হাংরি জেনারেশন এবং নবারুণ ভট্টাচার্যঃ তুলনামূলক পাঠ

প্রবুদ্ধ ঘোষ

বাড়ি ভেঙ্গে পড়ার শব্দ তখনই শোনা যায়, যখন তা শোনার জন্যে কেউ থাকে। নবারুণ এই শব্দ শোনানোর কাজটাই করতে চান; সচেতনভাবে। তাঁর অধিকাংশ লেখার কেন্দ্রীয় চরিত্ররা কোনো ‘ইডিওলজি’ বা মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত, তারা রাষ্ট্র-সমাজ নির্মিত হেজিমনি মাথায় নিয়েই দিন গুজরান করে। আর, সাহিত্যের কাজ কী? ক্যাথারসিস করা? মানে, মোক্ষণ? না, বরং নবারুণ বা হাংরিদের লেখা প্রতিমুহূর্তে ক্যাথারসিসের উল্টোদিকে হাঁটে। মোক্ষণ করা, শান্তি দেওয়া তার কাজ নয় বরং আপাতশান্তির বোধটাকে আঘাত করাই মূল উদ্দেশ্য!
‘আমার কোনো ভয় নেই তো?’ গল্পের বীরেন। সমস্ত মধ্যবিত্তের মুখের কথা সে বলেঃ আমার ভয় নেই তো? অথচ, যতই সাবধানে পা ফেলুক, যতই ঘর বাঁচিয়ে সন্তর্পণে ‘সেফ্‌’ থাকার চেষ্টা করুক, মরতে তাকে হবেই। ‘স্টিমরোলার’ গল্পে হঠাৎই যেন পেয়ে যাওয়া বিকল্প রণনীতি। শ্রমের শোষণ আর পুঁজির সামনে অসহায় হেরে যেতে যেতে হঠাৎই জ্বলে উঠে, কোনো এক বিপজ্জনক বিন্দুতে শ্রমিকটি প্রবল আক্রোশে ফেটে পড়ে ও তার শ্রমশক্তি শুষে নেওয়া বিদেশি দামি গাড়িগুলিকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয়। আর, আশ্চর্যভাবে নবারুণের গল্পে দু’শ্রেণির লোক থাকে স্পষ্টতঃ। একদল যারা বিশ্বায়নী বাহুল্যে গা-ভাসিয়ে দেয়। আর, অন্যদিকে তাদেরই বিপরীতে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা কী উৎসাহে বাঁচার রসদ খুঁজে নেয়। সে ভাঙ্গছে নিয়ত, তার সব কিছুই ক্ষয়ে যাচ্ছে, তবুও সে মরছে না। তারা মান্য চলিত ভাষার পরোয়া করে না, তারা উচ্চবিত্তের ‘সফিস্টিকেশন’-এর পরোয়া করে না। তারা শুধু বেঁচে থাকাটা উদ্‌যাপন করে চলে। হ্যাঁ, হয়তো তারা টিঁকবে না, তবুও অসম লড়াইয়ের উদ্‌যাপন। ‘পাঁচুগোপাল’ গল্পে কোনোমতে দিন-গুজরান পাঁচুগোপাল সেই অসম লড়াইয়ের কল্পবাস্তবের মুখ। ‘পাঁচুগোপাল একদিন ওই খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে জলে নোংরা ফেলা বন্ধ করতে বলবে। ওরা শুনবে না। ওকে ধরে মালিকের কাছে নিয়ে যাবে। মালিক জানতে চাইবে ও চোলাই কারখানায় কাজ চায় কিনা। পাঁচুগোপাল ভ্যাটের জালায় থান ইট মারবে। ওরা তখন পাঁচুগোপালকে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেলবে। ও মরবে চোলাইয়ের মালিকের পায়ের তলায়। রক্ত বেরোবে ওর মুখ দিয়ে। ও মরবে।... সুখের কথা যে পাঁচুগোপাল এখনও মরেনি। এখনও ও নিজের মতো করে বেঁচে আছে।’ [পাঁচুগোপাল] বেঁচে থাকার উদ্‌যাপন ও মধ্যবিত্ত অবস্থান থেকে উঠে আসা তীব্র শ্রেণিঘৃণা ’৬০ র দশকের শেষদিকে যুদ্ধবাস্তব সময়ের সুভাষ ঘোষের লেখাতেও দেখি- “প্রত্যেক যুদ্ধরত হিন্দুজেনারেল বুকে হাত দিয়ে বলুন দিকিনি তিনি কী করবেন যদি তাঁর সামনে স্বয়ং ব্যাস-বাল্মীকি এসে দাঁড়ান- বা খ্রিস্টজেনারেলের সামনে স্বয়ং যীশু- বৌদ্ধ সেনানায়কের সামনে গৃহত্যাগী রাজকুমারবুদ্ধ যদি- তিনি কী অস্ত্র সংবরণ করবেন?... এই বধ্যভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে যদি মনে করেন আপনি সংখ্যালঘু- আসুন বুর্জোয়াদের বেডরুম লোপাট করি- ডাইনিং হল লুট করি-”। অথচ, এই যুদ্ধবিরোধিতা যে আদৌ যুদ্ধ থামাতে পারে না, সেটা নিশ্চিত। বস্তুতঃ, কোনো গান-কবিতা-সাহিত্যই কি আদৌ যুদ্ধ রুখতে পারে? এমনকি, এরপরেও মধ্যবিত্ত শ্রেণি যে অবধারিত ‘ইনসিওরেন্স’ এবং সমস্তরকম সুরক্ষার আওতায় থেকে নির্বিঘ্ন জীবনটাই প্রার্থনা করবে, তাও জানা। সেই বীরেনের মতই, ‘আমার কোনো ভয় নেই তো?’ দশকের পর দশক এই আপ্তবাক্য তো চিরন্তন। হাংরিদের বা নবারুণের লেখায় তারই সোচ্চার উচ্চারণ। আর, নবারুণ সেই অন্ধকারের মধ্যেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের মধ্যে অর্গ্যানিক ইণ্টেলেকচুয়াল-এর সন্ধান করেন। যদিও সে পথই যে ‘ঠিক’ এমন কোনো মাথার দিব্যি নেই, কিন্তু সেও একটা পথ। আর, যেকোনো দিন সেই পথেই বিষ্ফোরণটা হতে পারে।


নবারুণের গল্পগুলির অন্যতম প্রধান মোটিফ হচ্ছে মার্ডার এবং অস্বাভাবিক মৃত্যু। বিশেষতঃ, নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষেরা স্বপ্ন দেখতে দেখতেই হঠাৎ যেন হারিয়ে যায়; অথবা, মানুষগুলো মরে যায়, স্বপ্ন মরে না! অথবা, এভাবেও কি ভাবা যেতে পারে যে, তাদের আত্মহত্যা আসলে দৈনন্দিন সমাজের নিয়মগুলোকেই অস্বীকার করা? আর, তাদের মার্ডার হয়ে যাওয়া আদতে রাষ্ট্রের ‘সুশাসন’-কেই চ্যালেঞ্জ জানায়? ‘আমার কোনো ভয় নেই তো?’ গল্পের মধ্যেও এই বাক্যমধ্যবর্তী নীরবতা দশক-মধ্যবর্তী নীরবতায় বদলে যায়, তাই ’৭১-’৭২ সালে কলকাতায় আসা রিভলভার থেকে বেরোনো গুলি ২০০৪ সালের আপাতশান্ত সময়ের এক মধ্যবিত্ত মানসিকতাকে খুন করে। অন্যদিকে, হাংরি জেনারেশনের লেখার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে আত্মাবিষ্কার। হাংরিদের ‘ক্ষুধা’ বিষয়ে তাঁদের নিজস্ব মতামত এই ক্ষুধা আসলে নিজেকে দগ্ধ করে সত্য আবিষ্কারের ক্ষুধা। সত্য, যা ক্রমাগতঃ এমনকি নিজেকেও ছিঁড়েখুঁড়ে উন্মোচিত করে চলে। তাকাই তুষার রায়ের একটি কবিতার দিকে- “দামী সাবান গায়ে ঘষে ঘষেও ফর্সা হতে পারছো না বলে দুঃখ?/ তাহলে কোমরে ব্লেড ঘুরিয়ে দু-হাতে গেঞ্জি তোলো চামড়ার/ অমনি বেরিয়ে পড়বে কি আশ্চর্য আপেল রং রক্তাভ/ আর আজীবন জ্বলুনি থেকেও কি তীব্র তীক্ষ্ণ জ্বালা/ শালা , অথবা আপন মাংসয় দাঁত দিয়ে তুমি আত্মায় পৌঁছও।” [আত্মায় পৌঁছওঃ তুষার]। অথবা, ফাল্গুনী রায়ের কবিতায়, “আমার বুকের ভিতর লোভ অথচ হৃদয় খুঁজতে গিয়ে বুকের ভিতরে/ রক্তমাংসের গন্ধ পাচ্ছি কেবল”।


আজ স্যানিটারি ন্যাপকিন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে; প্রকাশ্যে চুম্বন করে প্রতিবাদ জানানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় বাধানিষেধ ও সমাজের প্রচলিত ‘ট্যাবু’গুলিকে। এই বিদ্রোহ কিন্তু ’৬০ এর দশক থেকেই শুরু করে দিয়েছিলেন ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকেরা। সমস্তরকম গোঁড়ামি এবং ‘ঢাকঢাকগুড়গুড়’ বিষয়ের ভিতে টান মেরেছেন। সাহিত্য বহু আগেই ভবিষ্যতের কোনো এক আন্দোলনের কথা স্বীকার করে যাচ্ছে- তার নিজের মত করে, নিজের প্রকাশে। না, নিশ্চিতভাবেই সাহিত্যের কাজ ভবিষ্যৎদর্শন নয়; কিন্তু হ্যাঁ, সাহিত্যের অন্যতম কাজ ভবিষ্যতের সামাজিক আন্দোলনের, সাহিত্য আন্দোলনের সূত্রগুলোর হদিশ দিয়ে যাওয়া। ফাল্গুনী রায় যখন কবিতায় বলে, ‘শুধুই রাধিকা নয়, গণিকাও ঋতুমতী হয়’, তখন কি আজকের এই আন্দোলনের কথাই মনে হয় না? যেখানে, ঋতুমতী হওয়া কোনো ‘লজ্জা’র বিষয় নয়, ‘অশুদ্ধি’র বিষয় নয়, বরং তা স্বাভাবিক জৈবনিক প্রক্রিয়া। আর, প্রতিমুহূর্তের এই আত্মজৈবনিক বিষয়গুলিই উঠে আসে হাংরি জেনারেশনের লেখায়। বা, সগর্ব্ব মানুষ-প্রমাণ ‘আমি মানুষ একজন প্রেম-পেচ্ছাপ দুটোই করতে পারি’’। এগুলো তো দৈনন্দিন। এগুলো তো স্বাভাবিক। তা’লে? আসলে, ‘শুদ্ধতা’-র একটা অর্থহীন ধোঁয়াশাবোধ তো তৈরি করেই দেয় সমাজ, একটা বর্ডারলাইন। সাহিত্যের নায়ক রক্তমাংসের মতো হবে কিন্তু তার ক্ষুধা-রেচন ইত্যাদি থাকবেনা বা পুরাণচরিত্রদের শারীরবৃত্তীয় কার্য নেই! এই ‘মেকি’ ধারণাসমূহ লালন করে আসা আতুপুতু প্রতিষ্ঠানগুলো যখন হাড়-মজ্জা-বোধ জীবন্ত হতে দেখে তখন ‘অশ্লীল সংস্কৃতি’ ছাপ্পা মারে। সমাজের জড়তা, মধ্যবিত্ত ভণ্ডামির মুখোশগুলো খুলে দেয় টান মেরে। আর, তাই ‘নিষিদ্ধ’, অশ্লীল মনে হয় এদের লেখাগুলি। হাংরি-দের যেখানে মূল বক্তব্যই ছিল প্রতিটি লেখায় ও সাহিত্যযাপনে আত্মউন্মোচন, সেখানে এই বিষয়গুলি স্বাভাবিক বীক্ষাতেই উঠে এসেছে। এবং, ‘সাহিত্য বিক্রির জন্যে আরোপিত যৌনতা’ বনাম ‘শিল্প ও জীবনের সাথে সম্পৃক্ত যৌনতা’ এই বিতর্কের ডিস্‌কোর্স তৈরি করেছে। অন্যদিকে, নবারুণের লেখায় রাজনীতি সচেতনতা অনেক প্রাধান্য পায়। তাঁর প্রতিষ্ঠানবিরোধী লেখার ক্ষেত্রে তিনিও ‘বাজার চাহিদার যোগানে সাহিত্য’ এই ধারণার সঘোষ বিরোধিতা করেছেন। শারীরবৃত্তীয় চাহিদাগুলির সাথে বৌদ্ধিক চাহিদা যে জড়িত, সেটা তাঁর লেখাতেও আসে। তবে, অনেকাংশে আসে রাজনৈতিক অবক্ষয়, অসহায়তা, শ্রেণিচিত্র এবং প্রতিরোধ। নবারুণ যখন ফ্যাতাড়ুর প্রতিটি বচনে, তাদের কর্মকাণ্ডের মধ্যে দিয়েই মধ্যবিত্তের না-পারা গুলোর উন্মুখ উড়ান দেখাতে চান, তখন মনে মনে ফ্যাতাড়ুদের মত সেই কাজগুলি করতে চাওয়া সত্ত্বেও এতদিনের সমাজনির্মিত তথাকথিত সুষ্ঠু ‘সাহিত্যবোধ’ মেনে নিতে পারেনা সেই ভাষা, সেই কর্মকাণ্ড! বড়লোকের গাড়ি দেখলেই টায়ার ফুটো করে দেওয়ার ইচ্ছে, দামি অফিসে গিয়ে হতাশা লুকোতে গদিতে নাক খুঁটে আসা, মেয়ে দেখলেই অবদমিত কামনা জেগে ওঠা কিন্তু ফের ‘ইগো’-র আচরণে পরিশীলিত থাকা, জ্ঞানীগুণীসমাবেশে ভণ্ডলোকেদের ‘সংস্কৃতিবান সাধু’ হয়ে ওঠার বিরুদ্ধে সঘোষ আওয়াজ তোলা মধ্যবিত্তের বৌদ্ধিক স্তরে এগুলো চলতে থাকে। কিন্তু, সে শেষপর্যন্ত নীরব দর্শকের মতই মেনে নেয়; আর, নবারুণ তাঁর গল্পের চরিত্রদের দাঁড় করিয়ে রাখেন এগুলোরই প্রতিবাদে। নিজেদের মত করে বিকল্প রণকৌশল খুঁজে নেয় তারা। সুভাষ ঘোষের গদ্যে থাকে সমস্ত ধড়িবাজ, রাজনীতিবাজ, সঞ্চয়িতাবাজ, পলিসিবাজ, নামকাতুরে মানুষের কথা; যারা আপাতনিশ্চিন্ততার মোড়কে মুড়ে রাখে নিজেদের দৈনন্দিন আর গান্ধীর বাঁদরের মতই কিচ্ছু না-দেখে না-শুনে না-বলে কাটিয়ে দিতে চায় রাত-দিন। আর, প্রাতিষ্ঠানিকতা এদেরই ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে থাকে, নিজেকে ‘শিল্প’ বলে দাবি করে অন্য সম্ভাবনাগুলো নষ্ট করে দেয়। বেঁচে থাকাটা একটা দায় একটা নিয়ম হয়ে ওঠে পণ্যসমাজে। আর, সেই পণ্যসময়ে বেঁচে থেকে কিচ্ছু না-পেয়ে বেঁচে থেকে হতাশার অবিমৃষ্য বোধ তৈরি হয়। ’৬০-’৭০ র দশকের ক্রমাগত অর্থনৈতিক অবক্ষয়, মধ্যবিত্তের আশাহীনতার অভিঘাত নৈরাশ্যের জন্ম দেয়; এমনকি সাহিত্যেও। আর, সেই নৈরাশ্যকে এড়িয়ে গিয়ে কবিতা বা গদ্য লেখা যায় না। অরুণেশ ঘোষ তাঁর ‘কিচ্ছু নেই’ সময়কে লিখছেন- ‘১ পাগল এই শহরের চূড়ায় উড়িয়ে দিয়েছে তার লেঙ্গট/ ১ সিফিলিস রুগী পতাকা হাতে মিছিলের আগে/ ১ রোবট নিজেকে মনে করে আগামীকালের শাসক/ ১ মূর্খ ঘুমিয়ে থাকে শহর-শুদ্ধ জেগে ওঠার সময়... শীতের ভোর রাত্রে- মধ্যবিত্তের স্বপ্নহীনতার ভেতর/ আমাকে দেখে হো হো করে হেসে ওঠে বেশ্যাপাড়ার মেয়েরা’। এই স্বপ্নহীনতাকে বাড়িয়ে তোলে পুঁজিবাদের দমবন্ধ চেপে বসা। ভারতের তথা বাংলার অর্থনীতি-মডেলকে সাজানোর দোহাই দিয়ে বিদেশি শস্যবীজ এবং সবুজ বিপ্লবের সাথেই আমদানি হয় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা। আর, নগরায়ণের মুখ খুলতে থাকে। ’৯০ র দশকের পরে যে বীভৎস হাঁ-তে ঢুকে যেতে থাকবে ভারতবর্ষের একের পর এক গ্রাম-মফস্বল।


১৯৬৮ সালে বিনয় ঘোষ ‘কলকাতার তরুণের মন’ নামক প্রবন্ধে লিখছেন- “গোলামরা সব উঁচুদরের ঊর্ধ্বলোকের গোলাম, আগেকার কালের মতো তাঁদের হাত-পায়ের ডাণ্ডাবেড়ি দেখা যায় না। তাঁদের ‘স্টেটাস’ আছে, ‘কমফর্ট’ আছে, ‘লিবার্টি’ আছে। তাঁরা নানাশ্রেণীর ব্যুরোক্র্যাট টেকনোক্র্যাট ম্যানেজার ডিরেক্টর ইঞ্জিনিয়ার সেলস-প্রমোটার বা ‘অ্যাড-মেন’- যাঁরা যন্ত্রের মতো সমাজটাকে চালাচ্ছেন। ব্যক্তিগত ভোগ-স্বাচ্ছন্দ্য ও স্বাধীনতার একটা লোভনীয় মরীচিকা সৃষ্টি করছেন তাঁরা সাধারণ মানুষের সামনে এবং দিনের পর দিন বিজ্ঞাপনের শতকৌশলে নেশার পিল খাইয়ে সেই ভোগস্বাধীনতার স্বপ্নে তাদের মশগুল করে রাখছেন।”। ’৬০-’৭০ র অবক্ষয়ী অথচ পণ্যপ্রিয় ভোগসমাজের কথা সেইসময়ের মতন করেই লেখেন হাংরি গল্পকাররা। আর, ভবিষ্যতের পণ্যসমাজের একটা আভাসও থাকে। “আপাতত প্রতীয়মান ধূম্রজালে জড়ানো ধীরে ধীরে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর একজন দৈত্যভৃত্য- ঃ আপনার গোলাম আকা কি হুকুম যা বলবেন যা চাইবেন জীবনে তাই হাজির... একটি সিগারেট। ...একটি সিগারেট। পাঁচ বছরে একটি টিভি সেট। দশ বছরে একটি গাড়ি আর বিশ বছরে সিগারেট খেতে খেতে একবার সারা দুনিয়ায় চক্কর দেব। বাতাস স্তব্ধ। অবাক হঠাৎ মেঘের আকাশ-কাঁপানো অট্টহাসি।”[ঘটনাদ্বয় ও তাদের সাজসজ্জাঃ রবিউল] বস্তুতঃ, ১৯৪৭-এ ক্ষমতা হস্তান্তরের পরে এই সংস্কৃতির মধ্যে দিয়েই যাচ্ছিল ভারতীয় সমাজ। বিনয় ঘোষের এই প্রবন্ধের যে সমাজবর্ণনা, তা অবিকল রয়েছে বিশ্বায়ন পরবর্তী আজকের সমাজেও। নবারুণের ‘কনগ্র্যাচ্যুলেশন’ গল্পটির পাঠ নেওয়া যেতে পারে। গল্পের প্রোট্যাগনিস্ট শাশ্বত স্টেটাস, কমফর্ট অর্জন করেছে। বিশ্বায়নের গলিঘুঁজি চিনে সে আজ সফলতমদের মধ্যে একজন। প্রত্যেকে তাকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। এই সফলতার শিখরে শেষ অবধি তাকে একটি ‘অপ্‌শন’ বেছে নিতে বলা হয়, তার মৃত্যুর অপ্‌শন। আশ্চর্য, সেটা মিলে যায় তার সৌভাগ্যের নম্বর-৪ এর সাথে। আর, এখানেই মনে পড়ে জাঁ বোর্দ্রিয়ারের পণ্যসমাজ ও উত্তর-আধুনিকতার হাইপার-রিয়ালিটির ধারণা। অতিরিক্ত পণ্যচাহিদায় ও ভোগের আতিশয্যে বাস্তব মরে যাচ্ছে। শুধুমাত্র ‘কমোডিটি ফেটিসিজম’ বা পণ্যাকর্ষণ; সেখানে পণ্যকে ব্যবহার করতে করতে মানুষ পণ্য হয়ে যাচ্ছে। তার জীবন ও যাপন সমস্তটাই পুঁজিবাদী উৎপাদনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আর, কোনো বস্তুকে ভোগ করার অর্থ শুধুমাত্র প্রয়োজনীয়তা বা মানসিক আনন্দের থাকছে না, তা সংস্কৃতিক প্রয়োজনের বৃহত্তর ক্ষেত্রও তৈরি করে নিচ্ছে। আর, তখনই প্রকৃত বাস্তবের থেকে বেরিয়ে একটা হাইপার-রিয়ালিটি বা অধিবাস্তব তৈরি করে নিতে হচ্ছে। আদতে কিন্তু মানুষটা মরে যাচ্ছে। তবুও সে এক অদ্ভূত ভোগ্য-পণ্য বোধের মধ্যে দিয়েই চলেছে। যা আপাত তৃপ্তির। ‘কনগ্র্যাচ্যুলেশন’ গল্পের শাশ্বতর মতই। অথবা, ‘কোল্ড ফায়ার’ গল্পের সেই চরিত্ররা; যারা বিলাস-ব্যাসনে অভ্যস্ত এতটাই যে মৃত্যু-পরবর্তী চিতার তাপ, শ্মশানের নরকাবস্থা থেকেও আরাম চায়, তাই সুখানুভূতি নিতে নিতে ‘কোল্ড ফায়ার’ বা বরফশীতল অগ্নিচুল্লীতে মরার জন্যে এবং বিশেষ ডিস্‌কাউণ্টের ব্যবস্থাও করে যায়। এতটাই পণ্যসঙ্গমে অভ্যস্ত তারা। বোর্দ্রিয়ারের মতে, উত্তর-আধুনিক সমাজে শ্রেণিবিভাগ আর শুধুমাত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত থাকছে না, বরং তা এখন নির্ভর করছে ভোগের ওপর। কে কোন পণ্য ভোগ করছে, তার ‘ব্র্যাণ্ড’ এবং দামের ওপর নির্ভর করছে তার শ্রেণিঅবস্থান। অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, পণ্যকৌশলে ভুলিয়ে দিতে চাওয়া দেশকাল-ইতিহাস আর, এমনকি প্রকৃত যৌনতা, সামাজিকতা সবকিছুরই মৃত্যু ঘটছে- তখনই অধিবাস্তব টেনে নিয়ে চলেছে ‘ভার্চ্যুয়াল’ জগতে, এই সত্য তো হাংরি জেনারেশন এর লেখাতেও উদ্ঘাটিত হয়েছে! বস্তুতঃ, তাঁদের লেখায় তাঁরা এটাকেই আক্রমণ শানাতে চেয়েছেন। আজকের ‘ফেসবুক-ট্যুইটার রিয়ালিটি’ তে দাঁড়িয়ে দূরদর্শী মনে হয় এই লেখাগুলো; নবারুণের ‘ক্লোন-ব্রয়লার’ সংক্রান্ত গল্পগুলি।


বুঝে নেওয়া দরকার হাংরি-প্রজন্মের সাহিত্য আন্দোলনের নিভন্ত আগুন এবং সেই আগুনে শাসক-রাষ্ট্রের ক্রমাগত শান্তির জল ঢেলে যাওয়া; অথচ সেই নিভু আগুনের থেকে ফিনিক্সের জেগে ওঠা। নিওফ্যাসিজম্‌ বিশ্বব্যাপী ঠাণ্ডাযুদ্ধ পরবর্তী সময় থেকেই ঘর গোছাতে শুরু করেছে। রাজনৈতিক ভাবে দখল চালানো তো বটেই, তার সাথেই থাকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে আগ্রাসন। আর, পুঁজিবাদ নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে তার উৎপাদন-পদ্ধতিকে খাপ খাইয়ে নিতে চায়, তেমনি সাহিত্যকেও যেহেতু পুঁজিবাদ পণ্য হিসেবেই দেখে, তাই তার উৎপাদন-কৌশলেও নতুন ফর্মুলা নিয়ে আসতে চায়। আর, সেই ফর্ম্যুলার অন্যতম হল, একদা যা ছিল প্রান্তিক, যা ছিল শাসকের ‘ডিস্‌কোর্সের’ বাইরে, তাকেই কেন্দ্রের দিকে ঢুকিয়ে দেওয়া, শাসকের ‘ডিস্‌কোর্সে’ তাকেও ঢুকিয়ে নেওয়া। হাংরি প্রজন্মের আন্দোলনের সময় যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি তাদের ‘প্রান্তিক’ করে রেখেছিল, পরে সময়-সুযোগ বুঝে তাকেই প্রতিষ্ঠানের কৃষ্ণগহ্বরে ঢুকিয়ে নেয়। অ্যাণ্টি-কাল্‌চার ও কি বাজার-কাল্‌চার এ ঢুকে পড়ে? যখন তার প্রভাব এড়ানো যায়না আর, যখন ছাই হয়েও ফিনিক্স পাখির মতো জ্বলে ওঠে ফের তার ভাষা-সংস্কৃতি তখন বাজার নতুন ভাবে নামে? প্রতিষ্ঠান দখল করে নেয় বিগত সব প্রত্যাঘাতগুলো? একদা ‘ওরা অশ্লীল’ বলে চেঁচানো সাহিত্যিকেরাও লিখে ফেলেন হাংরি-দের কথা। বাণিজ্যিক ছবি হয়, সেখানে হাংরি-লেখক রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রুফ-চেক্‌ করাতে মুখিয়ে থাকে। এ-ও তো এক সংস্কৃতি। প্রতিস্পর্ধাকে নমনীয় করে, দোষারোপ গুলোকে বড়ো করে প্রতিস্পর্ধী-সংস্কৃত র ‘সংস্কৃতি’-কে ভুলিয়ে দেওয়া। কারণগুলোকে ভুলিয়ে দেওয়া, প্রেক্ষাপট ও প্রেক্ষিতকে গুলিয়ে দেওয়া। পণ্যমুখর পুঁজিবাদে লেখক ও লেখাদের পণ্য করে তোলা, বিপণন কৌশলে চমক! আসলে, ভোগবাদ, পুঁজির সংস্কৃতি তার নীতি বদলায় না, কৌশল বদলে ফেলে। বিশেষতঃ ‘ঠাণ্ডা যুদ্ধ’-র পর থেকে সচেতনভাবে তৃতীয় বিশ্বের উপর চাপিয়ে দেওয়া উদারনীতি-নয়া উপনিবেশ-লো ইণ্টেন্‌সিটি কনফ্লিক্ট এই ত্রিশূল সর্বতোভাবে সংস্কৃতিকেও নিয়ন্ত্রণ করে। বিশ্বায়ন ‘প্রান্তিক’দের সাহিত্যে থাবা বসায়। কিন্তু, নবারুণ তাঁর লেখায় ইচ্ছে করেই তাই ‘প্রান্তিকতা’র কথা ব্যক্ত করেন। প্রতিষ্ঠানের আদর পাওয়া সাহিত্যছাঁচ বাঁচিয়েই নিজের লেখায় ছাঁচ গড়ে রাখেন। বাজার তার বাইরে কিছুই রাখতে চায় না, তার নিজের স্বার্থেই। ’৬০-’৭০ দশকে সাহিত্যে যৌনতা-জীবন বিষয়ক প্রকাশ্য আলোচনাকে নিন্দা করেও, পরে তাকেই সাহিত্যবিক্রির মূল ‘পুঁজি’ করেছে মূলধারার সাহিত্য; এই উদাহরণ আরো রয়েছে। তাই, নবারুণের লেখা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই কৌশলকেও আক্রমণ করে।


হাংরিদের ক্ষেত্রে বৃহত্তর ক্ষেত্র থেকে সরে এসে ক্রমেই ‘আত্ম’কে উন্মোচন করায় জোর দেওয়া। এবং, অন্যদিকে নবারুণের লেখায় ‘আত্ম’ থেকে বেরিয়ে বৃহত্তর আর্থ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সম্পৃক্তির চেষ্টা। ক্ষুধার্ত কবিরা দেখেছে প্রতিশ্রুতির গলিত শব, দেখেছে একের পর এক মিছিল ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার হয়ে যায়। আর, তাই বিমুখতা তৈরি করে নিয়েছে রাজনীতি থেকে। সুবো আচার্যের কবিতায়- ‘নই কর্তাভজা স্বাধীনতা-সেবী- রুশচীন বহ্ন্যুৎসবে আমার/ কোনো আহুতি নাই- ইন্দিরা কেন গান্ধী হয়ে গেল এ নিয়ে/ ভাবনা নাই’। হয়তো, রাজনৈতিক দিশাহীনতা এবং নির্দিষ্ট বিকল্পের সন্ধানহীন গোলোকধাঁধাতে আটকে থেকেছিলেন ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখকরা; তাকেই এক নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবয়ব দিয়ে বিকল্পের সন্ধান ও বিষ্ফোরণের সম্ভাবনাগুলো তুলে আনতে চাইলেন নবারুণ। নবারুণের প্রতিরোধ শুধু প্রতিষ্ঠানকেই নয়; বরং তাঁর প্রতিবাদ বুদ্ধিজীবিদের দোদুল্যমানতার প্রতিও। ফ্যাতাড়ুরা সেইসব বুদ্ধিজীবিদের ঘৃণা করে। নকশাল আন্দোলন পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে মোড়বদল হয়েছে। নকশাল আন্দোলনের স্বপ্ন, বাস্তব এবং অভিঘাত সেই ’৭০ র দশক থেকেই পাতার পর পাতা ভরে বাঙালি তথা বিশ্ব পাঠককে উপহার দিয়েছে বহু সাহিত্য। আর, তারই সাথে শুরু হয়েছে ‘অ্যাপলিটিসাইজেশন’ বা ‘নিরাজনীতিকরণের’ পদ্ধতি। নকশাল আন্দোলন মধ্যবিত্ত রোম্যাণ্টিকতা ও কাঁচা প্রেমের মতো, বামপন্থা মানেই তা ভ্রষ্ট সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখায় এবং আসলে নিরাজনীতিই মানুষকে ‘মানুষ’ করে তোলে! এহেন ভাবনাগুলোকে সচেতন ভাবেই প্রতিষ্ঠান্নগুলোর মধ্যে দিয়ে ছড়িয়ে দেওয়া হতে লাগল। বিশেষতঃ ’৮০ র দশকের বাংলা সাহিত্য থেকেই। আর, ’৯০ পরবর্তী প্রাতিষ্ঠানিক ও ‘এলিট’ পত্রিকার সাহিত্যগুলি কিছু অবয়ববাদী বা স্ট্রাক্‌চারালিস্ট ধাঁচা(স্টিরিওটাইপ) এনে ফেলল। যেমন, নকশাল ছেলেটি লেখাপড়ায় মারাত্মক ব্রিলিয়াণ্ট ছিল, ‘ভুল’ রাজনীতির পাল্লায় পড়ে গ্রামে গেল রাজনীতি শিখতে ও ডি-ক্লাস্‌ড হতে, তার প্রেমিকা উচ্চবিত্ত ঘরের এবং যৌনসম্পর্কের বিশদ অনর্থক বর্ণনা, পুলিশের গুলিতে বা অত্যাচারে পঙ্গু হল, আদতে লড়াইটা এবং মতাদর্শটা ব্যর্থ হল এবং অ্যাপলিটিক্সের ওপরে সমাজসেবার ওপরে ভরসা রাখল ব্যর্থ নায়ক! এই অবয়ববাদী ধাঁচায় ফেলে প্রতিষ্ঠানগুলি বিক্রি বাড়াতে লাগল তাদের সাহিত্যের। আর, তার সাথেই ক্রমে ‘সক্রিয় রাজনীতি’ ও বামপন্থা থেকে বিমুখ করে দিতে লাগল বিশ্বায়ন পরবর্তী প্রজন্মকে। আর, নবারুণ কোথাও গিয়ে এই ধাঁচাটাই ভাঙ্গতে চাইলেন। যদিও এই শাসক-নির্মিত ও বাজার-নির্মিত ধাঁচা ভাঙ্গার লেখায় তিনি ‘প্রান্তিক’, বোধহয় তাইজন্যেই নিয়ত এত সোচ্চার তিনি। “ক্লোনেরাই সরবরাহ করে চলেছে ব্রয়লার নাটক, ব্রয়লার উপন্যাস, ব্রয়লার কবিতা, ব্রয়লার ছবি, ব্রয়লার সমালোচনা, ব্রয়লার পত্রিকা। ক্লোন, ব্রয়লার, মিডিয়ক্রিটি- সব শব্দকে গিলে রূপসী রাক্ষসীর মতো দাঁড়িয়ে আছে সেলফোন হাতে একটি শব্দ- সেলিব্রিটি।”


নবারুণের গল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য জায়গা হচ্ছে ইণ্টারটেক্সচ্যুয়ালিট ি বা পাঠমধ্যান্তর। একই নাম এবং চরিত্ররা ফিরে আসছে বিভিন্ন গল্পে। কিন্তু, এই গল্পগুলি কিন্তু সিক্যোয়েল নয় বা ফ্যাতাড়ুর মতন সিরিজ হিসেবে লেখা নয়। এলিট ম্যাগাজিন বনাম লিটিল ম্যাগাজিন এবং বিখ্যাত বনাম অখ্যাত এই বাইনারি অপোজিটে দাঁড়িয়ে একপ্রকার বিনির্মাণ হিসেবেই উঠে আসে ‘ফোয়ারা’। ‘টয়’ গল্পের স্বচ্ছল-ফ্ল্যাটবাসী-স স্থসাংস্কৃতিক মিথিল ফিরে আসে ‘ম্যালোরি’ গল্পে। দু’টি গল্পেই একটি সাধারণ সূত্র থাকে, তা হচ্ছে ঠাণ্ডা মাথায় খুন অথবা, বিজ্ঞানমনস্কতায় খুন। আসলে, এই অনুতাপহীন বীভৎসতা প্রতিমুহূর্তে অনুষ্ঠিত হয়ে চলেছে। আবু ঘ্রাইবের কারাগারে, ছত্তিশগড়-লালগড়ের থানায়। বিজ্ঞানীরা নিত্যনতুন আবিষ্কার করেন হত্যাপদ্ধতিকে নিখুঁত করতে আরো। মনে পড়ে যায় ‘আগন্তুক’ ছবিতে মনমোহন মিত্রের সেই সংলাপঃ “সভ্য তারাই যারা একটি বোতাম টিপে দুটি শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে পারে; আর, সভ্য তারাই যারা সেই বোতাম টেপার সিদ্ধান্ত নিতে পারে।” টয়-মিথিল-মিমিরা আসলে সেই সভ্যতারই সফল ধারক ও বাহক। আর, হাংরি-দের গল্পের এবং গদ্যের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হচ্ছে, মুক্তসমাপ্তি। অর্থাৎ, কোনও স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন না লেখক; হয়তো স্থির সিদ্ধান্ত হয় না কোনও। অন্ততঃ, যে সময়ে তাঁরা লিখছেন, সেই সময়ে অচঞ্চল বিশ্বাস কিছু নেই, কোনও স্থিতি নেই, সিদ্ধান্তে আসার ভিত্তি নেই। বাসুদেব দাশগুপ্তের ‘বমন রহস্য’ গল্পে আশাহীন এবং আলোহীন ভোগবাদী সমাজের প্রতি ঘৃণা ঠিকরে বেরোয়। গল্পের শেষ লাইন- “বমি করে যাই রক্তাক্ত পথের উপরে। সমস্ত চর্বিত মাংসের টুকরো, সমস্ত জীবন ভোর খেয়ে যাওয়া মাংসের টুকরো আমি বমি উগরে বার করতে থাকি। বমির তোড়ে আমার নিঃশ্বাস যেন আটকে আসে।”। পাঠকের যথেচ্ছ স্বাধীনতা থাকে, জীবনের সাথে মিলিয়ে পরিণতি ভাবার; সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেওয়ার দায় লেখকের নয়।


হাংরি লেখকেরা তাঁদের লেখালেখিতে জোর দিচ্ছেন পাঠের ওপর। অর্থাৎ, লেখকের ভাষাগত চাতুর্য, শব্দলালিত্য আর বিচার্য নয় বরং বিচার্য পাঠবস্তুটি। ন্যারেটিভের ক্ষেত্রে হাংরি-দের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে রানিং কমেণ্টারির মতোন অর্থাৎ, চলন্ত ধারাভাষ্যের মতো সাহিত্য। যা ঘটছে, যা অভিজ্ঞতা সেটাকেই গল্প বা কবিতায় তুলে আনা। কবিতা সম্পর্কে প্লেটোসহ বহু প্রাচীনপন্থীর মতামত এই ছিল যে, কবিতা বাস্তব থেকে দূরে নিয়ে যায় চেতনাকে। অথচ, হাংরি-দের কবিতা পড়লে কিন্তু তার উল্টোটাই মনে হয়। বড়ো বেশিই যেন বাস্তবের গহ্বরে ঢুকিয়ে নিতে চাইছে পাঠককে, সঙ্গে নিজেরাও। নৈর্ব্যক্তিকতাকে প্রত্যাখ্যান করে হইহই করে লেখক নিজেকেও এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে লেখার মধ্যেই। এর ফলে কবিতার চিরাচরিত সম্বোধক-সম্বোধিত বা অ্যাড্রেসার-অ্যাড্রে ি নিয়ম ধাক্কা খাচ্ছে। সাহিত্য আর ততটা দূর থেকে বসে, নিরাপদে লেখার বিষয় থাকছে না; যখন পৃথিবী পুড়ছে ব্রহ্মাণ্ড পুড়ছে তখন লেখাও পুড়তে বাধ্য। ‘ফিকশন’ বা কল্পকাহিনীর ‘জন্‌র’-র ক্ষেত্রে নিয়ম ওলটপালট করেন নবারুণ। ফিক্‌শন-এর অলিখিত শর্তই হচ্ছে যে, সেখানে ঘটনার উল্লেখ থাকবে কিন্তু সরাসরি নামোল্লেখ থাকবে না কিছুর। গল্পে কোনো তথ্য বা রেফারেন্স থাকলেও, তার টীকা লেখার দায় নিশ্চয় লেখকের নয়। অর্থাৎ, বাস্তব আর কলপনার মধ্যে ফারাক রাখা। কিন্তু, নবারুণ সচেতনভাবেই ভাঙ্গেন এইটা। তাঁর বহু লেখায় সরাসরি রাজনৈতিক দল সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি ইত্যাদির নামোল্লেখ থাকে। তাঁর ‘কাকতাড়ুয়া’ গল্পের শুরুতে বলে রাখেন “নির্দিষ্ট ঘটনাটি ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসে ঘটেছে, ১৫ তারিখে... রচনাটির কোনো অংশই কাল্পনিক নয়।” বস্তুতঃ, কাল্পনিক সাহিত্য লেখার দায়ও যেন তাঁর নয়। বরং, ভারতের ‘স্বাধীনতা দিবসে’ বিহারে দলিত-নিধন ও উচ্চবর্ণ-শ্রেণির আধিকার প্রতিষ্ঠার বাস্তবতাই ভারতীয় সাহিত্যের এতদিনের অনূক্ত কথন। ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’ গল্পের বাস্তবতা পশ্চিমবঙ্গের যে কোনো কারখানার। ইউনিয়ন-মালিকের আঁতাত এবং একের পর এক শ্রমিকের অপমৃত্যু, শ্রমিক শোষণ; অথচ গণমাধ্যম সেই শোষক শক্তিরই অংশীদার। আর, এ গল্পের শেষেও পাঠকের কাল্পনিক গল্পপাঠের মৌতাত ভেঙ্গে নবারুণ জানান যে, ‘প্রত্যেকটি তথ্য সত্য। মোহিনী মিলের ঘটনাবলীর সূত্র বন্ধু রতন চক্রবর্তীর রিপোর্ট।’ আর, হয়তো প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার সূত্র ধরেই সরাসরি বিদেশি ব্র্যাণ্ড, বহুজাতিক সংস্থার সরাসরি নামোল্লেখ। ‘৯৮৬৪৪’ গল্পে আডিডাস, পুমা, নাইকি, রিবক ইত্যাদির নাম সরাসরি থাকে। সাধারণতঃ কোনো লেখায় ব্র্যাণ্ডের নামোল্লেখ থাকে তার মার্কেটিং করার জন্যে অথবা, ‘মার্কেটিং পলিসি ইন নেগেটিভ ওয়ে’ তে করার জন্যে। কিন্তু, নবারুণ তা করেন না, বরং সচেতনভাবে তিনি বিশ্বায়নবিরোধিতা ও পণ্যবিরোধিতা করে যান। বলেন, যে, ব্র্যাণ্ডেড জিনিস পরাটাই ফ্যাশন। ফের মনে পড়ে বোর্দ্রিয়ারের তত্ত্ব। নবারুণ বারবার বহুজাতিক ও শোষক পণ্যের উল্লেখ কেন রাখেন? “ইন্দোনেশিয়াতে ‘নাইকি’ কোম্পানির কনট্র্যাক্ট শ্রমিকরা পায় দিনে ২.৬০ ডলার। ‘নাইকি’-র চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার ফিল নাইট এক বছরে যত টাকা কামান তত টাকা রোজগার করতে হলে একজন কনট্র্যাক্ট শ্রমিককে ৯৮,৬৪৪ বছর ধরে জুতো বানাতে হবে।” [৯৮৬৪৪]। সংখ্যাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলার খেলা চলে ‘আংশিক চন্দ্রগ্রহণ’ গল্পেও। উচ্চমধ্যবিত্ত, অতিস্বচ্ছল রোহিতের মাসমাইনে ৬০,০০০ আর ব্রিটিশ-আমেরিকান মিলিটারি ‘কম্বোপ্যাক’ ইরাকে খুন করেছে ৯৮,০০০। অর্থাৎ, এই তফাৎটা মাত্র ৩৮,০০০। এই সহজ অঙ্ক ও সংখ্যাতত্ত্ব বুঝে ফেললে জীবন মসৃণ আর না বুঝলেই অস্বস্তি বাড়বে।


নবারুণ কবিতার সংজ্ঞাও একপ্রকার নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। ঠিক যেভাবে হাংরি-রা তাদের কবিতার ধারণা স্বতন্ত্র করে দিচ্ছেন। নবারুণের কবিতা চিরাচরিত চাঁদ-ফুল-তারার রোম্যাণ্টিকতা অস্বীকার করে। কবিতা যে ‘লেখার’ নয়, বরং কবিতা ‘হয়ে ওঠার’ বিষয়, তা স্পষ্টতর হয় অস্থির সময়ে- “কবিতা এখনই লেখার সময়/ ইস্তাহারে দেওয়ালে স্টেনসিলে/ নিজের রক্ত অশ্রু হাড় দিয়ে/ এখনই কবিতা লেখা যায়...”। কবিতার আসন্ন সম্ভাবনাও লিখে রাখেন শেষ পংক্তিগুলিতে। “কবিতার জ্বলন্ত মশাল/ কবিতার মলোটভ ককটেল/ কবিতার টলউইন অগ্নিশিখা/ এই আগুনের আকাঙ্খাতে আছড়ে পড়ুক”। আর, এখানেই কবিতাকে নতুনভাবে সাজিয়ে নেওয়ার ভাবনার সাথে মিল পাওয়া যায় হাংরি-দের। ১৯৬১ সালের নভেম্বরে পাটনা থেকে প্রথম হাংরি বুলেটিন বেরোয় ইংরাজিতে। ‘Weekly manifesto of hungry generation’, যার সম্পাদক দেবী রায়, মুখ্যনেতা শক্তি চ্যাটার্জ্জী এবং ক্রিয়েটর মলয় রায়চৌধুরি। তার প্রথম অনুচ্ছেদ- “Poetry is no more a civilizing maneuver, a replanting of the bamboozled gardens; it is a holocaust, a violent and somnambulistic jazzing of the hymning five, a sowing of the tempestual Hunger.” কবিতা কোনো নিরপেক্ষতার মাপকাঠি নয়, কবিতা শুধুমাত্র ছন্দ-শব্দ দিয়ে বেঁধে রাখার নান্দনিকতা নয়। বরং, অসহ্য জীবনকে তার মধ্যে প্রতিটি ছত্রে রেখে দেওয়া, অনন্ত বিস্ফারের সম্ভাবনায়। আর, এখানেই মনে পড়ে মারাঠি কবি নামদেও ধাসালের লেখা। দলিত জীবনের আখ্যান এবং প্রতিটি পংক্তিতে উল্লেখযোগ্য ঘৃণা; এই ঘৃণাই আসলে জীবন, এখান থেকে ভালবাসার জন্ম। হাংরি-দের লেখায় আত্ম-কে আবিষ্কার, জীবনের কেন্দ্রের মূল উৎস গুলোয় ফেরা, সন্ধান করা অসুখের উৎসের। কবিতা থেকে কবিতাযাপন হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া। ক্রাইসিস-গুলোকে চিনে নিতে নিতে প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠা। কবিতা মানে বাস্তব থেকে দূরে সরার, অথবা কিছু মিথ্যে স্তোকবাক্য দিয়ে বাস্তবকে আড়াল করার চেষ্টা আর নেই; চাঁদ ফুল তারা নদী আর অতটাও সুন্দর নেই যে তারাই হয়ে উঠতে পারে ‘Aesthetics’-র মাপকাঠি। এস্থেটিক্‌স-ও নিয়ন্ত্রিত হয় পুঁজির দ্বারা, পুঁজির স্বার্থেই! সেই এস্থেটিক্‌স কে প্রবল বিক্ষোভে উপহাস করেন ফাল্গুনী রায়ও- “রাজহাঁস ও ফুলবিষয়ক কবিতাগুলি আমি মাংস রাঁধার জন্যেই দিয়েছিলাম উনোনে...”। বরং দৈনন্দিন যুদ্ধদীর্ণ ‘অসুস্থ’ জীবন থেকেই উঠে আসে ‘Aesthetics’-র সারবত্তা। আর, কবির নিশ্চয়ই দায়বদ্ধতা থাকে সমাজের প্রতি; হাংরি-দের সেই নিজেকে, ভাষাকে, কবিতাকে ছিঁড়েখুঁড়ে সত্যের কাছাকাছি পৌছানোর ঔপনিষদীয় উপলব্ধি নবারুণেরও- “একটা মিথ্যে কবিতা যত মিথ্যে কথা বলতে পারে/ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেণ্টও তা পারে না/ কিন্তু একটা সত্যি কবিতা/ ঘুমন্ত শিশুদের সারারাত বিমান আক্রমণ থেকে/ আড়াল করে”।


রাষ্ট্রের ভণ্ডামিগুলো, ‘আদার্‌’ ছাপ্পা মেরে দেওয়াগুলো, ‘নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নেওয়া’র গড্ডালিকা স্রোতগুলোর পালটা স্রোত সাহিত্যে-জীবনযাপনে আসে। আর, ‘সংস্কৃতি’ ঠিক করে দেওয়া কর্তারা থাকবে, ততটাই থাকবে সেই ‘সংস্কৃতিকে’ প্রত্যাখ্যান। হয়তো সমান্তরাল, তবু থাকবে। প্রবলভাবেই। সমাজশাসকেরা বরাবরই নিজেদের মত করে হেজিমনি চাপিয়ে দেয়, শাসনের ডিস্‌কোর্সের অভিমুখে দাঁড় করাতে চায় সব্বাইকে। আর, যখনই তার বিরুদ্ধে স্বর ওঠে, তা সে সাহিত্যেই হোক বা অন্য কোথাও, তাকে দমিয়ে দেওয়া হয়। ব্রাত্য করে রাখা হয় ‘সংস্কৃতি’-র শুদ্ধতার দোহাই দিয়ে। জাতীয় সাহিত্যের মাপকাঠিতে ‘অশ্লীল’ বা ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে প্রতিপন্ন হয় এই সাহিত্যগুলো। ক্ষুধার্ত প্রজন্মের লেখাকে বিশ্লেষণ না করেই তাকে দাগিয়ে দেওয়া হয় এবং পরে তাকেই আত্তীকরণ করে বাজারজাত পণ্য করার প্রাতিষ্ঠানিক চেষ্টা। নবারুণের জীবন-রাজনীতি-সাহিত্য সম্পৃক্ত হওয়ায়, তাকেও বঞ্চনা সহ্য করতে হয়। কিন্তু, তথাকথিত ‘নিম্নবর্গের’ এই সাহিত্যগুলোই প্রয়োজন হয়, যদি ভারতীয় সাহিত্যের ওলট-পালট, এগিয়ে চলাকে খুঁজতে হয়। বিশেষতঃ পণ্যসঙ্গমরত সমাজে যেখানে জীবন-মানুষ-শিল্প সবটাই ক্রমপণ্য হয়ে যাচ্ছে, তখন বিরোধিতার স্বর, রাষ্ট্রদ্রোহিতার স্বরগুলোর হয়তো বেশিই প্রয়োজন; দ্রোহকে আরো ক্ষুরধার, শাণিত এবং সত্যসন্ধানী করে তুলতে।



ভাবনা সহায়তা-
ঘোষ বিনয়, মেট্রোপলিটন মন, মধ্যবিত্ত, বিদ্রোহ; Baudrillard Jean, The Consumer Society: Myths and Structures; Macherey Pierre, A Theory of Literary Production; Sieghild Bogumil, ‘A new ethics of Comparative Literature: Methodological considerations’; নবারুণ ভট্টাচার্যের প্রকাশিত বই, হাংরি জেনারেশনের প্রকাশিত লেখাসমূহ এবং আন্তর্জাল।