ডিফেন্ডার

অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়

তীব্র গতিতে বল নিয়ে ছুটে আসছে মেসি । সন্দীপকে কাটালো , দেবা ডান পাটা এগিয়ে দিয়ে কাটাতে পারবে না বুঝে থাইটাকে একটু মুড়ে কোমড় পেছনে নিয়ে অ্যাঙ্গেলটা বাড়িয়ে দিয়ে চেষ্টা করল আটকাতে । পারবে না , আমি জানি মেসির ওই তীব্র গতি আর প্রায় নব্বই ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে কাটিয়ে নেবার ক্ষমতা এভাবে আটকাতে পারবে না দেবা । ও নিজেও জানে , তবু আপ্রাণ চেষ্টা করবে । গোড়ালি ঘষে ডান পা আরও কিছুটা বাড়িয়ে দিল । এই চেষ্টার জন্যই অভিজিৎ স্যার ওকে টিমে জায়গা দিয়েছে । নাহলে যার বাঁপা প্রায় চলেই না ,গতি কম , এমন কাউকে তিনকাঠি রক্ষায় রাখে কেউ ! ঘামে ভেজা হলুদ জার্সির শুন্যটা সেঁটে বসে রয়েছে পিঠে । মেসি দেবাকে ছাড়িয়ে আমার দিকে ।
সন্দীপ ক্যালাটা কেটে গিয়ে হাঁ করে তাকিয়ে দেখছে । কোমড়ে দুটো হাত দিয়ে সিনেমা দেখতে এসেছে যেন ! জার্সির নম্বর মিলিয়ে পনেরোটা লাথি কষাতে ইচ্ছে করছে । গোলে ইন্দ্র একা । আজ সকাল থেকে অলরেডি পাঁচবার যাওয়া হয়ে গেছে । দুটো মেট্রোজিল পেঁদিয়ে নেমেছে কোনোরকমে । মালটার এত নোলা , পইপই করে বললাম অতগুলো আইসক্রিম খাস না , একে দশপিস মাংস ঝেরেছিস , কে শোনে কার কথা ! ওর দাদু নাকি পূর্ববঙ্গে আইসক্রিম বিক্রি করত , ফলত দুধ জল আর চিনি ওর কোনো ক্ষতি করবে না । একই পাড়ার লোক কিনা ! জীবনে এত সবুজ ঘাসে কখনও খেলি নি । চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে । দুমুঠো উপড়িয়ে রসুনছকে গরম ভাতের সাথে খেয়ে দেখলে হয় ! নতুন পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে বাজারে ।
আর পেঁয়াজের মত পরতে পরতে ঝাঁঝালো মেসি আমার দিকে অগ্রসর । ফাইনাল চার্জে যাব । বডি ওয়েটটা বাঁদিকে করে বাঁ হাত দিয়ে ইন্দ্রকে সংকেত দিলাম ওই পোস্টটা দেখার জন্য । আমি ওকে ডানদিকে আসতে বাধ্য করব – পাল দেবার কোনো লোক নেই এই যা সহায় । আর ঠিক দুপা পিছনে বড় বক্স । আমার হাতগুলো একটু বেশি লম্বা বলে শিখা বরাবরই একটু দূর দিয়ে হাঁটতো । ওর কাঁধে হাত রাখলে হাতটা কাঁধেই থাকতো । শিখার এই অংক অসাধারণ । শিখা কি টিভির সামনে এখন !
হেলিকপ্টারের মত হাতগুলো তুলে নিলাম । নাহলে ব্যাটা বলটা হাতে মেরে পেনাল্টি চাইবে । হাত নাড়িয়ে ওকে ডিসট্রাক্ট করব । শালা ছাড়বো নাকি তোমায় পাঁচ ফুট দু ইঞ্চি ! আসুক , আসুক , আরও ভেতরে আসুক । গোষ্ঠ পালের হাফ প্যান্ট বাড়িতে রাখা আছে । কাদার ছিটেগুলো এখনও দগদগে । দুলাখ টাকা অফার করেছিল দালালটা , বাবা দেয় নি । এত সহজে তোমার কাছে হেরে যাব স্পেন কলোনি ! হালকা একটা ভাঁজ দিল , গতি বাড়িয়ে ঢুকছে বক্সে । আমার লম্বা ডান হাত তুলে ওর দৃষ্টি আলগা করতে চেষ্টা করছি । শালা নাচাচ্ছে আমায় ! ওর সাপোর্টে মারাদোনার জামাই বক্সে ঢুকে আসবে যখন তখন । তার আগে কর্নারের দিকে যতটা সম্ভব সরিয়ে নিয়ে যেতে হবে । দেবা সামলে উঠে ঠিক সেন্টার পোজিশনটা দেখে নেবে । আপাতত ওকে ছৌ নাচ দেখিয়ে কর্নারের দিকে নিয়ে যাওয়া আশু লক্ষ্য ।
স্যারের কটকটে সবুজ ট্র্যাকসুট দেখতে পাচ্ছি । উত্তেজনায় সাইড লাইনে চলে এসেছেন । শিখা বলে পশ্চিমবঙ্গের সব গাছের পাতা থেঁতো করলেও ও রং পাবে না । স্যারের বাগানে নাকি ঈর্ষায় কোনো গাছ হয়ে না । উনি তারে ট্র্যাকসুট মেলে দেন আর টাটকা অক্সিজেন আসে ঘরে । স্যার কি বলছেন দেখার সময় নেই , আমি শুধু ছৌ নাচ দেখিয়ে মেসিকে নিয়ে যাচ্ছি কর্নারের দিকে । আবার একটা ভাঁজ দিল । তারিফ করতে ইচ্ছে হলেও নিজে ফেটে যাওয়ার লজ্জা আরও বেশি প্রবল । সামলে নিয়ে আবার চিটে গেছি । নিজের ঘাম থেকে আঁখের গুড়ের গন্ধ পাচ্ছি । জিভ নোনতা , ছাড়বো না কিছুতেই । এই মুভটা আটকে দিলেই হাফ টাইম । সারা পৃথিবী জেনে যাবে এই পঁয়তাল্লিশ মিনিটের গল্প । আমাদের অচেনা শহর রাতারাতি ইন্দ্রর দাদুর আইসক্রিম গাড়ির মত লোভনীয় হয়ে উঠবে । গত পনেরো বছর রগড়ে রগড়ে আজ এই দিন ।
বলটা পায়ের চেটোতে নিয়েছে , ঠোকরাচ্ছে আস্তে আস্তে । বাছা , আমি অনেক কাঠঠোকরা দেখেছি , তোমার হলুদ ঠোঁটের ধার শরীরটাকে পিছিয়ে পিছিয়ে নিয়ে সামলাবো । তারপর শরীর একদম সামনে দিয়ে চীনের দেওয়াল । আপাতত আমি আর মেসি ছোট বক্সের একদম কোণায় । ইন্দ্র পিছন থেকে পরিত্রাহী চিৎকারে অভয় দিচ্ছে । আউট স্টেপে মেসি শট নিলে ও আটকে দেবে । কিন্তু আমি জানি মেসি শট নিতে পারবে না । ওর সাথে চোখাচোখি হয়েছে দুবার , আমি সম্ভ্রমের গন্ধ পাচ্ছি ...