তোমাদের কী শীত করছে এমন?

অনীক রুদ্র

যথাস্থিতির পরিধি ছাড়িয়ে এই দেখা, জাড্য অতিক্রান্ত কবিকে যা নিয়ে যায় চিরস্পর্শী গভীরতার অনুভবে। মানুষের প্রতি, দেশ ও সামাজিক বিপন্নতা কিংবা রাষ্ট্রব্যবস্থার ভয়ঙ্কর ও করুণতরো সংকটে, নিজস্ব ঢঙে, ভঙ্গি ও ভাষায় তিনি প্রতিস্পর্ধী রচনা করে যান ‘শীতে জমে মরে-যাওয়া বুড়ো ভিখিরির গান’— কবিতা থেকে যা ছুঁতে চাইছে গানের ব্যপ্তি অথবা আর্তি।
‘তোমাদের কী শীত করছে এমন
বা শুধুই আমার’

কিন্তু বুড়ো ভিখিরির জন্য সময় শেষ তখন, সূচিত তার মৃত্যুবার্তা যখন ঠাণ্ডায় জমে গেছে গীটার, ক্যারল নিভে যায় শহরের হ্যালজেন, নিয়ন। অন্য আর এক প্রবীন শীতে যে বৃদ্ধ মানুষটি আত্মরক্ষার্থে জড়িয়ে নিয়েছিল নির্বাচনী পোস্টার, ছেঁড়া পলিথিন ব্যাগ, পতাকার কাপড় তার পাঁজর ঘিরে। এন-জি-ওরা তো জানে না তার জন্য এই শীতে দরকার ছিল হয়ত একখানি ‘সহৃদয় কম্বল’ বা নিদেন পক্ষে সাহেবদের বাতিল কোন জামা... এবং এই কালান্তর শীতে জমে মৃত্যুর ঘন্টাধ্বনি অনুভব করছে সে এখন। একজন বৃদ্ধ সম্বলসহায়হীন আর্ত ভিখিরি রাজধানী শহর দিল্লিতে ফুটপাথের কোন এক কোণে প্রবল ঠাণ্ডায় জমে মরে যাচ্ছে। খুব অনন্য কোন দৃশ্য বা দৃশ্যান্তর? প্রকৃতির প্রকোপে গ্রীষ্ম, শীত, বা বর্ষীয় অসম যুদ্ধে আমাদের দেশে মানুষ কি মরে না?

কয়েকবছর আগের একটা শীতে কবি তখন দিল্লিতে, থার্মোমিটার বা তাপমানযন্ত্রের পারদ যখন বেশ নিম্নগামী, বেশ কিছু আশ্রয়হীন, গৃহহারা মানুষ সেই শীতের প্রকোপে সারা উত্তরভারত জুড়ে যাদের মৃত্যু ঘটেছিল। আমাদের এই বুড়ো ভিখিরিও তাদের মতো একটি সংখ্যা ছিলেন। তার চলভাষ যন্ত্র থেকে কোলকাতায় একটা সকালে কম্পিত কন্ঠে ব্যথিত নবারুণ আমাকে জানিয়েছিলেন এই মর্মান্তিক সংবাদ। এক নাচার বৃদ্ধের তিল-তিল করে দেখা সেই মৃত্যু দৃশ্য কবিকে কি মারাত্মক ভাবেই না বিড়ম্বিত ও বিচলিত করেছিল যার অব্যবহিত পরেই তিনি রচনা করেন এই কবিতা। যা আসলে বুড়ো ভিখিরির ‘গান’ নামে প্রকাশিত হয়। নবারুণের দীর্ঘ কয়েকটি কবিতার সংকলনে যা ‘অতন্দ্র বিমান’ শিরোনামের একটি কাব্যগ্রন্থে সম্প্রতি পাওয়া যাচ্ছে।

নির্মাণশৈলীর ক্ষেত্রে কবির অনুকরণীয় ভক্তির নিজস্বতা, শ্লেষপ্রয়োগ বা ততোধিক আকর্ষণীয় হাড়-হিমকরা মৃত্যুদৃশ্যের এমন বর্ণনা প্রায় ক্যালাইডোস্কোপিক। ঘটনা ও তজ্জনিত দৃশ্যানুষঙ্গের উপস্থাপনা হয়ত পুনারুধুনিক নবারুণকে এভাবেই মানায়। পণ্ডিতেরা বা প্রথাগত সাহিত্য-আলোচকরা অনেকেই বিশ্বাস করেন, নিজের অনুভবকে সর্বজনীন করে তোলার সার্থকতাই কবিতারও কঠিন কাজ। তাই নির্মাণ বিষয়ে তার কথনভঙ্গি, মারাত্মক সংশ্লিষ্ট ঘটনাপুঞ্জের কোলাজ বানানোর মধ্য দিয়ে শৈত্যপ্রাবল্যে এক বৃদ্ধের মৃত্যুর আগে যে তীব্র যন্ত্রণা, তার ধারাভাষ্যে যার নাম দিলেন কবি ‘গান’, হয়ে উঠলো সাংকেতিক এবং সাংঘাতিক, স্তব্ধ বিমূঢ় করে দেওয়ার মতো। পাঠককেও তিনি সরাসরি জানাতে চাইলেন
‘তোমাদেরও কী শীত করছে এমন’


এই যে প্রশ্ন চিহ্ন, যা আমাদের ভীত, সন্ত্রস্ত ও বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেয় বা দেবে! কালান্তক এ শীতলতার সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে। অসম যুদ্ধ মেনে নিয়েও একজনের বেঁচে থাকার চিৎকার যা কিনা অন্য অর্থে চিৎকৃতও নয়; আমাদের দেশের শহর বা প্রান্তিক গ্রামের বাস্তবতা। সামাজিক ও রাজনীতিক অবস্থানকে ঝাঁকিয়ে দিতে পারে। ঘুরে ফিরে যাচাই করে জমাট হয়ে ওঠা অবশ্যম্ভাবী কোন মৃত্যুযন্ত্রণা।

না, এই কবিতা মৃত্যু-চেতনার শুধু নয়, বাঁচতে শেখানোরও সঙ্গীত। উঠে দাঁড়াও বন্ধু। সব যুদ্ধ যেতা যায়না আর যুদ্ধ তো থামেনা নবারুণের কবিতায়।

শীতে জমে মরে যাওয়া বুড়ো ভিখিরি গান

সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার
তোমাদের কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার

ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে নাক দিয়ে
ছুটে যাচ্ছে কত অশ্বশক্তির গাড়ি
গাড়ির কাঁচের মধ্যে সফল আমিষ
অ্যালকোহলের ওমে দ্রুততর লয়ে চলা নাড়ি

হেডলাইটের ঐ দুর্ধর্ষ আলো
কিছুটা মাখতে পারলে লাগত বা ভালো
কিন্তু সময় শেষ বুড়ো ভিখিরির জন্যে
অত শত গাড়ির থামার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার


গির্জায় নিথর ঘণ্টা
ঠাণ্ডায় জমে গেছে গিটার, ক্যারোল
নিভে গেছে শহরের হ্যালোজেন, নিয়ন
বহুতল ক্যাসেরোলে মোবাইল ডাকে
অথচ বাজতে গিয়ে থেমে গেছে ফুটপাথে
ড্রামসেট, ব্যাঞ্জো ও তুখোড় ড্রামার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার

এবং আগের বা অন্য প্রবীণ শীতে
জড়িয়েছি পাঁজর ঘিরে
নির্বাচনী পোস্টার, ছেঁড়া পলিব্যাগ,
পতাকার কাপড়
লেপটে, বেঁধেছি দিয়ে
ফেলে দেওয়া দড়ি বা কখনও কুড়োনো
ক্যাসেটের ফিতে
এন.জি.ও.-রা কী জানে যে আমার
আর দরকার নেই সহৃদয় কম্বল
বা সাহেবদের বাতিল জামার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার
গাছেদের কী শীত করছে এমন
কুকুরদেরও কী শীত করছে এমন
রাস্তা, সিনেমাহল, টিপকল, রেস্তোরাঁ, বিউটি পার্লার
সকলেরই কী শীত করছে এমন
মথ, পাখি, মেঘ, মদ, গ্রহ
সবারই কী শীত করছে এমন
শীত কী এমনই থাকছে বুকে, পিঠে ভালবেসে, ঘেঁষে
শীত কী ফুঁপিয়ে কাঁদছে, কখনও বা চুপ ম্লান হেসে।
কি মেডেল জিতে নেবে শীত
সোনা, রুপো, ব্রোঞ্জ না তামার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার

বুড়ো ভিখিরির এই জমে মরে যাওয়া গানে
রক্তের সব লোহা মন্ত্রমুগ্ধ জড়ো হয় সমুদ্রের টানে
সেই স্রোতে সাংকেতিক, সামুদ্রিক, চোরা
সহসা জমাট হয়ে নির্বাক আকার নেওয়া স্বচ্ছ ফোয়ারা
থার্মোমিটারের পারা শুধুই শিখেছে খেলা
তলায় নামার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার

যে অবস্থায় ভাপ-ওঠা দুধ, সুপ বা চা
বা স্রেফ গরম জলই খেতে ভালো লাগে
সে অবস্থাটাও আমি পেরিয়ে এসেছি
পেরিয়ে এসেছি একটু আগে
ঠাণ্ডায় গাঢ় ঢেউ বয়ে চলেছেই
যেভাবে সীমান্ত পেরিয়ে চলে যায় ঠাণ্ডা রেলের লাইন
যেভাবে চলে যায় যুদ্ধ বন্দীদের নিয়ে ঠাণ্ডা কামরা
সেভাবেই পৌঁছতে অভ্যস্ত আমরা
যেখানে কাঁটাতার নেই, পুলিশের লাথি নেই
প্রয়োজন নেই পবিত্র ভোটপত্র বা হলফনামার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার

মবিল মোছার তুলো, ঘাস, খড়, কুটোকাটা
ফুলের টুক্লির কাঠ, বরবাদ টায়ার, জুতো
সবই আগুন হতে দেখেছি তো
এই বন্ধ চোখে
বুকের উনুন জ্বলে অরন্ধনে, অন্তহীন শোকে
তাও মন্দের ভালো
ছেদচিহ্নটির খুব কাছে
অসাড় মৃত্যু থেকে মুক্তি দেবে বলে
চুল্লি দাঁড়িয়ে আছে
অসাড় মৃত্যু থেকে মুক্তি দেবে বলে
চুল্লি দাঁড়িয়ে আছে
দাউ দাউ আগুনের কোনো দরকার নেই
ফাঁকা উপমার
সবারই কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার
তোমাদেরও কী শীত করছে এমন
না শুধুই আমার।