালেরা হৈ হৈ করে জীবন উদ্‌যাপন করে। তাঁর লেখায় সম্পর্কের, চরিত্রের, মানবতার প্রতিটা খুঁত, বীভৎস গর্ত পাঠককে বিব্রত করে, রাষ্ট্রশাস নকে তো বটেই। তাঁর লেখায় ‘অন্ধকার ক্রমে আসিতেছে’। তাঁকে না-ফেলা যায় শাদা-চরিত্ঠে, না রাখা যায় কালো চরিত্রে। প্রান্তিকঠার শেষ সীমায় দাঁড়িয়ে, নামহীন নো ম্যানস্‌ ল্যান্ডে দাঁড়িয়ে অসহায় সাদাত হাসান মান্টো; সেই বিষাণ সিং-এর মতই।

“ভোরের ব্রাহ্মমুহ ূর্তে যখন ওয়াঘা সীমান্ত শান্ত, নিরুদ্বিগৠন তখন বিষাণ সিং-এর আর্ত চীৎকার চিরে দিল আকাশ। দু’দেশের সীমান্তের রক্ষীরা দৌড়ে এল। দেখল যে বিষাণ সিং à§§à§« বছরে একবারও শোয়নি, ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, সে এখন দু’হাত ছড়িয়ে মাটিতে শুয়ে। ওদিকে, কাঁটাতারেঠ° পিছনে হিন্দুস্তা ন। এদিকে, কাঁটাতারেঠ° পিছনে পাকিস্তানॠআর, মধ্যিখানে যে ভূখণ্ড নামহীন, সেখানে পড়ে রইল টোবা টেক সিং”।



ঋণস্বীকার- সাদাত হাসান মান্টোর বিভিন্ন গল্প।
নন্দ’র মা- জয় গোস্বামী।
কোমল গান্ধার চলচ্চিত্র- ঋত্বিক ঘটক।
জনৈক ইংরেজ সৈনিক ফ্রাঙ্ক রিচার্ডসেঠজবানবন্দী, "Christmas in the Trenches, 1914," EyeWitness to History, www.eyewitnesstohistory.com (2006)