না মানুষী ভূখন্ড

অমর মিত্র


নো ম্যান’স ল্যান্ড-----না মানুষী ভূখন্ড। যে ভূখন্ডে কোনো দেশেরই অধিকার নেই। দেশে দেশে সীমান্ত। দুই সীমান্তের ভিতরে এই না মানুষী ভূখন্ড। ভারত বাংলাদেশের ভিতরে আমি ওই ভূখন্ড দেখেছি বনগ্রাম-- হরিদাসপুর সীমান্তে। পেট্রাপোল বেনাপোলে। এমনিতে ভারত কাঁটাতার লাগিয়েছে। বাংলাদেশ লাগায়নি।
কাঁটাতারের ওপারে দেড়শো মিটার ভারতীয় ভূখন্ড ছাড় আছে। দেড়শো মিটার বাদ রেখেই কাঁটাতার লাগাতে হয়। আন্তর্জাতিক আইন তেমন। এর ব্যাখ্যা আমার জানা নেই। শুনেছি রাইফেলের গুলির রেঞ্জের বাইরে রাখতে হয় অন্য দেশের সীমানা। আর তা দেড়শো মিটার। কিন্তু এই ছাড় তো সবর্ত্র রাখা সম্ভব নয়। হিলি সীমান্তে তো গৃহস্তের ভিটের ভিতর দিয়ে চলে গেছে সীমান্ত রেখা। এই সব জায়গায় নো ম্যান’স ল্যান্ড নেই। কোথাও আছে কোথাও নেই। তবে চেকপোস্টগুলি যেখানে, না মানুষী ভূখন্ড সেখানে রাখা আছে যদি সম্ভব হয়। কাঁটাতার লাগানোর ফলে সীমান্তের ওপারে যে দেড়শো মিটার ভারতের আছে, সেখানে ভারতীয়দের জমি, ভিটে আছে। এই দখলি স্বত্ব অ্যাডভারসড পজেশন। তাদের সঙ্গে ভূমিতে ভূমিতে বাংলাদেশের যোগাযোগ আছে। কিন্তু ভারতে আসতে ভোটার কারড দেখিয়ে সীমান্ত রক্ষীর কাছে নাম লিখিয়ে ঢুকতে হয়। কিন্তু সন্ধ্যার আগে সব কাজ সেরে ফিরে যেতে হয় নিজের ভিটে, কাঁটাতারের ওপারে।
আর আছে ছিটমহল। তার ইতিহাস দীর্ঘ। তার জন্মের পিছনে যেমন ইতিহাস, রাজায় রাজায় যুদ্ধ, সেই যুদ্ধ যেমন কামান বন্দুকে, তেমন পাশায়, জুয়ায়। ছিটমহল হলো একদেশের ভিতরে অন্যদেশ। ভারতের ভিতরে বাংলাদেশ, বাংলাদেশের ভিতরে ভারত। এদিকে ছিল বাংলাদেশ ৫৩টি( অঙ্গারপোতা, দহগ্রাম ধরে, যা করিডোরে বাংলাদেশের সঙ্গে জুড়ে গেছে ) মৌজা। ওদিকে ভারত ১১১টি মৌজা। এইসব মৌজার মানুষ যেন নো ম্যান’স ল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। কোনো দেশের দায়িত্ব ছিল না ছিটমহলবাসীর ভাল মন্দ নিয়ে। ভারত কেন এপারে তার ভূখন্ডের ভিতরের বাংলাদেশের উন্নয়নে মাথা দেবে? ওপারেও তাই। ছিটমহলবাসী অন্য দেশের নাগরিকতার জন্য, গ্রাম থেকে বের হলে গ্রেপ্তার হয়ে যাওয়ার এক আশঙ্কায় ভুগত। এমন হয়েছেও। সীমান্তরক্ষী তুলে নিয়ে গিয়ে পুশ ব্যাক করেছে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ছাপ মেরে। সে বাড়ি ফিরে ফিরেছে দু-চার বছর বাদে। বাংলাদেশও তাকে নেয়নি। সে আইনত বাংলাদেশের নাগরিক হলেও ( ভারতের ভিতর বাংলাদেশের মৌজার অধিবাসী, সেই কারণে) তাকে তো বাংলাদেশ সরকার কোনো পরিচয়পত্র দেয়নি। তাই সে দেশেও সে অনুপ্রবেশকারী। দুই দেশেই সে অনুপ্রবেশকারী, তাহলে তো, সে দেশহীন ভূখন্ডের মানুষ। তা কি নো ম্যান’স ল্যান্ড হয়? না আমরা যে না মানুষী ভূখন্ডের কথা জানি তা ছিটমহল নয়। নো ম্যান’স ল্যান্ড কারোরই জমি নয়। অনুপ্রবেশকারী বলে দাগিয়ে সেখানে পাঠিয়ে দিলে তার পায়ের নিচে মাটি থাকবে না। সীমান্ত পার হয়ে অন্য দেশে প্রবেশ করার সময় নো ম্যান’স ল্যান্ড পার হতে হয়। সীমান্ত কাঁটাতার মানুষকে দেশের খাঁচায় ঢুকিয়ে দিয়েছে সত্য। এক দেশে প্রাকৃতিক বিপযর্য় হলে, বন্যা, ঝড়, দীর্ঘস্থায়ী খরা হলে, দুর্ভিক্ষ হলে, অন্নের অভাব হলে, ধর্মীয় কারণে বা বর্ণের জন্য দাঙ্গা হলে মানুষ যে যাবে অন্যদেশে তার উপায় নেই। আবার রাষ্ট্র যদি মানবিক মুখ দেখায়, তবে সে সীমান্তে আছড়ে পড়া অন্য দেশের নাগরিককে, নো ম্যান’স ল্যান্ডের মানুষকে আশ্রয় দেয়, অন্য উদ্বাস্তুদের ছায়া দেয়। জার্মানি দিচ্ছে আই,এস জঙ্গীদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সিরিয়া, আফ্রিকার অগণিত দুর্গত মানুষকে। সংখ্যায় লাখ চার-পাঁচ হবে। ইওরোপে লোক সংখ্যা কম। এখন বিপন্ন মানুষের আশ্রয় ইওরোপের নানা দেশ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত নিয়েছিল লক্ষাধিক উদ্বাস্তুর ভার। নো ম্যান’স ল্যান্ড আমার কাছে ভয়ের। আমার কাছে নিয়ে আসে সেই ছবি, যে ছবি তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এঁকেছিলেন ডাইনি গল্পে। সেই যে ভয়ানক রৌদ্রে ঝলসে যেতে থাকা প্রান্তর, যেখানে ছায়া নেই, তৃণের চিহ্ন নেই, প্রাণের কোনো স্পর্শ আছে কি না সন্দেহ, সেই প্রান্তরের শেষে সেই বুড়ির কুটির। স্বর্ণ ডাইনি। নো ম্যান’স ল্যান্ড তেমনি এক জমি। যে জমিতে অনন্ত দাবদাহ বহেই যায় বুঝি , সেই প্রান্তর পার হওয়াই যায় না। কাঁটাতারের ওপারে রক্তচক্ষু রাইফেলধারী প্রহরী। মৃত্যু। ২০১১ সালের ৭-ই জানুয়ারী, ফেলানি খাতুন কাঁটাতার পার হয়ে নিজ দেশ বাংলাদেশে ফিরছিল। শীতের রাত। দালালেরা মই লাগিয়ে তাকে ও তার বাবাকে পার করানর ব্যবস্থা করেছিল। কোচবিহার জেলার চৌধুরীহাট সীমান্ত চৌকির ঘটনা। বাবা পার হয়ে গিয়েছিল। ফেলানি গুলিবিদ্ধ হয়ে কাঁটাতারে আটকা পড়েছিল। তারপর তার লাশ বাঁশে বেঁধে বি,এস,এফ, সীমান্ত থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। ফেলানি হত্যা দেখিয়ে দিয়েছে কাঁটাতার আর সীমান্ত জন্ম দিয়েছে সেই তৃণহীন ছায়াহীন প্রান্তরের, এক দয়াহীন মায়াহীন না মানুষী ভূখন্ড, সেখানে মৃত্যুরূপিনী ডাকিনীর লোল জিহ্বা থেকে লালসার জল পড়েই যাচ্ছে ক্রমাগত।