না-মানুষী ভূখন্ড

সোমনাথ দে

আত্মা বিষয়ক একটি কবিতা
খোলাবাজার বন্ধের পর শুরু হয় আসল বেচাকেনা
ক্রেতা বিক্রেতা শুধু সময়ের ডাকনাম
কারও দুঃখ আছে তাই
সুখ কিনে ঘরে ফিরে যায় একটা আস্ত দিন
ভেজা কাপড় সারারাত
মেলা থাকে তারে, যা সকালে শুকিয়ে যায়
ছোটোখাটো উঁচুনিচু ফুলে যাওয়া, তুবড়ে যাওয়া
বিশ্বাসকে ঘুম থেকে উঠে
আয়রন করে মানুষ
আর দূরে অন্ধকার জ্বলে ওঠে মস্তিকের কলোনির ভেতর
নিজেকে কমগুরুত্ব দিয়ে অন্যায় করবে ভেবেও
সে বেশি গুরুত্ব নিয়ে সহসা থামায়
ট্রেনেও হকারের সাথেও দরদাম করে আত্মা নিয়ে
আর হকারও জানে
এই পৃথিবীতে সবাই
নিজের কাছে নিজের মূল্য অনুযায়ী
দাম কখনো বাড়িয়ে কমায়, আবার কখনও কমিয়ে বাড়িয়ে দেয়।
সত্যিকারের অসুখ
সাহিত্যের আড্ডায় ছেলেটিকে প্রায়ই দেখতাম
মুখ নিচু করে বসে আছে
নামকরা কবি লেখকদের সামনে পড়লে
যেমনটা হয়, কেউ নিজেকে গুটিয়ে ফেলে আর কেউ
মাত্রাতিরিক্ত প্রচার করে নিজের
কিন্তু যখন দেখতাম ছেলেটি নির্বিকার বসে আছে
অসুস্থ লাগতো নিজেকে, ভাবতাম
সত্যিকারের সাহিত্য বোধহয় ওই ছেলেটির মতো হয়
মুখ নিচু, ঘাড় নিচু, স্বাধীন এবং আত্মভিমানি
তবে এবারের আড্ডায় ওকে আর দেখতে পাইনি
শুনলাম কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছে ও
আর তারপর থেকে প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে শয্যাশায়ী এখন
ভেবেছিলাম একবার দেখা করে আসি
কিন্তু যাইনি,
মনে মনে চেয়েছিলাম ও জানুক
একমাত্র জ্বর ছেড়ে গেলেই যে আসল জ্বর আসে তা ছাড়েনা সবার
আর তাছাড়া জ্বর তো কোনও রোগ নয়,
রোগের উপলক্ষ মাত্র...

নির্বাক
চিন্তায় পাপ এনো না কখনো, জলবায়ু বদলে যায়
যে ভাষার জন্ম হয়েছে স্তব্ধতা থেকে
সে কেবল
নিঃসঙ্গতার ঘুড়ি ওড়ায় রাতের আকাশে
মেঘ ডেকে আনে
সাহস যুগিয়ে বেঁচে থাকা মানুষ
মৃত্যুর সাহসও সংগ্রহ করার রসদ খুঁজে পায়
নতজানু হতে শেখে যাবতীয়
আকুতিমিনতি নিয়ে
সেই ভাঙা ছবিটার সামনে,
যে আজপর্যন্ত চোখের পাতা ফেলেনি কোনোদিন...
নো-ম্যান্স ল্যান্ড
যেখানে পৌঁছতে চেয়েছিলাম, বোধহয় সেখানে
পৌঁছতে পারবো না আর কখনো,
তবুও ঘুম থেকে উঠে চটি পায়ে বেরিয়ে পড়ি
সকালের নির্জনতা পাখিরা ভরে দেওয়ার আগেই,
পঞ্চাশ বছরের সেই বৃদ্ধযুবকের মতো
যে চাকরি চলে যাওয়ার খবর
বাড়িতে দিতে না পেরে
সকাল থেকে সন্ধ্যে ঘুরে বেড়ায় হরবোলা,
সেই হেরে যাওয়া প্রেমিকের মতো
যে এখন সস্তার সিনেমাহলে
শূন্য-এক্স ছবির টিকিট ব্ল্যাক করে,
অথবা সেই পাগলের মতো
যে স্পিডব্রেকার লাগিয়ে রাখা রাস্তাকে সিঁড়ি ভেবে
গুণে যায় আপনখেয়ালে,
তাই যেখানে পৌঁছতে চেয়েছিলাম বোধহয় সেখানে
পৌঁছতে চাইনা আর কখনো,
স্রেফ ঘুম থেকে উঠে আবার ঘুমিয়ে পড়ি
সেই বন্ধুর মতো
যে আজীবন কোথাও পৌঁছতে পারেনি, কারন
তার মধ্যে কোনোদিন শত্রু হওয়ার যোগ্যতা ছিলনা !
শূন্যতার অ আ ক খ
এই চাপা ত্রাস, কামানগুচ্ছ গলায় বিঁধে আছে...পালাবো কোথায়? হাতবোমা আর ট্রিগার নিয়ে মায়ের আঁচলে বসে খেলছে দামড়ার দল। উনুনে উনুন... সেদ্ধ হয়ে যাচ্ছে আমার হাত পা...শূন্যের আর্কাইভ থেকে মহাশুন্য লাফিয়ে পড়ছে… কার কাছে যাবো? এ বঙ্গে পাখিরা তস্কর... আর তস্করে চুরি করে পাখির আকাশ... ফড়িং মরে যায়… অন্ধকার আত্মসাৎ করে ফুলের আগুন চোখ। অসহ্য লাগে আমার...লঙ্গড়খানায় এই উবু হয়ে বসে থাকা … তবায়েফ অসুখ...আমি ভেসে যাবো... ঘুমের ভেতর মৃত্যু বরদাস্ত করবো না আমি...মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলতে পারবো না, ‘তোর জন্মের আগে আমি মনে মনে ছেলে চেয়েছিলাম ...’