অ-ক্যাননীয় নবারুণ

শতাব্দী দাশ

“যে পৃথিবী রয়েছে আমাকে ঘিরে, আমি তাকে লেজিটিমাইজ্‌ড হতে দিতে চাই না। অতএব আমি এটাকে সারাক্ষণ আক্রমণ করি ও করব”।


নবারুণ নিঃসঙ্গ নিশানের মতোই উড়বেন, স্ব-সাহিত্যকে বলবেন গেরিলাযুদ্ধ বা ‘মলোটভ কক্‌টেলের ফর্মুলা’ বা ‘পাটা মাইনের ডিটেইল্‌ড ডিজাইন’। সাহিত্যের ‘ক্যানন’ (Canon) বা কানন নিয়ে তাঁর ‘চুদুরবুদুর’ থাকার কথা নয়। ছিলও না।

বাংলা সাহিত্যের ক্যানন-মানচিত্র নির্মাণের রাজনীতিটি বড় আলাদা কিছু নয়। মান্য লেখক, মান্য লেখা, মান্য ভাষা স্থির হয় নির্দিষ্ট প্রকাশন-সংস্থার/গুলির কাচঘরে। জাতি-বর্ণ-লিঙ্গের চেনা ছকে খেলা চলে। এমনও শোনা যায়, ‘একজন সংখ্যালঘু লেখক’ ‘দুজন মহিলা কবি/ঔপন্যাসিক’ ইত্যাদি সহজ ফর্মুলায় ‘পলিটিক্যাল কারেক্টনেস’ রক্ষাও করা যায়। মান্যরুচির ড্রয়িংরুমে তা নিয়ে কান্নাকাটি, হল্লাহাটি হয়। কারণ সে-হেন সাহিত্যের অলিন্দে বিচরণ করাও একরকম প্রিভিলেজ। কিন্তু অদ্বৈত মল্লবর্মণ বা কমলকুমার, জগদীশ গুপ্ত বা অমিয়ভূষণ, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বা দেবেশ রায়, গীতা চট্টোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, স্বপ্নময়, ঝড়েশ্বর –এঁদের মেধা ও মননের ধাক্কায় জল-অচল-বর্গ ভেঙে যেতেও সময় লাগে না।

আর নবারুণ তো ঘোষিত ভাবেই,স্বভাব-স্পর্ধায় অ-ক্যাননীয়। রাজনীতিটাই প্রত্যাখ্যানের, অস্বীকারের, বর্জনের। শুধু প্রতিষ্ঠানের মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে ‘লেখক’ বলে কুমীরছানার মতো বারবার তুলে ধরার রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান নয়, চারপাশের ভুল ঘটমান, ভুল বিশ্বায়ন, ভুল সাংস্কৃতিক উপনিবেশবাদ, ভুল এলিটিস্‌ম্‌, ভুল বামপন্থা— নিরন্তর বর্জন করতে করতে এগোচ্ছেন তিনি— একক র্যা ডিক্যাল। কখনও হারছেন, কোণঠাসা হচ্ছেন— ‘ভাসান’-এর পাগলের মতো, ‘বিকল্প রণনীতি’র অধ্যাপকের মতো, যারা পিছু হঠতে হঠতে ব্যক্তিগত পরিসরটুকুতে একান্ত নিজস্ব রণনীতির আশ্রয় নেয়। আবার কখনও জিতছেন— সেই জিতে যাওয়া আনরিয়েল, ম্যাজিক-রিয়েল, পোষ্টমডার্ন, মেটাফিজিক্যাল— যাই হোক্‌ না কেন। কারণ ফ্যাতাড়ুদের ডিরেক্টর-জেনারেলের মাথার ভেতর ‘ড্যামেজ করতে হবে সুযোগ পেলেই’ এই বোধ কাজ করে। এঁকে ক্যাননচ্যুত করতে তাই কোনো বহিঃ-রাজনীতির দরকারই বা কী? তিনি প্রতীতিগত ভাবেই, নিজ আয়াসেই বা অনায়াসেই, ‘নিজের মুদ্রাদোষে’ অ-ক্যাননীয়।

সত্তরের নক্‌শাল আন্দোলনকে রাষ্ট্রশক্তি থেঁতলে দেওয়ার পর রাজ্যে এল সংসদীয় বামপন্থা। কিছু প্রতিস্পর্ধী স্বর তাও থেকে গেল, বিপ্লবের ভূত যাদের ঘাড় থেকে নামানো রেজিমেন্টেড বামদলের পক্ষেও অসম্ভব। ক্রমে সোভিয়েতের পতন ঘটল, বিশ্বের রাজনৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হল, বিপক্ষবিহীন প্রথম বিশ্বের হাতে জমতে লাগল পুঁজি। তৃতীয় বিশ্বে সেই ক্যাপিটাল চালানোর নাম হয়ে গেল বিশ্বায়ন। এমন কি, রাজ্যের বামেরাও কেন্দ্রীয় উদারনীতিতে সায় দিলেন ১৯৯৪-এ। এই লক্ষ্যভ্রষ্ট, আদর্শভ্রষ্ট পৃথিবীতে নবারুণ তাঁর ‘ব্যক্তিগত ফিউচারিজ্‌ম’-এর একটি রূপরেখা আঁকলেন অগত্যা। এই উলটপুরাণের পাল্টা ইমেজ তৈরি করাই হয়ে গেল শিল্পী হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক দায়িত্ব। উড়ালপুল আর শপিংমলের শহরকে তিনি শুধু বর্জনই করলেন না, বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ খুঁজতে লাগলেন অটোস্ট্যান্ড, রিকশাস্ট্যান্ড, আদিগঙ্গা, চোলাইয়ের ঠেকের মানুষজনের মধ্যে। এই অনুসন্ধানের ভূগোল-ইতিহাস তো আছেই। মার্ক্স-এর কথা, তাঁর বিপ্লবতত্ত্ব ও রাষ্ট্রতন্ত্রের প্রয়োজনীয় ও আবশ্যিক সংযোজন হিসেবে গ্রামশি ও আলথুসার-এর তত্ত্বাবলী— সবেতেই প্রোলেতেরিয়েতরাই বিপ্লবের পুরোধা। সাবঅল্টার্ন সাহিত্যিক হিসেবে নবারুণ সবচেয়ে বেশি আলোচিত এবং ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটির গ্রামশি-কৃত ব্যবহারটিই নবারুণ-সাহিত্যের জন্যে সুপ্রযোজ্য। অর্থাৎ, যে র্যানন্ডম জনতাকে পলিটিসাইজ করা যায় ও করতে হবে, যাদের রাজনৈতিকরণ করতে হবে বৃহত্তর বিপ্লবের স্বার্থে। এই ‘সাবঅল্টার্ন’ শব্দটিই আশির দশকে ভারতীয় তাত্ত্বিকরা ব্যবহার করেন উপমহাদেশের ঔপনিবেশিক শোষিতদের বোঝাতে। কিন্তু এই সাবঅল্টার্নদের মোবিলাই্জ করে কারা? সাবঅল্টার্নরা যেহেতু ক্ষমতাবৃত্তের বাইরে, তাই তাদেরকে দিনবদলের/ পরিবর্তনের এজেন্ট হিসেবে দেখেন ইন্টেলিজেন্সিয়া এবং তাকে রোমান্টিসাইজ করার প্রবণতাও বিরল নয়— এমনটাই দাবি করেন গায়ত্রী স্পিভাক্। নবারুণের প্রতিরোধের সাহিত্যধারাটিও মোটামুটি এই পথের অনুসারী।

নবারুণের প্রথমদিকের সাহিত্যে আমরা পাই বিপ্লববোধসম্পন্ন আপোষহীন চরিত্রদের— ‘ভাসান’-এর পাগল বা ‘বিকল্প রণনীতি’র মহীতোষেরা। আবার অদ্ভুত একলা মানুষেরা— বারেন, সদাশিব, চিতামানুষ— এদের একাকীত্ব ‘মার্ক্সিস্ট এলিয়েনেশন’ মনে করিয়ে দেয়। সিস্‌মোগ্রাফের মতো সংবেদনশীলতায় নবারুণ নতমস্তক মানুষের প্রতিটি হেরে যাওয়া আর অসহায়তার হিসেব রাখেন। ‘নস্ত্রাদামুসের আত্মহত্যার’র লেখক মেলান অতিকায় বালক আর তার পিতার অসহায়ত্বের সাথে বিশ্বজনীন ক্যাটাস্ট্রফিকে। ‘আমার কোনো ভয় নেই তো?’ আর্তনাদে সমবেদনার হাত রাখেন।

অন্যদিকে, ‘এ মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ বিপ্লবী উচ্চারণ হিসেবে একটা মিথ হয়ে ওঠে। এর সূত্রে হিন্দিবলয়ে ও সর্বভারতীয় স্তরে তাঁর বিপ্লবী পরিচিতি। ‘আটজন মৃতদেহ আমার চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে’— এই আটজনকে কিন্তু বরানগর বারাসতে মেরে রেখে গিয়েছিল নক্‌শালরাই, রাজনৈতিকভাবে যাদের নবারুণের সমর্থন করার কথা। বাঁধাধরা রাজনীতির গতে তাঁকে ফেলা মুশকিল। আশির দশকের মাঝামাঝি, আরনাল ও কানসরার গণহত্যা নিয়ে আবার লিখেছেন ‘পুলিশ করে মানুষ শিকার’। তাঁর কবিতায় সাম্প্রতিকতা আছে, কিন্তু প্রোপাগান্ডা নেই, রাজনৈতিক মেসেজ আছে, কিন্তু শ্লোগানধর্মীতা নেই। বরং আছে অদ্ভুত সব পোয়েটিক ইমেজারি। ‘এ মৃত্যু উপত্যকা’র একটি কবিতায় মানুষরা দেশলাই বাক্সের মধ্যে এক একটি কাঠির মতো শুয়ে থাকে (ম্যাচবাক্সের মানুষ) :

বারুদ-মাখানো তাদের ঘরের দেওয়াল
সেই দেওয়ালেতে মাথা ঠুকে কী যে চায়
অর্থহীন ও নিতান্ত বরবাদ
ফ্যাকাশে আগুনে নিজেরাই জ্বলে যায়।

কিন্তু নাশকতার ইন্ধন থেকেই যায়। পেট্রোল দিয়ে আগুন নেভানোর স্বপ্নের দেখা মেলে তাঁর এক ছোট নন-ফিক্‌টিসাস্‌ গদ্যে। বা ‘পেট্রোল আর আগুনের কবিতা’য়। পরে ‘পারিজাত ও বেবি-কে’-তে এই তরল যাদুবাস্তবের বিধ্বংসী উপাদান হয়ে ওঠে।

আবার কবি নবারুণের রূপকল্প সবক্ষেত্রেই নাশক নয়। ‘আকাশ তখন আমার লেখার টেবিল/ ঠাণ্ডা পেপার-ওয়েট হবে চাঁদ’ আমাদের অভিভূত করে। ‘লুব্ধকে’ দেখি— ‘অলৌকিক ভিক্ষাপাত্রের মতো চাঁদ/ দাঁতে কামড়ে ছুটে যাচ্ছে রাতের কুকুর...’

কবিতার পথটি কিন্তু এরপর তিনি তাঁর গদ্যের জগতেও খোলা রাখবেন। বরং সেখানে বাস্তব থেকে পরাবাস্তবে তাঁর যাতায়াত আরও সহজ হবে। কবিতায় যদি বা তিনি মূলধারার আঙ্গিক ও ভাষার প্রভাব এড়াতে পারেন না, বা চান না, গদ্যে তিনি তা দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেন। কবি হিসেবে যেমন তিনি নিজেকে ‘এলিয়টের প্রভাবমুক্ত’ বলে ঘোষণা করেন এবং নেরুদা-এলুয়ার-মায়াকভ্ স্কি-হিকমেত এর আন্তর্জাতিক পরিসরটি বেছে নেন, গদ্যেও তিনি ছকে বাঁধা রিয়ালিজ্‌ম্‌-এর বাইরে একটা রাস্তা খুঁজে নেন গ্রসম্যান বা বুলগাকভ-এর মাধ্যমে— সোভিয়েত পর্যায়ের সাহিত্যিক হয়েও যাঁরা তথাকথিত রিয়ালিস্ট না। নব্বইয়ের দশকে ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’ আর নবারুণের ‘হারবার্ট’ অভ্যস্ত নিশ্চিন্ততাকে আঘাত করল। হারবার্ট বুজরুকির সার্কাসকে বুজরুকি দিয়েই ভ্যাঙায়। একটি বহুস্তরী ন্যারেটিভে নবারুণ অবলীলায় ভিন্ন ভিন্ন মেরুতে যাতায়াত করেন— রিয়াল-আনরিয়াল, লজিক্যাল-ইল্‌লজিক্যা । একদিকে হারবার্টের পরলোকগত জীবনের রহস্যানুসন্ধান, অন্যদিকে কমিউনিস্ট-পার্টির অনুষ্ঠানে ‘ফল অফ্‌ বার্লিন’ ডকুমেন্টারি দেখা। যুক্তিবাদীরা ভূতকাল নিয়ে হারবার্টের নাড়াচাড়া বিদ্রূপ করে, অথচ হারবার্টকে আসলে চালিত করে নক্‌শাল আমলেরই ভূত। সে র্যাতশনালিস্টদের কাছে হেরে গিয়েও আদায় করে সমবেদনা। পুঁজির আগ্রাসনে দ্রুত বদলে যাওয়া চারপাশের বিরুদ্ধে হারবার্টের প্রতিবাদ অতি ভঙ্গুর। তাও বিনুর লেপের তলায় বেঁধে রাখা ডিনামাইট ইলেকট্রিক-চুল্লিতে বিস্ফোরণ ঘটায়। লেখক তাঁর প্রতীতি জানান— কখন কে কোথায় বিস্ফোরণ ঘটাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের তা বুঝতে এখনো বাকি আছে।

দেবেশ রায় এক আশ্চর্য দৃপ্ত ভঙ্গি লক্ষ্য করেন উপন্যাসটিতে, যেখানে “এইটুকু আয়তনের একটি উপন্যাসে এত বংশলতিকা, বাড়িঘর, শহর, মানুষজনকে যে ঔপন্যাসিক আঁটাতে পেরেছেন তার প্রধান কারণ তাঁর ভাষা। শহুরে খিস্তি, রাস্তার বুলি, বাড়িঘরের সেকেলে বাচন, কথাবলার তেরছা ঢং মিলিয়ে ...একটা বিশিষ্ট ভাষারীতি তৈরি করেছেন। ঔপন্যাসিকের ক্ষমতা আঙুলের ডগায় না থাকলে ভাষাকে দিয়ে এ কাজ করানো যায় না”। গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক্‌ও এই ভাষাকে বলেছেন : ‘a daunting mix of street slang, deadpan reportage and nineteenth century spiritual prose’.

‘ভোগী’তে গঠনশৈলী একরৈখিক, তুলনায় সরল। কিন্তু হারবার্টের মতো সে-ও এক বিপন্ন লুপ্তপ্রায় জীব— সে ভুবনায়িত সময়ে বিপজ্জনক সারল্য নিয়ে দাঁড়িয়ে। ‘অটো’তে আবার অসহায় মানুষটিই হয়ে ওঠে ঘাতক। কারণ ‘যে মৃত্যু উপত্যকায় নবারুণের চরিত্ররা অনবরত ঘোরাফেরা করে, সেখানে মানুষের দুটোই চেহারা— হয় নিঃশব্দ ঘাতকের, না হলে অসহায় আত্মহননকারীর বা পরাজিতের’।

হারবার্টের পর নক্‌শালবাড়ির বিপ্লবী রাজনীতি সরাসরি ফেরে ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’তে । প্রৌঢ় রণজয়, একদা গেরিলা যোদ্ধা, বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীন, স্বয়ং বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষার এমবডিমেন্ট উদারনৈতিক অর্থনীতির যুগে সে গেরিলা বিপ্লবের স্বপ্ন দেখে। নবারুণ একরৈখিক ন্যারেটিভ, এমন কি, কাহিনীও বর্জন করেন। রণজয় ও অন্যান্যদের টুকরো টুকরো কথা ও চিন্তারাশির কোলাজ একটি পরিস্থিতি গড়ে দেয়— যুদ্ধ পরিস্থিতি।

‘লুব্ধকে’ কুকুরেরা রাতের অন্ধকারে ধ্বংসাভিমুখী শহর ছেড়ে চলে যায়। প্রাণমন্ডলের সাম্যবাদের সাথে আমরা অন্ত্যজের প্রত্যাখ্যানের স্পর্ধার ফ্ল্যাশও দেখতে পাই কি? ‘খেলনানগর’-এ তেজস্ক্রিয় নিরীক্ষায় ধ্বংসপ্রাপ্ত শহরের কঙ্কালের সামনে প্রথমেই পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, শক্‌-থেরাপিতে লেখক অবিচল থাকেন।

‘ফ্যাতাড়ু’দের আবির্ভাব যখন হল, ততদিনে সংঘবদ্ধ শ্রেণীসংগ্রামে বোধহয় আস্থা হারিয়েছেন লেখক। কিন্তু বিশ্বায়ন বা নব্য-উপনিবেশবাদের একবগ্গা মাস্তানিও মেনে নেওয়া যায় না। পুঁজিবাদ মানুষকে একই মাপে ছেঁটে ফেলবে, সাম্রাজ্যবাদ স্থির করবে কিভাবে প্রতিটি মানুষ ভাববে, দেখবে, রিঅ্যাক্ট করবে (বা করবে না), এই নিয়ত স্ট্যান্ডার্ডাইজেশনে র সময়, উন্নয়নের নামে মানুষের অপমানের সময় লেখক তো মেটাস্টেটমেন্টই দেবেন। রাজনৈতিক ব্যঙ্গের চোখে রিয়েলিটিকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি ম্যাজিক রিয়েলে পৌঁছচ্ছেন। আন্তর্জাতিক জোট নয়, ছোট প্রেক্ষিতে অন্তর্ঘাত— যে কোনো মূল্যে স্থিতাবস্থাকে ডিস্টার্ব করাই উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে: ‘কিছুই দেখিনা মোরা, শুনি আর খাই/ ওই একটাই কাজ— ঝামেলা পাকাই’। যা কিছু প্রাতিষ্ঠানিক, রাজনৈতিক, সামাজিক বা সাংস্কৃতিক— সব কিছুকেই ফ্যাতাড়ুরা সন্দেহের চোখে দেখে। তারা নৈরাজ্যবাদী, কিন্তু মে-দিবসের বিদ্রোহীরাও কি ছিল না অ্যানার্কিস্ট? তারা অস্বীকার আর অসন্তোষের স্বর। প্রকৃতই, তাদের শৃঙ্খল আর পলিটিক্যাল কারেক্টনেস ছাড়া হারানোর কিছু নেই। শুধু ফ্লোটেলে, সভা-সমিতিতে, ফ্যাশন প্যারেড, আই-পি-এল-এ, এমন কি সুশীল মিছিলে ভাঙচুর করা আর হাঙ্গামা বাধানো তাদের প্রিয় বিনোদন। ‘জীবন্ত উড়ুক্কু মানুষ’দের ‘ওড়া’র ক্ষমতা থেকেই শুরু হয় মুখ বন্ধ করে দেওয়ার বিরুদ্ধে সাবভার্সান। একে পোষ্টমডার্ন বলেছেন অনেকে। অনেকে বলছেন বাখতিনিয়ান, কারণ ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কার্নিভ্যালের এ এক লাগাতার উদ্‌যাপন, দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলেও আমোদগেঁড়ের মতো বেঁচে থাকার রাজকীয় উৎসব। কিন্তু ত্রৈলোক্যনাথের পর এমন উদ্ভটরসই বা আমরা কবে দেখেছি বাংলা গদ্যে? অবশ্যই ‘ফ্যাতাড়ু’ বিনাশবাদী, গঠনবাদী নয়। এ হেন অন্তর্ঘাতের তীব্রতা, ব্যাপ্তি ও ফলাফল নিয়ে আদপেই নবারুণ ভাবিত নন। কিন্তু ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বুর্জোয়া সমাজের উপর এই শেষ পদাঘাতটিরও প্রয়োজন ছিল। তারা অতীন্দ্রিয়, কিন্তু রিয়্যালিটি ব্যাপারটাই কি প্রশ্নাতীত? কলকাতা শহরের যে মানচিত্র আমরা জানি, তার ঠিক উল্টো মানচিত্রের সন্ধান দেয় তারা, এবং কোনটি বাস্তব— তা সফলভাবে গুলিয়ে দেয়।

‘কাঙাল মালসাট’-এ আর ‘মসোলিয়াম’-এ ফ্যাতাড়ুর গল্প ধীরে ধীরে বহুস্তরিক হয়, চোক্তাররা আসে, আসে দাঁড়কাক, বেগম জনসন ‘বুলগাকভের মাস্টার অ্যান্ড মার্গারিটা’র ছায়া স্পষ্টতর হয়। যেখানে প্রফেসর উল্যান্ড আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা মস্কো দাপিয়ে বেড়ায় আর গুঁড়িয়ে দেয় শহুরে এলিটিজ্ম্, যাদের মধ্যে আছে বেহেমথ নামের খিস্তিবাজ কালো বেড়াল, যে ভালোবাসে দাবা, ভোদকা আর পিস্তল। বেজডম নামের পাত্তা-না-পাওয়া কবিও আছে, খানিক আমাদের পুরন্দর ভাটের মতো— পুরন্দর, যার প্রতিটি কবিতা আসলে নবারুণের রাজনৈতিক প্যামফ্লেট।

এইভাবে নবারুণের সাহিত্যকোষটিকে যদি আমরা একটি ইউনিট হিসেবে দেখি, তবে তাঁর বহুমুখী দর্শনের উদ্ভাস হয়তো আমরা পাব, কিন্তু প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতার অবাধ্য একবগ্গা একটানা রেওয়াজ চলতেই থাকে। এবং ক্যানন সংক্রান্ত আলোচনাই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ে।

নবারুণের ভাষা তাঁর রাজনৈতিক স্ট্র্যাটেজিরই আরেক দিক। অদ্বৈত মল্লবর্মন, দেবেশ রায়, দীপেন বন্দ্যোপাধ্যায় বা ইলিয়াসের মতো এক নিজস্ব ভাষা তৈরি করে নেন তিনি। আদপে যা হেটারোগ্লসিয়া। তৈরি করে নেন, কারণ ‘লেখকের যদি তিলমাত্র অথেন্‌টিসিটি থাকে, তাকে নিজের ভাষায় কথা বলতেই হবে। সাহিত্যে খিস্তির ব্যবহার নিয়ে যেকোনো সমালোচনাই তিনি অপ্রাপ্তবয়স্ক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ক্যাননীয় সাহিত্যে যা মান্য ভাষা, তাকে ‘সিন্‌থেটিক’ ভেবে বর্জন করেছেন। যে ভাষায় মিউচুয়ালম্যান হারবার্ট, ফ্যাতাড়ু, চোক্তাররা কথা বলে, সেই লক্ষ মানুষের কথ্যভাষা, জীবনধারণের, আনন্দের, দুঃখের ভাষা দিয়েও তিনি তথাকথিত মান্যভাষাকে চ্যালেঞ্জ করেন। বলেন, ‘আমি আমার সাহিত্যে খিস্তি ব্যবহার করি মানুষকে সম্মানিত করতে’। ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি আমি কোনো ভাল্‌গারিটি করিনি’। হারবার্ট-এ প্রতিটি পরিচ্ছেদের শুরুতে ব্যবহার করেন অষ্টাদশ বা ঊনবিংশ শতকের বাংলা কবিতা, কারণ সেই ভাষায় মানকুমারী বসু, বা অক্ষয়কুমার বড়ালের ভাষায়, তিনি ‘এনার্জি’র একটা স্রোত দেখতে পান, যে ‘এনার্জি’ সাধারণ যাপনের নিত্যনৈমিত্তিকতা থেকে আসে।

আমরা নবারুণের ‘ফর্ম’ বা ভাষা নিয়ে উল্লম্ফন করতেই থাকি, করাটা অস্বাভাবিকও নয়, কিন্তু তিনি বার বার মনে করিয়ে দিতে থাকেন যাবতীয় ফর্ম, যাবতীয় কৃৎকৌশল তিনি শুধুমাত্র কন্‌টেন্টের প্রয়োজনে আনেন। তাঁর সৃষ্টিকর্ম একটি ইন্টারডিসিপ্লিনারি প্রসেস। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজনীতিকে বাদ দিয়ে যা পড়া যায় না। তা ফর্ম নিয়ে নিরীক্ষামাত্র যে নয়, তা প্রাতিষ্ঠানিক অ্যাকাডেমিশিয়াকে হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দেন।

ক্যানন ও নবারুণ সংক্রান্ত এই আলোচনায় মৃত্যু-পূর্ববর্তী সময়ে যে কাল্ট ফিগার, রক্‌স্টার নবারুণ— তাঁকে নিয়েও দু’চার কথা বলতে হয়। ফ্যাতাড়ু-উত্তর সময়ে বাংলা সাহিত্যে তিনি নিজেই এক প্যারালাল প্রতিষ্ঠান। আসলে এই ফ্যাতাড়ুইজ্‌ম্‌ বা ফ্যাতাড়ুডমেরও একটা কমোডিটি ভ্যালু আছে, তা লেখকের অভিপ্রেত হোক বা না হোক। কারণ, ফ্যাতাড়ুরা উইশ-ফুলফিলমেন্টের দ্যোতক। সমাজতত্ত্বের রিলেটিভ ডিপ্রাইভেশন নীতি অনুসারে ফ্যাতাড়ুদের রগড়ে অনেকেই ডিপ্রাইভেশনের সাময়িক উপশম খোঁজেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় বা বাস্তবে, স্বঘোষিত ফ্যাতাড়ু যেসব যুবা ও যুবতী, তারা ফ্যাতাড়ুর রগড়ের আড়ালে তার কান্না, তার ট্র্যাজিক মুখ দেখে কি? নবারুণের কথায় যা ‘অন্ত্যজের স্পনটেনিয়াস এক্সপ্রেশন অফ প্যাশন’ তা ইন্টেলিজেন্‌সিয়ার খিস্তিবিলাসে পরিণত হয় না তো? নবারুণ কিন্তু রাজনীতির পথ ধরে তাঁর বিপ্রতীপ সাংস্কৃতিক (Counter Cultural) উচ্চারণে পৌঁছেছিলেন। ফ্যানডম উল্টো পথে হাঁটে— সৃষ্ট ভাষা ও ভাষ্য ধরে রাজনীতিতে পৌঁছতে চায়, বা চায় না। বাংলা সাহিত্যে প্রতিস্পর্ধী সংস্কৃতি কেন পুরুষালি ও পুরুষ-প্রধান, এবং তা হলেও তা কেন বিশ্লেষণযোগ্য নয়, তা আলোচিত হয় না। কিউ-এর ছবিতেও নবারুণ বলেন, রবীন্দ্রনাথ বাংলাভাষাকে emasculate করেন, অর্থাৎ রবীন্দ্র-পূর্ববর্তী পৌরুষের ভাষাই তিনি ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন, কারণ তাঁর শৈল্পিক স্ট্র্যাটেজিতে সেটাই প্রয়োজনীয়। এইভাবে যে শুধু ‘অটো’, ‘ভোগী’ বা ‘যুদ্ধপরিস্থিতি’র নবারুণ ঢাকা পড়ে যান তাই নয়, গৌণ হয়ে যান মহাজানিক নবারুণ, হারিয়ে যান কেঠো মার্ক্সবাদকে অস্বীকার করা নবারুণ। চরাচরের প্রতিটি জীব ও জড়ের বেঁচে থাকা বা টিকে থাকা নিয়ে উৎকণ্ঠিত ইকো-কমিউনিস্ট নবারুণ হারিয়ে যান, যিনি মার্ক্সীয় সাম্য-কে বৃহত্তর জগতের প্রেক্ষিতে দেখেন—


গাছেদেরও কি শীত করছে এমন
কুকুরদেরও কি করছে এমন
রাস্তা, সিনেমাহল, টিপকল, রেস্তোরাঁ
বিউটি পার্লার
সকলেরই কি শীত করছে এমন ?

(শীতে জমে যাওয়া মরা ভিখিরির গান)

আইকন নির্মাণের প্রক্রিয়ায় এই বহুস্তরী নবারুণ হারিয়ে যান বলেই মনে হয়। কেন? সহমর্মিতা, ভালোবাসা ততটা ম্যাস্কুলাইন নয় বলে?

অবশ্য শুধু লিঙ্গ-রাজনীতি নয়, যৌনতা থেকেও নবারুণ-সাহিত্য যোজন দূরত্ব রক্ষা করে। আর এখানেই হাংরি প্রজন্মের প্রতিষ্ঠান-বিরোধীতার সাথে তাঁর তফাৎ তৈরি হয়। তুষার রায় থেকে সমীর রায়চৌধুরী থেকে মলয় রায়চৌধুরী— এঁরা জোরালো ভাবে প্রতিষ্ঠানকে আঘাত করেছিলেন। তাঁরা যৌনতা নিয়ে মুখর, অস্তিত্ববাদী সংকট নিয়েও। বিশ্ব-রাজনীতির টানাপড়েন সেখানে ব্যাকড্রপ। কিন্তু নবারুণের সাহিত্য তাঁর রাজনৈতিক সচেতনতারই প্রসারণ। নবারুণের বিষয়, আঙ্গিক, ভাষা সবই যে ভয়ংকর রকম প্রকাশ্যভাবে নাশকতাবাদী, তার স্পষ্ট উচ্চারণ :


কত জায়গায় তো ফেলি আমি দেশলাই
একবারও ভুল করে নয়,
যদি কেউ আগুন
জ্বালায়...
(পাঠকের কাছে প্রশ্ন)

তাঁকে নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা তাই দিনের শেষে বৃথা মনে হয়। কারণ যখন শুধু প্রায়োগিক নয়, তাত্ত্বিক-জগতেও মার্ক্সবাদ ধাক্কা খাচ্ছে, পোস্টমডার্নিজম্, পোস্টস্ট্রাক্চারালিজ ম্-এর ছেনি-হাতুড়ি নিয়ে ভাঙাচোরা হচ্ছে, বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বর্তমান পরিস্থিতি, তখনও নবারুণ এসবকে ‘দু’দিনের ভাইরাস’ বলছেন; বলছেন, যেমন বলেছিলেন সার্ত্র– ‘সবই আছে মার্কসে’। খুঁজে নেওয়ার অপেক্ষা। বলছেন, আদর্শবাদকে ‘ফালতু’ বলে নাকচ করতে তিনি দেবেন না। তিনি মানবেন না যে, ‘মতাদর্শ নিছকই হাত উড়ে যাওয়া মানুষের ফাঁকা আস্তিন যা গুটিয়ে ফেলে কোনো লাভ নেই’। তিনি অন্ধবেড়ালের মতো ঝঞ্ঝার রাতে বিধ্বস্ত হোটেলের মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকবেন। যদিও আবার বলবেন, ‘অথচ কথা ছিল গল্প শোনার ও শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ার... কিন্তু সব শেষ হয়ে যাচ্ছে’ (সব শেষ হয়ে যাচ্ছে)— যা প্রায় প্রলাপের মতো শোনাবে, কিন্তু আমরা মাথা নত করে শিখব ‘না’ বলতে, আপোষহীন প্রত্যাখ্যান শিখব। এবং ক্যাননে বা প্রতিষ্ঠানে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে মাথাটি ঘামাব না। কারণ এ নিয়েও মোক্ষম কামানটি দেগে গেছেন তিনি:

নিউক্লিয়ার যুদ্ধে
বিশ্ব যেবার ধ্বংস হয়ে যায়
গোটা মানব সংসারই যখন
ছাইয়ের গাদা
সব দেশ যখন শেষ
তারও পরে বেরিয়েছিল
শারদীয়া দেশ
অপ্রকাশিত, এক আঁটি
রাণুকে ভানুদাদা।

‘Manuscripts do not burn’— বুলগাকভ-এর এই আত্মজৈবনিক বচনের অনুবাদ করে কাঙাল মালসাটের এপিগ্রাফে লিখেছিলেন— ‘পান্ডুলিপিরা পোড়ে না’। ক্যানন-কে পদাঘাত করার কাজটি কি তখনই সুসম্পন্ন হয় নি?