ফ্যাতাড়ু: কল্কী ও তার ঘোড়ার রগড়

সিদ্ধার্থ বসু

“পরিহাসের রসিকতায় উৎসারিত হয়ে
সৈন্য, নটী, দালাল, ভাঁড়, ব্রাত্য, সার্থবাহের ঘরে
স্বচ্ছলতা আশা আপোষ কাড়াকাড়ি বিলাস ব্যর্থতায়
দেখেছিলাম কল্কী ও তার ঘোড়া রগড় করে”
(‘যদিও আজ তোমার চোখে’, জীবনানন্দ দাশ)


সমগ্র ফ্যাতাড়ু-সৃষ্টির— এবং এমনকি ‘হারবার্ট’, ‘যুদ্ধপরিস্থিতি’, ‘লুব্ধক’ ইত্যাকার তথাকথিত সিরিয়াস উপন্যাস এবং আরো অজস্র গল্পেও— নবারুণ ভট্টাচার্যের পিভটাল থিম আমার মতে ওই দু’ লাইন: ‘সনি বা আকাই, কিছুই দেখিনা মোরা/ ঝামেলা পাকাই’| কিন্তু আসলে কি সত্যি কোনো পক্ষভেদ করেন না নবারুণ? একেবারে রাজনৈতিক অর্থেই কি নিরপেক্ষ বলতে পারি আমরা তাঁকে? হ্যাঁ, সনি বা আকাই-এর মধ্যে কোনো তফাত তিনি করেন না প্রকৃতই| কিন্তু আরো ধ্রুপদী ও আরো রাজনৈতিক ক্ষেত্রে? না| সেখানে তিনি একেবারে ঘোষিতভাবেই পক্ষপাতদোষে দুষ্ট: প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ এবং বহুশ্রুত নামের প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ থেকেই| ‘রাতের সার্কাস’ কবিতাগ্রন্থের ‘আমি কার সঙ্গে’ শীর্ষক কবিতায় পাই: যার চালচুলো নেই/ যে জানে/ শেষ হিসেবে/ চুল্লিই তার ঘর—/ সে কেন/ তোয়াক্কা করবে/ ক্যাবারে শহর/ .../ মরি আর বাঁচি/ কলম আর কাগজ নিয়ে/ আমি কিন্তু ঠায়/ তার সঙ্গে আছি’|

ফ্যাতাড়ুদের প্রথম আত্মপ্রকাশের গল্পেই পাওয়া যায় মানুষকে অনেক ঘেঁটে-ঘুঁটে নতুন করে বানাবার শেষতম সুফল এই ফ্যাতাড়ুদের মূলগত কোয়ালিফিকেশন: বড় বড় অফিসে গিয়ে বহুক্ষণ অবহেলার অপেক্ষা সইতে সইতে মনে মনে খিস্তি করা, নাক খুঁটে চেয়ারের হাতলে লাগানো, নখ দিয়ে খুঁচিয়ে গদি ছেঁড়া, ল্যাভেটরিতে ঢুকে আয়না ভাঙ্গা, বেসিন ফাটানো, এবং দেয়ালে নোংরা কথা লেখা| হোপলেস কেস, আধমরা, লাথখোর ছেলে, খুচরো চিটিংবাজ, উটকো দোকানদার, খিদিরপুর, একবালপুর, কাঁটাপুকুর, সোনাগাছি, গরানহাটা, ভাল্লুকপাড়ার মাগ, হিজড়ে, আলবাল পদ্যগদ্য লেখক ‘সব মিলে কতগুলো সব?/ ওরা নয়, সহসা ওদের হয়ে আমি, কাউকে শুধায়ে কোনো ঠিকমত জবাব পাই নি’ (‘এইসব দিনরাত্রি’, জীবনানন্দ দাশ)| এবং এদের প্রোগ্রাম বা অপারেশন হলো ড্যামেজ: ‘না, না, খুনজখম নয়| ভয় দেখানো| নোংরা করা| ভণ্ডুল করে দেওয়া|’ হাতিয়ার বলতে মুড়ো ঝাঁটা, ভাঙ্গা উনুন, পচা শামুক, পচা আলুর দম ও পাঁঠার মাথার উৎকট ঘুগনি, সেলুন থেকে কুড়োন কাটা চুল, বেডপ্যান এবং তত্সহ বিষ্ঠা ও ছনছন মুত| তা এরা সব কারা? এদের ‘সম্রাট নেই, সেনাপতি নেই;/ তাদের হৃদয়ে কোনো সভাপতি নেই/ .../ স্বাভাবিক মধ্যশ্রেণী নিম্নশ্রেণী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর পরিধি থেকে ঝরে/ এরা তবু মৃত নয়; অন্তবিহীন কাল মৃতবৎ ঘোরে’ (‘এইসব দিনরাত্রি’; জীবনান্দ দাশ)। তাই কি নয়? সেই তারাই যেন এরা| এই ফ্যাতাড়ুরা| শুধু তফাতটা হলো, জীবনানন্দীয় ‘অন্তহীন নক্ষত্রের আলো’ যে ‘দীনতা’ তার শিকার হয়েই তাদের শেষ নয়, তারা প্রতিআক্রমণ করে এই দীনতাকে— নিজেদের দীন-হীন স্থিতি ও অক্ষমতাটুকু নিয়েই, দীনতাকেই সম্বল করে তারা প্রত্যাঘাত করতে চায় এই দীনতার কোনো আধোচেনা, অস্পষ্ট, বা অনেক ক্ষেত্রেই অচেনা উৎসের বিরুদ্ধে| হ্যাঁ| খুব গোদা শোনালেও নবারুণের কুশীলবরা সকলেই সাধারণ মানুষের পক্ষে| ভুল হলো| এরা নিজেরাই সকলে অতি সাধারণ সব মানুষ| এরা ‘জানে না কোথায় গেলে মানুষের সমাজের পারিশ্রমিকের/ মতন নির্দিষ্ট কোনো শ্রমের বিধান পাওয়া যাবে;/ জানে না কোথায় গেলে জল তেল খাদ্য পাওয়া যাবে;/ অথবা কোথায় মুক্ত পরিচ্ছন্ন বাতাসের সিন্ধুতীর আছে’ (‘এইসব দিনরাত্রি’, জীবনানন্দ দাশ)| এমনকি আরেকটু আগ বাড়িয়ে হয়ত এমনটাও বলে ফেলা যায় যে এরা ঠিক সাধারণ নয়, এদের অস্তিত্ব স্থিতিধর্মী নয়, বরং অন্তর্ঘাতমূলক| হারবার্ট থেকেই এই অবস্থানের চলা শুরু| মৃতের সহিত কথোপকথন-এর হারবার্ট যেন রেশনাল যুক্তিবাদিতার মুখের ওপর একটা বেপরোয়া চড়| যে রেশনালিটি মানুষকে খেতে-পরতে দেয় না, তিলমাত্র অবাধ্য হলে উৎপীড়ন করে, আর ‘রাজনীতি করতে’ গেলে প্রথমে পাগল বলে ও তারপর গুলি করে, তার এখনো জানতে বহুত দেরী আছে যে কে কোথায় বিস্ফোরণ ঘটাবে হঠাৎ| নবারুণের এই ‘রাজনীতি করা’ কুশীলবরা অবশ্য আক্ষরিক অর্থে রাজনীতিমনস্ক নয় কেউ-ই| কিন্তু প্রচলন বা প্রতিষ্ঠা-র বিরুদ্ধাচরণ করতে গিয়ে রাজনৈতিক হয়ে ওঠা ছাড়া আর কীই বা করতে পারত বা পেরেছে তারা?

উৎপল দত্তের কালজয়ী নাটক ‘টিনের তলোয়ার’-এর শুরুর দিকে এক প্রান্তবাসী মানুষ জঞ্জাল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ‘বাংলার গ্যারিক’কে ছুঁড়ে দেয়: ‘আমায় লিয়ে লাটক ফাঁদতে পারবে? আমায় লিয়ে? উহুঁম! চাটুজ্যে বামুনের জাত যাবে না তাতে?’ এবং এই ‘আমার’ পরিচয় দিতে গিয়ে সে শুধু বলে: ‘আমি কলকেতার তলায় থাকি’| তা এই তলায়-থাকা মানুষদের লিয়েই আমাদের ভটচায্যি বামুন কিন্তু আগাগোড়া নিয়োজিত| অথবা, শুধু মানুষ-ই নয়, কুকুর-বেড়ালদের জন্যেও সমান সংযোগে লিপ্ত তিনি| লুব্ধক, কালপুরুষের কুকুর-নক্ষত্র, যেন হয়ে ওঠে শহর পত্তনের উপজাত বর্জ্য যত অকালকুষ্মাণ্ডদের প্রতীক, যারা কিনা বেচতে কিনতে পারবে না বড় বড় ব্যবসায়ীদের মালমশলা| নবারুণের নিজের কথাতেই পাই, “ফ্যাতাড়ুরা টোটালি আমার পলিটিকাল কনশাসনেসের এক্সটেনশন”| আর এই পলিটিক্স প্রিচ করার ক্ষেত্রে মুখের ভাষাকে এক আদ্যন্ত প্রাসঙ্গিক হাতিয়ার করে তুলতে অন্ত্যজ মানুষদের ব্যবহার করেন যোদ্ধার সাজে, যুদ্ধে সামিল হয় তাদের নিজস্ব ভোকাবুলারি: ‘বোকাছেলে পুচু পুচু কোকাকোলা খায়/ বোকাচোদা বাপ তার পয়সা যোগায়’ কিম্বা ‘আয় মোরা সব গরিব যত/ বাঁধব জবর জোট/ একসুরে আয় বলব তেড়ে/ ভোটমারানি ফোট’| কিম্বা ‘এবে শোন পুলিশ পুঙ্গব/ আঁটি-বাঁধা কোঁকড়ার ঝাঁট/ মরা তোরে ডরাই থোড়াই/ বলে কবি পুরন্দর ভাট’— যেন তুষার রায়ের নিরীহ ‘পুলিশ ওরে পুলিশ/ কবি দেখে টুপিটা তোর খুলিস’-এর শরীরে একমুঠ বিষ-পিঁপড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে| কবি পুরন্দরের সুইসাইড নোট শেষ হয় তুমুল ইঙ্গিতবহ ‘এক পা স্বর্গে এক পা নরকে ঝোলা/ একটি কামান, দুটি কামানের গোলা’ দিয়ে| আবার কোথাও বা তুমুল দার্শনিক সত্য: ‘সবাই বাগায় সবাই লাগায়/ সকলেরই হবে অন্ত/ আজ যেই শিশু করিতেছে হিসু/ কালই কেলাবে দন্ত’| সেইরকমই ‘গাছ হতে দেখো ঝরে টোপাকুল/ কেহ সি.পি.এম, কেহ তৃনমূল/ ডাইনোর দলে ভিড়িবে সকলই/ কাঁপি সন্ন্যাস রোগে/ আর যাহা বাকি তাহাও যাইবে/ মহাকাল জলযোগে’|

কিন্তু নবারুণ খুব সোজা খেলুড়ে নন| মারাদোনার চেয়েও মারাত্মক তাঁর ড্রিবলিং| মেসির চাইতে অনেক জটিল তাঁর মেশিনারি| আর তাই ‘ভোটমারানি ফোট’ কবিতা শেষ হওয়ামাত্র পুরন্দরকে শুনতে হয় ‘নকশাল বলে ধরতে পারে কিন্তু’| আর অমনি পুরন্দর নামায় তার ‘দেশপ্রেমের কবিতাও আছে’: ‘কারগিলে হাড়গিলে ঠোকরাতে আসে/ বাজপেয়ী বাজপাখি ছেড়ে দিয়ে হাসে’; এবং তার ঠিক পরে পরেই ‘মাল্টিনেশনালের বিরুদ্ধেও লিখেছি’ বলে পুরন্দর আওড়ায় তার কোক ও পেপসি সমৃদ্ধ লাইন কটি| ‘বড়লোকের গাড়ির টায়ার/ ফুটো করে লাগাও ফায়ার/ নজরটুকু রাখবে যেন/ আঁচটুকু না লাগে আয়ার’-এ শ্রেণীসচেতনতার খোশবাই ধরতে না ধরতেই তাই ডি.এস. বলে ওঠে ‘কিন্তু আয়াকে ছাড়া হবে কেন? ফিমেল বলে?’ এবং সেখান থেকে শেষতক ‘আয়া যদি ডবকা হয় তাহলে কিন্তু ছাড়াছুড়ি নেই’ পর্যন্ত যায় কথার স্রোত| অর্থাৎ ‘গরিব যত’ বা সর্বহারাদের ‘জবর জোট’ মালটি অমন চিবুনো নয়, যে চট করে চিউইংগামের মত চ্যাপ্টা করে দেওয়া যাবে, আহা কেরেস্তানি ইউটোপিয়া থেকে গড বাদ দিলেই হলো-র মত করে| নবারুণের ‘সাবজেক্ট কিন্তু বড়লোক ভার্সাস গরিব’, ‘কিন্তু গোটাটাকে ধরা হয়েছে হাগার অ্যাঙ্গেল থেকে’ অর্থাৎ: ‘চেয়ার-পায়খানাতে হাগে বড়লোক/ বড়লোক কাগজেতে হেগো পোঁদ মোছে/ গরিবেরা মাঠে হাগে, তেড়ে আসে জোঁক/ গরিব নালার জলে হেগো পোঁদ ছোঁচে’| এবং পদ্য নামতে না নামতেই ডি.এস.-এর: ‘ক্যাঁচা হয়েছে গুরু| খাওয়া-দাওয়াতেই নয়, হাগার কেসেও হারামিপনা|’ অন্যত্র: ‘যতই তাকাও আড়ে আড়ে, হঠাৎ এসে ঢুকবে গাঁড়ে/ বাম্বু-ভিলার রেকটোকিলার গাঁটপাকানো বাঁশ/ আজ্ঞাবহ দাসবাবাজি আজ্ঞাবহ দাস’ এর অমোঘ সন্ত্রাস|


এই কোটি কোটি মানুষের মুখের ভাষা ব্যবহারের মধ্যে যৌনতার ভূমিকা নিয়ে নবারুণ বলেন: ‘আমি কোনদিন এক্সপ্রেসিভলি সেক্সুয়ালিটি নিয়ে লিখি না| আমার ‘যৌনতা’র ব্যবহার মোস্টলি মজা, হিউমার| সেক্সুয়ালিটি মানুষের এমন একটা ব্যক্তিগত এলাকা, যেটা নিয়ে কিছু করতে গেলে আমাকে একটু ভাবতে হবে| আমার তো ডি.এইচ.লরেন্সের মত ক্ষমতা নেই’| অর্থাৎ ‘সেক্সিস্ট নবারুণ’ তকমা নিয়েও আবার ভেবে দেখতে হয় সমালোচকদের| যৌন অভিব্যক্তি নয়, “মাথায় শুধু একটা বুজভুম্বুলে চিন্তা ছিল যে, একটা গ্র্যান্ড খচরামি করতে হবে, বড় করে ফাঁসিয়ে দিতে হবে| সে থেকেই শুরু” হয় নবারুণের তুলকালাম ‘কাঙাল মালসাট’| টেকচাঁদ বা হুতমের সার্থক উত্তরাধিকার তাঁর ওপর বর্তেছে: ‘কে হে মূঢ় পড়িতেছ পানু/ নত মুখে হও নতজানু/ পাইলট মরে হেগে/ জেটপ্লেন ধায় বেগে/ রানুকে ধরিল বুঝি ভানু’ বঙ্গসংস্কৃতির মাফিয়াদের ধরে ফেলে হাতেনাতে| এবং ‘সঠিক যৌনকেশ/ ওই গেল বেঁকে/ সঠিক যৌনকেশ শোভে নানা ঠেকে/ সঠিক যৌনকেশ/ ওই করে রব/ ধন্য কহে দেশবাসী/ কিবা বৈভব’ ভাট কবিতায় বামালসমেত ফেঁসে যায় আমাদের পলিটিকাল কারেক্টনেস|

“আমরা দণ্ডিত হয়ে জীবনের সভা দেখে যাই/ মহাপুরুষের উক্তি চারিদিকে কোলাহল করে” (‘মনোকণিকা: সাবলীল’; জীবনানন্দ দাশ)। পাতি কথায় রাজনীতির তত্ত্ব নয়, আধুনিক মানুষের আপাদমস্তক রাজনৈতিক আইডেন্টিটি নিয়েই কারবার নবারুণের| আর সেইখান থেকেই উঠে আসে তাঁর অশ্লীলতা, অবাধে কিন্তু সুকৌশলে খিস্তির ব্যবহার, এবং ক্ষমতাকেন্দ্রকে শুধু চ্যালেঞ্জ নয় একেবারে ঠাট্টা-মস্করার স্তরে নামিয়ে আনা তাঁর অভিসন্ধিমূলক উদ্ভটরস| যেখানে ক্ষমতার প্রত্যাঘাতে গু-মুত হলো সবচেয়ে এফেক্টিভ হাতিয়ার| তত্ত্ব পরিষ্কার: ‘গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির/ গাঁড় মারি তোর শপিং মলের/ বুঝবি যখন আসবে তেড়ে/ নেংটো মজুর সাবানকলের’| কিন্তু রাস্তা খুব সোজাসাপ্টা নয়| যেখানে চোক্তার ভদির ‘সবরকম অশুভ অনুষ্ঠানে ঘর ভাড়া দেওয়া’ যেন হারবার্ট এর কথা মনে করিয়ে দিয়ে যায় আরেকবার| পুলিশের বড়কর্তাকে কালীপূজোর হুজ্জত সামলাতে খবদ্দারী ফলাতে গিয়ে নাকাল হয়ে ফিরতে হয় ভুতের হাতে, এক্কেবারে আলো-ঝলমল কলকেতা শহরের গা-ঘেঁষা অন্ধকারে| কমরেড আচার্যর সঙ্গে মোলাকাত হয় ঝুলন্ত স্থিরচিত্র থেকে সরাসরি পার্টি-অফিসের ঘরে ল্যান্ড করা স্ট্যালিনের| মিলিটারি ব্যবস্থাকে টুসকি মারার মত অবজ্ঞায় ভদি আর সর্খেলের বাতচিত হয় ‘ওভার অ্যান্ড আউট’ সহযোগে সৈনিক রীতি মেনে| এবং সর্খেলের খোঁড়াখুঁড়ির ফসল হয় এক ‘নুনু কামান’ যার প্রথম ব্যবহারের অব্যবহিত ফল দেখতে পাই ‘রিট্রিট, রিট্রিট! কামানের সঙ্গে নো গাঁড় মারামারি’| চাকতির খেল জমে উঠতে আমরা পাই বি-হেডেড সব মন্ত্রী-সান্ত্রী-নেতা দের যারা আবার হেলমেট কষে মাথাটিকে যথাস্থানে ধরে রেখেছেন| এ আক্রমণ সদলবল এবং সশস্ত্র| কিন্তু এর গতিপথ নির্ধারণ করে দিতে কোনো মাথাভারী আঁভা গার্দ বসে নেই কোনো উঁচু চুড়োয়| তাদের যুদ্ধের মতই তাদের অস্ত্রশস্ত্রও অভিনব ও আনকোরা| আর অবসিনিটি সেখানে এক ব্রহ্মাস্ত্র যা বাজার গরম করে না, ফুঁড়ে ফেলে, আক্ষরিক অর্থেই পেনিট্রেট করে| কবিসম্মেলনে মালতীলতা পাহাড়িকে ডি.এস.-এর: ‘....আমরা মা-বোনদের ইজ্জত দিতে জানি... গোঁড়গেলের ন্যাজ দিয়ে কান খুঁচিয়েছেন.... দেখা হবে, পাকা দেখা’ এবং তারপর বস্তা বস্তা আরশোলাসহ ‘বড়লোকের ছেঁয়া/ করছে টেঁয়া টেঁয়া/ বড়লোকের ছেঁয়ি/ করছে টেঁয়ি টেঁয়ি’— তীব্র অট্টবিদ্রুপে বাঙালির কচিদুর্বাদলশ্যাম কাব্যপ্রেমের মুখ ঘষে দেয় বিচিত্র বাস্তবের তপ্ত জমিতে| ‘মানুষটা মরে গেলে যদি তাকে ওষুধের শিশি/ কেউ দেয়—বিনি দামে— তবে কার লাভ’ (‘লঘু মুহূর্ত’, জীবনানন্দ দাশ) এই নিয়ে সালিশি করতে তারা একবারের জন্যও বিচ্যুত হয় না| তাই খরা-বন্যা ধ্বস্ত বিপর্যস্ত এলাকায় জনদরদী নেত্রী আভা-র উদ্দেশ্যে, পুরন্দর নয়, বিপন্ন মানুষেরাই গান ধরে: ‘আভা দিদির মাই লো/ সবাই মিলে খাইলো’ এবং তারপর ‘উদরাময় হইলো’| মাইলো বিলোতে আসা আভাদিদির ‘মাই আর লো’র মাঝখানে শূন্যস্থানটি আমদের বিদ্ধ করে| তথাকথিত শ্লীলতা আর সফিস্টিকেশনের ঢাকনা ছিঁড়ে-ফেঁড়ে যায়|

মানুষ সর্বদা যদি নরকের পথ বেছে নিত—
(স্বর্গে পৌছুবার লোভ সিদ্ধার্থও গিয়েছিল ভুলে,)
অথবা বিষম মদ স্বতই গেলাসে ঢেলে নিত,
পরচুলা এঁটে নিত স্বাভাবিক চুলে,
সর্বদা এসব কাজ করে যেত যদি
যেমন সে প্রায়শই করে,
পরচুলা তবে কার সন্দেহের বস্তু হত, আহা,
অথবা মুখোশ খুলে খুশি হত কে নিজের মুখের রগড়ে|’
(‘মনোকণিকা: মানুষ সর্বদা যদি’; জীবনানন্দ দাশ)।
‘কাঙাল মালসাট’-এর এক অধ্যায়ে পাই গঙ্গার দু’ পার থেকে ভূতেদের বস্তা বস্তা উড়ন তুবড়ি চার্জ-এর রোমহর্ষক বিবরণ: ‘মাঝেমধ্যে একটা আধটা পটাশ বা ইলেকট্রিক ঝাড়ের উড়ন রাতকে দিন করে দিচ্ছে| সেই শৈল্পিক আভায় দীন ও আনন্দময় ভূতগুলিকে স্পষ্টতর দেখায়| বেশিরভাগই খালি গা ও গামছা পরা| এদেরই বাড়ির মেয়ে ভূতেরা অক্লান্ত পরিশ্রম করে মশলা ঝেড়েছে, গুঁড়িয়েছে, ছেঁকেছে, রোদে দিয়েছে|... অবশ্য কলকাতার লোকেদের এটা জানা দরকার যে কালীপূজোর পরদিন ভোরে যে শীর্ণ শিশুরা আধপোড়া বা নিভে যাওয়া বাজি কুড়োতে বেরোয় তারা ভূত নয় বরং ছোট সাইজের জ্যান্ত মানুষ| ছেঁড়া প্যান্ট দিয়ে নুনু বা পোঁদ দেখা গেলেও তারা লজ্জা পায় না| ওই আধা-ন্যাংটো হাড়-জিরজিরে শিশুদের প্রতি কাঙাল মালসাটের উপহার’: বন্দুকের বারুদের মেশাবার অনুপাত এবং ‘এ বিষয়ে আর যা যা করণীয় তা ঠিক সাহিত্যের আওতায় পড়ে না’| উদ্দেশ্যপূর্ণ হিউমারের মুখোশ খসে গিয়ে সত্যিকারের মুখ বেরিয়ে পড়ে নবারুণের— যে মুখ একজন স্বঘোষিত বিদ্রোহীর মুখ— যে তার স্বরচিত কুশীলবদের নিয়ে পারি জমায় সেই দেশে, যাকে ‘উড়ো নদী বলে;/ সেইখানে হাড়হাভাতে ও হাড় এসে জলে/ মুখ দ্যাখে— যতদিন মুখ দেখা চলে’ (‘লঘু মুহূর্ত’, জীবনানন্দ দাশ)|