স্ট্রাইকার

অতনু বন্দ্যোপাধ্যায়

এক।।

‘আমি উচ্চারণ করলাম
তোমার জন্য শুধু তোমার জন্য’
... চে’ স্বপন রায়

বিছানায় এখনো কার্তুজের ছড়াছড়ি। তুমি সেই ভোর হতেই চলে গেছ বাকিটা মিটিয়ে নিতে।
বাড়িঘর সব টুকরো টুকরো পোষাক পড়ে নিয়েছে।
হঠাৎ জানালায় চোখ যেতেই প্রিয় রঙিণ মাঠটাকে দেখলাম।এখানেইতো আমাদের খেলতে
খেলতে চমকে ওঠার মুহূর্তগুলো।
দাদাকে যেদিন পুলিশ ধরে নিয়ে গেল সেদিনও আমরা মাঠেই ছিলাম।

আবার কার্তুজগুলোর দিকে চোখ চলে গেল।শূন্য মাঠটা যেন বল গড়িয়ে দিচ্ছে দাদা’র দিকে।
সব সবুজ হয়ে উঠবে।
আমাদের সন্তানরা দেখতে পাবে গোলপোস্টগুলো আর স্ট্রাইকারদের।

বারান্দায় বসে বসে এইসব উপভোগ করার দিন এসে গেল প্রায়।

পাশের ঘরে মা এখনো স্থির বসে আছেন।

খেলার মাঠের এই উন্মাদনা ওকে কিছুতেই আর স্পর্শ করে না। যেমন করলো না দেশের অসংখ্য মেয়েদের।মায়েদের।


রাস্তায় গড়িয়ে যাওয়া বলের পাশাপাশি মনে পড়ছে সেদিনের চিৎকার


আমার দাদা আপ্রাণ বলতে চাইছে

দেখিস একদিন তুই খুব বড় স্ট্রাইকার হবি। গোটা দেশ তাকিয়ে থাকবে তোর একটা গোলের জন্য। বিনিময়ে......
                জঙ্গল
                         আর
                স্বাধীনতা

যাদের আমরা দুইভাই লুকিয়ে লুকিয়ে লিখে রাখতাম গোলপোস্টের এধারে ওধারে।


দুই।।

‘তুমি যেন ধরেই নিয়েছ অন্ধকার জ্বলে উঠলে
এরকম হয়’
... চে’ স্বপন রায়


এবার রাস্তায় খেলতে নামছি।তারই খবর ছড়িয়ে যাচ্ছে স্টেডিয়ামে স্টেডিয়ামে। সারা সেশের মানুষ তাকিয়ে আছে প্রিয় খেলার দিকে। দুদিকের গোলপোস্টের দিকে।

মাঠের মাঝখানে এই দাঁড়িয়ে থাকাকেই তুমি নিশানা ডাকতে শিখিয়েছিলে।আর মায়ের চোখ থেকে তখন ক্রমাগত ভেসে যাচ্ছে কান্না।

জার্সিতে এখনো চুরুটের গন্ধ লেগে আছে।পায়ের শুকনো কাদারা মনে করাচ্ছে সকলের শুভেচ্ছা বিনিময়।

দাদার কথা ওরা কেউ জানতো না। এমনকি প্রতিপক্ষও না।

একটা পায়রা উড়ে আসছে তোমার চিঠি নিয়ে। সন্তানের রং নিয়ে। সমস্ত স্টেডিয়াম যেন প্রথম সূর্যের আকাশ লিখছে।আর এই পাখিটা। গড়ানো বলটা এবার দাদাই বাড়িয়ে দেবে আমাদের সীমানা ছিঁড়ে ফেলে...

স্বপ্নের ওইপারে বাঁশি বেজে উঠলেও পারের কাছাকাছি এইযে রিভলভার।এইযে আমাকে গোলটা করতেই হবে
আর চুমু খেতে হবে গোলপোস্ট গুলোকে... তাদের বাড়ানো হাতেই ফুটে উঠুক পতাকার অটোগ্রাফটুক।চোখের বিশ্বাস নিয়ে।

দাদা বলেছিল,

স্ট্রাইকারদের ওরা ক্রমাগত চিহ্নিত করে।তারপর সুযোগ পেলেই জার্সি কেড়ে নেয় নিজেদের ইচ্ছে মত।

আজ তোকে যে জার্সিটা দিয়ে গেলাম

সেটাতে যেন চাপ চাপ রক্ত লেগে থাকে।আর তুই ঘুমিয়ে পড়লে সেখান থেকেই মাঠে নামুক আমাদের পরবর্তী স্ট্রাইকাররা। পিঠে বল আর হাতে রিভলবার নিয়ে।
                                              অন্ধকারের এইরকম জ্বলে ওঠা নিয়ে।