না মানুষের জমি

রঞ্জন মৈত্র



কিসসু হ\'ল না । যা হলই না তা নিয়ে ভাবতে বসলে যা হতে পারে তার জন্য তো দশ মিনিটও সময় থাকে না হাতে । তবে তোমার পোস্টমরটেম শব্দটা খেয়াল করেছি স্মৃতিরেখা । যা কিনা মৃতের হয় । মড়ার । আমরা তো মড়া পার হয়েই এলাম । যেদিন সব ম\'রে গেল । খাওয়া দাওয়া শ্রদ্ধা ভক্তি হোশ মদহোশ ডাকখোঁজ । এ সবই তো ছিল । তারপর ফুরিয়ে গেল ঘড়ির কাঁটা । মাঝে একটা শূন্যস্থান । যেখানে জুতোর ফিতে বাঁধা হচ্ছে । ব্যাগের চেন টানা , নিজের কাঁধ ও মাথা বাজিয়ে দেখা । হচ্ছে । এর পর কিছু শব্দ । যা জানো । আসলে আওয়াজ । চলমান ধ্বনি । শব্দের কিছু হয় । যাকে হওয়া বলে । আওয়াজের কিছু হয় না , বিশ্বাস করো । যখন ভোরে একটা দিগন্ত হচ্ছে । এক দুই তিনটে রঙে সূর্য হচ্ছে । মাঠ একটু কেঁপে উঠল । আওয়াজ । যে কেবল দৃষ্টি এড়ায় । ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে ।

স্টেশনে পুরী আসতে পারে নি । মন ভারী হ\'ল । পথও ভারী হয়ে গেল । পাঁচালীর পথ । তার উপর রিকশা চলছে । একটা মোড় ঘুরতেই আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ল , পুরী । সেই পাখসাটে ফেনা তৈরি হয় , জলের ধনুক । উড়ে গেল পাঁচালী । কাটা ঘুড়ি , জোড়া পুস্তানি , উড়ে গেল । পাঞ্চালী আপনার নামটি চমৎকার । পাঞ্চাল দেশ মনে পড়ে । উৎস মনে পড়ায় । পাঁচাল , পশ্চিমবঙ্গেই । জেলা মনে পড়ছে না কিছুতেই । আদিগন্ত সেই মাঠের শুরুটি কোন জেলা ? খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলাম । তখন বীজতলা পুঁতছি , তখন সমুদ্র । নৌকো, টিলা, বি টি রোড । পুঁতছি । পাঁচালী উড়ে গেল । এখন পুরী হয়ে আসছে । একটা বাঁক , সড়ক , চোখ , নাক , গোড়ালি , সব । কি যে হ\'ল স্মৃতিরেখা ! কি হ\'ল ! আমার রেখার কোন স্মৃতি নেই । বিশ্বাসই একটা রেখাকে সরল করে । প্রান্তবিন্দু দু\'টির কোন মণি নেই । তাও , বিশ্বাসই ।

সাথসঙ্গত শব্দটিকে তুমি লালন করো । আমি টের পাই । ফোন , মেসেজ , ঊর্ধ্বগগনের মাদল পেরিয়ে টের পাই । শব্দটি কে প্রথম বলেছিল , কবে , জানি না । তোমার উচ্চারনের ধ্বনি কতদূর মাঠে , কত দূর পর্যন্ত মাঠে ! দূরে আমার হাত ছিল না । কেবল ধান গম সর্ষে মাসকলাই বুনতে বুনতে মনে হ\'ল এই মাঠ আমার । এই বৃষ্টি ও তার রিং টোন আমার । একটা দেশের জন্য রাত জাগা , একটা দেশোয়ালের জন্য কান্না , সব ভোলানো ভোর পড়ছে টুপ টুপ ক\'রে । পাখি , মৃদু বাতাস , কাঁটাতার আর শ্যামল গন্ধ বেয়ে পড়ছে । মানে কে প্রথম জানতে চেয়েছিল , বলেছিল কিসসু হয় নি , জানি না । শুধু মুখের ভাষায় , খড়ের চালে , ছাদের আলসেতে , কেউ ডানার সঙ্গী খুঁজছে । তারা সুসময় , তারা পাখি । আলাদা ভাষা , আলাদা জোড় - বিজোড় । তবু সুসময় । একা কেউ নিজের শরীরকে বসিয়ে রেখে ওড়াউড়ির মেলায় যোগ দিয়েছে মহাশূন্যে । কেউ নিজের ডানাগুলিকে শূন্যে মেলতে দেখার ছায়া দেখছে চায়ের কাপে , একা । যখন পায়ের নিচে বাড়ি । যখন সিঁড়ি , সদর দরজা চিনিয়ে দেয় প্রত্যেক দিন ।

একটা টুঙি বেছেছিলাম তোমার জন্য । জন্মদিনের উপহার । যতদূর চোখ যায় হাওয়াকে ঢেউ শেখাচ্ছে সবুজ । তার মাঝে একলা এক খয়েরি টুঙি । যতদূর চোখে পড়ে এক হাইওয়ে যার প্রান্ত স্রেফ একটা সরকারি হিসেব মাত্র । তার মাঝে এক টুঙি , একলা । সন্ত্রস্ত এক রেখার দুই মাথায় মশাল জ্বলছে । মাঝেও । রেখা চলেছে নিরাপদ আশ্রয়ে । দু\'পাশে অন্ধকার ধান , অন্ধকার জন্মদিন , এই উপহার , ধ্বনিময় আজব মিশ্রণ । ভানুরেখার জন্য কারা কারা পতাকা হাতে চলেছে । আমাকে খুঁজছি । তোমাকেও । পাকা ধানের গন্ধ খুঁজছে হাতি । ঢাবার গন্ধ খুঁজছে ট্রাকের ড্রাইভার । ঘুম খুঁজছে রাতের পাহারাদার । ফলন খুঁজছে আলছেঁড়া জমি । কে মানে চেয়েছিল , কে শরীর , কে হাব এবং ভাব ! আমি তো হাত ধরেছি , ডাক ধরেছি , শস্য , পতাকা । আর সিঁড়ি চলে যাচ্ছে টুঙির মাথায় । এই এক ফালি সামিট , যা পাখির, মৃত্যুর , আর বৃষ্টি , স্মৃতিহীন তোমারও ।