দাঁড়াব কোনখানে রোহিঙ্গা সমস্যা ও কিছু অপ্রাসঙ্গিক প্রসঙ্গ- দূরবীন দিয়ে দেখা

সৌরাংশু



রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আসুন একবার দেখে নিই রিফিউজি বা উদ্বাস্তু কাদের বলে? শরনার্থী বা উদ্বাস্তু কি একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ? নাকি উদ্বাস্তু বলে স্বীকৃত না হলে শরণার্থীর স্বীকৃতি পাওয়া যায় না?


আসুন ধীরে ধীরে দেখে নিই এই প্রশ্নগুলির উত্তর এবং সর্বশেষে এর পরিপ্রেক্ষিতে বাঙালি হিসাবে পরিচিত নিজভূমে পরবাসী রোহিঙ্গাদের সমস্যাটাও দেখে নিই। নাহ এই ক্ষেত্রে এতটা ভাবলেশহীনভাবে “সমস্যা” কথাটাকে জোরের সঙ্গে বলে তাল ঠুকতে পারলাম না। ভেবে দেখুন, বঙ্গোপসাগর আর ভারত মহাসাগরে হাজার হাজার মানুষকে নিয়ে নৌকা দিনের পর দিন ভেসে বেড়াচ্ছে, অথচ তীরে ঠেকতে পারছে না। চোখের সামনে ছবিটাকে রেখে দিন, কি ভাবে তারা দিনের পর দিন উপযুক্ত খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও পানীয় জলের অভাবে মনুষ্যেতর জীবন যাপন করছে। আমরা খালি কল্পনাই করতে পারি কিন্তু ভেবে কূল পাব না। তবু কল্পনায় ভর করে শুধুমাত্র সমস্যাটাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব যদি করাতে পারি তাহলেই এই লেখাটা সামান্য হলেও লক্ষ্যভেদ করেছে বলে মনে করব।

জনআন্দোলন, রাষ্ট্রীয় চিন্তাধারায় বিপ্লব এবং সর্বোপরি রাষ্ট্রসংঘের অন্দরমহলে পৌঁছোবার আশা করি না। তবুও কেউ যদি কোথাও বাংলা ভাষায় এই কথা কটা পড়ে নিজের মতো করে সমস্যাটাকে সঠিক মঞ্চে তুলে ধরতে পারেন, এই আশাতেই পাল তুললাম।

“পঞ্ছি নদীয়া পবন কে ঝোঁকে
কোই সরহদ না ইসে রোকে...” (জাভেদ আখতার “রিফিউজি” চলচ্চিত্র)

সরহদ বা সীমা তো মানুষের জন্য বেঁধে দেওয়া আছে, ভারতীয় হিসাবে আপনি ভারতে, পাকিস্তানী হিসাবে উনি পাকিস্তানে, মালদ্বীপবাসী হিসাবে তিনি মালদ্বীপে থাকেন। কিন্তু উদ্বাস্তু কারা? শরণার্থীই বা কে?

১৯৫১ সালে গৃহীত উদ্বাস্তু প্রসঙ্গে রাষ্ট্রসংঘের কনভেনশন বলছে, “জাতি, ধর্ম, ভাষা, বিশেষ কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদস্য হবার হেতু নির্যাতিত হবার ভয়ে যে জনগোষ্ঠী বা জনসাধারণ নিজ দেশ থেকে উৎপাটিত হয়েছে অথবা একই ভয়ে যদি সেই দেশের সীমানায় ফিরে যেতে অপারগ হয় তাহলে তাদের উদ্বাস্তু বলা হবে।” ১৯৬৭তে এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিজদেশে যুদ্ধ বা হিংসা এড়াতে যারা দেশত্যাগ করেছে তারাও।

সংজ্ঞা নিয়ে বেশী ঘাঁটাঘাঁটি করে লাভ নেই শুধু জেনে রাখা ভাল যে, ২০১৪-র রাষ্ট্রসংঘের রিপোর্ট অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কোটি ৫৪ লক্ষ আন্তর্জাতিক উদ্বাস্তু এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুর সংখ্যা ৩ কোটি ৮২ লক্ষ।

ভেবে দেখুন, যে পরিবেশে আপনি বড় হবেন, আপন করে নেবেন, সভ্যতার ফসল ফলাবেন সে পরিবেশটা আপনার নয়। আপনি সে পরিবেশেরও কেউ নন। এইরকম হানাহানি, হিংসা বা বিদ্বেষের কারণে আজকে প্রায় সাড়ে পাচকটি মানুষ ঘর ছাড়া।

আসলে দেশ বলে তো কিছু ছিল না। যাযাবরদের দেশ থাকে না, প্রবাসীদের দেশ থাকে না, অভিবাসীদের দেশ থাকে না। শুধুমাত্র উদ্বাস্তুরা সম্পূর্ণ নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজস্থান থেকে উৎপাটিত হয়। আমরা যত শিল্প ও বিজ্ঞানে এগিয়ে চলেছি, দাঁড়াবার জায়গা ততই কমে যাচ্ছে এবং বিভেদ, উৎপাটন ততই বাড়ছে। নিজ বাসভূমি থেকে তো উৎপাটিত হয়েছেন। কিন্তু যাবেন কোথায়?

এসব তো বহুদিন আগেই হয়েছিল। তখন মানুষ মানুষের জন্য হয়তো ভাবত না। সমস্ত কিছুই ঐশ্বরিক নাক গলানোর নামে চালিয়ে দিয়ে নিরীহ বিজিতের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে হত্যা করে ধ্বংস করে নিজ গোষ্ঠীর ধ্বজা তুলে রাখত। প্রত্যেক সভ্যতাই স্থাপিত হয়েছে এরকম নিরীহ নাম না জানা উৎপাটিত, বিতাড়িত, নির্যাতিত বীজিতদের হাড় মজ্জার ভিতের উপর। ঘোষিত ইতিহাস বা প্রাগৈতিহাসিক যুগে ভিটে মাটির ভাবনা ছেড়ে শুধুমাত্র জীবনযাপনের তাড়নায় হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষ খড়কুটো সম্বল করে ভেসে চলেছে।

ইজরায়েল গঠনের বাইবেলের গল্পটা মনে করে দেখুন! নিজ ভূমি থেকে উৎপাটিত ইহুদীরা ক্রীতদাস হিসাবে মিশরের নগর সভ্যতার ভিত গঠন করে চলেছে বহু যুগ ধরে। মোজেসের হাত ধরে তারা ভয়াল নীলনদের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে এসে হাজির হল পুণ্যভূমিতে। নাম দিল ইজরায়েল। অথচ এই ইজরায়েলই আজ অন্য একটি জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করতে কুণ্ঠা বোধ করে নি। যুগ যুগ ধরে আরব ও ইজরায়েলের প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে বলি হয়ে চলেছে প্যালেস্টিনীয়রা।

এবারে আসি বর্তমান বিশ্বের আধুনিকতার এবং রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম বৃহত্তর সমস্যার কথায়- ‘শরনার্থী সমস্যা’।

আপনাকে তো আপনার ভিটে থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হল, এবার দাঁড়াবেন কোন খানে?

“... নদী পেরিয়ে, সাগর পেরিয়ে আমি তোমার কাছে যেতে পারি,
কিন্তু তোমাকে পেরিয়ে আমি কোথায় দাঁড়াব মানুষ!
তুমি যদি বল, না-
তুমি যদি নিষেধের কাঁটা
বিঁধে রাখ আমার যাত্রা পথের মাটিতে, পাথরে!” (রঞ্জিত গুপ্ত “পাথর প্রতিমা”)

কবে কোন অন্য দেশ অন্য কোনখানে তার ঝাঁপি খুলে দেবে, তার বুকের আগল খুলে দেবে। কাঁটা তারের বেড়ার মাঝে তার ক্যাম্প খুলে দেবে আর জন্মজন্মান্তরের শিকড় উপড়ে ফেলে বিভূঁইতে গিয়ে নতুন করে ইঁট পাতা শুরু করতে হবে। ভিত নড়ে গেলে আট কুঠুরি নয় দরজার মহলা কি পোক্ত হয় বলুন?

মনে করে দেখুন সেই ছবিগুলো... ভারত আর পাকিস্তান সবে স্বাধীন দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। দু দিক দিয়ে শরণার্থীদের মিছিল। সর্বস্ব খুইয়ে এক কাপড়ে চলে আসছে আলপথ ধরে। সব গেছে- সম্পর্ক, দুধেলা গাই, রুই কাতলার পুকুর, পূর্বপুরুষের ভিটে মাটি, সম্মান, আত্মসম্মান এমন কি কাছের লোকগুলোও কোথায় কে চলে গেছে তার ঠিক নেই। দো মহলা তিনমহলা ছেড়ে এসে ঠাঁই হল রিফিউজি ক্যাম্পে। যেখানে মানুষ কেন? গৃহপালিত পশুরাই নিজের সন্তান লালন পালন করতে ভয় পাবে, সেই রিফিউজি ক্যাম্প! দেশ থেকে রিফিউজড, স্বাধীন সত্তা থেকে রিফিউজড কতগুলো শুধু মানুষের মতো দেখতে বলেই মানুষ, হাত পা আর মাথা নিয়ে বেঁচে রয়েছে পরিত্যক্ত পৃথিবীতে।

অবশ্য ভারত ও পাকিস্তানকে তিন টুকরো করে স্বাধীন করার সময় যে দুটি প্রধান জনগোষ্ঠীকে সীমারেখার দ্বারা বিচ্ছিন্ন করা হয়েছিল তাদের ভবিতব্য তো এক ছিল না। পশ্চিমপ্রান্তের সব খুইয়ে আসাদের সঙ্গে পূর্বপ্রান্তের সর্বহারাদের বোধহয় মিল বিশেষ ছিল না। তার আর্থসামাজিক নিরীক্ষণ না হয় অন্যত্র করব।

স্বাধীনতা দু দুবার বাঙালিকে ভিটেছাড়া করেছে। আর তারপরেও জীবনের সুরক্ষা পায় নি। চল্লিশ আর পঞ্চাশের দশকগুলোতে রিফিউজি ক্যাম্পের দুর্দশাগুলো এপার বাঙলার একটু বয়স্ক ব্যক্তিদের মন থেকে মুছে যায় নি হয় তো। আর তারপর যখন ভাষার জন্য দেশ পেল বাঙালি, তখনও ভাতের জন্য তাকে সে দেশও ছাড়তে হল। আর ছেড়ে কি জুটল? একটা মরিচঝাঁপি, একটা বরাক উপত্যকার রক্তপাত! নিজের দেশও থাকতে দেয় না আর দু মুঠো খুদকুঁড়োর আশায় পড়শি দেশে এলে জোটে বেয়োনেট আর বারুদের হাহাকার।

কিন্তু এসব পেরিয়ে আরও একদল বাঙালি শুধুমাত্র ধর্ম এবং ভাষার কারণে নিজ দেশেই স্বীকৃতি হারাচ্ছে আর ক্রমশ অন্ধকারে মিশে যাচ্ছে, তাদের খবর কি রাখি আমরা?



ঢাকা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সোনার বাংলাদেশে ২০১২তে প্রকাশিত এক প্রবন্ধ রোহিঙ্গাদের ইতিহাসের কথা তুলে ধরেছেঃ
“বর্তমান মিয়ানমারের রোহিং (আরাকানের পুরনো নাম) এলাকায় এ জনগোষ্ঠীর বসবাস। ইতিহাস ও ভূগোল বলছে, রাখাইন প্রদেশের উত্তর অংশে বাঙালি, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করেছে। তাদের কথ্য ভাষায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে। রাখাইনে দুটি সম্প্রদায়ের বসবাস ‘মগ’ ও ‘রোহিঙ্গা’। মগরা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। মগের মুল্লুক কথাটি বাংলাদেশে পরিচিত। দস্যুবৃত্তির কারণেই এমন নাম হয়েছে ‘মগ’দের। এক সময় তাদের দৌরাত্ম্য ঢাকা পর্যন্ত পৌঁছেছিল। মোগলরা তাদের তাড়া করে জঙ্গলে ফেরত পাঠায়।
রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে একটি প্রচলিত গল্প রয়েছে এভাবে সপ্তম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া একটি জাহাজ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকজন উপকূলে আশ্রয় নিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমে বেঁচে গেছি। এই রহম থেকেই এসেছে রোহিঙ্গা।
তবে,ওখানকার রাজসভার বাংলা সাহিত্যের লেখকরা ঐ রাজ্যকে রোসাং বা রোসাঙ্গ রাজ্য হিসাবে উল্লেখ করেছেন।
তবে ইতিহাস এটা জানায় যে, ১৪৩০ থেকে ১৭৮৪ সাল পর্যন্ত ২২ হাজার বর্গমাইল আয়তনের রোহিঙ্গা স্বাধীন রাজ্য ছিল। মিয়ানমারের রাজা বোদাওফায়া এ রাজ্য দখল করার পর বৌদ্ধ আধিপত্য শুরু হয়।
এক সময়ে ব্রিটিশদের দখলে আসে এ ভূখণ্ড। তখন বড় ধরনের ভুল করে তারা এবং এটা ইচ্ছাকৃত কিনা, সে প্রশ্ন জ্বলন্ত। তারা মিয়ানমারের ১৩৯টি জাতিগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করে। কিন্তু তার মধ্যে রোহিঙ্গাদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এ ধরনের বহু ভূল করে গেছে ব্রিটিশ শাসকরা।
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি মিয়ানমার স্বাধীনতা অর্জন করে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু হয়। সে সময়ে পার্লামেন্টে রোহিঙ্গাদের প্রতিনিধিত্ব ছিল। এ জনগোষ্ঠীর কয়েকজন পদস্থ সরকারি দায়িত্বও পালন করেন। কিন্তু ১৯৬২ (আসলে ১৯৮২) সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে মিয়ানমারের যাত্রাপথ ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। রোহিঙ্গাদের জন্য শুরু হয় দুর্ভোগের নতুন অধ্যায়। সামরিক জান্তা তাদের বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে। তাদের নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। ধর্মীয়ভাবেও অত্যাচার করা হতে থাকে। হত্যা-ধর্ষণ হয়ে পড়ে নিয়মিত ঘটনা। সম্পত্তি জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়। বাধ্যতামূলক শ্রমে নিয়োজিত করা হতে থাকে। তাদের শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা সুযোগ নেই। বিয়ে করার অনুমতি নেই। সন্তান হলে নিবন্ধন নেই। জাতিগত পরিচয় প্রকাশ করতে দেওয়া হয় না। সংখ্যা যাতে না বাড়ে, সে জন্য আরোপিত হয় একের পর এক বিধিনিষেধ।
মিয়ানমারের মূল ভূখণ্ডের অনেকের কাছেই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী 'কালা' নামে পরিচিত। বাঙালিদেরও তারা 'কালা' বলে। এ পরিচয়ে প্রকাশ পায় সীমাহীন ঘৃণা।”

এবার প্রশ্ন উঠতে পারে, যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কি বাঙালি হিসাবে গণ্য করা হতে পারে? যদিও বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রাসঙ্গিক তবুও মায়ানমারের এই মুসলিম জনগোষ্ঠী, যাদের সঙ্গে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের ভাষার কিছুটা মিল আছে, তাদের মায়ানমার সরকার এভাবে দেশচ্যুত করে বাঙালি পরিচয় দিয়ে বাংলাদেশের সম্পত্তি বলে হাত মুছে ফেলছে কেন?

মায়ানমারের ইতিহাসকাররা বলতে শুরু করেছেন, এই রোহিঙ্গারা আদতে বাঙালি, বৃটিশদের সঙ্গে এরা মায়ানমারে (তদানীন্তন বার্মা) আসে এবং তারপর থেকে বংশবিস্তারের মাধ্যমে জাঁকিয়ে বসে রাখাইন প্রদেশের সামগ্রিক জাতিগত চিত্রটিই পালটে গিয়ে আদি বাসিন্দাদের সমস্ত ক্ষমতা দখল করে নেয়। আদতে নাকি বার্মা সার্বিকভাবেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশ। মুসলিম ধর্মে দীক্ষিত এই রোহিঙ্গারা আসলে এসেছে তদানীন্তন বৃটিশ ভারতের রাজ্য বাংলা থেকে তাই আদি বর্মাদেশীয় বলে রোহিঙ্গাদের গণ্য করা হবে না।

ভারতের পূর্ব প্রান্তের এই দেশটি একসময় অখণ্ড ভারত রাষ্ট্রেরই অঙ্গ হিসাবে ধরা হত। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতীয়দের কাছে যাহা অহমীয়া তাহাই বর্মিয় বলে গণ্য করা হত। বৃটিশ আরাকানে এমনকি রেঙ্গুনে (অধুনা ইয়াঙ্গন) লক্ষ লক্ষ বাঙালি নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করত। কেন জানি না, বুদ্ধি বা শিক্ষা বলুন বা সাদা বাংলায় তৈলমর্দনে বাঙালি জাতি বরাবরই অগ্রগণ্য তাই বোধহয় বৃটিশ রাজত্বে নিজেদের প্রাধান্য বিস্তার করতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় নি। বৃটিশ সূর্য উদিত হয়েইছিল এই বাংলারই প্রান্তরে। তাই দ্রুত ছড়িয়ে পড়া। উত্তর পূর্বাঞ্চলে বিশেষত আসাম ও ত্রিপুরায় একছত্র সরকারি ক্ষমতা ভোগ করার পিছনেই এই এগিয়ে থাকার বিষয়টি কাজ করছে বলেই বোধ হয়।

যে কোন ভাবেই হোক বাঙালি নিজস্ব তেজবলে স্বতন্ত্রতা বজায় রাখতে সামর্থ হয়েছিল। কিন্তু আজকের ভারতে প্রান্তীয় শক্তির উত্থানে উত্তর পূর্বে বাঙালির পেটে ও মুকুটে টান পড়েছে। বিদ্বেষ জায়গা নিয়েছে ভাতৃত্ব বোধের। যদিও সঠিক অর্থে বাঙালি বলে চিহ্নিত করা যাবে না তবু মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের অবস্থানও এর থেকে আলাদা নয়।

পশ্চিম প্রান্ত প্রদেশগুলিতে অবস্থানরত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা বিদ্বেষভাবে এক ইঞ্চি জমিও ছাড়তে রাজি নয়। আর মায়ানমার সরকারও ভোটের রাজনীতির জন্য এই অবস্থানে সরকারি ব্যবস্থাকে হাতিয়ার করেছে। এমন কি মায়ানমারের মানবাধিকারের মূর্ত প্রতীক এবং বিরোধী নেত্রী নোবেল বিজয়ী আন সাং সু কির দলও বিরূপ অবস্থান ধারণ করেছে। ফল স্বরূপ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার।

১৯৭৭এই নব গঠিত বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য শরণার্থী শিবির গঠিত হয়। কারণ ১৯৭১এর বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সময়ই প্রায় ১ কোটি বঙ্গভাষী প্রতিবেশী দেশগুলিতে আশ্রয় নেয় সুরক্ষার খাতিরে। এদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল হিন্দু। বেশ কিছু উৎপাটিত বাঙালি হিন্দু মায়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে আশ্রয় নেয় আরাকান প্রদেশে। ইতিমধ্যেই বৃটিশ মদতপুষ্ট রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে গোষ্ঠী সংঘর্ষ সেই ১৯৪২ থেকেই শুরু হয়েছে। এবং ধীরে ধীরে উভয় জনগোষ্ঠী একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং বিদ্বেষপূর্ণ অবস্থান করছিল। তিরিশ বছর পরে নতুন করে বাঙালিদের আরাকানে আগমনে যা তুমুল আকার ধারণ করে। স্থানীয় বৌদ্ধরা প্রতিবাদ প্রতিরোধ করতে শুরু করে। জাতি দাঙ্গা নতুন ভাবে শুরু হয়। ফল স্বরূপ মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশে শরণার্থী শিবির আর ফল স্বরূপ ১৯৮২ সালে আইন করে জুনটার রোহিঙ্গাদের দেশচ্যুত করা।

বাংলাদেশের দুটি রিফিউজি ক্যাম্পে প্রায় দু লক্ষ রোহিঙ্গার স্থান হয়। মায়ানমার সরকারের বক্তব্য, এরা সকলেই বাঙালি। তাই বাংলাদেশেই এরা ফিরে যাক। কিন্তু কোটি যেখানে সঠিক সংখ্যা সেখানে লক্ষে তো লক্ষ্য পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। তাই রোহিঙ্গা আন্দোলন শুরু হয় ১৯৯০তে। রোহিঙ্গা ইতিহাসকার, সমাজবিদরা রোহিঙ্গাদের ইতিহাসকে বাঙালিদের থেকে আলাদা করে প্রচার করে আন্তর্জাতিকভাবে রোহিঙ্গাদের দেশচ্যুত করার ঘটনায় সমর্থন আদায়ের প্রচেষ্টা শুরু করেন।

প্রায় অর্ধশতাব্দী জুড়ে ক্ষমতায় থাকা বর্মীয় সেনাবাহিনী বা ‘জুনটা’ সরকার তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে। তাদের ক্ষমতার বাহক হল স্থানীয় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী এবং তাদের জাতীয়তাবাদের চেতনা। তাকে অদেখা করে তো প্রান্তিক জনগণকে সাহায্য করা সম্ভব নয়! একে ততদিনে গণতন্ত্রকামী শক্তিরা প্রবলভাবে বিশ্বের বাজারে নিজেদের জাহির করতে শুরু করে দিয়েছেন। তাই রোহিঙ্গাদের বাঙালি হিসাবে চিহ্নিত করে তাদের সামাজিকভাবে একঘরে করে এবং ক্রমশ বাতিল করে দেবার তলেতলে সিদ্ধান্ত।

বিভিন্ন পশ্চিমি সূত্র ঘাঁটলে যেটা দেখা যাচ্ছে যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা অঘোষিত সরকারি মদত পেয়েই আসছে। আর তার ফলেই এই জাতিদাঙ্গা ধীরে ধীরে কদর্য রূপ ধারণ করেছে। ২০১২ থেকে যা রাজ্য জুড়ে বিপুল দাঙ্গায় পরিণত হয়েছে। যে দাঙ্গার হিংসার পরিমাপ করতে গেলে সীমা পরিসীমা পাওয়া যাবে না।

২০১২র আদমশুমারিতে সরকারিভাবে রোহিঙ্গাদের মায়ানমার সরকার বাংলাদেশী শরণার্থী বলে স্বীকার করতেও অস্বীকার করে। রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৮ লক্ষ রোহিঙ্গা দেশছাড়া এবং প্রায় ২লক্ষ রোহিঙ্গা মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু ক্যাম্পে রয়েছে। এই রিপোর্টই বলছে রোহিঙ্গারা সর্বাধিক অনাহুত জনগোষ্ঠী এবং সর্বাধিক নিপীড়িতও। উদ্বাস্তু ক্যাম্পগুলিতে যে পরিমাণ নিপীড়ন হয়, তা নাৎসিদের ইহুদী নিপীড়নের সমকক্ষ। এই উদ্বাস্তু ক্যাম্পের বাসিন্দাদের নূন্যতম নাগরিক স্বাচ্ছন্দ তো দূরের কথা তাদের বেঁচে থাকার রসদও অনিয়মিত। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিকিৎসাগত সমস্যা এবং আরোপিত বেশ্যাবৃত্তির সমস্যা। পশ্চিমি মানবাধিকার সংগঠনগুলি এই নিয়ে তুলকালাম করেও বিশেষ কিছু সুবিধা করে উঠতে পারে নি।

এই সমস্ত কিছুর ফলশ্রুতি হল, লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের নৌকো করে বঙ্গোপসাগর আন্দামান সাগর এবং একটু এগিয়ে ভারত মহাসাগরের বুকে নিজেদের সঁপে দেওয়া। জীবন কোন পর্যায়ে দুঃসহ হলে এই প্রবল অনিশ্চয়তার মধ্যে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে! এরপর শুরু হল আশেপাশের দেশগুলো মানবতাহীন প্রতিক্রিয়া। মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া ও থাইল্যান্ড মায়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আইনি বেড়াজাল দেখিয়ে এই সব ভাগ্যহন্তাদের আবার সমুদ্রের মধ্যে ঠেলে দিল। বাংলাদেশ ইতিমধ্যেই সর্বাধিক সংখ্যক উদ্বাস্তুকে শরণ দিয়েছে বলে অপারগতা জানাল। মায়ানমার সরকার যেই দেখল মাটির বোঝা হাল্কা হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে হাত ধুয়ে ফেলল।

এর মধ্যেই মৃদুমন্দ আন্তর্জাতিক চায় থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া কিছু কিছু লোক দেখানো শরণার্থী শিবির খুলেছে বটে। কিন্তু সেই শিবিরগুলিতে মানবতার ছোঁয়া নেই বললেই চলে। বরং মালয়েশিয়ার মানবাধিকার সংগঠনগুলি ইতিমধ্যেই আওয়াজ তুলেছে যে শিবিরগুলি সব নারী পাচারকারী চক্রের স্বর্গরাজ্য। মালয়েশিয়া সরকার আশ্বাস দিয়েছে যে তদন্ত হবে কিন্তু ওই পর্যন্তই। আশিয়ানের মঞ্চ থেকে বরং অনেক গঠনমূলকভাবে এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা হচ্ছে। অথচ মজার বিষয় হল আশিয়ান দেশগুলিই কিন্তু এককভাবে এই সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে। তারা বরং রাষ্ট্রসংঘের মানবাধিকার সংস্থার সঙ্গে মিলে রাখাইন প্রদেশের মধ্যেই এই সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব রেখেছে। কিন্তু এখানেও জুনটা সরকার প্যাঁচ খেলে রেখে দিয়েছে। যারা দেশের নাগরিকই নয় তাদেরকে একমাত্র শরণার্থী হিসাবে দেখা যেতে পারে। আর কে না জানে শরণার্থী এবং নাগরিকের অধিকারের মধ্যে সোমালিয়া- আমেরিকার পার্থক্য।

কিন্তু যারা এত তত্ত্বের কচকচানি সহ্য না করতে পেরে সমুদ্রের মধ্যে নৌকো নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে তাদের কি হবে? তারা থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ইন্দোনেশিয়া প্রভূত দেশগুলি থেকে তাড়া খেয়ে আবার মাঝ সমুদ্রেরই অংশীদার হয়েছে। ঝড় বৃষ্টি সাইক্লোনে তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা ক্রমে ক্রমে কমতে শুরু করেছে। এর মধ্যেই আশার আলো হিসাবে ফিলিপিন্স তাদের শরণ দেবার কথা ঘোষণা করেছে। কিন্তু ফিলিপিন্স পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই যে সলিল সমাধি হবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

বিশ্বাস করুন, অবলীলাক্রমে লিখে চলেছি, মাঝে সাঝে গুগল সার্চ করে ছবিটবি খুঁজে দেখে “আহা উহু” করছি বটে। কিন্তু আমাদের আরামকেদারার সামাজিক মনন বুঝতেই পারবে না দিনের পর দিন কিভাবে লোকগুলো বেঁচে আছে। নাকি আদৌখালি হাতপা মাথা চোখ মুখ নাক নিয়ে শ্বাসই নিচ্ছে। বেঁচে থাকার থেকে অনেক কঠিন অবস্থায় শুধুমাত্র অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। মানুষের বেঁচে থাকার সামান্য সংজ্ঞাগুলোও ওই নৌমানবদের (Boat People) কাছে গুরুত্ব হারিয়েছে। ঘোর বর্ষায় সহায় সম্বলহীন মানুষগুলো ভলিবলের মতো একবার এদিক একবার ওদিক করে চলেছে। মায়ানমারের থেকে বিতাড়িত হয়ে কিছু দল থাইল্যাণ্ডের উপকূলে এসে পৌঁছল, সেখান থেকে উপকূলরক্ষী বাহিনীর তাড়া খেয়ে গেল মালয় বা ইন্দোনেশিয়া সেখানেও ঘর বাঁধা সম্ভব হল না। বিদ্যুৎপৃষ্ঠের মত ফিরে এল মাঝ সমুদ্রে।

মানবিকতার ছিটে ফোঁটা নেই, সন্তান মহিলা বয়স্ক কারুর জন্য সামান্য দয়া মায়া নেই। নৌমানবদের প্রতিটি দেশই যেন একত্রে একটা আবর্জনার পুঁটলির মতো দেখছে। মানব নিঃসৃত মানব সৃষ্ট আবর্জনার পুঁটলি। খাবার নেই, জল নেই, জৈবিক কাজের জন্য সামান্য আড়াল নেই, নিত্য বেঁচে থাকার লড়াই আর আসমুদ্র অনিশ্চয়তার মধ্যে ভেসে থাকা।

প্রাণের কোন দাম নেই যে! এই প্রচণ্ড অবক্ষয়ের সমাজে প্রাণের কোন দাম নেই। সে মনুষ্য প্রাণই হোক আর মনুষ্যেতর প্রাণ। দেশে ঠাঁই নেই প্রতিবেশী ঘরে ঠাঁই নেই। লোক দেখানো শরণার্থী শিবিরে ময়লা কাপড়ের বাণ্ডিলের মতো পড়ে থাকা। ‘শোষণ’ ‘নিষ্পেষণ’ এই সব শব্দগুলো ‘আস্থা’ ‘জীবন’ এইগুলোকে বদলে স্থান করে নিয়েছে। কি করে ব্যবহৃত হবে সদা সর্বদা শুধু তাই ভয়।

শরণার্থী শিবিরগুলির স্বাস্থ্য চিন্তা বলে তো কিছু থাকে না। আসলে আশ্রিতকে বাহিরবিশ্বের চাপে লোক দেখানি ঠাঁই দিলে তাদেরকে কবে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারব সেই চিন্তাই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খায়। তাই আঁখের মতো পিষে পিষে রস বার করে নেওয়া আর ছিবড়েগুলোকে ফেলে দেওয়া। থাইল্যাণ্ডের দক্ষিণে একটা গণকবর আবিষ্কৃত হয়েছে। লুকোছাপার জায়গায় নেই, মুখোশগুলো ছিঁড়ে পড়েছে। এখন তেঁতুল পাতা দিয়ে পাহাড় প্রমাণ মনুষ্যত্বহীনতা ঢাকার চেষ্টা। তদন্তের নামে দীর্ঘসূত্রিতা, সহায়তার নামে অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া! এক বুক কাদার উপর দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে যদি ক্ষীণভাবে খড়কুটো পাওয়া গেল তাও তো টেনে অতল গহ্বরের দিকে নিয়ে যায়। হায় মানুষ আর তার সযত্নে লালিত সভ্যতার বড়াই।

প্রশ্ন হল আন্তর্জাতিক বিভিন্ন শক্তিগুলি নীরব কেন? বা সামান্য প্রতিবাদ প্রতিরোধ দিয়েই রোহিঙ্গাদের দুঃখ কষ্টগুলো সেইভাবে গুরুত্ব সহকারে বিশ্বের বড়দারা দেখছে নাই বা কেন? আর দেখলেও সেটা আমরা অথবা রোহিঙ্গারা টের পাচ্ছে নাই বা কেন?

দেখুন বিশ্বের ইতিহাস ঘাঁটলেই দেখা যায় সমগ্র পরিকাঠামো বা সিস্টেমের পরিবর্তনের সময় একটা দুটো পিঁপড়ে চ্যাপ্টা পড়ে গেলে কেউ পাত্তা দেয় না। আর এ তো মাত্র দেশজ পরিচয়হীন কিছু হীনবল মানুষ। মায়ানমার প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে সেনাবাহিনীর অধীন। সেখানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা ধীরে ধীরে হচ্ছে। সেই নিয়েই বড়দারা আগ্রহী বেশী। এমনকি মানবতার জন্য নোবেল শান্তি পুরষ্কার প্রাপ্ত সু কিও সেই নিয়েই বেশী চিন্তিত।

আধুনিক পৃথিবীতে এর তুলনা টানতে গেলে বড় একটা মিলবে না। মনে করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ইহুদী ঘেটো, সোমালিয়া, বাংলাদেশ, ইরাকের কুর্দ, ইয়েজিদি বা সোভিয়েতের চেচনিয়া ভয়াবহতা বা নিষ্ঠুরতার মাপকাঠি হতে পারে কিন্তু এরা ত তবু পায়ের তলার মাটি আর মাটির নীচে আশ্রয় পেয়েছে। নৌমানবরা তো তাও পাচ্ছে না। এ কি সিন্দবাদের অভিযান না ফ্রান্সিসের অ্যাডভেঞ্চার? না সমুদ্র যাত্রার রোমান্স নেই, রোমান্স নেই। রয়েছে কাঠখোট্টা বাস্তবের অন্তহীনতাঃ
“Day after day, day after day,
We stuck, nor breath nor motion;
As idle as a painted ship
Upon a painted ocean.
Water, water, everywhere,
And all the boards did shrink;
Water, water, everywhere,
Nor any drop to drink.
The very deep did rot - Oh Christ!
That ever this should be.
Yea, slimy things did crawl with legs,
Upon the slimy sea.” (স্যামুয়েল টেলর কোলরিজ, “রাইম অব দ্য অ্যানসিয়েন্ট মেরিনার”)


এই অন্তহীন জীবনহীন ভেসে চলা নিয়ে কি সারা বিশ্বের কেউই লেশমাত্র চিন্তিত নয়? সেই ১৯৮৮ থেকে দেখলে আমেরিকা, বা ইউরোপীয় সঙ্ঘ রোহিঙ্গাদের সমস্যা নিয়ে শুধুমাত্র “গভীরভাবে দুশ্চিন্তা” প্রকাশ করেই খালাস। এমন কি এই গভীর দুশ্চিন্তা তাদের বা ভারত সহ অন্যান্য দেশদের মায়ানমারের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করতে বিন্দুমাত্র বাধা প্রদান করে নি। মায়ানমার এখন প্রথম বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলির বিনিয়োগ গন্তব্য। সেখানে গণতন্ত্র এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রবেশ ঘটল কি না তাই নিয়েই সকলের মাথাব্যথা।

আর সব দিক দিয়ে হেরে যাওয়া মানুষগুলো এখনো বুঝে উঠতে পারল না কি কারণে তারা এই দুর্বিষহ জীবন পুরস্কার স্বরূপ পাচ্ছে? বাঙালি হলে তো অন্যরকম সমস্যা। কিন্তু তা তো তারা নয়। যে দেশকে আজ থেকে বহু শতাব্দী আগে তারা আপন করে নিয়েছিল, সে দেশই আজ তাদের পর করে দিয়েছে। এবং সংগঠিত উৎপীড়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তাদের খাদের ধারের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। একটা সমগ্র জাতিকে ডোডো পাখির মতো অবলুপ্তির পথে ঠেলে দিয়ে কোন উন্নয়ন যে হচ্ছে তার হিসাব নেই।

তবু এইভাবেই হয়তো ডারউইন তত্ত্ব মেনে মানব সভ্যতা বিকাশের দিকে এগিয়ে যাবে। যেখানে শক্তিধরই একমাত্র টিকে থাকবে এবং যে দুর্বলের কেউ নেই কিছু নেই সে বিবর্তনের স্বাভাবিক নিয়মে ধূলায় পড়ে থাকবে পায়ের চাপে চাপে মাটির সঙ্গে মিশে যাবার অপেক্ষায়।

মানব সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে মানবতার কবে থেকে যে বিপরীত সম্পর্ক তৈরী হল সা আমার মতো সাধারণ মানুষের চিন্তার বাইরে। লিখতে গিয়ে ভেবেছিলাম লেখক হিসাবে এখানে নিজেকে বেশী গুরুত্ব না দিয়ে মানবতার সমস্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করার চেষ্টা করব। প্রায় তিন হাজার শব্দের শেষে এসে আমি সত্যিই কোন দিশা খুঁজে পাচ্ছি না। হয় তো সামাজিক দায়বদ্ধতার এখানেই ইতি হয়ে গেছে আমার। আর কি!

লেখক হিসাবে সত্যিই জানি না এই লেখার ভবিষ্যৎ কি। ঐহিকে প্রকাশিত হল- চারজনের ভাল লাগল- ছজন বলল, ‘ধুর’- আর তার পর দিন দশেক ফেসবুকের জানলায় টাঙিয়ে রাখলাম ‘কেমন দিলাম’ বলে- কমেন্ট পড়তে লাগল, ‘তুমিই পারো’, ‘কি দারুণ’, ‘একদম জীবন্ত’- চুলচেরা বিচার হতে শুরু করল, ‘এই জায়গায় নুন একটু বেশী পড়লে ভাল হত’, ‘চিনি দিলে না রান্নায়? তুমি কি বাঙাল?’, ‘ আহা ঐ ছবিখানার স্বাদটা একদম কাটা ঘায়ে নুনের ছিটের মতো! জীবন্ত হয়ে উঠেছে যেন!’ ব্যাস এই টুকুই হয়তো! সংবেদনশীল হিসাবে নাম ছড়িয়ে পড়ল আর দু চার জন বা খুব বেশী হলে কুড়ি জন লেখা পড়ে “বাহা” “আহা” “উহু” করে হাত ঝেড়ে ফেলল। এ ছাড়া তো ভবিষ্যৎ নেই। আরে মানুষের জীবন নিয়ে কি বিশ্লেষণ হয়? নাকি প্রবন্ধ রচনা হয়?

শেষের ছবিটা দিলাম। যদি হৃদয় দিয়ে অনুভব করাতে ব্যর্থ হই তো ছবিই সই। এই কলমের ক্ষমতা হয়তো তেমন নেই, যে পড়া মাত্র সারা পৃথিবী জুড়ে হইচই পড়ে গেল। প্রান্তিক ভাষার একটি অনলাইন পত্রিকার প্রকাশিত একটি লেখার জন্য ফুটেজ তো কয়েক সেকেণ্ডের মাত্র। কিন্তু সত্যি করে বলছি সব ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে মানুষগুলোকে নিয়ে একটু ভাবুন! কি ভাবে নৌমানবগুলো ‘নামানব’-এর জীবন কাটাচ্ছে। একবার মানসচক্ষে কল্পনা করে দেখুন আর ভাবুন ভাবুন! ভেবে যদি কিছু হয়! কি হবে না হবে সে পরের কথা! জ্ঞান আহরণ করলাম! একজনের জায়গায় দশজন জানল! এইভাবেই যদি ছড়িয়ে পড়তে পারে তাদের কথা! তাহাদের কথা! আর এর মধ্যেই হঠাৎ কেউ হয়তো সত্যিকারের আওয়াজ তুলল সঠিক জায়গায় আর যাদের কানে গেলে একটু নড়া চড়া হতে পারে তারাও নড়ে চড়ে বসল। হয়তো সারা পৃথিবীটাই বদলে গেল! কে জানে স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেলে তো বাঁচতেই ভুলে যাব। রোহিঙ্গারা তো বেঁচে থাকারই চেষ্টা করে চলেছে প্রতিনিয়ত। কেউ যদি জানাত কি ভাবে তারা একটু দাঁড়াবার জায়গা পেত...

“...অরণ্যের ওপাশে খুঁজে সর্বশেষ দাঁড়াবার জায়গা।
অনুসারী গ্রহগুলো একদিন আমাদের হবে।” (ফকির ইলিয়াস “দাঁড়াবার জায়গা”)



(ছবি গুগল থেকে সংগৃহীত)

পুনশ্চঃ এই লেখাটা লিখে নাকে সর্ষের তেল দিয়ে ঘুমোতে গেছিলাম। কিন্তু একটা তিনবছরের বাচ্চার মৃতদেহ ঘুমোতে দিল না। খাতা খুলে বসতেই হল। আইলান কুর্দি! নামটা মনে রাখবেন! রিফিউজি নয় রিফিউজড। প্রত্যাখ্যাত! সারা বিশ্ব ওই একটা ছবিতে কেঁপে গেছে। ছেলেটা মারা গিয়ে সম্ভবত, (হ্যাঁ সম্ভবতই বলছি কারণ সত্যিই কিছু হবে বলে আমি এখনো জানি না।) এই ভয়ঙ্কর সমস্যার দিকে মানুষের নজর টেনে দিয়ে গেল। রোহিঙ্গারা এখনও ভেসে চলেছে কিন্তু খবরের কাগজের পাতায় আর তারা নেই! মনে রাখবেন!