নবারুণ ও বিপ্লব!

রক্তিম ঘোষ

“রাষ্ট্র ও বিপ্লব” বইতে লেনিন লিখেছিলেন, “What is now happening to Marx's theory has, in the course of history, happened repeatedly to the theories of revolutionary thinkers and leaders of oppressed classes fighting for emancipation. During the lifetime of great revolutionaries, the oppressing classes constantly hounded them, received their theories with the most savage malice, the most furious hatred and the most unscrupulous campaigns of lies and slander. After their death, attempts are made to convert them into harmless icons, to canonize them, so to say, and to hallow their names to a certain extent for the “consolation” of the oppressed classes and with the object of duping the latter, while at the same time robbing the revolutionary theory of its substance, blunting its revolutionary edge and vulgarizing it. Today, the bourgeoisie and the opportunists within the labor movement concur in this doctoring of Marxism. They omit, obscure, or distort the revolutionary side of this theory, its revolutionary soul. They push to the foreground and extol what is or seems acceptable to the bourgeoisie.”
Subaltern –এর এতো ভদ্র ভাষায় খিস্তি পোষায় না। বাঙালীর বাচ্চা আবার এটুকু ইঞ্জিরি না মারালে পারে না। এক কথায় বললেই হয়, “বানচোদরা মানুষ না অ্যামিবা”, কে জানে?

কথা হল যে নবারুণ না মহান না বিপ্লবী। আমি বলছি না, আসলে উনি এর কোনটা বলেই নিজেকে বোধহয় দাবী করেন নি। নবারুণ এখন একটা মৃত শরীর, যা গত বছর আগুনে জ্বলে গেছে। মগজটাও ছার পায় নি। কিন্তু বিপ্লবই বলুন আর মৃত মানুষ, বাজার বানায় বেশ ভালো। Emotion বিক্রি করে ব্যবসা চলে রমরমিয়ে। মৃতের সাথে বিপ্লবের দূরতম সম্পর্ক থাকলে তো আর কোন কথাই থাকে না। নবারুণের সাথে সম্পর্কটা অতটাও দূরের ছিল না তাই— কিন্তু, নবারুণ চলে যাওয়ার পর ফ্যাতাড়ুরা পরে আছে শুধু। বাকিটা? পণ্য আর কি! তাই ‘নবারুণ ও বিপ্লব’ বলে কোন বিষয়ের বাস্তব অস্তিত্ব নেই। আছে একটা সময়। তা নেহাতই past tense.
------------------------
“Social justice goes through the history of Zorastrianism. Fighting evil underlies its essence, the Gathas are looking after the poor, separating what’s good and what is not.”— Prof. Skjaevvo.

এ সময় এ পৃথিবীর কথা-
যে পৃথিবীর বুকে শ্বাস নিই— হেঁটে চলি,
কথা বলি পারম্পরিক অভ্যাসে,
যেখানে নিজের ছায়াকেও ভয় হয়।
জন্মায় একদলা ঘৃণা— একাকীত্বের দলন।
ছায়ার ওপারে জানি আলো থাকে—
ভয় ভেঙে চোখ খুলি;
দেখা যাক, আকাশকে ছুঁতে পারি কিনা।


বিশ্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুই ঐতিহাসিক অধ্যায়; নিপীড়িত মানুষের মুক্তির দিকে দুই ধাপ এগোন আর মার্ক্সবাদের ঐতিহাসিক সারবত্তাকে বাস্তবের মাটিতে প্রতিষ্ঠা দান; এ সমস্তটাই গত শতাব্দীতে এ পৃথিবীর মাটিতে যুগান্তর এনেছিল। সোভিয়েত রাশিয়া আর গণপ্রজাতন্ত্রী চীন রচনা করেছিল শৃঙ্খলিত জনতার মুক্তির মহাকাব্য। সারা পৃথিবীর সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমজীবি নিপীড়িত মানুষ বিভোর হয়েছিলেন মুক্তির স্বপ্নে, সামিল হয়েছিলেন সচেতন উদ্যোগে। বাস্তবের মাটিতে সত্যকে আর ন্যায়কে প্রতিষ্ঠার জীবন্ত দিশাকে সামনে পেয়ে বিশ্বজুড়ে মুক্তিসন্ধানী মানুষ যখন আপোষহীন সংগ্রামে এগিয়ে চলেছেন, ঠিক তখনই ধাক্কা এল। পতন হল রুশ সোভিয়েত আর বিপ্লবী চীনের। শুধু পতনই হল না হাঁটা শুরু হল ১৮০ ডিগ্রী বিপরীতে। স্বপ্নভঙ্গের এই ইতিহাসও বিগত শতাব্দীতেই ফেলে এসেছি আমরা। আর আজ কমিউনিস্ট আন্দলনের দেড়শ বছর পার করে আমাদের সামনে রয়েছে সমাজতান্ত্রিক শিবিরহীন, বাস্তব বিকল্পহীন এক পৃথিবী।

এ এমন এক সময়, যখন বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের একচেটিয়া বিশ্বায়নী আগ্রাসন তীক্ষ্ণ থেকে তীক্ষ্ণতর নখে ফালা ফালা করে দিচ্ছে এই পৃথিবীর মাটি-সম্পদ আর মানুষের জীবন। বিপরীতে যমজ সন্তান হয়ে বেঁচে আছে শ্রেনীসংগ্রাম তার নিজের নিয়মেই। কিন্তু মার্ক্সবাদী মতাদর্শের নেতৃত্ব সেই সংগ্রামগুলিতে প্রায় অনুপস্থিত। ফাঁকা জায়গা দখল করেছে কোথাও সংগঠনহীন স্বতঃস্ফূর্ততার মতাদর্শ, কোথাও বা ধর্মীয় মৌলবাদ। আর বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ, নিপীড়ন আর লুঠের ছককে নিত্যনৈমিত্তিক সাজিয়ে চলেছে নিত্যনতুন কায়দায় সংগঠিতভাবে, এমনকি প্রগতিশীলতার মুখোশেও।

আমাদের দেশেও সংগঠিত কমিউনিস্ট আন্দোলনের এক শতক পূর্ণ হতে চলল। দীর্ঘ বিভ্রান্তি— দিশাহীনতা— দোদুল্যমানতা— পথ খোঁজার পর্ব পেরিয়ে ৬৭ সালে প্রতিষ্ঠা পাওয়া বিপ্লবী লাইনেরও অর্ধ শতাব্দী অতিক্রান্ত হবার মুখে। বিপ্লবী আন্দোলনের এই ধারা অসংখ্য আত্মত্যাগ, রক্ত–ঘাম-চোখের জল, দ্বন্দ্ব-সংঘাত পেরিয়ে বাস্তবের মাটিতে এখনও আপোষহীন এবং জীবন্ত। একই সাথে মতাদর্শগত ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রশ্নে সে আক্রান্ত ভিতরে বাইরে দুদিক থেকে। মূলত ভিতরের দিক থেকেই বলা চলে। এ রাজ্যের দিকে তাকালে দেখতে পাব তার অসংগঠিত ছিন্ন ভিন্ন দিশাহীন চেহারা। এ বাংলায় ঐতিহাসিক নন্দীগ্রাম-লালগড় আন্দোলনের পরবর্তীকালে বিশেষভাবে, বাস্তবত অনেক আগে থেকেই, মূলত সংশোধনবাদী, গ্রুপবাজী আর সামাজিক ফ্যাসিবাদী রাজনীতির দীর্ঘ ইতিহাসের সৌজন্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে মার্ক্সবাদ সম্পর্কে বিভিন্ন ভ্রান্ত ধারণা ও অবিশ্বাসের জমি তৈরি হয়েই ছিল। লালগড় আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে বিপ্লবী শক্তির দোদুল্যমান ও নেতিবাচক দিশাহীন ভূমিকা সেই সঙ্কটকে আরও পুষ্ট করেছে। অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদের বিশ্বায়ন ও উদারনীতির প্রভাব অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তো বটেই, বাজারী পণ্যায়ন আর সংস্কৃতি ছাপ ফেলতে শুরু করেছে এমনকি দূরবর্তী প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতেও। বাংলার রাজনীতিতে সামগ্রিকভাবে দিশাহীনতা গেঁড়ে বসেছে। প্রতিবাদী আন্দোলনগুলি বিচ্ছিন্ন ও বিক্ষিপ্তভাবে অব্যাহত থাকলেও কার্যত দিশাহীন এবং গতানুগতিকতার ধারাবাহিকতায় আচ্ছন্ন।

চিন্তাশীল মানুষরা কি তাই বলে হারিয়ে গেছেন? অনেকেই যাননি। তাঁদের চিন্তা বেড়েছে, প্রশ্ন বেড়েছে, বেড়েছে দিশাহীনতাও। আর নিপীড়িত মানুষের সামনে গতানুগতিক আন্দোলন বিশ্বাসভঙ্গ আপোষ ও শেষ পর্যন্ত হতাশা বাদ দিলে অন্য কোন বাস্তব বিকল্পের প্রশ্ন সামনে নেই।

তাই দেশটাকে, তাই জন্মভুমি বাংলাকে যেন কেমন অচেনা ঠেকে। এ যুগের আতশ কাঁচে সব কিছু দেখবার চেনবার অভ্যাস হয়ে গেছে কিনা। এক একটা জলজ্যান্ত মিথ আমাদের ভাবনায় গেঁড়ে বসে আছে। সবটাই কেমন আগে আগে ভেবে ফেলি। এটা ঠিক ওটা ভুল। এক লাইনের উত্তর। ব্যস! সব ঠিক ভুলের ঠেকা নিয়ে বসে আছে কতগুলো মিথ। সত্যের অনুসন্ধান করার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছে সবাই। নিজের দেশকে দেশের মানুষকে মিথ দিয়ে চেনা সম্ভব আদৌ! চলমান বর্তমানকে! আজ্ঞে না... মিথ মানে পুরাণের গপ্পোকথা মাত্র নয়। মিথেরও শ্রেণীবিভাগ রয়েছে। এ যুগে মার্ক্সবাদী মিথ, নকশাল মিথ, হিন্দুত্ব মিথ, ইসলামী মিথ, নাস্তিকতা মিথ, জাতীয়তা মিথ, দেশপ্রেম মিথ, নৈরাজ্য মিথ, ইত্যাদি বহু বহু মিথ দেখা যায়। যার সাথে বাস্তবে সেগুলো যা তার কোন সম্পর্ক নেই। আজকের বাস্তবতার সাথে সেইসব বিষয়ের সম্পর্ক কি সেটা উপলব্ধিরও কোন চেষ্টা নেই। এক একজন— এক বা একাধিক দল এক একটা মিথের মালিকানা নিয়ে বসে আছে। বাজারে যেমন চলে আর কি। বেশির ভাগই সুবিধাবাদী কারণে, কম সংখ্যক না বুঝে অভ্যাসে। না চেনে যা ধরে এগোতে চায় তাকে। না চেনে মানুষ কি চায় তাকে। না চেনে বর্তমান সময়কে। না চেনে এ দেশটাকে, এদেশের মানুষকে। তাদের ঐতিহ্য–সংস্কৃতি–চেতন া-ইতিহাসকে। বর্তমানের ঘনীভূত সঙ্কটের গুরুত্ব উপলব্ধি করা তা দূরের বিষয়।

ফলে তীর ছোটে ভুল স্রোতে, যদিও স্রোতটা চেনা। যারা রাজা হয়ে বসতে চায় তাদের জন্য ঠিকই আছে। কিন্তু যারা আত্মত্যাগে পিছপা নন, মানুষের মুক্তি আর প্রকৃত স্বাধীনতার টানে যারা ছুটছেন যুগ যুগ ধরে নানা দেশে মানুষের মাঝে, নানা নামে— নানা পন্থায়— নানান পরিচয়ে? তাঁরাও যে আটকে যাচ্ছেন প্রভূত সততা আর আন্তরিকতা নিয়েও সংকীর্ণ মিথ গণ্ডির মাঝে। ভাঙতে কেই বা চায়? না ভেঙে গতানুগতিক ছোটাছুটির অনুশীলনটাই সহজ বোধহয়।

এ যেন একলব্যের গল্প। নিজের চেষ্টায়, নিজের শ্রমে অর্জিত জ্ঞান— ধনুর্বিদ্যা। দ্রোণ তাঁর কখনই শিক্ষক ছিলেন না। বরং দিয়েছিলেন অস্বীকৃতি। এদিকে কি প্রশ্নহীন আনুগত্যে কতদিনের অর্জিত জ্ঞান— ফলিত প্রয়োগের হাতিয়ার বুড়ো আঙুলখানা কেটে সঁপে দেন দ্রোণের পায়ে। এও এক মিথ। আনুগত্যের মিথ। গুরুবাদের মিথ। আত্মসমর্পণের মিথ।

এখানেই ব্যাতিক্রম কর্ণের মতো লোকেরা।
“সূত জননীরে ছলি
আজ যদি রাজ জননীরে মাতা বলি
------------
----------
তবে ধিক মোরে”

“জয়ী হোক রাজা হোক পাণ্ডব সন্তান” কামনা করে পথে নামেন পথের সন্ধানে। ঘোষণা করে যান মানুষের মর্যাদা মূল্যবোধ। যাকে ভাঙিয়ে আপোষ হয়— ব্যাবসা হয়, তাকেই আঁকড়ে শেষ যুদ্ধের দিকে এগিয়ে চলেন। ভাতৃঘাতী তীর ছুটে আসুক, রথের চাকা তাকে তুলতেই হবে। নতুন প্রজন্মের জন্য। মানুষের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য। সত্যকে আঁকড়ে ধরা মুক্তির সন্ধানে।

বেঁচে থাক মানুষের প্রকৃত সুখ আর স্বাধীনতা সন্ধানীদের আপোষহীন পথ কেটে পথ বানানোর অনুশীলন, মনের জানলা খোলা রেখে— বাজুক আত্মসম্মানের সুর ফল্গুধারার মতো।
“সূতপুত্র আমি, রাধা মোর মাতা
এর চেয়ে নাহি মোর অধিক গৌরব।”
এতো গেল বিপ্লবের কথা । নবারুণ কোথায় ?
--------------------


এতো অবাক কাণ্ড! শক্তিশেলের লক্ষ্মণের পাশে দাঁড়িয়ে বাতাসা চিবোনো মুখ নিয়ে হনুমান তাকিয়ে দেখছিল আকশ থেকে নেমে আসা লোহার ডিম। সময়ের তা পেয়ে ডিম ফুটে ওঠে। নবারুণ চোখ রাখেন মহাযানের আয়নায়। “আয়না অন্ধকার। তারপর তার কোণা দিয়ে বিদ্যুৎ চমকাবার আলো চিড় খায়। সমস্ত আয়নাটা জুড়ে ঠাণ্ডা আগুনের ঢেউ ওঠে। আবছা থেকে স্পষ্ট হয় এক একটা ছবি। ফের মিলিয়ে যায়। জায়গা, মানুষ, নাম, দেশ, সময় কিছুই জানে না দুখী...”। নবারুণ ভাবা practice শুরু করেন। ধমনীতে এসে লাগে সুবর্ণরেখার ছোঁয়া। “হাজার হাজার মানুষের মিছিল। ঢাল দিয়ে মুখ ঢাকা পুলিশরা দৌড়ে আসছে। সাঁজোয়া সেই ঢেউ-এর সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয় মানুষের। লাঠি চলে, আতসবাজির মতো ধোঁয়া ছড়িয়ে উড়ে যায় টিয়ার গ্যাসের সেল, গুলি চলে। মানুষ গুলি খেয়ে পড়ে যায়। মানুষের রাগী সমুদ্র আছড়াতে আছড়াতে এগিয়ে আসে। পুলিশের গাড়ি উল্টে যায়। জ্বলে ওঠে। ফাঁকা রাস্তায় জুতো, চটি, চশমা পড়ে। এখানে ওখানে টায়ার জ্বলছে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে।”

নবারুণ হিসাব কষতে বসেন। স্তালিন জমানা। গুলাগ কেসে মরা কনদ্রাতিয়েভ। পার্জে। “নেপলিয়নিক ওয়ার থেকে শুরু করে রাফলি পঞ্চাশ বছর ধরে ডিউরেশনের তিনটে ওয়েভ আইডেনটিফাই করার পরে,... পঁচিশ বছরের আপসার্জ... আবার ধরো টু অ্যান্ড হাফ ডিকেড ধরে ডিক্লাইন...” সাইকেল ঘুরে চলেছে। নবারুণ হয়ত অসহায় বোধ করছেন। ২০১১-এর লালগড়। জনসভায় বক্তব্য রেখে নেমে দেখলেন, পরবর্তী বক্তা মা-মাটি-মানুষের জয়ধ্বনি তুলছে। আর একদল ৩৪ বছরী বিপ্লবীরা তখনও অভ্যেসে খুঁজে চলেছেন, বন্দুকের নলে এখনও নিরোধ লাগানো কেন? এতো কম আদিবাসী মরল?

এর অনেক দিন পর শ্মশান যাত্রার আগে পরে মৃতদেহের কপিরাইট চেয়ে কোন কোন বিপ্লবী দল লাফিয়ে উঠবে, নবারুণ জানতেন। জানতেন না শুধু, তারাই আবার শুয়োরের মতো বাঁশে লাশ ঝুলিয়ে নেওয়া সিআরপিএফ–এর “শহীদ” দের নামে স্টেডিয়াম চেয়ে আন্দোলনে নামবে। অথচ কনদ্রাতিয়েভ সাইকেলে নবারুণ ঘুরতে থাকেন। ভেসে ওঠে বিনুর মুখ। ক্যাট – ব্যাট – ওয়াটার – ডগ – ফিস। রয়ে যায় শুধু বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ গ্রাম বাংলার চিরস্থায়ী দুর্ভিক্ষ হয়ে। আবার চোখ চলে যায় মহাযানের আয়নায়। “এই বরফ ঠেলে রেল ইঞ্জিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে বক্তৃতা করছেন লেনিন। ওভারঅল পরা শ্রমিকদের মিছিল এগোয়। সামনে হাঁটছেন কার্ললিবনেঘট্, রোজা লুক্সেমবুর্গ। কারাগারে নোট বইতে এক টুকরো পেন্সিল দিয়ে নিবিষ্ট মনে লিখে চলেছেন আন্তোনিও গ্রামসি। ফাঁসির দড়ি পরানো হচ্ছে জুলিয়াস ফুচিকের গলায়। সাইগনের রাস্তায় নিজের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে বসে আছেন ধ্যানমগ্ন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। স্তালিনগ্রাদের যুদ্ধ— জার্মান পরিখার মধ্যে স্টেনগান হাতে লাফিয়ে পড়ছে লাল ফৌজ। রক্ত, মাংস, কাদা, বরফ, ভাঙা ট্যাঙ্কের লোহা, বুলেট সব মিশে যাচ্ছে। খুন করা হচ্ছে প্যাট্রিস লুমুম্বাকে লাল্বাজার সেন্ট্রাল লক-আপের মধ্যে চারু মজুমদারের মুখ।” দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে ক্রমশ। নবারুণ খুঁজতে থাকেন পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্টকে।
---------------------


পায়ে পায়ে ঠোক্কর লাগাটা নতুন নয়। কিন্তু টেনে প্রণাম মেরে উঠে দাঁড়ানোর অভ্যাসে শিরদাঁড়া ধনুকের মত বেঁকে গিয়েছে কত যুগ আগে। কেমন ছিলার মত সটান খাড়া হয়, আর বয়সের জং থেকে বেরিয়ে আসে মট মট শব্দ। যদিও সাঁঝবেলায় পিদিম আর ধূপ কাঠির জগত পেড়িয়ে আলোছায়ার খেলায়, হঠাৎ করে মৃত্যুকে চিনেছিল। ঠিক মৃত্যু বলা যায় কিনা জানি না, কিন্তু তার তো সেরকমই মনে হত তখন। মুহূর্তের মধ্যে মনে হত কেউ পড়ে নিচ্ছে তার মনের কথা, তার ভিতর আরও একটা অন্য কেউ, তার ভিতর আর এক— আর সবটার অন্য কেউ যেন সে নিজে। একম অদ্বিতীয়ম নিজেকে খুঁজে পেয়ে মনে হয়েছিল মৃত্যুকে ছোঁয়া যায়। আবিষ্কারের রাতেই হ্যালির ধুমকেতুর থেকে একটা অগ্নিপিণ্ড ছুটে এসে ভস্মীভূত হয়েছিল পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে। ষোড়শ শতকের মায়া উপকথা যে পুঁথির পাতায় সাজানো ছিল, অনেকটা তার পোড়া গন্ধের মত আভাস নাকে ভেসে আসে। সভ্য স্প্যানিশদের জ্বালানো সপ্তদশ অগ্নিকুণ্ডের আঁচ এসে গায়ে লাগে। প্যালেস্তাইন জ্বলছে। অদৃশ্য কোনও তৃতীয় পায়ে আবার হোঁচট লাগে। নিজের ভিতর অন্য কেউ, এই স্ব এবং পরাধীনতাকে প্রথম সভ্যতার অসুখ বলে জেনেছিল।

অতএব বিদায়ের কাল। দর্শনের অসুখ নাকি নবারুণ নিজের মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করলেন? তারপরে— এই অন্ধকারে কালীঘাটের প্রাচীন মরা গঙ্গার পাশের শ্মশানের অন্ধকারে কয়েকটা করোটিকে হেসে উঠতে দেখা গেল। দূর থেকে মানুষের কলরব; বোধহয় শ্মশান যাত্রী। তাল রেখে কয়েকটা শিয়ালও ডেকে উঠলো: যব তক সুরয চান্দ রহেগা...। প্যালেস্তাইনের আকাশে যখন রকেট উড়ে আসছে একের পর এক, তখনই টেক অফ করলেন ফ্যাতাড়ুদের সৃষ্টিকর্তা। সাথে উন্মত্ত কয়েকটা উড়ন্ত চাকতি। ধিরে ধিরে ছুটতে শুরু করল নানা দিকে, কবন্ধ সমাজের উত্থিত শোষণের মুণ্ডুর দিকে তাক করে। মৃত্যু উপত্যকা জুড়ে হায়নার হাসির শব্দ ম্লান হয়ে ভেসে উঠলো আদিম অকৃত্রিম ফ্যাত ফ্যাত সাঁই সাঁই। কুমীরের কান্নায় আকাশ ঢেকে যাওয়ার আগে unpredictable বিস্ফোরণের সাবধান বাণী শুনিয়ে গেল যেন। প্রাসাদ গাত্রের দেওয়াল জুড়ে মুতের আঁশটে ঘ্রাণ ক্রমশ তীব্র হয়ে উঠলো। গরীবের চোখের জল আর মুতের ঘ্রাণ সৃষ্টি ও শুকিয়ে ধ্বংস হওয়া যখন প্রাকৃতিক অভ্যাসে পরিণত, তখন নবারুণ চুল্লীতে চোখ বুজে ভস্মীভূত হবার আগে শেষ স্বপ্ন দেখছিলেন— "মাঝরাতে কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে!"