দূরপাল্লার একাকী দৌড়বীর

সরোজ দরবার

‘অভিভাবক ও গুরুজনদের সম্বন্ধে কিছু লেখাই কঠিন। মূল্যায়ণের তো প্রশ্নই ওঠে না’ – সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে লিখতে গিয়ে এ নবারুণীয় অনুভূতি দিয়েই গঙ্গাজলে গঙ্গাপুজোর নান্দীমুখ করতে পারি। সত্যি লেখা কঠিন, কেননা মানুষটা যখন নবারুণ ভট্টাচার্য। ‘ছোটলোকের গায়ের ঘামের গন্ধ’ জড়ানো পৃথিবীর হাওয়া যিনি শেষবার ফুসফুসে টেনে নেওয়ার পর যখন বন্ধু সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় আক্ষেপ করে বলে ওঠেন, ‘তুমি ছিলে আমাদের শেষ মাতাদর যে তাচ্ছিল্য নিয়ে থুতু ফেলতে পারত। আজ আমাদের রক্তের গলি উপগলিতে কোনও ব্যারিকেড রইল না নবারুণ। এইসব চ্যানেল আর পুচকে সাংবাদিক এখন তোমার অসমাপ্ত আত্মজীবনী নিজেরাই সমাপ্ত করার দায়িত্ব নেবে।’, তখন ভয় হয়, এই নির্বোধ দায়িত্বের ফাঁদে অজান্তেই পা দিয়ে ফেলছি না তো! সত্যিই তো জীবনানন্দকে নির্জন অভিধা দিয়ে বাঙালি যেমন তার ফ্যাসিনেশনে দাগা বুলিয়ে তৃপ্তি পায়, নবারুণকে নিয়েও সে তেমনই স্বনির্মিত খিস্তিপ্রবণ, বিপ্লব-বিপ্লব মুখোশটিকে স্টাডিরুমের দেওয়ালে টাঙিয়ে রেখে আত্মপ্রসাদ লাভ করবে এ আর আশ্চর্য কী! এবং করেওছে। আজ আর কোনওকিছুই অপ্রকাশ্য নয়, কোনও কিছুই সম্পাদিত হওয়ার অপেক্ষা রাখে না। অতএব তাঁর মৃত্যুর পর নেশাতুর, টি-শার্টে চে-র ছবিওয়ালা কষ্টকল্পিত বিপ্লবীরা ব্যাপক খিস্তি সমৃদ্ধ বাচনে চেতন ভগত কিংবা সুচিত্রা ভট্টাচার্যের মুন্ডপাত করে নবারুণ-প্রণয় ব্যক্ত করেছেন জোর গলায়। ব্যক্তি আক্রমণে নবারুণ কি আদৌ খুশি হতেন? যাঁরা তাঁকে জানতেন, তাঁরাই জানেন। এবং সময়ের কী প্রগাঢ় ঠাট্টা, বছর ঘুরতে না ঘুরতে, সেই সব ছদ্মবিপ্লবীরা যখন প্রতিষ্ঠানের তেলে-ঝোলে-নালে মাখামাখি হয়ে ভেজা সপসপে জামা লুকনোর পথ না পেয়ে এর ওর চৌকাঠে মাথা কুটছেন, তখন আর একবারও এসে পড়েছে আমাদের নিজেদের মূল্যায়ণের তিথি। হ্যাঁ গুরুজনের মূল্যায়ণ করা যায় না, তাঁকে সামনে রেখে নিজের অপরাধ ও অক্ষমতাটিকে সনাক্ত করা যায়।
সহযোদ্ধা ও সহজীবি সঞ্জয়বাবু সেদিন আক্ষেপ করেছিলেন, কেননা, তিনি দেখেছেন, পিস হ্যাভেনেও পরিত্যক্তদের জন্য কোনও আলাদা কক্ষ নেই। ‘এই সভ্যতা সবাইকেই অ্যাকোমোডেট করে। যারা চে গুয়েভারা তারা চাপরাশি হতে পেরেছে। নবারুণ তোমার চলে যাওয়াই ভালো। আজ হোচিমিন সরণি জুড়ে শপিংমল’- তাঁর এ কথার সূত্রেই দেখি এই ক’দিনেই নবারুণকেও আমরা চলতি বিন্যাসে অ্যাকোমোডেট করে ফেলেছি বা চেষ্টা চালাচ্ছি জোরকদমে। সমস্ত গজলের ঐশ্বর্য নিয়েও কাজী নজরুল ইসলাম যেমন কিছুতেই প্রেমের কবি হবেন না, বিদ্রোহীর চিরকেলে ট্যাগ নিয়ে সংস্কৃতির শপিংমলে প্রদর্শিত হবেন, নবারুণকেও তেমনি আমরা খিস্তি-ফ্যাতাড়ু-আগুন-চ ুল্লি-বমন-থুতু মেশানো ককটেলের একটা বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান বানিয়ে ফেলা হবে, দিতে চাওয়া হবে বিপ্লবী গোছের কিছু একটা অভিধা, যার সমার্থক শব্দ বোধহয় এখনও অভিধান খুঁজে পায়নি। পায়নি কারণ, নবারুণকে শেষমেশ অ্যাকোমেডেট করতে গেলেও সভ্যতার কিছু সমস্যা ও অক্ষমতা থেকে যায়। খিস্তি আর পুরন্দর ভাটের কিছু কবিতার নিরিখে যারা নবারুণকে চলতি খোপের ভিতর সেঁধিয়ে ফেলতে চান, তাঁরা বোধহয় প্রাতিষ্ঠানিকতার ছলনাময় ‘মাজাকি’টাকেই প্রশ্রয় দিয়ে ফেলেন। আসলে বোধহয় একদিকে থাকে তাঁর স্বরচিত সাম্রাজ্য। যা অস্থির অস্তিত্বের স্থানাংক নির্ণয়। ওই যাঁরা সত্যিই চে হতে চেয়ে চাপরাশি হয়ে গেল, ওই যাঁরা তিরিশ বছর রাষ্ট্রায়াত্ত সংস্থার বাঁধানো খাতায় কলমপেষা শেষ করে ফুলগুলি সব কোথায় গেল বলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তাঁদের সবার হয়ে বাস্তবতার প্রসারিত এক ভূমিতে দাঁড়িয়ে থাকেন নবারুণের ফ্যাতাড়ুরা। আমাদের সময় তাঁর ভাষায় আমোদ পায়, দেখে এই মল অধ্যুষিত শহরে ফ্যাতাড়ুরা উড়ে বেড়ায় বটে কিন্তু তেমন কোনও নাশকতার জন্ম দেয় না। ফলত প্রত্যাখানের ঔদ্ধত্য, অস্বীকারের ঐশ্বর্য ইত্যাদি যখন কথার কথা হয়ে ফুলদানিতে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে পড়ে, আর বিস্ফোরণের সম্ভাবনা যখন একটা নিরাপদ বিপ্লবের খেলনাবাটিতে পর্যবসিত হয়, তখন আমাদের প্রয়োজন হয় আর এক নবারুণকে খোঁজ করার। ফ্যাতাড়ুরা যে আর বিশেষ কিছু করতে পারবে না, সে বোধহয় তাঁদের স্রষ্টাও জানতেন, তাহলে কেন তাদের এমন করে ওড়ালেন? না করিয়েই বা কী করবেন? গোড়ায় তো থেকে যাচ্ছে সেই প্রাথমিক প্রশ্ন-
‘অনেক গ্রামবাসী
তাদের চারজন কমরেডের মৃতদেহের জন্যে
শহরতালুকের মর্গের বাইরে
সকাল থেকে বসে আছে!

একজন শ্রমিক
হায় কি দুর্বল তার ইউনিয়ন
রেললাইনের দিকে তাকিয়ে ভাবছে
আত্মহত্যা করলে কি বাঁচা যাবে?

অনেকগুলো বাচ্চা
পোস্টারের কাগজ আর প্যাকিংবাক্সের ঘরে
খেলে খেলে একসময় ঘুমিয়ে পড়েছে
ওদের মা ফিরলে তবে খেতে দেবে।

এখন কি আমার শিল্পচর্চা করা মানায়?’’
আমরা দেখতে পাই মৃদুভাষী অথচ তীক্ষ্ণ এক নবারুণকে। বিস্ফোরণ আর হবে না জেনেও হয়ত যিনি বিস্ফোরণের সম্ভাবনাটিকে জিইয়ে রাখেন। আমরা দেখতে পাই সেই নবারুণকে, বইমেলার অতি ভিড়ের মধ্যেও যাঁকে একাকী বসে থাকতে দেখেছেন হয়ত অনেকেই। আশাপাশে লোক ছিল না কি? ছিল তো। তবু তিনি একাই বসে ছিলেন সেদিন, ঠিক যেমন তাঁর হারবার্ট, ফ্যাতাড়ুদের থেকে একটু দূরে, স্বতন্ত্রতায় বসে থাকে তাঁর প্রবন্ধগুলি।
ছবিতে আমরা যখন গ্রামের দৃশ্য দেখি তখন এক ধরনের রোম্যান্টিকতা আমাদের মধ্যে কাজ করে। আহা এই ছিল আমাদের গ্রাম গোছের ব্যাপার। ‘পথের পাঁচালী’র সূত্রেও অপু-দুর্গার রেল দেখা, কাশবনের ঢেউ ইত্যাদি নিয়ে কম রোমান্টিসিজম তো ঢেউ তোলে না। কিন্তু নবারুণের চোখে ‘পথের পাঁচালী’ যেভাবে ধরা পড়ে, আমরা বুঝতে পারি অস্বীকারের আঁতুড়ঘর কোন অনুভব আর দৃষ্টিতে নির্মিত। যে শিল্পবোধ জীবন ব্যতিরেকে কোনও কিছুকেই শিল্পের শিরোপা দিতে নারাজ, সেই বোধ নবারুণকে দিয়ে বলিয়ে নেয়, ‘ ‘পথের পাঁচালী’ আমার কাছে নিয়ন্ত্রিত দুর্ভিক্ষের এক কাহিনী, যে দুর্ভিক্ষ খুব ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে চলে। চলতেই থাকে। এক একে করে সে শিকারও বেছে নেয়- আপাতদৃষ্টিতে সে সব মৃত্যু অপুষ্টিজনিত বলে মনে হয়, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে ক্ষুধা ও ক্ষুধাজনিত অপুষ্টি।’’ যে অপু, দুর্গা জন্মাবধি ভালো কিছু খেতে পায় না, একদিন বাড়িতে ভালো খাবার দাবার হলে সেদিনটি স্মরণীয় উৎসব হয়ে ওঠে তাদের নিয়ে বাঙালির রোম্যান্টিকতা পাঠ্যবই অবলম্বন করে যতই ডালপালা মেলুক না কেন, নবারুণের চোখ অক্ষরের আড়ালে ধারাবাহিক দুর্ভিক্ষের অশনিসংকেত ঠিকই চিনতে পারে। এবং বিভূতিভূষণ অবধারিতভাবেই তাঁর কাছে অন্য মাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। উপনিবেশ সাহিত্যের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ে যখন লেখক বিচলিত ও সংগ্রামী থাকেন, তাঁরই মিলিত রূপ তিনি দেখেছেন বিভূতিভূষণের মধ্যে- ‘ক্ষুধার আশ্চর্য আখ্যান সৃষ্টিকারী বিভূতিভূষণের মধ্যে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পর্যায়ের গুণাবলী কমবেশি মিশ্রণে রয়েছে বলে আমি মনে করি। এও মনে করি যে সচেতনভাবে দলিল সৃষ্টি করার দায় স্বীকার করে সাহিত্যসৃষ্টির যে একমাত্র অর্থবহ মানবিক ধারা আছে এবং সেই পথে যাঁরা চলেছেন ও চলবেন তাঁরা সকলেই বিভূতিভূষণের কাছে ঋণগ্রস্ত হয়ে থাকবেন।’ বিভূতিভূষণের এ মূল্যায়ণ আমাদের চিনতে সাহায্য করে নবারুণ ভট্টাচার্যকে। আমরা বুঝি, ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ নয়’ আমাদের কপচানোই সার হবে যদি না আমরা ধরতে পারি তাঁর ভিতর বসত করা সেই দূরপাল্লার দৌড়বীরটিকে, যাদের একা একাই দীর্ঘ, দীর্ঘতম পথ পেরোতে হয়।
প্রবন্ধ, সাহিত্যবাসরে যা নাকি দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে পরিগণিত এবং তা সঠিক কি না তা নিয়ে বিস্তর তর্ক-আলোচনা আছে, তা তার স্বভাবগুণেই আমাদের ঠেলে দেয় চিন্তা সরণির দিকে। গল্পে-উপন্যাসেও যে পরিসর তৈরি করে দেন অনেক লেখক, নবারুণ তো বটেই, তবু সেখানে ঝোঁকটা থাকে কাহিনির এগনোর দিকে। ফলত যে ভাবনার দিকে ঠেলে দিতে চান, তা কখনও সফল, কখনও বন্ধ্যা। প্রবন্ধ, তার আত্মপ্রশ্নধর্মিতার খাতিরেই নিজেই প্রবেশ করে সে সাম্রাজ্যে, হাত ধরে তাঁর পাঠকের। নবারুণের এই লেখাগুলিও আমাদের তাই দেয় তাঁর ভাবনাজগতের অদ্বিতীয় চাবিকাঠি। এবং সহসা মোহভঙ্গে আমরা দেখি, তাঁরই তৈরি করা খিস্তিপ্রবণতা আসলে একটা সম্মোহন, যার লোভে লোভে হয়ত তাঁর চেতনার কাছে পৌঁছব- এমনটাই আশা ছিল তাঁর। বুঝি, সেটাকেই মিথ করে তোলা মুর্খামি ছাড়া আর কিছু নয়। যেমন একদিন নবারুণের নিজেরই ভুল ভেঙেছিল জীবনানন্দের মুখোমুখি পড়ে। ‘... যথাসময়ে কেতাবি জ্ঞানে নিজেকে যারপরনাই সমৃদ্ধ ও আশ্চর্য মনে করে সেসব বুকনি ব্যবহারে রপ্ত হলাম- নেচার রোম্যান্টিসিজম, পরাবাস্তবতা, বিষণ্ণতা, মৃত্যুচেতনা, অতীত-বর্তমান সমীকরণ তৎসহ রহস্যময়ীদের উল্লেখ যাঁরা আসিরিয়া, ব্যবিলন থেকে শুরু করে বাংলায় ছিলেন, আছেন, থাকবেন।’ এবং তারপর, ‘ এরকম অনেক কিছু জেনে বেশ ভালোই ছিলাম। এরও পরে তাঁর গদ্যের সঙ্গে পরিচয় হয়। আগেকার অনেক হেশাব-কেতাবই গুলিয়ে গেল।’ আমরা বুঝতে পারি স্বয়ং নবারুণের ক্ষেত্রেও আমাদের এই গুলিয়ে যাওয়াটা একান্ত জরুরি। ‘তিনি ছিলেন আমাদের অস্বীকারের ভাষা’ বলে যে বা যাঁরা অস্বীকারকে ছলনা করে তাঁর গায়ে খিস্তি ও নির্বিষ আগুনের যুগপৎ ট্যাগ লাগিয়ে কুকর্ম সেরে রাখতে চান, এই গুলিয়ে যাওয়া আমাদের সে সব থেকে উদ্ধার করবে। সঞ্জয়বাবু বন্ধুস্মরণে বলেছিলেন, সেদিন তাঁরা খোচড় চিনতে পারতেন। চিনতে পারাটা আজ বোধহয় আরও বেশি করে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
‘আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, যে তাগিদ থেকে আমি লিখি তার সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক রদবদলের যে বিচিত্র ও ট্রাজিক সময়ের আমি সাক্ষী তার অনুরণন আমার আখ্যানে রয়েছে- কখনও আমি অংশীদার এবং সব সময়েই ভিক্টিম। তৃতীয় বিশ্বের একজন লেখক হিসেবে এটাই আমার উপলব্ধি। বিচ্ছিন্নতার কষ্টকর একাকীত্ব থেকে কোনো একটা অণ্বয়ে যাওয়ার চেষ্টা আশা করি পাঠকের চোখ এড়াবে না’- উপন্যাস সমগ্রের ভূমিকায় এ কথা লিখেছিলেন তিনি। লেখার মধ্যে দিয়েই তাঁর যৌবনে লেখা ইতিহাসে সাড়া দিয়েছিলেন। সময়ের পরিহাসেই সে অবস্থান থেকে তাঁকে সরে আসতে হয়েছে। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন কোথাও একটা সত্তর থেকে গেছে। এইটি বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে তিনি জোর দিয়ে বলছেন, ‘ চেতনা থেকে সত্তর যদি অন্তর্হিত হয়, তাহলে আত্মপরিচয় বলে আর কিছু অবিশিষ্ট থাকবে না।’ তাই আখ্যানে যে অণ্বয়ে পৌঁছনোর চেষ্টা তিনি করেন, ব্যক্তিগত গদ্যে দেখি এক ভবিষ্যতের উৎসবের স্বপ্ন তাঁর লেখায় উঁকি দিয়ে যায়। যে ঋত্বিক তাঁর অস্কার এবং অঙ্গীকার তিনি তো বলেইছিলেন, ‘দেশটা ক্রমশ ইতরের দেশ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর কোন সৎ শিল্পীরই নিজের দেশকে ইতর বলে দেখানো উচিত না। ব্যাপারটা অধার্মিক।’ ১৩৭১ সালে শারদীয়া পরিচয় পত্রিকায় ঋত্বিক যা বলেছিলেন, শারদীয়া পত্রিকা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়েই নবারুণ তাই আফসোস করে বলেন, ইতরের দেশ হয়ে দাঁড়ানোর আর বাকি কিছু আছে? এ এমন একটা সময় যখন, ‘ গোলকায়নের আমিষ আবহাওয়ায়, বে-আব্রু অসভ্যতা আকণ্ঠ ভোগের কার্নিভালে গোটা ব্যাপারটাই আর যেমনই হোক একটা ঐতিহ্যের বিচিত্র এক্সপ্রেসনে আবদ্ধ নেই, ন্যাক্কারজনক একটি ঢ্যামনামিতে পর্যবসিত হয়েছে।’ এবং এ কথা শুধু পুজোসংখ্যার মধ্যেই আবদ্ধ থাকে না, বরং গোটা সাহিত্য-সংস্কৃতির পরিমন্ডলকে তীর্যক কটাক্ষে বিদ্ধ করে। নবারুণ দ্বর্থ্যহীনভাবে আমাদের জানিয়ে দেন, ‘সাহিত্য ও অন্যান্য শিল্প গতানুগতিক ভূষি মালে পরিণত হয়, শেষ বিশ্লেষণে যার একটা লক্ষ্য রয়েছে- রাজনৈতিক শান্তিকল্যাণ রক্ষা করা।’ তিনি নিজে কোনওদিন তার পরোয়া করেননি, কেননা শুরুতেই তাঁর সভাবসিদ্ধ ডিসক্লেমার, তাঁর লেখার সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। আমরা মিলিয়ে নিতে পারি বিচ্ছিন্নতার কষ্টকর যে একাকীত্ব থেকে আখ্যানে তিনি মুক্তি খুঁজেছেন, সেই যন্ত্রণাদীর্ণ মুহূর্তগুলিকে। মার্শাল টিটোর ‘মিলিটারি রাইটিংস’ বইটি তিনি খুঁজছিলেন, কেননা, ‘লেখাতে নয় হাতে নাতে কাজে লাগাতে চাই বলেই। অন্তত হঠকারী একটা কিছু করে ফেলতে তো পারা চাই। অন্তত সম্ভাব্য কিছু একটা নিয়ে ভাবতে ও ভাবনাটাকে চারিয়ে দিতে চেষ্টা তো করাই যায়।’ আমরা বুঝতে পারি কেন তাঁর আখ্যানে শেষমেশ বেঁচে থাকে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা। এবং তিনি একে ‘মতাদর্শের দায়’ বলেই মনে করেন। ‘ লেখাকে হতে হবে সমসময়ের দলিল। এটা আজকাল হামেসাই বলা হয়। আমিও অস্বীকার করি না। কিন্তু অসংখ্য দলিল, উন্নতমানের সাহিত্য, বাঘা বাঘা লেখক- সবই থাকল কিন্তু চোরধাউড়, স্কাউন্ড্রেল, লুম্পেনরা দেদার সরফরাজী করে গেল- এটাই বা কেমন কথা?’ সুতরাং ফ্যাতাড়ুরা থাকে। জরুরি যা কিছু তিনি টুকরো টুকরো করে বলে যান, কিন্তু নিজেকে রিপিট করেন না। এও তাঁর শৈলীর চমৎকারী। বক্তব্য এক হলে পুনরাবৃত্তির ফাঁদে পা দিয়ে ফেলেন বহু তাবড় প্রাবন্ধিকই, নবারুণ সেখানেও স্বভাবসিদ্ধভাবেই ব্যতিক্রম।
সত্তর চলে গিয়েছে, কিন্তু ‘ভগ্নউরু হতাশ্বাস’ যে লেখকের স্বপ্নে চে গুয়েভারার মৃত অবস্থার ছবি যীশু খ্রিস্ট হয়ে ধরা দিতে থাকে এবং তাঁর চারপাশে যখন ‘মাথাকাটা কবন্ধ ব্রয়লারের সমাজ’ বানানোর সর্বগ্রাসী চক্রান্ত চলতে থাকে, তখন বিশ্বস্ত কমরেডটি আর কী করতে পারেন? আখ্যানের আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকে তিনি নোট পাঠিয়ে যেতে পারেন ভাবীকালের উৎসবের জন্য। এছাড়া আরও একটু সুবিধা করে দিয়ে তাঁর আত্মার কিছু অংশ গুঁজে রাখেন তাঁর প্রবন্ধ তথা গদ্যগুলিতে। চলতি সমীকরণের বাইরে আমাদের খোঁজ সে সবের কাছাকাছি পৌঁছলেই ইউটোপিয়ার সম্ভাবনা সত্যি হলেও হতে পারে, অন্তত সে সম্ভাব্যকে চারিয়ে দিতে তো দোষ নেই। খিস্তি-অস্বীকার-অঙ্গী ার ইত্যাদি পাঁচমেশালির প্রাতিষ্ঠানিক ছেনালি অবশ্য ব্যারিকেড হয়ে সেই সন্ধানের সামনে এখনও দাঁড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু কে না জানে, নবারুণ বিশ্বাস করতেন, এবং আমরাও করব যে, ‘ব্যারিকেড রাস্তা বন্ধ করে ঠিকই আবার নতুন রাস্তা দেখিয়েও দেয়।’