মিডফিল্ডার

অর্ঘ্য বন্দোপাধ্যায়

জীবন যখন নিজেকে চেনায়, তখন হাজার ভোল্টও এত ক্যাজুয়ালি দেয় যে সবসময় মনে হতে থাকে ‘যা! মাধুরী আসবে না এও হয় নাকি?’ কিন্তু একবার অনিল কাপুর, একবার গোবিন্দা, একবার সালমান খানের কায়দায় ওয়েট করেও বাস স্টপে কেউ এসে নামে না...আসল কুলভূষণ খারবান্দা যে অন্য লোক সে সব জানা যায় অনেকদিন পর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ । ঘামতে ঘামতে উঠে বসে...’স্বপ্ন আমি দেখিনি মা!’ আমি তো একটা সত্যি দেখছিলাম...একটা গোল। কিছুতেই করতে পারছি না মা! যতবার...একটাই গোল কেন এতবার মিস হচ্ছে মা? আমি তো একটাও সেশন প্র্যাকটিসে ফাঁকি দিইনি...সবকটা সেটপিস...সবকটা কর্নার...সব থার্ডবারে ছিল...তাতেও কি করে? কি করে দুটো ডিফেন্ডার আমার ডানদিকটা ব্লক করে দিচ্ছে এত দ্রুত? একটুও জায়গা পাচ্ছি না! টার্ন করার। আর আমার লেফট ফুট...আমার বিখ্যাত বাঁ পা...যার জন্য আমাকে সবাই দিয়েগো বলে ডাকতো? সেটা কেন এমন নির্বিষ বলতো? কোনদিন কি আমি ঐ গোলটা করতে পারব না মা? পিকু কই...পিকু? পিকুউউউউউউউ! শালা শুয়োরের...সেন্টার লাইনে দাঁড়িয়ে কই ছিলছো? বক্সে কেউ নেই কেন??? না মা আমি কিছুতেই...ঘামে জবজবে ঘুমটা ভেঙ্গে যায়...আর আসে না...আবার যখন আসে আবার গোলটা হয়না...আবার আবার এবং আবার...সেই ডি বক্সে একা...
মিডফিল্ডার একটা শব্দ। শুধু একটা শব্দ নয়, তার সঙ্গে লেগে অলৌকিক একটা বিশ্বাস...যে বলটা ঠিক জায়গা মত, ঠিক সময়ে, আর সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনার দরজা খুলে রেখে এসে পড়বে আমার পায়ের কাছে... আর আমি বা আমরা গোলটা করব। আর তারপর সেলিব্রেশন...কাগজের পাতায় আমাদের ছবি, আমাদের নাম, আমাদের ইন্টারভিউ আর আমাদের রূপকথা...কিন্তু সে যেদিন ডি বক্সে একা পড়ে যাবে? একটা গোলের জন্য? আমাদের কিছু যাবে আসবে কি?
‘স্টার ইউনিট’ ক্লাব। ৯৮এ আণ্ডার সিক্সটিনের প্র্যাকটিস তখন চলছে, শনিবার। একটু ঢিমে। সিনিয়ররা আসে,আড্ডা মারে... আর টুক টাক গা ঘামানো ...তো আমাদের প্রাকটিসের পর সিনিয়রদের সেরকমই হিজিবিজি চলছে...ডাকুদা একটা কড়া ট্যাকেল করল নেপালি এক দাদাকে, ছিটকে মানে জাস্ট উড়ে গিয়ে সাইডলাইনের বাইরে...। না ছিটকে পড়া দিয়ে পরিচয় হয়নি...হাসছে তখনো...পরিচয় হল যখন, তখন ও উঠে দাঁড়িয়েছে। পড়ে যেমন ছিল...শরীরটাকে জাস্ট একটা ঝটকা দিল... সোজা দাঁড়িয়ে পড়ল। কোন কিছুতে ভর না দিয়ে...আমি তো হাঁ। এরম ফিটনেস কারু হয় নাকি? শুয়েছিল আর উঠে দাঁড়ালো? ফিদা হয়ে গেলাম। পরিচয় করলাম, আর চেলাও হয়ে গেলাম শিগগির। মাঠে এলেই ঘ্যান ঘ্যান করতাম...আউট স্টেপটা দেখাও, হিলটা কেমন হলে পারফেক্ট হয়...পাত্তা দিত না একদম। তবে হাসত...খুব হাসত সবসময়...এককালের পুরো ডিসট্রিক্টের সেরা গেম মেকার...খুব বেশি হলে নেপালি টানে বলত
-প্রেক্তিসস কোরো...প্রেক্তিস...হাদওয় ার্ক!
‘হাদওয়ার্ক’টা বলার সময় ছোট ছোট চোখ গুলো বড় করে হয়ে যেত। আর কোচ জয়ন্তদাকে অসম্ভব ভক্তি। কখনো হয়তো বলল...
-জ্যান্তদা, ইনকো লং বল মে শিখাও...উসসে আঁখ বনতা হ্যায়।
‘তুই শেখা?’ জয়ন্তদাও।
কান এঁটো করে ছোট্ট জবাব
-ক্যায়া আপ ভি জ্যান্তদা...
ব্যাস বলেই টুক করে কেটে যেত। অথচ খেলার সময় কখনও ক্যাজুয়াল হতে দেখিনি... টার্ন, লিফট, লং বল... ডেডলি ছিল প্রদীপদা। একবার লিগ দেখতে গেছি, বারবেটিয়া সঙ্গে খাতরা। দেখি বারবেটিয়ার পুরো টিমটা একটুও নড়ছে না...নড়ছে একমাত্র মাঝমাঠে একটা লোক। কিন্তু ওপরে কেউ নেই যে বল গুলো ফিনিশ করে...থ্রুগুলো চেনা লাগল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই...হাফটাইম। বারবেটিয়ার ড্রেসিংরুমে গিয়ে দেখি প্রদীপদা। হাসছে। আসলে খেপ খেলতে এসেছে। ফাস্ট টিম অন্য একটা টুর্নামেন্ট খেলতে গেছে…টাকা জমা আছে বলে জোড়াতালি দিয়ে একটা সেকেন্ড টিম নামিয়ে দিয়েছে বারবেটিয়া...এখন খেলার লোক নেই...অগত্যা। খাতরা ওয়ান নিল লিড করছিল...হারল টু ওয়ানে। দুটোই সেকেন্ড হাফে, দুটোই প্রদীপদা। ঈশ্বরের মতো বাঁ পা। একটা ভালো স্ট্রাইকার পেলে আর দেখতে হত না।
তো এভাবেই চলছে। দাদা মাঝে মাঝে ক্লাবে আসছে যাচ্ছে...আর হাসিতে ঝলমল করে উঠছে সবুজ ঘাসগুলো…আমরাও আস্তে আস্তে ঢুকে পড়ছি সিনিয়রদের গ্রহে। একটা নতুন বাচ্চাদের গ্রুপ জয়েন করেছে...তাদের না চাইতেই জ্ঞান দিচ্ছি, পিঠ চাপড়ে দিচ্ছি...আমাদের একটা দল হয়েছে...নিভু বিকেলে প্র্যাকটিসের পর বারপোষ্টের পাশে আমরাও গুলতানি করার অধিকার পাচ্ছি...সময় এগোয় আরও খানিকটা,ঘটনা আরও অনেকটা গড়ায়...আমি আন্ডার সিক্সটিন থেকে তখন এসে পড়েছি হায়ার সেকেন্ডারি বোর্ডের আন্ডারে...চলছে দিনরাত এক করে পরীক্ষার বাটনা বাটা...এমনই এক সকালে পড়তে যাচ্ছি, সাইকেলে গলির একটা বাঁক ঘুরতেই...গেরস্ত বাড়ির সামনে দোতলা থেকে ঝোলা একটা দড়িতে ‘গণশক্তি’ বাঁধছে একটা চেনা নেপালি মুখ। ডাকতে গিয়েও ঝপ করে একটা গাছের আড়ালে ঢুকে পড়লাম। এক বাড়ি শেষ করে অন্য বাড়িতে ‘গণশক্তি’ বাঁধতে চলে গেল একটা হাল্কা মুডের সাইকেল। আর ভারি করে দিয়ে গেলো আমার সকালটা। আমিও কয়েক বছর চুটিয়ে খেলেছি । আমিও একই পজিশনে খেলতাম। খেলা তৈরি...ছিল আমারও কাজ । প্রদীপদার ডজ, মোশন, রানিং, থ্রু, ওয়াল, শ্যাডো জাস্ট কপি করতাম...দাদা গোলকিপারকে ওয়ান টু ওয়ান যখন খেলত কখনও একসেকেন্ড বেশি দেয়নি বল জাজ করার জন্য...আজ আমাকেও দিল না। এটুকুও জানতে দিল না যে খেলা ছাড়ল কেন...বড় ক্লাবে গেল না কেন...কেন সব ছেড়ে এই জোয়াল টানতে নেমে পড়ল? আমি যখন পরীক্ষার জন্য জোনালের প্র্যাকটিস সেশন টা স্কিপ করলাম...জানতাম আমারও আর ফুটবলের কাছে কোনোদিন ফেরা হবে না...বাবা বলেছিল ’এদেশে ফুটবল খেলে কিছু হয় না বুঝলে?’...দাদারও কি সেরকম? লাইফকে খেলতে নামার এত তাড়া কি ছিল দাদা?...গোলকিপারকে বক্সে ওয়ান টু ওয়ান আমিও তো অনেক খেলেছি, কিন্তু আজ তোমাকে খেলতে পারলাম না কেন? আর তুমি? যার এত ভালো প্রিসিশন, সে আমাকে না দেখতে পেয়ে চলে গেলো? এটা মানতে পারছি না দাদা! আজ কেন খেলতে পারলাম না তোমাকে?
পরপর দুটো মরশুমে ডিসট্রিক্টের সেরা মিডফিল্ডার প্রদীপদা, আমার ঈশ্বর...সকালটাই পালটে দিয়ে চলে গেলো...এমন কোন গন্তব্যের দিকে যেখানে একটা থ্রু থেকেও হয়তো আর গোল হবেনা। পেনালটি গুলোও বারে লেগে অবধারিত ছিটকে যাবে।