এখনও আকাশ লাল... কখনও ঝাণ্ডা, কখনও চাপ চাপ

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

একদিন পেট্রল দিয়ে
সব আগুন আমি নিভিয়ে দেব
সব আগুন আমি নিভিয়ে দেব
পেট্রল দিয়ে

এক সময় যখন বাংলা গানে আকাল নিয়ে খুব আলোচনা বিতর্ক হ’ত নব্বইয়ের দশকে, তখন গম্ভীর ভাবে কেউ কেউ বলতেন ‘সেই পুরনো গানগুলোই এখনও শুনতে হয়...’, আর কেউ কেউ একটু সাহস করে বলতেন ‘সুমন চট্টোপাধ্যায়, নচিকেতারাও তো চেষ্টা করছে...’। ‘জীবনমুখী’ শব্দের ব্যবহারে রেকর্ডিং সংস্থার ফাটকা বাজারে চলেছিল খুব। কিন্তু এই ‘জীবনমুখী’ শব্দের প্রয়োগ নিয়ে রক্ষণশীলেরা দু’দশক ধরে সেই গায়কের মুণ্ডপাত করেন, যাঁর অ্যালবামে ব্যবহার হয়েছিল ওই শব্দ। কিন্তু গরমাগরমির মধ্যেই অনেকে বেশ টের পেয়েছিলেন... সুমন, নচিকেতা, অঞ্জন দত্ত, শিলাজিত-দের হাত ধরে যে ধারাটা আসছে (যদিও প্রত্যেকের নিজেস্ব পথ, অন্যের থেকে ভীষণ ভাবে আলাদা, স্বতন্ত্র) তা উড়িয়ে দেওয়ার নয়, ওটা থেকে যাবে। মজার কথা, একবিংশ শতাব্দীতে ঢুকে যখন বাংলা ব্যান্ডের জোয়ার এসেছে তখন বেশ কিছু ব্যাণ্ড-এর সদস্যকে বলতে শোনা গেল – ‘আমরাই বাংলা গানের স্রোতা ফিরিয়ে আনলাম।’ তাদের যখন, মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে সুমনের অবদানের কথা... প্রতিষ্ঠিত ব্যান্ডের সদস্য তাঁর ‘সবজান্তা বিতর্ক-বাগিস’ হাবভাব নিয়ে উকিলের মত বলছেন ‘হ্যাঁ... সুমন তো থাকবেই... কিন্তু সুমনের গানের যারা স্রোতা, তাঁরা কিন্তু ডেডিকেটেড স্রোতা। এবং তাঁরাই ওনার গান শোনেন। সব কথার মানে বুঝতে পারেন... রিলেট করতে পারেন।’ নবারুণ-সাহিত্য প্রসঙ্গে কিছু ভাবতে বসলেও, কেন জানি না অবদানের কথাটা এই ভাবেই মাথায় আসে। বাংলা সাহিত্যে নবারুণ ভট্টাচার্য এবং তাঁর থেকে যাওয়া (রাজ করাও বলা চলে) এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত, যেখানে তিনি যে কাজটা রেখে গেছেন... তা থেকে যাবেই, অথচ নবারুণের লেখার যারা নিবেদিত পাঠক, সেখানেই তাঁর বিশেষ জায়গা। শব্দের জটিলতা বা ভাবের ব্যঞ্জনা নয়... নবারুণের একদম ‘সমাজে কফিনে পেড়েক ঠোকা’-র মত দমাদম হাতুড়ির আঘাতের শব্দ তোলা এই লেখাগুলো, আসলে হয়ত... সকলের জন্য নয়। ঠিক যেমন নিট হুইস্কি, অভ্যেস ছাড়া যে কেউ গলায় ঢেলে দিতে পারবে না। গলা জ্বলে কষ্ট পাওয়া অবস্বম্ভাবী... আর সাধ করে এমন কষ্ট পেতে কেই বা চায়? একের পর এক... সুনীল, জয় গোস্বামী, ভাস্কর, প্রভৃতি প্রতিষ্ঠ কবিদের কবিতা পড়তে পড়তে হঠাৎ যদি কারও চোখের সামনে এভাবে পেট্রল দিয়ে আগুন নেভানোর লাইন ঝলসে ওঠে। তখনই বুঝতে হবে... এই কবিতা একেবারেই অন্য কারও, অন্য এক বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই লেখা। ঝিম মেরে ‘মুখর বাদল দিনে’ বসে বসে কবিতা পড়া পাঠকের কলার ধরে একবার ঝাঁকিয়ে দেওয়া... ‘যে পৃথিবীতে বাস করছ সেখানে শুধু বাদল নেই... পেট্রল আর আগুনও আছে!’

নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা, প্রবন্ধ, গদ্য, গল্প এবং উপন্যাস (বিস্ফোরক সাক্ষাৎকারগুলোই বা বাদ দিই কি করে?) একে একে ভাগ করলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই দীর্ঘ আলোচনার যথেষ্ট জ্বালানী রয়েছে। কয়েক মাস আগে একটি সাহিত্য পত্রিকায় দেখলাম একটি প্রাসঙ্গিক প্রবন্ধ, নবারুণ ভট্টাচার্যের কবিতা, গল্প এবং উপন্যাসকে নিয়ে আলোচনা। এমন আলোচনার সত্যিই প্রয়োজন, এবং নবারুণ-সাহিত্যের প্রাসঙ্গিকতার দশকে দশকে পুনর্মূল্যায়নের জন্যই বেশি করে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু না, এই আলাদা আলাদা বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনায় যেতে চাইছি না এখন। সবার আগে, যে জিনিসটা অন্যরকম করে ভাবাতে বাধ্য করে তা হ’ল নবারুণের স্পিরিট। সৃষ্টির মধ্যে সেই স্পিরিট এতটাই জীবন্ত যে ঝকঝকে কাস্তের মত ঝলসে ওঠে অন্ধকারে... পুলিশ ভ্যানের হেডলাইটের আলোয়, কিংবা হলুদ নিওন ল্যাম্পে, কিংবা নিছক বুভুক্ষু জ্যোৎসনায়। ওই স্ট্যান্ড আউট অ্যাপ্রোচটাই ঘাড় ধরে ভাবায়, ভাবতে বাধ্য করে। তাই নবারুণ-সাহিত্যের তথ্যগত আলোচনা, বিস্তারিত বিশ্লেষণ (যা বিশেষজ্ঞদের কর্তব্য বাঁচিয়ে রাখা)... সব কিছুর আগে, মনে হয় ওই স্পিরিট টাকে অনুভব করার একটা একাগ্র এবং সৎ প্রচেষ্টার প্রয়োজন। সেও এক প্রকার অনুধাবন, একটা বোধ কিংবা চেতনার অদ্বিতীয় প্রকাশ কে চেনার অধ্যাবসায়। এই চেনাটুকু না হ’লে... কখনও অস্ত্রের ফলায় ঝলকানো আলো থেকে বাঁচতে, আবার কখনও পচনশীল মৃতদেহ’র বিভৎসতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে মুখ ঢাকতে হবে বার বার।

নবারুণ-সাহিত্য গলধঃকরণ করাটাই সকলের কাজ নয়। এটা একটা কটূ সত্য, এ’কথা আগেই উল্লেখ করেছি। এবং অবশ্যই, তারাই বেশি করে নবারুণের লেখার কাছে ফিরে আসবেন, যারা কোথাও না কোথাও সেই লেখার মধ্যে যে বার্তা, যে চেতনা... তাঁর সঙ্গে একাত্ম বোধ করেছেন। সচেতন-অবচেতনে বুঝতে পেরেছেন ‘এ ফুল-মেঘ নিয়ে ভাল থাকার সময় নয়... মানুষ সারা রাত কাঁদছে, সেই রাতের শেষ নেই’ এই সত্যকে অস্বীকার করে সাহিত্য টিকবে না। আর, একজন মানুষ কেবল এই দিকটা বার বার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছেন। এই অনুভব যাদের ইতিমধ্যে হয়েছে, নবারুণ তাঁদের কাছে নমস্য, নবারুণের লেখা তাদের কাছে আফিমের নেশা, ফিরে আসতেই হবে বার বার... আয়নায় নিজেকে দেখতে, সমাজের কদর্য চেহারাটা দেখতে। ওনার নিজেরই কথা ছিল, ল্যাবেরটরীতে রসায়নিক বিক্রিয়া ঘটিয়ে বিস্ফোরণ করা যায়... ওনার এক্সপেরিমেণ্টেশন সেই বিস্ফোরণের জন্য। সেই কারণেই, কবিতাগুলি এমন জ্বলন্ত। গল্পগুলো আরামকেদারায় বসে বা খাটে শুয়ে শুয়ে গল্প পড়া পাঠক/পাঠিকা-কে বার বার অস্বস্তিতে ফেলবে। উপন্যাসগুলিও খুব বেশি দীর্ঘ নয়... ঠিক যতটা বলার প্রয়োজন, ততটা চিনিয়ে দিয়েই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া এক আখ্যানের মত। আক্ষরিক অর্থেই শ্রাপনেল! বিস্ফোরণের সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে যাবে চারিদিকে -
“চুলকুনিটা দপদপ করে লাফায়, চোয়ালটা ঝুলে পড়েছে... মুখের মধ্যে থুথুর ঘূর্ণী... চোখ দু’টো ঠাণ্ডা... মরা শকুনের চোখ... ট্রিগারের ওপর কালচে নখওয়ালা আঙুল জড়িয়ে আছে... সাপ... জিভ ধারালো ভাঙা দাঁতে লেগে চিরে যাবার মতো তীব্র একটা মুহূর্ত...”

বামপন্থাকে যেভাবে আমরা চিনেছি, মানে পশ্চিমবঙ্গের তারা যারা আশির দশকে জন্মেছে... তারা দেখেছে বামপন্থা মানে বামফ্রণ্ট। বামফ্রণ্ট মানে সিপিএম। আর এদিকে, সে অর্থে খুব কম সাহিত্যিকই বামপন্থার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে সাহিত্য রচনা করেছেন। সমরেশ মজুমদার উপন্যাস বা গল্পে নক্সাল আন্দোলন এবং বামপন্থার সামাজিক মূল্যায়নের ছবি অনেক জায়গায় ফুটে উঠলেও তার বেশির ভাগটাই বাণিজ্যিক সফল উপন্যাসের রসদ নিয়ে চলেছে ভেতরে। মূল বামপন্থাকে মেরুদণ্ড করে এগোয়নি কখনও। আর হাতে গোণা যাদের লেখার মধ্যে বামপন্থার বোধ পাওয়া যায়, তাঁদের একজন মহাশ্বেতা দেবী। মহাশ্বেতা দেবীর লেখায় ভীষণ ভাবে এসেছে শ্রেণী আন্দোলনের কথা, বিদ্রোহের কথা, নক্সাল আন্দোলনের ইতিহাস। আর হয়ত সেই ধারারই উত্তরাধিকার থেকে ওনার পুত্র নবারুণের মনে এসেছিল বামপন্থি রাজনৈতিক চেতনা ভ্রুণ। নবারুণ ভট্টাচার্যের সচেষ্ট ভাবে বামপন্থাকে চিনিয়ে দেওয়ার যে অঙ্গীকার, তা বার বার লেখার মধ্যে ফুটে উঠেছে। উনি যেন বুঝতে পারতেন... কলকাতা শহরে বসে, বা পশ্চিমবাংলার জেলায়, সদরে বসে মানুষজন বামপন্থা বলে যাকে চিনছে, তা কতটা বিচ্যুতির পথে... ভীষণ প্রয়োজন পৃথিবী জুড়ে বামপন্থার বিবর্তন আর আসল চেহারাটা তাদের দেখানো। তাই শহরের বাইরে এখানে ওখানে জমে থাকা বামপন্থী মনোভাবের উল্লেখ ফিরে ফিরে আসে। বিদ্রোহ যে কোনও প্রতিষ্ঠিত দলের সম্পত্তি বা দায়বদ্ধতা নয়, তাও বুঝিয়ে দেওয়া হয়। যেন আমরা কখনও অধিকার পাওয়ার প্রত্যাশা এমন ভাবে না করি, যে কোন রাজনৈতিক দল তা আমাদের পাইয়ে দেবে। রাজনৈতিক দল হলেই ক্রমে তা সুবিধাবাদী মানুষের প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠান এলেই পুঁজিবাদের গন্ধ লেগে যাবে একসময়... তা সে দল যদি বামপন্থীও হয় তাও। ক্ষমতা এবং মসনদে বসা ব্যাপারটাও একই রকম। না হ’লে প্রাণের বন্ধু ফিদেল এর সঙ্গে চে’র দূরত্ব কেনই বা তৈরী হ’ত? শতাব্দীব্যাপী (আসলে তারও অনেক পুরন, বিংশ শতাব্দী ঐতিহাসিক ভাবে সারা বিশ্বে বেশি প্রাসঙ্গিক) বামপন্থার যে জোয়ার... বলশেভিক আন্দোলন, লং মার্চ, ভিয়েতনাম, কিউবা এবং ভারতবর্ষেও এদিক ওদিক স্ফুলিঙ্গ জ্বলে ওঠা... তা সত্ত্বেও যে শেষের দিকে এসে সোভিয়েত সাম্রাজ্যের পতন, ভারতে কমিউনিস্ট মনোভাবের অবক্ষয়... পৃথিবী জুড়ে ধীরে ধীরে বামপন্থার হারিয়ে যাওয়া (বলা চলে সুবিধাবাদী পুঁজিবাদীদের বাকি সব কিছু গ্রাস করে নেওয়া), এর মধ্যেও নবারুণ অদ্ভুত ভাবে আশাবাদী। এই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর কিছু করা বা না করার ওপর যে স্পিরিট অফ কমিউনিজ্‌ম আদৌ নির্ভর করে না, এবং করবেও না কোনওদিন... এ কথাটা স্পষ্ট জানিয়ে গেছেন তিনি। ইন্দোনেশিয়ার কথা বলতে গিয়েই, '৯৮৬৪৪'-এ একটা গল্পের মাঝে উঠে এসেছে ১৯৬৭-এ কি করে প্রেসিডেন্ট সুহার্তো-র আমলে বিদেশী লগ্নিকরণের পুঁজিবাদী ধারা ইন্দোনেশিয়ায় দানা বাঁধছে। "চালু হ'ল ফরেইন ইনভেস্টমেণ্টস... শুরু হ'ল কিকব্যাক, ঘুষ ও ফ্রাঞ্চাইসি বিতরণের খেলা।" ওটা না’হয় ইন্দোনেশিয়ার প্রসঙ্গ, কিন্তু পাঠকেরা একটু ভাবুন তো? স্বাধীনতার পর যে ভারতবর্ষ, বিশেষ করে গত ত্রিশবছরে দেশের যে বাণিজ্যনীতি এবং অর্থনৈতিক কৌশল, তাহ’লে ওই ইন্দোনেশিয়া পালটে ইন্ডিয়া লিখলেও কি বড় বেশি ভুল হবে? অথচ ইন্দোনেশিয়ার মত কমিউনিস্ট নিধন কিন্তু এদেশের ইতিহাসে হয় নি। শোষণ চললেও হয় নি... কারণ সেইরকম শক্তিশালী বামপন্থী আন্দোলনেরও নজির নেই। যা আছে, তা বিচ্ছিন্ন আন্দোলন (যা ঐক্যবদ্ধ দূরদর্শী নয়) অথবা রাজনৈতিক দলের ঝাণ্ডা ওড়ানো। লাল ঝাণ্ডা থেকে হালাল ঝাণ্ডা। রাজনৈতিক দলের লাগানো লাল ঝাণ্ডা কে তাই ভালুকের মত নাচতে নাচতে গিনি বলে ‘হালাল ঝাণ্ডা... হালাল ঝাণ্ডা’। কাকতাড়ুয়া নীরবে সব কিছু দেখতে থাকে... সব কিছুই বোঝে, নিজের মত করে –
“ ঠাকুর ধর্মনাথ ভোটে দাঁড়াবে বলে জানা গেছে... হেডলাইটের ঝলসানো আলোয় দেখা যায় খাকি শার্ট পরা একচোখা কাকতাড়ুয়া দাঁত বার করে হিহি করে হাসছে... কাকতাড়ুয়ার ভোট নেই।”

" 'পারাং' - একরকমের দেশি কুঠার। কমিউনিস্টদের কান বস্তা করে জমা পড়ত পুরস্কারের লোভে। সারা দুনিয়ে গণতন্ত্রপ্রেমী খানকির ছেলেগুলো মুখে লুপ লাগিয়ে বসেছিল।" ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্ট আন্দোলন, আর গনহত্যার ইতিহাসের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনও ইতিহাসবিদ হয়ত এই ভাবে লিখতে পারবেন না। ওটা নবারুণ, এবং এই কেবল নবারুণই পারতেন... পলিটিকালি কারেক্ট সেলফ প্রোক্লেমড ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালীদের দ্বারা হবে না। আর ওটা যদি কেউ করতে চানও এখন, নবারুণপন্থী হয়ে... তাহ'লেও তার কতটা সৎ আর কতটা অনুকরণ তা স্পষ্ট বোঝা যাবে, অন্ততঃ 'ফ্যাৎ ফ্যাৎ সাঁই সাঁই' মার্গে উদ্বুদ্ধ নবারুণ-পাঠকরা ঠিক ধরে ফেলবেন। নবারুণ ভট্টাচার্যের একাধিক কাজের মধ্যে দিয়ে এই ভাবেই বিদেশের প্রেক্ষাপটগুলো দেখার চেষ্টাটা থেকে গেছে। সে যে সবসময় ঠাস বামপন্থী দৃষ্টি, তা নয়। বামপন্থা ঘুরে ফিরে এসেছে ঠিকই... তবে তা এসেছে তৎকালীন সামাজিক পরিকাঠামোর মধ্যেই, কিংবা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। সোভিয়েতের ভাঙনের জের চলে আসে কথোপকথনে, রাষ্ট্রের স্বপ্নভঙ্গের এক ভিন্ন ছবি... ‘নেকলেস’ গল্পের মধ্যেই, যেখানে কেজিবির কথা উঠে এসেছে - ঘুমিয়ে সময় কাটাচ্ছে, জেগে উঠে ভাবছে ভাল কিছু দেখবে। আসলে ‘নেকলেস’ গল্পটা জুড়েই এরকম বাইরের জানলা দিয়ে নানারকম আলো-বাতাস এসেছে... কখনও হাম্ফ্রি বোগার্ট, তো কখনও ‘ফা জিন’, কখনও ৭০০ বছরের পুরনো ঘরানা উ দাং শন। আবার কোথাও অন্য কোনও গল্পের ফাঁকে এসেছে জাপানী স্কচ ‘সান্তোরি’ কিংবা চীনের সিগারেট ‘হংতাশান’-এর কথা। গল্প কিংবা উপন্যাসের সংখ্যা হয়ত বিশাল নয়, কিন্তু তাও যা রয়েছে... আর তাঁর মধ্যে নবারুণ ভট্টাচার্যের অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং জ্ঞানের যে প্রতিফলন ফুটে ওঠে তা আন্তরিক শ্রদ্ধা দাবী করে। সত্যজিৎ রায়ের গল্পে সিধু জ্যাঠা চরিত্রের রূপায়ন অনেকেই বলেন ওটা সত্যজিৎ রায়ের নিজেরই একটা দিক – মনের জানলাটা খুলে রেখে দেওয়া, যাতে বাইরের আলো-বাতাস ঢোকে। তাহ’লে নবারুণ ভট্টাচার্যই বা সেই সিধু জ্যাঠার থেকে কোন অংশে কম হলেন? বাংলা সাহিত্যে সমসাময়িক অন্য সকলের লেখার মধ্যে, কেবলমাত্র Diversity of International Topics -এর জন্যেই ভীষণ ভাবে নবারুণ স্বতন্ত্র হয়ে থাকতে পারেন। কতটা পড়াশুনো এবং তার মধ্যে দিয়ে একটা চেতনার অর্জন ঘটলে যে কলম ধরার সৎ-সাহস নিজে থেকেই দুঃসাহস হয়ে উঠতে পারে, তা এই পোড়া দেশে একটা নবারুণ এসেছিল বলেই অনেক হতভাগ্য জানতে পেরেছে (স্বীকার করবে কি না সেটা পরের কথা)।


তখন আমাদের ফ্যাকাশে চোখে ঘুম আসে
স্বপ্নের ঝাঁকুনিতে আমরা থরথর করে কাঁপি
আমাদের নিয়ে রাত চলতে থাকে

রাত একটা পুলিশভ্যান
রাত একটা কালো পুলিশভ্যান

এই দুঃসাহসিকতাই সমাজের গভীর থেকে গভীরতর ক্ষতগুলোকে বার বার ফিরিয়ে এনেছে আমাদের চোখের সামনে। ‘কালো পুলিশভ্যান’ চিনতে কলকাতার মানুষের সত্তর দশক দেখা বোধহয় খুব জরুরি নয়। আর রাজনৈতিক দলের জবরদখল করা বামপন্থার যে রোম্যান্টিসিজ্‌ম, তার সেই ব্যর্থ চেষ্টার বাইরে রাতে চিরে এগোনো পুলিশভ্যানের ভেতরের স্বপ্নগুলোকে রেখে যাওয়ার দুঃসাহসটা দেখাতে পেরেছিলেন নবারুণ। সেই প্রশাসন-বিরোধীতা, মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার, অধিকারের জন্য লড়াই... সে ফিরে ফিরে আসবেই এক দেশ থেকে আর এক দেশের সাহিত্যিকের কলমে, শিল্পীর তুলির টানে, কবির চিন্তায়... কিন্তু নবারুণের উদ্দেশ্যই ছিল জ্বলন্ত কয়লার টুকরো গুলোকে জ্বলন্ত অবস্থাতেই আমাদের সামনে এনে ফেলা। যাতে দেখলে বোঝা যায়, জ্বলন্ত অবস্থায় সেটা কেমন লাগে রাতের অন্ধকার। দিনের ছাইটা তো সংবাদ পত্রের সাজানো খবরেই পড়ে নেবে লোকজন চা খেতে খেতে।
আর, তারই সঙ্গে থেকে গেছে লেখার মধ্যেও একটা ভাঙা-গড়ার খেলা, এক স্বতন্ত্র পরিবেষণ যা নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক মানের। টয় গল্পে একটি ছোট ছেলে ইমার্শন হিটার দিয়ে অ্যাকুয়ারিয়ামের সব মাছ মেরে ফেলছে... আর তার সঙ্গেই লাগসই ভাবে জুড়ে দেওয়া ইংল্যাণ্ড এবং ফ্রান্সে হত্যাপরাধী শিশুদের কথা, যারা ঠাণ্ডা মাথায় নির্লিপ্ত ভাবে হত্যার বর্ণনা দিয়েছে। সাধারণ মা-বাবার পিলে চমকে উঠতে পারে... কিন্তু ছেলেটির বাবা-মা নিশ্চিন্ত হ’তে পারছে। ঠিক যে ভাবে, আমরাও নিশ্চিন্ত থাকি, আমাদের চারপাশে প্রতিদিনের নৃশংসতা দিনের পর দিন দেখতে দেখতে। আরও বেশি মনে থেকে যায় শেষ রাতে গল্পের সেই শেষ ক’টা লাইন যেখানে পাঠকের কানে ‘হরিবোল’ ধ্বনির মাঝেই ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে “এত জল নিয়ে ভিজে ভারী ফুলে ওঠা রাত কোনো একটা বেওয়ারিশ তারিখহীন ঘোলাটে সকালের দিকে চলেছে... কাল হয়তো কোনো বিশেষ ঘটনা ঘটবে না... আবার কাল তো তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধও শুরু হতে পারে।” আর এসবের সঙ্গেই পাল্লা দিয়ে চলেছে জানিয়ে দেওয়া, বুঝিয়ে দেওয়া, মনে করিয়ে দেওয়া... চোখে আঙুল দিয়ে দেখানোর প্রক্রিয়াকে আরও তীব্র করে তোলা, আরও ঝাঁঝালো করে তোলা। নাকের সামনে অ্যামোনিয়া না ধরলে হুঁস ফিরবে না। যেখানে শকের দরকার, সেখানে হৃৎপিণ্ডের ছন্দ ফিরিয়ে আনার জন্য শকই দিতে বলে চিকিৎসা বিজ্ঞান। আর নবারুন-সাহিত্য জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে এমনই সব শক্যুমেন্টরি। ঠিক যতটা বলা দরকার ততটাই কথা। যে প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড়াতে চাইছে না লোকে সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে ছেড়ে দেওয়া। যে দৃশ্যটা দেখে মুখ ফিরিয়ে নেব আমরা, সেই দৃশ্যটাকেই একদম বিস্তারিত ভাবে চোখের সামনে তুলে ধরা। ‘হালাল ঝাণ্ডা’-য় গিনির পায়ের মালাই চাকি কেটে প্ল্যাটিনামের চাকতি উপড়ে নিয়ে যাওয়ার ওই বিবরণ, কেবল ওনার হাতেই সম্ভব। উনিই পারতেন ‘৪+১’ গল্পে লাশ এবং শববাহকদের মাধ্যমে আমাদের অতগুলো প্রশ্নের সামনে এসে দাড় করিয়ে দিতে। সমস্ত দুঃসাহস, ক্লাস, চরম টাইমিং সেন্স নিয়ে নবারুণ ভট্টাচার্য নিজের সৃষ্টিগুলোর মধ্যেই নিজে একটা এনিগ্‌মা। তাঁকে শ্রদ্ধা বা সম্মান করা যায়, কিন্তু তাঁর ঘরানাকে ধরে তাঁর মত করে লেখার চেষ্টা আর বোধহয় সম্ভব নয় (অন্ততঃ এখন তো একেবারেই নয়)। কারণ তার জন্য সবার আগে দরকার ওই চেতনা এবং বোধ কে লালন করতে শেখা, যেটা না থাকলে বাকি সবটাই কৃত্তিম অথবা দেখনদারি অনুকরণ মাত্র।


তখন আমৃত্যু লিখে যাব প্রতিবাদ
উন্মত্ত হিংস্র ও ক্রুদ্ধ নিরবধি
এ যদি সমাজ হয়
তবে আমি সমাজবিরোধী।

ঐ দেখো, সকালের পূব
জ্বলে যাচ্ছে নিশানের লালে
বিপ্লবের মৃত্যু হয় না জিভ কেটে নিলে
বা ফাঁসিতে ঝোলালে।

নবারুণ ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক অবস্থান, এবং তার মতামত নিয়ে কোনও দিনই দ্বিচারিতা দেখা যায় নি। হয়ত সেই কারণেই আশ্চর্যজনক ভাবে জীবদ্দশায় বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলিও তাকে কাছে পায়নি (বা নিজেরাও কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করেনি সেভাবে), এবং এখনও ওনার রাজনৈতিক মতামত নিয়ে বিস্তারে আলোচনা করতে গিয়ে একটু ভাববেন, হয়ত কিছু কথা সচেতন ভাবিয়ে এড়িয়ে যাবেন বর্তমান পরিস্থিতিতে। হারবার্ট-এর ওপর চলচ্চিত্র সমলোচিত হয়েছিল, কাঙালমালশাট-এর ওপর চলচ্চিত্রটি মুক্তিই পেলো না (বলা যায় মুক্তি পেতে দেওয়া হ’ল না)। পরিচালক সুমন মুখোপাধ্যায় স্বাধীন ভাবে (বলা যায় বেসরকারী ভাবে) আন্তর্জালে ছড়িয়ে দিতে পারতেন... কিন্তু জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে শত্রুতা করা বিবেচকের কাজ বলে মন হয়নি ওনার (স্বাভাবিক ভাবেই)। সুতরাং বোঝাই যায়, সেই খানে দাঁড়িয়ে মসোলিয়াম, খেলনা নগর কিংবা যুদ্ধ পরিস্থিতির মত উপন্যাস নিয়ে কাজ কি প্রভাব ফেলতে পারে!
সোভিয়েতের পতনকে উনি সরাসরি কমিউনিস্টযুগের অবসান বলে মেনে নিতে না চাইলেও, যেভাবে 'Post Communism era' বলে একবিংশ শতাব্দীকে চিহ্নিত করতেন, তাতে স্পষ্ট বোঝা যেত, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কি ভাবে ওনার ওপর প্রভাব ফেলেছিল। স্বপ্নভঙ্গের হতাশা স্পষ্ট।
“পৃথিবীকে বেশ কয়েকশো বার জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক্‌ করে দেওয়া যায় এরকম কয়েক হাজার নিউক্লিয়ার মিসাইল তাদের সাইলোতে ঘুমিয়ে থাকল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দেবার মতো বিশাল সামরিক বাহিনী, পুলিশ, কেজিবি, লক্ষ লক্ষ পার্টি সদস্য সব হয়ে গেল ঠুঁটো জগন্নাথ। ঘটনাটিকে আমরা বিশ্বের বৃহত্তম প্যারালিসিস বলে অভিহিত করতে পারি।” – ঠিক এই কথা গুলোই পেয়েছি আমরা ‘পৃথিবী শেষ কমিউনিস্ট’ গল্পের শুরুতে। অথচ একই সঙ্গে তার প্রতিটা গল্পে-উপন্যাসে প্রশাসন, শাসক এবং শোষকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব কে জাগিয়ে তোলার আহ্বান দেখতে পাই। দেখতে পাই সশস্ত্র বিপ্লবকে সমর্থনের সরাসরি স্বীকারোক্তি। ‘৯/১১’, ‘টেররিস্ট’, ‘চীন ২০০২’, ‘কাকতাড়ুয়া’, ‘প্রতিবিল্পব দীর্ঘজীবী হোক’... এমন গল্পগুলোয় খুব স্পষ্টভাবে সেই সমর্থনের ইঙ্গিত নজরে আসে। এবং একসময় সাক্ষাৎকারেও সরাসরি বলেছেন (মাওবাদী আন্দোলন, কিষেনজী বা ছত্রধর মাহাতো প্রসঙ্গে) – প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে এমন বিপ্লব, আন্দোলন আসবেই। যাদের লড়ার ক্ষমতা আছে, অস্ত্র আছে তাড়া সেই ভাবেই লড়বে। ও কোনওদিনই বন্ধ হবে না... বন্ধ হওয়ার নয়।
হয়ত বিভিন্ন দেশে এইভাবে লালিত বিদ্রোহ (তার সশস্ত্র হওয়ায় রাষ্ট্রের কতটা মঙ্গল সে ভিন্ন বিতর্কের বিষয়) এবং বামপন্থী লড়াইয়ের রোমান্টিসিজ্‌মকে জিইয়ে রাখার ইচ্ছে (যা প্রকৃত অর্থে তাঁদের হাত ধরে এসেছে যারা বামপন্থা জনক কিংবা ধারক এক একটি রাষ্ট্রে) নবারুণকে অনুপ্রেরণা জাগিয়েছে সৃষ্টি করতে। হয়ত এই অনুপ্রেরণার মধ্যেই উনি আশাবাদী হ’তে পারতেন বামপন্থার এই চরম দুঃসময়... যেখানে বামপন্থা/পুঁজিবাদী নিয়ে ভাবারই সময় নেই সুবিধাবাদী হয়ে উঠতে অভ্যস্ত নিউক্লিয়ার সমাজের। সেখানেও বসেও তিনি স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস দেখিয়েছেন, সেই দিনটির যা ২০২০ তে আসবে... যেদিন থেকে দুনিয়া কাঁপানো দশহাজার দিনের সূচনা হবে বলে এক বামপন্থী মুষ্টিবদ্ধ শপথকে বাঁচিয়ে রাখা, এক পবিত্র বামপন্থীর স্বপ্নে।

নবারুণ ভট্টাচার্য, কিংবা নবারুণ-সাহিত্য নিয়ে কিছু লিখতে গেলে, বা প্রকাশ করতে গেলেও হাড়ে হাড়ে অনুভব করি... উনি যা নিজে রেখে গেছেন, তার মধ্যেই সব বলা আছে। আর উনি নিজেই নিজের মনের কথা যে ভাবে রেখে গেছেন, অন্য কেউ তার থেকে বেশি কিছু ওনার অবর্তমানে বলতে পারবে না সেভাবে। স্মৃতি ভাগ করে নিতে পারে, কিংবা ব্যক্তিগত ধারণা (যেমন হয়ত আমি করলাম)। কিন্তু নবারুণ-এর বিশ্লেষণের কাজটা করতে গেলে সেই গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোই করা হবে। প্রতিটা কবিতা, গল্প এবং ওনার সাক্ষাৎকারের মধ্যে দিয়ে ওনাকে ফিরে দেখা, আমাদের মাঝে সচেতন ভাবে এই সূর্যকে বাঁচিয়ে রাখা, মনের মাঝে লালন করার প্রয়াস (কেবল প্রয়াসই, কারণ আগুন ধরে রাখার মত মন সকলের হয় না... সে প্রত্যাশা বাতুলতা মাত্র)। উনি পেরেছিলেন... রাজনৈতিক দলের জবরদখলে থাকা বামপন্থা, কারখানা ধর্মঘট বা কলেজ ইউনিয়নের ছেলেখেলা হয়ে যাওয়া ‘ইনকিলাব’-এর লাল ঝাণ্ডাকে অন্য ভাবে পাঠকের অন্দরমহল অবধি ঠেলে দিতে, যাতে উদাসীনতাটা কিছুটা হলেও কমে। সব কিছু বলে দেওয়া বা বুঝিয়ে দেওয়া হবে না। প্রশ্ন থাকবে, ফাঁক থাকবে দু’টো কথার মাঝে... তার মধ্যে দিয়েই মানুষকে পথ খুঁজে পেতে হবে... গল্পের মধ্যে গল্প... তার মধ্যে বেঁচে থাকা। বাংলা সাহিত্যে একেবারে স্বতন্ত্র এক ঘরানার মালিক নবারুণ ভট্টাচার্যের ছিল সৎ প্রয়াস, এবং প্রত্যাশাহীন ভাবে নিজের কাজটা আমাদের কাছে রেখে যাওয়ার ইচ্ছে... যার মধ্যে মানুষের নিজেকে আর সমাজকে দেখার এবং চেনার সৎ সাহসটা যেন বেঁচে থাকে। সাহিত্যবাণিজ্যের রাজধানীতে একরকম এক পেশে বামপন্থী সাহিত্যিকের তকমা নিয়ে, এবং ডেডিকেটেড নবারুণ-পাঠকদের মধ্যেই আলোচিত থেকে যাওয়া নবারুণ... তাঁকেও বৃহত্তর সমাজের উদাসীনতা বা জনসাধারণের এইভাবে চেতনালুপ্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের দাশ হয়ে থাকা, ঘুণ পোকার মত কষ্ট দিতো। আর সেই আক্ষেপ আর কষ্টগুলোই তিনি রক্তক্ষরনের মত পাতায় পাতায় রেখে গেছেন... প্রজন্মের জন্য, আগামীর জন্য।

আমি জানি
খুব ভাল লিখলেও
একটাও ফাঁসি
থামানো যাবে না
আমি জানি
গরিবদের ভয় দেখানোর জন্য
এই সব কিছু...