অথবা সে – হাইফেন - স্যানাটোরিয়ামে

তমাল রায়


পতনশীল পালক আর তুমি, ধর দুজনেই এক সাথে অবাধ সঞ্চরণশীল কোনো যাত্রাপথে। তুমি জানো না কোথা থেকে আসছ, কোথায় যাবে, সেও জানে না। কেবল আয়তনের ওপর ভিত্তি করে দুজনেই স্পর্শ করবে কোনো এক অনিশ্চিত সীমানা। সীমা আর সীমানার মধ্যে ফারাক আজীবন। আদতে তাও কি তোমার বা তার হাতেই?

বোকাদের জন্য কবিতা লেখা হয় না কোনো। ইতিহাস বলে কিছু ছিল না কোথাও। ঘড়ি বা সময় কি প্রবল অস্তিত্বময় হয়েও নিছক খেলনা সাম্রাজ্যের কাঠ-কুটো। গ্যারেজের যৌথতা বা গাড়ীর ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য দু’টিই ব্যবহৃত। ব্যবহার করার স্বাধীনতা তাদের আজও নেই, ঠিক যেমন মানুষ প্রয়োজনে তোমার, অপ্রয়োজনে ত্যাজ্য। সমুদ্র বা আগ্নেয়গিরি কেবল নিশ্চিত করতে পারলনা নিজেদের মৃত্যুকাল। কেবল ভূমিকম্প যা আনুভূমিক ততটা নয় যতটা উলম্বে প্রভাবে...মাটি কাঁপে আজও বোঝো?

মাথার বালিশের নীচ থেকে যে চারাটা শরীর টুইস্ট করে মুখ বাড়ালো জানলার বাইরে তার নাম অবিশ্বাস। দেখো রাতও কেমন ফিকে, দিন অনুজ্জ্বল। সাপ ও ওঝার মাঝে ওপড়ানো বিষ দাঁত। দেখো এ মাটি বিষে নীল। জলে ভাসছে কিছু অকারণ অভিব্যক্তি। ইচ্ছের হাত গলে বেরিয়ে এলো প্রবঞ্চনা, থুতু, লোভ আর লালাসর্বস্ব ভোগবাদী দুনিয়ার হাজার কিস্যা। মাটি কাঁপে টের পাও?

এ গল্প আদতে ইঁট বালি সিমেন্টে নির্মিত বোকা দেওয়াল (সম্পর্ক বা নির্মাণে সিমেন্টিং যদিচ চিরকালীন প্রশ্নের মুখোমুখি ! ) আর টিকটিকির, আর এক পুঁচকি আরশোলার। এ গল্প আদতে কাঠবেড়ালী আর পাশাপাশি দন্ডায়মান দুই পাঁচিলের গল্প।

দেওয়াল তো দেওয়ালই। ধর সে এক দেওয়াল রাজত্ব। ডাইনে দেওয়াল, বাঁয়ে দেওয়াল, সামনে দেওয়াল, পেছনেও। শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা দেওয়াল-ই রাজ। আর এই দেওয়াল জুড়ে দেয়ালার কোনো সুযোগই ছিল না। কারণ প্রতিটি দেওয়ালই ছিল কোনো না কোনো টিকটিকির দখলে। আর যা হয়, টিকটিকিরা ভেবে বসল যা তার তাতে আর অন্যের কোনো অধিকার নেই। ব্যস, এ ওর সাথে মারামারি, কাটাকাটি, কেবল শর্ত ছিল দেওয়াল থেকে নীচে পড়লেই আব্বুলিশ...হ্যাঁ তারপর, ঘচাং! মুশকিল হল ছোট্ট আরশোলাগুলোকে নিয়ে। তারা অত বোঝে না। ভেবেছিল যতদূর চোখে দেখা যায় তা আমাদেরও। কিন্তু তুমি যদি অসহায়, আর বুদ্ধিশুদ্ধি কম, তাহলে... দেওয়ালে গিয়ে বসল আর অমনি কোথা দিয়ে টিকটিকি এসে ঝপাং, পালিয়েছিল জানো। পেরেও গেল প্রথমটা। কিন্তু তারপর আবার, আবার। আর পারা যায়, ব্যস। কিছুটা খেল, কিছুটা রেখে দিল মহান মহামতী টিকটিকিকূল, আমার, তোমার। যাতে আর এত ক্ষুদ্র পতঙ্গ আর কভি নেহি আসে। হুম হুম বাবা! আমরা কি দোর্দন্ডপ্রতাপশালী বল।
বলা হল না কাঠ বেড়ালির গল্প আর। সেই তো একই উঁচু পাঁচিল আর পাঁচিল ডিঙ্গোতে চাওয়ার গল্প। ফলশ্রুতি কি তা সকলেরই জানা।


দেওয়াল দেওয়ালের থেকে, পাঁচিল ও পাঁচিল থেকে, হ্যাঁ স্পেস চেয়েছিলো, যেমন তুমি বা আমি। এই নাও স্পেস । স্ত্রী ও পুরুষের মাঝে, অতীত আর বর্তমানের মাঝে, জীবন আর মৃত্যুর মাঝে স্পেস, জীবন আর জীবনের মাঝে স্পেস, ট্রেন আর লাইনের মাঝে স্পেস। ফল? অনিবার্য দুর্ঘটনা। স্পেস – স্পেস- স্পেস...

একটি দুর্ঘটনার পর যা হয় – ধর উলটে গেছে আকাশ। আর পাঁক, ড্রেনের জল, হাইড্রেন্ট উপছানো , আর পাঁকে ভরছে আকাশ, আসলে গু-মুতে ভরা মাটিই তো আকাশ এখন, আর মেঘেরা সাদা ব্যাঙের ছাতা হয়ে এদিক ওদিক মাটিতে, নাম হয়েছে ছত্রাক! আকাশের নীলগুলো ব্যথা হয়ে টেলিফোনের কেবলে ক্লিপ লাগানো, মৃদূ হাওয়ায় দুলছে, দূর থেকে ভেসে আসছে উলটো সঙ্গীত। সুখ এখানে হুকা বারের মত স্পেশাল জোনের সাবজেক্ট। শান্তি দিদি স্যানাটোরিয়ামে গোমড়াথোরিয়াম। অব্যক্ত বেদনার ভান্ডার কানা উঁচু হয়ে উঠছে একটু একটু করে। জন্ম নিচ্ছে কাঁটা তার। গান নেই কোথাও, অথবা চিল, শকুন, উদ্ধত সঙ্গীন ! আকাশ কই, জল কই,জল?...এ সমরক্ষেত্রে ‘সুন্দর’ পিতামহ ভীস্মের মতই কন্টক শয্যায়। মনে কর না কর এ এক বধ্যভূমি। চিরকালীন স্ত্রী ও পুরুষের মাঝে স্পেস, স্পেস সরিয়ে ক্যাকটাস, গুলি - বারুদ বাতাস ভারী হচ্ছে চামড়া পোড়ার গন্ধে, বেঁচে নেই কেউ? কেউ নেই কোথাও??? ঢেউ ফিরে গেলে পড়ে থাকে ডাঁটি ভাঙা চশমা, এক পাটি হাওয়াই চপ্পল, ঢেউ নেই ঢেউ নেই ছোট্ট সে তট, তবু পড়ে আছে ভাঙা ঝিনুক, ভেতরে লেখা ছিল – যে ভালবাসে, ব্যথা বোঝে। আর শুকিয়ে যাওয়া ফেনা,পচা মাছের গন্ধ, বমি আসছে না? খুউউব। পড়ে আছে আয়লান কুর্দির দেহ। ও বাঁচতে চেয়েছিল আরো এগারো জন সিরিয়ানের সাথেই। সমুদ্র কিছু নেয় না, সব ফিরিয়ে দিয়ে যায়।

এ দৃশ্যে আপাতত গঁদার এর প্রবেশ। ক্যামেরা লং শট এ ধরছে এক দৌড়ে আসা কিশোরীকে। মোশন স্লো, খুব স্লো, ও দৌড়চ্ছে ধীরতম গতিতে, কারণ ও তো একা নয় ও আসলে এ সৌরজগতের আরো অজস্র সেই মানুষদের প্রতিনিধি যারা স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য, হ্যাঁ বন্ধু একটা নূন্যতম বেঁচে থাকার জন্য সব জেনেও অতিক্রম করতে চাইছে দেওয়াল বল দেওয়াল, পাঁচিল বল পাঁচিল, হ্যাঁ ওকে অতিক্রম করতেই হত যে। ও বোকা নয় তবু বোকা হতেই চেয়েছিল, যেমন ধর্ষিতা স্ত্রী বিশ্বাস করতে চান, এ চরম বিপদে তার সাথে থাকবেন তার এতদিনের সাথী, কিন্তু পুরুষতো পুরুষই, সে তো সিংহের জাত, কেন থাকবে অসময়ে সাথে! ঠিক তেমনই কিশোরী পেরিয়ে যেতে চাইছে... কাট।

উঁহু ধরা পড়ে গেছে। কাট। চাইলেই সব হয়ে যাবে এমন মাথার দিব্যি কে দিয়েছিল।

পালাচ্ছে, পালাচ্ছে- সিরিয়া থেকে ১১ মিলিয়ন লোক পালাচ্ছে, কোথায়? কাট।

পালাচ্ছে পালাচ্ছে, কোথায় যাবে চাঁদু, টার্কি? ধুর, গ্রীস? ধুর। তোরা তো বোঝা, কে নেবে তোদের। ওরা ঠেলছে ম্যাসিডনিয়া, হাঙ্গারি, হ্যাঁগা ওরা তোমাদের ভালভাবেই নেবে? কাট।

মরিচঝাঁপি? নেছিলো? কত্তা? বাপু অনশনে। আর ওরা পালাচ্ছে ১৯৪৬ কত্তাগো কে কাদের নেছিলো? কাট।

স্লো মোসনের কিশোরী দৌড়ে এবার পৌঁছালো, এই তো আর একটু, পেরে যাবে কি বল। কাট।

ক্যামেরা দূর থেকে দেখালো ফেলানি নাকি তোমার,আমার মেয়েই ঝুলছে কাঁটাতারে? কাট।
দেওয়ালে আরশোলা কে গিলে খেলো কিছু, ফেলে দিলো বাকিটা, হুম টিকটিকি। কাট।

এসব প্রশ্ন কখনো কর না - কে বলে দিয়েছিল এ অমৃতস্য পুত্র বা কন্যা কেবল তার দ্রাঘিমা আর অক্ষাংশেই নির্দিষ্ট থাকবে। তুমিও মানুষ বটে, হায় অমৃতস্য? মাই ফুট। কাট।

ক্যাকটাস বাড়ছে বিছানার মাঝে, সময়ের মাঝে কাঁটাতার, আর বেড়াল অথবা কুকুরের মত আমিও কাঁদছি। স্পেস সত্য, কাঁটাতার সত্য। মানুষ নয়।

হুম মানুষ সত্য, যার ক্ষমতা আছে! আর বাকি সব ছি! ছি!

এসো হে পান্ডব বর্জিত অঞ্চল তোমায় আমরা বধ্যভূমি নামেই অভিহিত করি। এসো হে শাপভ্রষ্ট কিছু মুগ্ধতা রাখ, দেখো এখনো সকাল হয়, আলো এসে পড়ে ছোট শিশুটির মুখে, এ পৃথিবী এখনও তেমন অসুন্দর নয়। নদীতে জল এখনো বয়ে চলেছে, মঙ্গল বা বুধ ইউরেনাস নেপচুন প্লুটো কোথাও কোথাও যদি কিছুমাত্র থেকে থাকে প্রকৃতির অমোঘ কিছু সৌন্দর্যই... ভাগ্যিস টিকটিকি বা মানুষ এখনও সেখানে পৌঁছায়নি।

মানুষ এখনো ততটা সামরিক হয়ে উঠলো না, তাই জলের স্বাদ মিষ্টি, মানুষ এখনো ততটা ছায়াময় অদৃশ্য নয় তাই সে আলো। মানুষ এখনও ততটা যান্ত্রিক নয় তাই সে মানুষ। যদিচ ঈশ্বরের অসুখের নাম মানুষ।

তবু স্পেস কমুক। জুড়ে জুড়ে যাক যত বিচ্ছিন্ন নিউক্লিয়ার ঘর ও বাড়ি। স্পেস কমুক। সাদিক আর সদানন্দের বাড়ি মিশে গেলে তার নাম দেবো ডাইভার্সিটি। কাঁটাতার এক দূরনিয়ন্ত্রিত ওয়েদার স্টেটমেন্ট। নো ম্যানস ল্যান্ড, আদতে এক সংক্রামক অসুখ। দেখো তুমি আর আমি, সাদিক আর সদানন্দ মিশে গেলে স্পেস কমেই। সকাল থেকে মেয়ে বৌ’রা ছেলে মানুষদের মত জল নিয়ে ঝগড়া করবে, বাসনে বাসনে ঠোকাঠুকি, মারপিট চিল চীৎকার, তবু জানো দুপুর গড়ালে পাশের ঘরে পৌঁছতো শুঁটকি মাছ বা লাউ এর ঘন্ট। এর বুঝি দাম নেই কোনো?

মহামতি গ্যেটে – না স্পেস আমাদের আর চাই না। রবি ঠাকুর দোহাই আর আলো চাই না ,অনেক তো হল। এবার ক্ষান্ত দাও। একসাথে থাকার কথা হয়েছিল না তোমার আমার?

কুসুম তোমার মন নাই শুধুই কাঁটাতার?

দেখো এ পূর্ণকুম্ভে তুমি বা আমি হয়ত কোনো নো ম্যানস ল্যান্ডেই জন্মেছিলাম। তবু এ পূর্ণতার মোহে মনস্কাম মাগে – আছে দুঃখ আছে মৃত্যু, বিরহ দহন জাগে।

এক হয়ো না খবরদার। বাপ বকবে, বস বকবে, ভেন্ন হও। হ্যাঁগা ভেন্ন হও।

তবু জান কুসুমও ঝরিয়া যায় কুসুম ও ফুটে।
তবু ফুল ফুটছে। আলোও আসবে নিশ্চিত।

জানি এ কষ্ট কল্পনা অথবা সম্ভাবনার শিল্পকলা,তবু-
এ জার্নি এবার ঐহিকে পতনশীলতার বিরুদ্ধে নো ম্যানস ল্যান্ড থেকে কোনো এক ইয়েস ওয়ান্ডারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে।
ভরসা রেখো।চল ঘুরে আসি।