মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে নবারুণ পাঠ

রমিত দে

বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন নবারুণ, এবং হয়ত সার্বিকভাবে মার্ক্সীয় রাজনৈতিক চেতনা ও শিল্পচেতনার অনুসারী হয়েই তিনি তাঁর সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের তত্ত্ব খুঁজেছেন বারবারে।খুঁজেছেন নিম্নবর্গের চেতনার নথিপত্র। এমনকি তাঁর এই মতাদর্শের সুক্ষ অনুরণন আমরা পাই তাঁরই গল্পসংকলের ভূমিকায়। যেখানে তিনি বলছেন- ‘“দলিত মথিত মানুষ ও তাদের জীবনের এক বিচিত্র ক্যালাইডোস্কোপের মধ্যে আমার জীবন কাটছে। চারপাশে তাই আমি দেখি। কিন্তু চূড়ান্ত নিরিখে এই বাস্তবকে আমি চিরস্থায়ী বলে মানি না। বাস্তবকে পালটাতে হবে। হবেই। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় চেতনা তৈরী করার ক্ষেত্রে সাহিত্যের অবশ্যই একটা বিশিষ্ট ভূমিকা রয়েছে। ...। গোটা দুনিয়ার মানুষকে এক নিষ্ঠুর ‘ভুলা মাসানের পাকে’ ফেলে দেওয়া হয়েছে। এই অপদেবতাকে আমি ঘৃণা করি এবং তার নিঃশর্ত মৃত্যু চাই। সে আমাকে নতিস্বীকার করাতে চায়। বোঝাতে চায় যে ইতিহাসের সামনে আর কোনো পথ নেই, মতাদর্শ নিছকই হাত উড়ে যাওয়া মানুষের ফাঁকা আস্তিন যা গুটিয়ে কোনো লাভ নেই। সে যত একগুঁয়ে আমিও তার কথা বুঝতে ততটাই নারাজ। শেষ হাসিটা অপদেবতা নয়, মানুষই হাসবে। ইতিহাস সেই ভরসাই দেয়।“...এ তো গেল নবারুনের ব্যাক্তিগত মতাদর্শের ধারনা যা তাঁর সাহিত্যে বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু একজন পাঠক হিসেবে কেবল তার গল্পে বাস্তবতা আছে সমাজ আছে নিম্নবর্গ আছে অভিজ্ঞতা বিনিময় আছে এমন মত দিলে তাঁর গল্পের উপন্যাসের সামগ্রিক সৃষ্টির নিবিড় পাঠ অসম্পূর্ণ থাকে বলেই মনে হয় কারণ নবারুণের মত একজন সাহিত্যিক কেবল জীবনবাস্তবতার ছবিই আঁকেননি বরং একজাতীয় মনোবিজ্ঞানের চর্চাও করেছেন আর তাই তার কথাসাহিত্যে প্রতিবিম্বিত হয়েছে বিভিন্ন আকারে । হয়ত এই অস্পষ্ট নির্দেশগুলো, ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির-ব্যক্তির সাথে সমাজের-সমাজের সাথে প্রাত্যহিক জীবনের এই সজ্ঞান ও নির্জ্ঞান সংঘাতগুলোকেই আমরা মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বের আলোয় তার গল্পের চরিত্র তার ডায়ালেকটিক তার ভাষা এবং সামগ্রিক ডিসকোর্সটিকে ফেলে দেখতে পারি ...
এখন শুরুতেই খুব সরল কথায় দেখা যাক মার্ক্সীয় ক্রিটিসিজম ব্যাপারটা ঠিক কি ! সাহিত্য আলোচনা করতে গিয়ে যে বিভিন্ন ব্যাখান বিভিন্ন মূল্যায়ন তার মধ্যেই এটি একটি।অন্যান্য শ্রেনি থেকে পার্থক্য বলতে মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব সমাজ ও সাহিত্যকে পারস্পরিক সংলগ্ন বলে মনে করে।মনে করে মানুষের যাবতীয় মনন যাবতীয় মতাদর্শ সমাজ ও অর্থনীতির বিন্যাসের সাথে সুস্পষ্টভাবে বিন্যস্ত। অর্থাৎ সাহিত্য নিজেই একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান সেখানে। মার্ক্স তাঁর ক্যাপিটালেই বলেছিলেন মানুষে মানুষে সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে থাকে উৎপাদনের হাত ধরে গড়ে ওঠা কিছু অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং সেই ভিত্তির উপরই গড়ে ওঠে একাধিক উপরিসৌধ যার মধ্যে সাহিত্য অন্যতম। সেই সাহিত্যের মধ্যে সেই ভাষার মধ্যে মানুষের অস্তিত্বই আসলে লুকিয়ে আছে। লুকিয়ে আছে দৈনন্দিন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে অস্তিত্ব বজায় রাখার সাক্ষ্য । যেকোনো একটি দেশের একটি সমাজের সাধারন ভিত্তিই হল উৎপাদন পদ্ধতি আর তাই পুঁজিবাদী তৃতীয় বিশ্বে শাসন ও শোষনই হয়ে উঠেছে নবারুণের সাহিত্যভিত্তি। তারই উপরিসৌধ হিসেবে ভাবনাগুলোকে টান দিয়েছেন ডমিন্যান্টদের সাথে প্রলাতেরীয়েতদের সামাজিক সম্পর্কের প্রক্রিয়াটিতে। কতৃর্ত্বের অধিকার প্রভুত্বের অধিকার শাসনের অধিকারের সাথে সাথে গভীরভাবে অনুসন্ধান করে গেছেন সাবল্টার্ন জগতটিকে। সেখানে পরনির্ভরতার মধ্যেও আছে প্রতিবাদের , পরিবর্তনের মনন, প্রতিরোধের নানান অভিনব পন্থার মধ্যে দিয়ে আছে একটি প্রতিবিপ্লবের ইংগিত আর এই প্রতিবিপ্লব তো মার্ক্সীয় চেতনাতেই জারিত। লেখক নবারুন তাকে ভাষা দিয়েছেন যা আদতে একটি ভাবেরই বাহন। এখন আমাদের পাঠকের কাজ লেখকের এই যে সম্ভাব্য অভিজ্ঞতা লুকিয়ে আছে পাঠের মধ্যে তার আবিষ্করণ কারণ মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে নবারুণকে পাঠ করতে হলে আমাদের পাঠককে পাঠ অন্তর্নিহিত সেই প্রত্যাশার দিগন্তটিকে খুলে দিতে হবে।
নবারুণের গল্পের পাঠকৃতির নিহিতার্থকে মার্ক্সিস্ট পারস্পেকটিভ থেকে ইন্টারপ্রেট করতে হলে আমরা মার্ক্স তাত্ত্বিক পিয়ের মাশারির “থিওরি অফ লিটেটারি প্রোডাকশনে’র মত কিছু আধুনিক তত্ত্বের দ্বারস্থ হতে পারি। স্রষ্টা ও পাঠউপভোক্তার পারস্পরিক অভিঘাতে গ্রহনতত্ত্বের যে রসায়ন বা গ্রাহক সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে অতীত পাঠের বয়ানে নতুন পাঠের সম্ভাবনার যে খোঁজ ষাট সত্তরের দশক থেকে সাহিত্য সমালোচনার পরিপূরক হয়ে উঠল সেখানে মাশারি তাঁর “থিওরি অফ লিটেটারি প্রোডাকশনে’র দর্পণে একজন মনস্বী পাঠকের কাছে মূলত কি দাবী করলেন ! মাশারির বক্ত্যবের মূলে ছিল দুটি উপাদ্য- প্রথমত-what does the text say-এবং দ্বিতীয়ত-what does the text not say…& why does it not say it… মাশারি মনে করতেন সাহিত্যের প্রতিটি সৃজনের মাঝেই কিছু না কিছু রহস্য আছে কিছু না কিছু অব্যক্ত এবং একজন প্রকৃত পাঠক ও প্রথম শ্রেনীর উপভোক্তার কাজই হল পাঠের গভীরে লুকিয়ে থাকা ওই অব্যক্ত শূন্যায়তনকে আবিষ্কার করে তার বহুমাত্রিক মূল্যায়ন প্রদান করা। মাশারি যেকোনো সাহিত্যের মধ্যবর্তী এই গ্যাপ এবং সাইলেন্সগুলোতে থেমেছেন বারেবারে এবং পাঠককেও থামতে বলেছেন গল্পের ভেতরের লাক্ষণিক বা Symptomatical এলিমেন্টগুলোর কাছে , কারণ লেখকের লেখাচিত্র অনেকটা আয়নার মত, সেখানে বাস্তব থেকে উঠে আসা একটা মতাদর্শ বা দর্শনের প্রতিফলন থাকে কিন্তু একটি গল্পকে ভাবপ্রকাশের উপযোগী এবং নান্দনিক শৈলী প্রদান করতে গেলে সম্পূর্ণ বাস্তব বা হিস্টোরিকাল রিয়েলিটি সবসময় স্পর্শ করা সম্ভব নয়। লেখক তাঁর নিজের মত করে সমাজের , বাস্তবের ফ্র্যাগমেন্ট্রেড ইমেজগুলোকে নির্মাণ করেন এবং পাঠক সেই নির্মাণে লুকিয়ে থাকা ফাঁক দিয়েই পাঠের পুনগর্ঠন ও পুনর্নবীকরন ঘটাতে পারে। মাশারির যুক্তিতর্ক ধরে নবারুণের গল্পপাঠের মার্ক্সীয় আলোচনায় প্রথমেই আমাদের এমনই কিছু লাক্ষণিক উপকরনের কাছে অথবা বলা ভালো কিছু আপাত অদৃশ্য প্রশ্নের মুখোমখি হওয়া উচিত।যা থেকে নবারুনের গল্প উপন্যাসে মার্ক্সীয় বীক্ষনটির সুস্পষ্টতা সহজেই পরিলক্ষিত হয়।প্রশ্নগুলি কেমন হতে পারে !-
ক-তাঁর রচনায় সাবঅল্টার্ন কিংবা নিম্নবর্গের যে বিপুল ও বহুমাত্রিক সংগঠন ও বিন্যাস দেখা যাচ্ছে তার পাশাপাশি কি সমাজের ক্ষমতাবানদের চিত্রায়নও কি নবারুণের সাহিত্যে মানবমনস্তত্ত্বের অংশীদার হয়ে উঠেছে? যদি হয়েই থাকে তবে কি তারাও সমানভাবে মনোযোগ আকর্ষন করেছে গল্পের পরিকাঠামো বা সাহিত্যের আঙ্গিকে?
খ-তাঁর সাহিত্য দর্শণের রক্তে মাংসে কি লেগে রয়েছে কোনো ক্লাস কনফ্লিক্ট? বিমূর্ত বা মূর্ত রূপে কি দৃশ্যায়িত হয়েছে শ্রেনী বিভাজনের , বিচ্ছিন্নতার প্রজাতিগত বাস্তবতা?
গ-চরিত্রের বিন্যাসে ,ভাষায় তাঁর , সামুয়িক ডিসকোর্স ও ডিকশনে কি উঠে এসেছে অ্যালিয়েনেশন বা বিচ্ছিন্নবোধের ন্যারেটিভ? অস্তি কি সেখানে সমাজ ও মানুষের মাঝের আইডেনটিটিহীন এক উদ্ভট রসায়ন?
ঘ- চরিত্রগুলির মধ্যে আর্থ সামাজিক মাত্রার পাশাপাশি একটি কালচেতনাও কি বর্তমান? অর্থাৎ যে সংস্কৃতি বা যে সময়ের থেকে উঠে আসছে তারা সেই বাস্তবেরই সেই সংস্কৃতিরই গুনিতক হয়ে নির্মিত হচ্ছে !
ঙ-কোনোরকম কনস্পিসিয়াস কনজাম্পসন লক্ষ্য করা যাচ্ছে কি চরিত্রগুলির মধ্যে?
ইত্যাদি একাধিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে পারে নবারুণের চরিত্ররা। এবং পাঠ ও পাঠকের মাঝের রিসেপটিভ স্টাডি থেকে নবারুণের গল্প উপন্যাস ও তাঁর সামগ্রিক সৃজনীর আর্কিটাইপে মার্ক্সবাদী ধ্যানধারনার সংশ্লেষ আমরা লক্ষ্য করতে পারি। আলোচনার পরিসর সীমিত তাই আমরা প্রথম তিনটি প্রশ্নকেই একটি সারনীতে লিপিবদ্ধ করে দেখি নিটোল নিঁভাজ মেলোড্রামা কিংবা বুর্জোয়া রোমান্টিসিজমের বাইরে , মুদ্রিত টেক্সটের বাইরে নবারুণের সেই গোপণ সাবটেক্সটিকেঃ-



এভাবে ধীরেধীরে মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্বের সূচকগুলির নিরিখে নবারুণের গল্পের প্রেডিকেট লজিকগুলো থেকে আমরা সহজেই ভেতরের অদৃশ্য দ্বন্ধাত্মক ডিসকোর্সটিকে ঢুকে পড়তে পারি। তাঁর গল্পের ন্যারেটিভ বা শিরদাঁড়া থেকেই স্বীকৃত ফ্যাতারু বা চোক্তারের মত চরিত্রদের মধ্যে দিয়ে যে কল্পবিশ্বকে মাঝে মাঝেই নির্মাণ করে তুলেছেন নবারুন তা কেবল নিছক কোনো সিনট্যাকটিক্স এক্সপেরিমেন্ট নয় বা প্রতীকের মাধ্যমে পাঠকের সাথে অতিযোগাযোগও নয় বরং এটা এক ধরনের চোরা বিপ্লব বলা যেতে পারে যা ধীরে ধীরে প্রতিদিনের অভ্যস্ত জগতকে সাহিত্যের সাবটেক্সট করে তুলছে , সৃষ্টির উৎস যে সমাজ তার সাথেই যুগলবন্দী খেলছে সাহিত্য এবং শেষমেশ একটি মানবসত্তায় স্থিত হতে চাইছে।
মার্ক্সের মতে পুঁজিতন্ত্রী সমাজে উৎপাদন প্রথা ও বিনিময় ব্যবস্থা এই দুইয়ের উপরই নির্ধারিত হয়ে রয়েছে বুর্জোয়া অর্থনৈতিক সমাজ কাঠামো। আর এই পুঁজিতন্ত্রী উৎপাদনের বিশেষ বিয়োজনই একটি সমাজকে ক্রমাগত নিয়ে চলে শ্রেনী সংঘর্ষের দিকে। এই শ্রেনী সংঘর্ষ অবশ্যই বুর্জোয়া আর প্রলেতারীয়দের মধ্যেকার সংঘর্ষ। নির্দিষ্ট একটি শ্রম ব্যয় করে একদল তা মূল্য উপার্জন করে অথচ অন্যজন সেই শ্রম সময় ব্যয় করা মূল্যের দাম ঠিক করে, অর্থাৎ মানবসমাজের ফাঁকে ফাঁকেই রয়েছে একধরনের পন্য পৌত্তলিকতা যা থেকে শ্রম বিভাজন এবং যা থেকে শ্রেনী সংঘর্ষ ; মার্ক্স দেখিয়েছেন এই সংর্ঘষ একদিকে যেমন পুঁজিপতির সাথে শ্রমিকের তেমনি অন্যদিকে এটা বিশেষ দুটো আর্থসামাজিক শ্রেনীসম্বন্ধের সংঘর্ষ , আসলে মার্কস তো কখনো কোনো একটি ব্যাক্তিকে একটি সামাজিক সম্বন্ধের বিকাশ ও উদ্ভবের জন্য দায়ী করেননি বরং তার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা শ্রেনীস্বার্থের প্রভাবকেই বিশেষ মূল্য দিতে চেয়েছেন। কারণ কেবল অর্থনীতির বিচারে এরা দুটি ভিন্ন শ্রেণীর প্রতিনিধি নয় সাথে সাথে চিন্তনেরও দুটি সমান্তরাল প্রতিনিধিত্ব করছে বুর্জোয়া ও প্রলেতারীয় সমাজ। স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক সূত্রের সাথে সাথে ভিন্ন সমাজসূত্র দ্বারাও এরা নিয়ন্ত্রিত। ফলে মার্কসের মতানুযায়ী এই শ্রেনীসংঘর্ষ তত্ত্ব যতটা না স্থুল বিত্তসম্পর্কের ততটাই তা ভাবাদর্শগত আর এই ক্লাস কনফ্রন্টেশনের মধ্যেই মার্কস লক্ষ্য করেছিলেন ডায়ালেকটিক মেটিরিয়ালিজমের মত বিষয়টি যা আসলে শ্রেনী সংঘর্ষের থেকেও বেশী কিছু, যেখানে সামাজিক এই বিরোধগুলির মধ্যেই পরিবর্তনের ভাষা লুকিয়ে আছে। এখন এই ডায়ালেকটিকের প্রকৃতিটি আদতে কি? মার্কস বলছেন যেকোনো দ্বন্ধ যেকোনো সামাজিক সংঘাত যেকোনো অভাবের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নিরন্তর পরিবর্তনের নিরন্তর পূর্ণতার সম্ভাবনা। All Changes is the product of the struggle between opposites generated by contradictions inherent in all event, ideas, and movement”- অর্থাৎ যেকোনো একটি সামাজিক কাঠামোর মাঝেই লুকিয়ে আছে একাধিক অ্যান্টিথিসিস আর এই থিসিস অ্যান্টিথিসিস একে অপরের সাথে কোলাইড করেই গড়ে উঠছে নতুন সিন্থেসেথিস যা আবার তার মধ্যে জন্ম দিচ্ছে নতুন অ্যান্টিথিসিসের। এবং এই তর্ক চলছে যা বাস্তবতাকে নিয়ন্ত্রন করছে। এখন মার্কসীয় তত্ত্ব বলছে মানুষের চেতনা তার সত্তাকে নির্ধারন করেনা বরং মানুষের সামাজিক সত্তাই তার চেতনাকে নির্ধারণ করে ; মানুষের যাবতীয় মননগত আর্দশগত প্রনালী হল তার বাস্তব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানের ফসল । মনে হতে পারেই আমরা কি নবারুণের সাহিত্যপাঠ থেকে সরে আসছি? না, বরং পৌঁছোতে চাইছি সেই মার্কসীয় সাহিত্যবীক্ষণের কাছে যেখানে নবারুণের চরিত্ররা ভিন্ন সামাজিক অবস্থান থেকে উঠে আসছে , যেখানে তাদের চেতনার আকার আয়তন মাত্রা ও ঘাতের প্রতিফলনও ভিন্ন। প্রাথমিকভাবে এই বাস্তবকেই তারা চিরস্থায়ী মনে করে নেয় ঠিক যেভাবে প্রতিযুগে শাসকশ্রেনির ধারনা বা বুর্জোয়া সংস্কৃতি প্রাধান্য লাভ করে। কিন্তু বিবর্তনের পথ একটা থাকে আর নবারুন সেই অনুসন্ধানের আঁচটাই প্রলেতারীয়দের মধ্যে উসকে দিয়েছেন, অভিজাততান্ত্রিক হাতকড়াটা খুলে ফেলার ভাষাটা শিখিয়ে দিতে চেয়েছেন মাংস রক্তে হাড়ে মজ্জায় প্রত্যাখান মাখামাখি মানুষগুলোকে। তার চরিত্ররা যেন বারবার বিরোধ করছে , প্রতিবিপ্লব চাইছে। বিপুল জনগনের এই স্বতঃস্ফূর্ত অনুভবগুলিকেই নবারুণ ভাষার শরীর দিয়েছেন তার সার্বিক সাহিত্যকর্মে । যেমন “পাঁচুগোপাল” গল্পটিকে দেখা যাক। মফস্বল থেকে ফার্স্ট ট্রেনে কলকাতা এসে পাঁচুগোপাল রিকসা চালায় আর তার বউ মৌরি ওভারব্রিজ সংলগ্ন বেপাত্তা রংবাজদের এলাকায় ডাল কলে কাজ করে। কিছু নিম্নবর্গীয় চেতনার ন্যারেটিভে নবারুণ চরিত্রটির প্রাথমিক খসড়া নির্মাণ করেছেন। যেমন সে ভাবে রিকসা চালিয়ে টাকা জমিয়ে দেশে গিয়ে বিড়ির দোকান দেবে, তারা খসা দেখবে অদ্ভুত এক মাঠে দাঁড়িয়ে, কিংবা ঠাকুরের প্রতি তার নির্দোষ ও সরল ভক্তি এমনকি তার বাচ্চাকাচ্চা না হওয়াও যে আসলে ঠাকুরের ব্যাপার এসবের মধ্যে কোথাও যেন দুর্বল থেকে দুর্বলতম একটি আইডেনটিটিহীন মানুষকে আমরা পাচ্ছি যে মেনে নিয়েছে এই অনস্তিত্ব এই অর্থহীনতাই তার অস্তিত্বের আশ্রয় , আর তাই এই প্রি এক্সিটিং আইডেনটিটি নিয়েই সে চলতি সমাজের হিসেব মেনে বেঁচে থাকার মানুষ। সাথে সাথে পাঁচুগোপাল চরিত্রটির মধ্যে নবারুণ ঢেলে দিয়েছেন একটি অ্যাবসার্ডিটি, তা হল মৃতের প্রতি পাঁচুগোপালের আন্তরিক ও জ্যান্ত টান। শশ্মানে বসে একটি নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে পাঁচুগোপাল শবদেহ লক্ষ্য করে , লক্ষ্য করে জ্যান্ত মানুষের মরা পুতুল। এই আপাত অযুক্তিময়তায় মৃতের সাথে কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে নবারুণ কি পাঁচুগোপালকে আপাত বাস্তবতার কাছে বসিয়ে গেলেন? ঘূর্ণায়মান রাষ্ট্রচক্রের মাঝে কিছু অনড় যোগাযোগাহীন অস্তিবাদী উপস্থিতির সামনে ! এখন মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্বের ডায়ালেকটিক সূত্রটিকে আবার দেখা যাক। মার্কসীয় তত্ত্ব সরাসরি বলছে উৎপাদনের ভেতর যোগদান করে মানুষকে যে নির্দিষ্ট কতকগুলি সম্পর্কের ভেতর ঢুকতে হয় সেখানে তার মত প্রাধান্য পায় না , প্রাধান্য পায় উৎপাদনের ভেতর লেগে থাকা অর্থনৈতিক গড়নটি। এখান থেকেই গড়ে ওঠে সোসাল কনসাসনেস; অর্থাৎ বুর্জোয়া শ্রেনী ভাবতে থাকে পুঁজিবাদী সমাজের তারাই শেষ মহান মানুষ এবং এটা তাদের কাছে বিশেষভাবে প্রাকৃতিক ও ন্যায্য বলেই প্রতীত হয়; অন্যদিকে প্রলেতারীয় অসহায় অদ্ভুত অযৌক্তিক বঞ্চিত মানুষগুলো কোথাও যেন প্রাথমিকভাবে ওই খন্ডিত স্বাধীনতাতেই তাদের গুঁড়ো গুঁড়ো করে ভেঙে থাকা বা ছাই হয়ে উড়ে বেড়ানোটাকেই মেনে নেয়। এখানেই মার্কসের ফলস কনসাসনেস’র(False Consciousness) ধারনাটা মান্যতা পায়, যার সংজ্ঞাতেই বলা হচ্ছে- “People’s acceptance of an unfavourable social sysem without protestor questioning, that is, as the logical way for things to be”...নবারুনের পাঁচুগোপাল আসলে সেই খন্ডিত স্বাধীনতার মানুষ আর এই ন্যারেটিভকেই আরো তীক্ষ্ণ করে তুললেন নবারুণ যখন বললেন- “ লোডশেডিং। কুপকুপে অন্ধকার। আমরা ছোটোরাস্তা দিয়ে ঝকঝকে আলোয় এলাম। অথচ পাঁচুগোপালের রিকসায় আলো ছিল না। পাঁচুগোপাল একটা প্রাইভেট গাড়িকে কিছুতেই সাইড দিচ্ছিল না। সাইড দিলে তো আর হেডলাইটের আলো পাওয়া যাবে না। বড়লোক আলো দেখাবে। গরীব উতরে যাবে।“...
আবার এই মার্কসীয় তত্ত্বই বলছে সকল সামাজিক ধারনা ও অবস্থানই আপন নিরসনকে ডেকে আনে এবং পুনরায় নতুনভাবে আত্মপ্রকাশ করে। যেকোনো ধারনা সমাজে বহুকাল থাকতে থাকতে প্রকৃত , অকৃত্রিম ইত্যাদি শব্দে জারিত হয় কিন্তু একটা সময় তাদের জরাগ্রস্থতার প্রশ্নও ওঠে এবং তখন তার বিরুদ্ধে শুরু হয় মানসিক বিরোধিতা,শুরু হয় একধরনের বিরোধী চিন্তন। নবারুণ ‘পাঁচুগোপালে’র মত একাধিক নীরব নির্জন হয়ে থাকা চরিত্রের মধ্যে এই বিরোধিতার আত্মবিশ্বাসটুকু চার্জড করতে চেয়েছেন বারেবারে। সোশাল এনস্লেভমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসতে প্রান্তবাসী চরিত্রটিকে একধরনের ছটফটানি একধরনের জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছেন। ‘পাঁচুগোপাল’ গল্পের একেবারে শেষে এসে লেখক অনুভূতিশূন্য কিছু মৃত মানুষের অক্ষরমালা নিয়ে চিড়ফাড় করে দেখতে চেয়েছেন শ্রেনীবিভক্ত সমাজের খন্ডিত নির্জীব পরাধীন সাবলর্টান মানুষগুলোর মাঝে লুকিয়ে থাকা বারুদটুকু। গল্পের সমাপ্তির আগে একটা ছবি তুলে ধরেছেন নবারুন; যেখানে দেখা যাছে পার্টির ক্যাডাররা চোলাই মদ বেচার অপরাধে মারতে মারতে একটা ছেলেকে উদোম ন্যাংটো করে খোয়াবরাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে স্টেশনে নিয়ে আসছে। মার খেয়ে সে পড়ছে, উঠছে আবার পড়ছে। আর তাকে একটা কথা বারবার স্লোগানের মত বলানো হচ্ছে- “ আমি চোলাই বিক্রি করি, ব্লাডার আমার বুকে”- মার থামছে না, এমনকি যখন লোকটা মরে যায় সেটা বোঝার পরেও মার চলতে থাকে। চারপাশের মানুষ এ অভিজ্ঞতা দেখছে সামাজিক সচেতনতা বাড়াবার প্রয়োজনে। আসলে এই চোলাইয়ের অপরাধে মার খাওয়া ছেলেটি একটি এটারনাল সাফারিংসের প্রশ্ন আমাদের তুলে ধরে। এখানে মার খাওয়ার কথা হচ্ছে কিন্তু জেহাদকথা নেই, বেঁচে থাকার মূল্য খুঁজতে মানিয়ে নেওয়ার কথা হচ্ছে। বুর্জোয়াশ্রেনী যে শাসনযন্ত্রে কেবল প্রভূত্ব প্রতিষ্ঠা করেনা সাথে সাথে সার্বিক সামাজিক মননে গড়ে তোলে একধরনের হেগেমনি ; এখানে তাদের নিজস্ব স্লোগান ঝুলিয়ে দিয়ে সমান্তরাল আধিপত্যময় ডিসকোর্স নির্মাণ করছে। কিন্তু ওই ছেলেটি আসলে প্রকান্ডঃ কোনো হিমশৈলের চূড়াটুকু মাত্র যাকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যাকে নির্মোক পড়া মধ্যবিত্ত সমাজ লুকিয়ে দেখছে দর্শকের ভূমিকায়। কিন্তু হিমশৈলের আপাত অদৃশ্য অংশটিরও তো একটা ভাষা থাকে, একটা প্রতিস্পর্ধী বয়ান । পাঁচুগোপাল সেই আপাত অদৃশ্য অংশ , সেই সাবলর্টান মেটাফর যার মধ্যে দিয়ে নবারুণ একটা প্রতিবিপ্লব চাইছেন, মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্বের এই সেই প্রোডাকটিভ ফোর্স যা সনাতনী সমাজ ও উচ্চবর্গ থেকে নিম্নবর্গের চেতনার বৈপরীত্যকে চিহ্নিত করতে চায় এবং সামন্ততান্ত্রিক বাস্তববাদ থেকে নবারুন বারেবারে সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের গভীরে প্রবেশ করতে চান। প্রখ্যাত মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লুই আলতুসের তাঁর প্রোডাকটিভ থিওরি দিয়ে ব্যাখা করেছিলেন কিভাবে কোনো সাহিত্য বা শিল্পবস্তু সামাজিক ভিত্তির পরিবর্তন করতে পারে। তাঁর মতে শিল্প সাহিত্যও একটি মতাদর্শগত সংগ্রামের ক্ষেত্র এবং একজন সাহিত্যিক তার নিজস্ব সৃষ্টির মধ্যে দিয়ে তার কালচারাল আর্টিফ্যাক্টের মধ্যে দিয়ে শ্রেনীবিভক্ত মানুষগুলির একটি নতুন মানসক্রিয়া গড়ে তুলতে পারেন। নবারুনও আসলে অ্যালিয়েনেটেড সত্তাদের , প্রলাতেরীয়দের তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যের দৃশ গন্ধ শব্দ স্পর্শের বয়নে একটি প্রোডাকটিভ ফোর্স করে তুলেছেন। পাঁচুগোপালের মৃত্যু কিভাবে হবে কিংবা আদৌ তার মৃত্যু না হয়ে পুনঃর্জন্ম হবে কিনা এজাতীয় প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে নবারুণ নিজেকেই যেন এক আত্মঘাতী পরীক্ষায় নামিয়েছেন। ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে গ্যাস চেম্বারে বা ইলেকট্রিক চেয়ারে মৃত্যু চাননি পাঁচুগোপালের বরং খালের পাশে যে বিরাট চোলাই তৈরীর কারখানা যেখানে বিরাট মালিক আসে পুলিশ আসে নেতা আসে ক্যাডার আসে রাষ্ট্র আসে পুঁজিবাদ আসে সেই খালের জলে চোলাই তৈরীর নোংরা আর বিষের সর ফেলা বন্ধ করতে চাইবে পাঁচুগোপাল , মালিক তাকে হয়ত বলবে চোলাই কারখানায় সে কাজ চায় কিনা এবং তা শুনে সে ভ্যাটের জালায় থান ইঁট মারবে, মালিকের পায়ের তলায় পিষে পিষে হয়ত মারা যাবে পাঁচুগোপাল। তবে কি বহুদিন ধরে অন্য এক পাঁচুগোপালকে খুঁজে বেড়াচ্ছেন নবারুণ ! সদ্যপ্রয়াত কবি সুমিতেশ সরকারের দুটো অমোঘ লাইন মনে পড়ে যাচ্ছে- “ বহুদিন ধরে তুমি লোকটাকে খুঁজে বেড়াচ্ছ/ আর লোকটাও খুঁজে বেড়াচ্ছে তোমাকে”..হ্যাঁ একজন পাঁচুগোপাল প্রতিনিয়ত অন্য এক পাঁচুগোপালকে খুঁজে বেড়াচ্ছে যে অনায়াসে ওই ভ্যাটের জালায় থান ইঁট মারবে , যে অবলীলায় বৃহৎ পুঁজি আর সামাজ্যবাদের কাছে নতিস্বীকার না করে মানুষের নতুন বাজার খুঁজবে; পাশাপাশি একজন নবারুন খুঁজে ফিরছেন নতুন এক নবারুনকে। কল্পস্বর্গবাদী হয়ে বেঁচে থাকা যার কাম্য নয় বরং মানুষের একটি নিঃশর্ত হাসিই তার চাহিদা। পাঁচুগোপালের মৃত্যুচিন্তা পাঁচুগোপালের নিজস্ব নয় বরং নবারুন তার সাহিত্যশৈলীতে একটি মতাদর্শকে মৃত্যু নাম্নী একটি টেকস্টের অন্তর্ভূত করতে চেয়েছেন। মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে তিনি আসলে মানুষের ওই প্রকৃত হাসিটাকেই উদ্ধার করতে চাইছেন যা চাপা পড়ে গেছে “ভুলা মাসানের পাকে”। পাঁচুগোপালের মৃত্যুচিন্তার মত একটি স্বপ্নলব্ধ ইউটোপিয়ান ডিসকোর্সের মধ্যে দিয়েও নবারুন আসলে বারেবারে শব্দের কাঠামোর ওপর দীর্ঘকালীন একটি ক্লাস কনফ্রন্টেশনের ছবি এঁকে চলেছেন। একটি মতাদর্শের, যে মতাদর্শ মার্কসীয় নৈতিকতা প্রাণিত।
মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্বের অন্যতম উত্তরসূরী পিয়ের মাশারি তাঁর A Theory of Literary Production(1966) গ্রন্থে বলছেন লেখক এই মতাদর্শকে পাঠের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখেন একেবারে প্রাকৃতিক ভাবে কারণ মতাদর্শ স্ব্য়ং অদৃশ্য একটি জিনিস এবং যেকোনো পাঠের শেষে পাঠক মনোবিশ্লেষকের ভূমিকায় উত্তীর্ণ হয়ে তুলে নিতে চাইবে ওই মতাদর্শের প্রাণটিকে, একটি বিষয় হিসেবে তাকে চিহ্নিত করবে । নবারুণ তাঁর মার্কসীয় মতাদর্শকেও পাঁচুগোপালের মত চরিত্রের রূপ আঙ্গিকে জড়িয়ে রেখেছেন , তাই তো তার মৃত্যুদৃশ্যের কল্পনাতেও তাকে কেবল নিম্নবর্গের ভীরু অনুগত নিষ্ক্রিয় একটি জীব হিসেবে দেখতে চাননি নবারুন বরং তাকে দিয়েছেন একটি রাজনৈতিক বিরোধের ফর্ম্যাট।তাকে সক্রিয় করে তুলেছেন প্রতিপক্ষ হিসেবে, প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন, আর নিম্নবর্গের চেতনার এই আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্যতার মধ্যে দিয়ে নবারুন তার মার্কসীয় মননের নবসংকলনই পৌছতে চেয়েছেন পাঠকের সামগ্রিক পাঠে। পাতি বুর্জোয়া অস্তিত্বের কাছে রাজনৈতিক পরিনতি হিসেবে পাঁচুগোপালের মত অলীক চরিত্ররা কেবল যে ব্যর্থতার ছবি নয়, বরং এই পাঠ থেকে আরও একটি চিত্ররূপ নির্মাণ হয়ে চলেছে আর তা হল একটি চরিত্রের শ্রেনীবিভক্ত সমাজের আইরনি থেকে ধীর ধীরে নিম্নবর্গীয় আইকন হয়ে ওঠা । শ্রেনীচেতনার বৈপরীত্য গভীর ভাবে অনুভব করেছেন বলেই হয়ত নবারুনের গল্প উপন্যাসের একাধিক চরিত্র সে হার্বাট হোক বা ফ্যাতাড়ু তাদের মধ্যে একধরনের সম্ভাবনাময় অঞ্চল গড়ে দিতে পেরেছেন নবারুন যেখানে পরিবর্তনের সম্ভাবনা আছে বিরোধের সম্ভাবনা আছে সম্ভাবনা আছে প্রলেতারীয়দের নিজস্ব বিবর্তন ও উত্তোরণের। আসলে তাঁর গল্পের একাধিক চরিত্রদের দিয়ে একটি মৌলিক পরিবর্তনের প্রশ্ন তুলেছেন নবারুণ।
যেকোনো পাঠের মার্কসীয় আলোচনাতেই মতাদর্শ বা আইডিওলজি একটি তাৎপর্যময় অংশ।মূলতঃ পন্য ও মূল্যের বন্টনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা সমাজে স্বাভাবিকভাবেই ডমিন্যান্ট ক্লাসের মতাদর্শটিকেই ডিকটেট করতে দেখা যায় । এবং মার্ক্সের মতে শুরু থেকেই শিল্প ও সাহিত্য তাতে প্রচ্ছন্ন মদতদাতার ভূমিকা নিয়েছে। পাঠকের অজান্তেই সে ঢুকিয়ে দিয়েছে বুর্জোয়া সমাজনীতির স্ট্যাটাস কিও। এবং দেখা .যায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই পরশ্রমজীবী শ্রেনীগুলির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে শিল্পসাহিত্য সেভাবে সোচ্চার নয়। কিন্তু যেকোনো সাহিত্যের মার্ক্সীয় বীক্ষণে সাহিত্যকর্মটিকে কেবল অ্যাস্থেটিক অবজেক্ট হিসেবে না দেখে দেখা হয় একটি বিশেষ সংস্কৃতির আর্থসামাজিক অংশ হিসেবে। ফলে সামাজিক প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বে বাস্তবধর্মী মনস্তত্ত্বের অনুসন্ধান থাকবে সেটাই স্বাভাবিক এবং রাজনৈতিক প্রসঙ্গ থেকেও তাকে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভব নয় । মার্কসীয় সাহিত্য তাত্ত্বিক জেমসন বলছেন সমাজের প্রতিফলনই শুধু নয় মার্কসীয় সাহিত্য তত্ত্বর দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে একটি সাহিত্যের প্রায় সমস্ত উপলব্ধির সাথে রয়েছে রাজনৈতিক পাঠ রাজনৈতিক ব্যাখা,অর্থাৎ মতাদর্শকে সরাসরি সাহিত্যের বিষয় হিসেবে ব্যাখা করতে চেয়েছেন তিনি-“It is only at this price- that of the simultaneous recognition of the ideological and Utopian functions of the artistic text- that a Marxist cultural study can hope to play its part in political praxis, which remains, of course, what Marxism is all about…”-তবে জেমসনের থেকে কিছুটা ভিন্ন লুই আলতুসের মার্কসীয় সৌন্দর্যতত্ত্বের ব্যাখা । আলতুসেরর মতে শিল্প শুধু মতাদর্শের প্রকাশ নয় বরং জ্ঞান ও মতাদর্শের মধ্যবর্তী একটি এলাকায় শিল্পের অবস্থান। আর মার্ক্সীয় সাহিত্য তত্ত্বের বয়ানে মতাদর্শগত এই একাধিক দ্বন্ধতা বারবার আমাদের নিয়ে চলে একটি গভীর প্রশ্নের দিকে তা হল কোনো সাহিত্যসৃষ্টিকে আমরা কিভাবে দেখব ? ক্রিয়েশন না প্রোডাকশন হিসেবে ! সামাজিক অবস্থান বা রাজনৈতিক পটপ্রসঙ্গতার মধ্যে দিয়ে নবারুণের গল্পে এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগে আমরা দেখে নিই মার্কসীয় সাহিত্য তাত্ত্বিক পিয়ের মাশারির এ সম্পর্কিত কিছু মূল্যবান ব্যাখা। মাশারি তাঁর “A theory of Literary Production”গ্রন্থে তিনি বলছেন ক্রিয়েশন একপ্রকারের সেলফ মাল্টিপ্লিকেশন, নিজেকেই নিজের পুনঃপ্রতিস্থাপনের প্রচেষ্টা বলা চলে। নিজের ভেতরের ‘আমি’টাকে খুঁজে পাওয়ার একধরনের কন্টিন্যুয়াল ইনভেস্টিগেশন। ফলে ক্রিয়েশনে একজন মানুষ ধারবাহিকভাবে সেই বাস্তবকেই গড়ে তোলার চেষ্টা করে যা আসলে এখনও বাস্তব হয়ে ওঠেনি। এবং ধীর ধীরে সে বিচ্ছিন্ন কল্পজগতে প্রবেশ করে সেই অপর অন্য আমিটাকে খুঁজে পেতে এবং প্রজাতি সত্ত্বা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই মানুষটা আসলে ম্যান উইথআউট ম্যান। মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বের নিরিখে মাশারি বলছেন এই অ্যালিয়েনেটেড মানুষকে যখন একজন লেখক তার লেখনীর মাংসল বৃত্তান্তে বাস্তব করে তোলার চেষ্টা করেন তখন শিল্প ক্রিয়েশন না হয়ে একধরনের প্রোডাকশন হয়ে ওঠে। লেখক শিল্পী সেখানে একজন ক্রিয়েটরের ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে ওই বিশেষ অবস্থা বিশেষ সমাজের এলিমেন্ট হয়ে ওঠেন। কারণ সেখানে লেখক অ্যালিয়েনেটেড মানুষের মধ্যে দিয়ে ক্রাইসিস অফ ক্রিয়েশন খুঁজবেন, নিজে অ্যালিয়েনেটেড হতে চাইবেন না।
আর তাই মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বের মতে সাহিত্য আসলে সমাজেরই একটি ক্ষুদ্র সংসস্করণ এবং তার নিজের নির্দিষ্ট কিছু আইডিওলোজিকাল ফাংশান রয়েছে। এবং সাহিত্যের এই আইডিওলোজিকাল ফাংশানটি সরাসরি লেখকের মতাদর্শের সাথে সংযুক্ত। বাস্তবতারহিত স্বর্গীয় তাড়না বা কোনো আধ্যাত্মিক সত্তার অনুপ্রেরণায় সাহিত্য সৃজনের প্রতি মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্ব প্রথম থেকেই খড়গহস্ত বরং সেখানে শিল্পের প্রেক্ষাপটে রয়েছে রক্তমাংসের পটভূমি। আর্থসামাজিক ক্ষমতার এক বিশেষ ধরনের বিন্যাস ও প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়েই মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্ব গড়ে উঠেছে।পণ্য ও উৎপাদনের সাথে মার্ক্স যেমন অর্থনৈতিক অবস্থানের ধাঁচ গড়েছেন তেমনি প্রথম থেকেই মার্কসীয় তত্ত্ব সমাজ পরিবর্তন ও সে সম্পর্কিত আন্দোলন এবং সাহিত্য রচনা এ দুটিকেই পরস্পর সম্পৃক্ত বলে দাবী করেছে। মার্কসীয় সাহিত্যতত্ত্ব বিকাশের অনেক আগেই স্ব্য়ং কার্ল মার্কস ১৮৫৯ এ তাঁর “Critics of Political Economy” তে নিজেই বলছেন – “The mode of production of material life determines altogether the social, political, and intellectual life process. It is not the consciousness of men that determines their being, but on the contrary their social being, that determines their consciousness”- মার্ক্সীয় ডায়ালেকটিক হেগেলীয় ডায়ালেকটিক থেকে ভিন্ন ছিল মূলত আদর্শবাদ হতে মানবতাভিত্তিক বাস্তববাদ অবধি। হেগেলের ডায়েলেকটিক আইডিয়া ভিত্তিক যেখানে মার্ক্স তার ডায়ালেকটিকের মূলে রেখেছেন বস্তুকে কারণ তিনি সমাজের মধ্যে থেকে সমাজকে আক্রমণের প্রশ্ন তুলেছিলেন। তার বিষয় সামাজিক তার চরিত্ররাও নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট। হেগেলীয় অতীন্দ্রবাদের থেকে মার্ক্সীয় মানবতাভিত্তিক বাস্তববাদ মানুষকে নিয়ে তার ভিত্তি রচনা করে এবং মানুষ যেহেতু সমাজের অংশ তাই সমাজের বাইরের কোনো কিছুকেই মার্কস তার মতাদর্শের ভিত্তি করেননি। মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বে তাই সমাজের বাস্তববাদ সমর্থিত হল এবং সেখানে সমাজ থেকে উঠে আসা চরিত্রদের দিয়ে স্বীয় সমাজকেই বিদ্রুপের একটি ক্ষেত্র তৈরী হল। এবং রুশ মার্ক্সবাদের জনক প্লেখানভের পর গেয়র্গ লুকাচই মার্ক্সীয় সাহিত্যত্ত্বের প্রথম প্রাসংগিক ব্যাখা দিলেন। লুকাচ বললেন সমাজকে জানতে হবে লেখককে এবং সেটাও সামগ্রিক সমাজকে, এবং চরিত্রের বিমূর্তার কোনো স্থান নেই বরং সেখানে চরিত্র সরাসরি সমাজের অংশীদার হয়ে কথা বলবে।মার্কসীয়তত্ত্বে র দিক দিয়ে দেখলে লুকাচ একাধিক বাস্তববাদী চিন্তার বিকাশ যেমন ঘটিয়েছিলেন তেমনি শিল্প রাজনীতি এবং সাহিত্যের সহাবস্থান ও অংশীদারিত্বের উপর সরাসরি জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু লুকাচ পরবর্তী সময়ে মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বে একাধিক মতবাদ ও চিন্তনের মিশ্রণ ঘটেছে এবং কোনো সাহিত্যপাঠে মার্ক্সীয়সৌন্দর্য তত্ত্বের ব্যাখায় চরিত্রের মূর্ততার প্রশ্নটা বারবার খন্ডন হয়েছে। সামাজিক ও আর্থরাজনৈতিক পটপ্রসংগ থেকে উঠে আসা চরিত্র ও আবহের সাথে কোথাও কোথাও শিল্পীর হাত ধরে ঢুকে পড়েছে অস্তিত্বগত অ্যাবসার্ডিটির নতুন মাত্রা। এবং লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মার্ক্সীয় সাহিত্যতত্ত্বের মিশ্রনে নবারুণের সাহিত্যপাঠে আমরা সবসময় এই সরাসরি সমাজতান্ত্রিক বাস্তববাদের ছবিটা পাইনা , কোথাও যেন সেখানে লুকাচ পরবর্তী ফ্র্যাঙ্কফুট স্কুলের মার্কসীয় নন্দন তত্ত্বের স্বর লক্ষ্য করা যায়। ফ্র্যাঙ্কফুট স্কুলের মার্ক্সীয় নন্দন তাত্ত্বিকরা বললেন সাহিত্যের সাথে বাস্তবের সংস্পর্শ সরাসরি নয় বরং কিছুটা ফাঁক থাকে , থাকে কিছুটা দূরত্ব আর এই দূরত্বই সাহিত্যকে শিল্পকে তাৎপর্যময় করে তোলে। অর্থাৎ সাহিত্যের আঙ্গিক বা সংগঠন একটি সুনির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থানের দিকে কাহিনীটিকে ক্রমাগত পাকাপোক্তভাবে নিজের দিকে জড়িয়ে নিতে চাইবে। ফলে এখানে বিষয় নয়, আঙ্গিকে রয়েছে সাহিত্যের মূল দিশাটি , যা মার্ক্সীয় বিশ্লেষনের সাথে সাহিত্যের পাঠের আলোচনায় বিশেষ ভূমিকা গ্রহন করে। এই প্রসংগে আমরা নবারুণের “৪+১” গল্পটিকে আমাদের আলোচনার বিষয় করতে পারি। চারজন শববাহক ও তাদের কাঁধে নেওয়া একটি মৃতদেহকে নিয়ে গল্পের ব্যক্তিমাত্রিক টেকস্টটি শুরু করেছেন নবারুণ; বৃষ্টির দিনে ট্রামের ধাক্কা খাওয়ার পর থেকে তাদের নিয়ে শুরু হয় গল্পের নাটকীয়তা। কি ছিল তাদের কাঁধে? যদি মৃতদেই হয় তবে ওই মৃতদেহটি কার? তার নাম কি? তার কেউ আছে? কিভাবে সে মারা গেছিল? যারা কাঁধে নিয়েছিল ওই চারজন শববাহক, তারাই বা কে ছিল? কেউ আছে তাদের? ওই মৃতদেহ কি কোনো বুবিট্র্যাপ? রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে করা কোনো গোপণ চক্রান্তের অংশ? এই হাজারো ক্যাওস দিয়ে কাহিনি থেকে তুলে আনার চেষ্টা হল আসল কথাকে অথচ আসল কথাটিই শেষমশ উদ্ধার হলনা কারণ প্রমাণ হল ওই চারজন শববাহকের চারজনই মূক বধির ও অন্ধ। এখানে চরিত্রগুলি প্রায় সবই ইউটোপিক কিন্তু যে আঙ্গিকে চরিত্রগুলিকে দিয়ে নবারুণ কথা বলিয়েছেন ( কিংবা বলা ভালো চরিত্রগুলির না-বলা কথার পারস্পরিক মিঁজ-অ-সেন তৈরী করেছেন) তা আমাদের একটা বাস্তব সম্পর্কিত ভিস্যুয়াল লিটেরেচারের দিকে নিয়ে চলে। আমরা যেন ওই প্রতিটা সংলাপের মধ্যে দিয়ে ছুঁতে পারছি মানুষের অনিশ্চিয়তা আর অস্তিত্বহীনতার অনুষঙ্গগুলোকে। গল্পটির কয়েকটা সংলাপকে নেওয়া যাক, দেখা যাক কিভাবে তারা কল্পনা থেকে মুক্ত করে দিচ্ছে একটি কল্পবাস্তব চরিত্রকে এবং ক্রমশ তার চিন্তাসূত্রকে রূপ দিচ্ছে বাস্তববাদের প্রতিপাদনে-




নবারুনের কৃত চরিত্রগুলির মধ্যে এভাবেই একধরনের শৈল্পিক ক্যালিগ্রাফি কখনও সরাসরি বাস্তবকে না ছুঁয়েও পাঠকের মধ্যে ট্রান্সক্রিয়েট করে দিচ্ছে বাস্তববাদী কিছু ব্যাঙ্গাত্মক ইঙ্গিত , মানবতার কিছু বৈধ প্রশ্ন, বেঁচে থাকার কিছু তর্কাতীত ব্যঞ্জনা যেখান থেকে পাঠক সমাজতন্ত্রের আরও গভীরে প্রবেশ করছে, নবারুণের সাহিত্যজ রূপ-আঙ্গিকের মাধ্যমে এবং চরিত্রগুলির মনোবিশ্লেষনের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করছে বাস্তবের গ্র্যান্ড ন্যারেটিভটিকে। সামাজিক ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে এই বাস্তবধর্মী মনস্তত্ত্বের অনুসন্ধান আদতে মার্কসীয় ভাবনাসুতোগুলোকেই ধীরে ধীরে গুটিয়ে আনে। স্ট্রাকচারাল মার্ক্সিজমে যে ট্রান্স ইন্ডিভিস্যুয়াল মেন্টাল স্ট্রাকচারের কথা বলা হয়েছে , নবারুণের চরিত্ররাও যেন তেমনিই ব্যক্তিমাত্রিক কাট আপ থেকে বেরিয়ে এসে গুলিয়ে যাচ্ছে বৃহত্তর মানুষের মিথস্ক্রিয়ায়। রাষ্ট্রীয় জাঁতাকল থেকে বেরোতে না পারা একটা সমাজ এবং তার রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সাথে মানিয়ে নেওয়া পুলিশ চিকিৎসক স্বরাষ্ট্র দপ্তর অবধি কিছু মনিটরিং মেশিনের মধ্যে দিয়ে এই যে একটা সোশাল ইম্পোটেন্সি গড়ে ওঠা নবারুণ তাঁর এক্সপ্যান্ডেড লিটেরেচারে সেই গল্পটাকেই ধরতে চেয়েছেন বারেবারে। যার মধ্যে সমাজের শরীর ও রাষ্ট্রের শরীরের পারস্পরিক সংক্রমণের প্রশ্নটি গুরুতর। বুর্জোয়া শরীর দিয়ে যে পোষ মানিয়ে দেওয়া হয়েছে সমাজের শরীরটাকে।“নিম্নবর্গে র ইতিহাস”র কিছু অংশ এখানেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে যেখানে সামাজিক শরীর ও বুর্জোয়া শরীরের প্রসঙ্গ এনে গৌতম ভদ্র বলছেন- “ সামাজিক শরীরকে বদলে বুর্জোয়া শরীর করার যে ঐতিহাসিক যজ্ঞ, আধুনিক রাষ্ট্রই তার প্রধান হোতা ও আধুনিকতার মতাশ্রয়ী শিক্ষিত মানুষেরা তার পুরোহিতশ্রেনী। আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য পরিষ্কার, সমাজকে ‘পোষ’ মানানো এবং ‘শরীর’ এর প্রশ্নটিকে ‘সামাজিক’ রাজনীতি বা রাষ্ট্রবিরোধী চিন্তার বাইরে নিয়ে আসা।‘-“৪+১” গল্পে এভাবেই তো একটি বুর্জোয়া শরীর গড়ে উঠছে সমাজকে ব্যবহার করে, সমাজের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লালিত ওই পুলিশ ডাক্তার প্রশাসন থেকে শুরু করে মধ্যবিত্ত সামন্তপ্রভুদের ব্যবহার করে , আর ওই কৃত্রিম প্রভুত্বের তলায় চাপা পড়ে আছে নিন্মবর্গীয় সাধারন মানুষের ইতিহাস। তাদের স্বর শোনা যাচ্ছে না, জানতে পারা যাচ্ছেনা তাদের অস্তিত্বের মোটিফ ও মেটাফর। নবারুনের গল্পের কেন্দ্র থেকে পরিধি অবধি এই সামাজিক ঘূর্ণিপ্রক্রিয়া পাঠককে বারবার একটি তর্কের সামনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে-তা হল একটি অলিখিত শৃঙ্খলামুক্তির আখ্যান, নিম্নবর্গের একটি অকথিত ভাষার আখ্যান, তাই হয়ত গল্পের শেষে এসে ক্বেউ কেউ ওই থমকে যাওয়া চার জন বোবা কালা অন্ধ শববাহকের পারস্পরিক ফিসফিসানি শুনতে পায়, শুনতে পায় তাদের নিজেদের মধ্যে চাপা হাসির শব্দ। যে সাবল্টার্ন স্টাডিজ নবারুণের গল্পের মূলছাঁচ সেখানে যেমন সমাজের ভগ্ন ও ভগ্নাংশের কথকতা রয়েছে তেমনি রয়েছে কিছু ব্যক্তিগত আনডিসক্লোসড কন্ঠস্বর। তিনি তো বাস্তবকে দীর্ঘস্থায়ী বলে মনে করেননি কখনই বরং বাস্তবকে পালটাতে চেয়েছেন, চেয়েছেন ‘প্রতিবিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক’।
ব্যক্তি নবারুণের সাথে যোগাযোগের কোনো জায়গা নেই, আমরা কেবল তার চরিত্রদের মনঃসমীক্ষণের সাথে যুক্ত। আমরা কেউ মনবিশেষজ্ঞ নই কেবল সাধারন পাঠকমাত্র অথচ তাঁর সৃষ্টির একত্বের মাঝে তিনি যে বহুত্বের বর্হিজগত বানিয়েছেন তাতে ওই প্রতীকের খেলা ধরে আমরা সহজেই একটি সমীকরণে পৌঁছে যাই , আর তা হল মার্কসীয় আত্মবীক্ষন। শ্রম বিভাজন বা ডিভিশন অফ লেবারের সাথে মার্ক্স যে বিচ্ছিন্নতাকে যুক্ত করেছিলেন সেই বিচ্ছিনতারই এক নতুন বিন্যাস গড়েছেন নবারুণ, বিচ্ছিন্নতার ভূখন্ডে টেনে এনেছেন সবকটি মানবিক সূত্রকে আর গড়েছেন একধরনের এক্সপ্যান্ডেড লিটেরেচার। মার্ক্স বলতেন উৎপাদনশক্তি বিকশিত হতে হতে এমন একটা জায়গায় এসে দাঁড়ায় যে প্রচলিত বিত্ত-সম্পর্কাদির সাথে তার বিরোধ হতে বাধ্য আর ওই উৎপাদন শক্তিকে শৃঙ্খলিত করতে সচেষ্ট হয় বিত্ত-সম্পর্ক আর তখনই উদ্ভুত হয় সমাজ বিপ্ল্বব বা সোসাল রিভোল্যুশন। নবারুণও কি এই বিচ্ছিন্নতার অবসানের সাক্ষীই হতে চেয়েছিলেন? নাহলে কেন তিব্বতী গুরু লং চেংপাকে দিয়ে বলালেন-“ এই বিশ্বে আর আমি থাকব না, থাকব মৃত্যুহীনতার মহান শান্তির ঘেরাটোপে। এ কথাও কি শান্তি দেবে? যখন চারিদিকে আলো ঝলসাবে, দপ করে জ্বলে ওঠার জন্যে যখন প্রত্যেকটা অনু প্রত্যেকটা কার্বন জোড়ের অলঙ্কার, টোপোলজির চার-রঙর প্রবলেম এমন কি তখনও যদি প্রত্যেকটা প্যারামবুলেটর,প্রত্য কটা দুধের বোতল, প্রত্যেকটা ললিপপ , প্রথম জন্মদিনের ভিডিও টেপ- সকলে অধীর হয়ে ওঠে? এ সময়ে কি কেউ থাকবে?
আসলে এ কথা তো নবারুণের ...
সব শেষ হয়ে যাওয়ার আগে সব শুরুর এ অপেক্ষাও ...

*****************************