তাহাদের কথা: মনুষ্যেতরর রাজনীতি

ঈশানী বসু

ঈশপের নীতিকথা থেকে অ্যারিস্টোফেনিসের নাটক, বিভিন্ন দেশের লোককাহিনী এবং উপকথায়, লিউইস ক্যারল থেকে সুকুমার রায়ের গল্পে প্রায়শই কথা বলা জীব জন্তুর দেখা মেলে। এদের উপস্থিতি আবার অনেক সময় নিছক রূপকের ভূমিকায় সীমাবদ্ধ না থেকে হয়ে ওঠে অনন্য সৃষ্টি লেখকের জাদু লেখনীর জোরে- যেমন ক্যারলের চেশায়ার বিড়াল, তলস্তয়ের ঘোড়া, বুল্গাকভের কুকুর, অরওয়েলের নিপীড়িত পশু খামার, উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনি, চড়ুই ও মজন্তালী, সুকুমার রায়ের কাক্কেশ্বর কুচকুচে, হিজি বিজ বিজ প্রমুখ। নবারুণ ভট্টাচার্যের উপন্যাস ও গল্পে যে সবাক ও নির্বাক পশুদের দেখা মেলে তাদেরও শুধু রূপক বলে দাঁড়ি টানা কঠিন। প্রসঙ্গত এই প্রাণীদের ভূমিকা অনুযায়ী এদের দুটি ভাগে ফেলা যায়- এক, নির্ভেজাল গোবেচারা প্রাণী যারা প্রকৃতি অপেক্ষা মানুষের খামখেয়াল ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার শিকার হয় (অন্ধ বেড়াল, বেড়াল ছানা, মাছ, কাঁকড়া, কুকুর) দুই, তেজীয়ান, পরম বুদ্ধিমান প্রাণী যার বুদ্ধি ও কৌশলের দৌড় মানুষকেও হার মানায় (দণ্ডবায়স, বনবেড়াল)।

এই দ্বিতীয় শ্রেণী আবার উগ্র সোশালিস্টিক, তারা ভয় দেখিয়ে, ধমকে চমকে, ভোজবাজির খেলা (পড়ুন চাকতি, বশীকরণ, ভুতুড়ে স্বপ্ন, মমি শিল্প) খেলে প্রতিষ্ঠানকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়ে। প্রসঙ্গত প্রাচীন গ্রীক পুরাণে দাঁড়কাক সূর্যদেবতা অ্যাপোলোর (যিনি গান বাজনা, শিল্পকলা, দৈব বাণীরও দেবতা) অনুচর ও মর্ত্যের মানুষের কাছে দেবতাদের বাণী পৌঁছে দেওয়ার ভারপ্রাপ্ত দূত। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান উপকথায় আবার দেবরাজ ওডিনের পোষা দুই দাঁড়কাক হুগিন (চিন্তা) ও মুনিন (স্মৃতি) তার কাছে দিন দুনিয়ার সব খবর নিয়ে আসে। ‘যোগ বশিষ্ঠে’ আমরা আবার ভূশুণ্ডী বা ভূশুণ্ড নামের এক দাঁড়কাকরূপী বৃদ্ধ ত্রিকালজ্ঞ মুনির দেখা পাই যিনি মেরু পর্বতের কল্পতরু বৃক্ষে বাস করেন ও পূর্বযুগের নিখুঁত বিবরণ দেন। কাক্কেশ্বর নিজেকে এরই উত্তরসুরী বলে দাবী করে। নবারুণের ‘কাঙাল মালসাট’ উপন্যাসের অতিকায় দণ্ডবায়স বা দাঁড়কাক এরকম কোন দাবী না করলেও সে যে পুরাকালের কাকের মতোই সুচতুর, জ্ঞানবৃদ্ধ ও জ্ঞানপাপী তাতে সন্দেহ থাকে না। লোককথা, বা বলা ভালো ‘বিস্ট ফেবলের’ আঙ্গিকে সে ‘ট্রিক্সটার’ (ঠগ)-এর ভূমিকা অক্লেশে পালন করে। তবে তার সাথে কাক্কেশ্বর কুচকুচের থেকে পঞ্চতন্ত্রের স্থিরজীবীর মিলই বেশি, যে কৌশলে শত্রু প্যাঁচাকূলকে সমূলে বিনাশ করেছিল। অবশ্য স্থিরজীবীর উদ্দেশ্য ছিল কাকদের রাজা মেঘবর্ণের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করা আর আমাদের সর্বজ্ঞ দাঁড়কাকটির প্রতিষ্ঠানকে নানা দিক থেকে আঘাত হেনে কাহিল করা। এই উলটো পুরাণের নেপথ্যে আছে তারই ‘মাস্টারপ্ল্যান’, যা অনুগত সৈনিকের মত পালন করে মার্শাল ভদি (চোক্তার) ও তার সাঙ্গপাঙ্গ, ফ্যাতাড়ু মায় পুলিশ গোলাপ মল্লিক। সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এই প্রাণীটি মোটেই পরমহংস নন, দলবলের সাথে দিব্যি বাংলা খেতে খেতে রণকৌশল, স্বামী নিগমানন্দের বানী বাৎলে দেন। অন্যদিকে গোরা ভূতদের সাথেও তার দারুণ র্যা পো, স্বয়ং বেগম জনসন তার বন্ধু ও বুদ্ধিদাত্রী। ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন গুলে বেটে খাওয়া এই জীবটি অগত্যা শ্রেণীশত্রুদের ওপর অতর্কিতে হানা দিয়ে নকল কমরেডের মুখোশ খুলে দেয়, চাকতির মাধ্যমে ‘লোবোটমি’ করে পুঁজিপতিদের মস্তিষ্ক ঘুলিয়ে দেয়, মিউজিয়ামের অপদার্থ, সাহেবভক্ত কিউরেটর, সমালোচককে জ্ঞানের বহরে ঘায়েল করে, দুর্নীতিপরায়ণ নগরপালের শিরশ্ছেদ করে।

‘মসোলিয়ম’ উপন্যাসে দাঁড়কাকটির প্রত্যাবর্তন ঘটে, বন বেড়ালের সাথে জোট বেঁধে আরও ‘স্যাবোট্যাজ’ ঘটাতে। এই বিজ্ঞ বন বেড়ালটি যে বঙ্কিমচন্দ্রের ‘কমলাকান্তের দপ্তর’র মার্জারী মহাশয়ারই উগ্র মূর্তি তা মনে করার বিলক্ষণ জায়গা আছে-
“দেখ আমি চোর বটে, কিন্তু আমি কি সাধ করিয়া চোর হইয়াছি? খাইতে পাইলে কে চোর হয়? দেখ যাঁহারা বড় বড় সাধু, চোরের নামে শিহরিয়া উঠেন, তাঁহারা অনেকে চোর অপেক্ষাও অধার্মিক। তাঁহাদের চুরি করিবার প্রয়োজন নাই বলিয়াই চুরি করেন না, কিন্তু তাঁহাদের প্রয়োজনাতীত ধন থাকিতেও চোরের প্রতি যে মুখ তুলে চাহেন না, ইহাতেই চোর চুরি করে। অধর্ম চোরের নহে— চোরে যে চুরি করে সে অধর্ম ধনীর।” (‘বিড়াল’, কমলাকান্তের দপ্তর)
যুগান্তরে সে বিনম্র সোশ্যালিস্ট নয়, পুরদস্তুর বাঘের বাচ্চার মত তেজীয়ান বন বেড়াল। হ য ব র ল’র বেড়ালের মত রূপ/কায়া পাল্টানোর মন্তরে সে এক লহমায় বেড়াল ছানা থেকে হিংস্র বন বেড়াল রূপ ধারণ করে কমরেড আচার্যর ডাকা গোপন মিটিং এ জল ঢেলে দেয়। এ বেড়াল অদ্ভুত রসের (‘নন্‌সেন্স’) আমদানি করে না, মার্কসবাদ, মিশরীয় কাম রাশিয়ান মমিবিদ্যা, ভোজবাজি রপ্ত করে সে তার স্যাঙাত দাঁড়কাকের মতই ঘোর প্রতিষ্ঠান বিরোধী কার্যকলাপে (সরকারী পরিকল্পনা বানচাল করা, পুলিশ, কমরেড ও ব্যবসায়ীদের হুমকি দিয়ে কাজ উদ্ধার করায়) লিপ্ত হয়। সে, দাঁড়কাক ও বেগম জনসন (ভূত) মিলে ছকে ফেলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে বুড়ো আঙুল দেখানোর নতুন মাস্টারপ্ল্যান— ভদিকে মমি সাজিয়ে দেদার পয়সা পেটার এবং তা হাতেনাতে করেও দেখায়। স্বভাবতই পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে যে এই সুতার্কিক, দার্শনিক, পরম জ্ঞানী জীবগুলি যারা নীৎশে, নিগমানন্দ, জোসেফ টাউনসেন্ড, গ্রেগর মেন্ডেল, মায় লেনিন-স্তালিনের ইতিহাস আওড়ায়, ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান সবই যাদের নখদর্পণে, তারা কি সত্যিই নিছক কাক ও বেড়াল হতে পারে? দাঁড়কাকের জবানবন্দীতে সে সাক্ষাত ভোজবাজী বিশারদ আত্মারাম সরকারের উত্তরসূরি ও ভদির বাবাও বটে, যা ইঙ্গিত দেয় তার সূক্ষ্ম দেহ ধারণ করার ক্ষমতাকে, অর্থাৎ সে হয় কাকবেশী জাদুকর নয় জাদু কাক—
“- পরকায়া- প্রবেশ, ভেরি ইজি। ভদির বডিতে আমি ঢুকে যাব। ভদি ঢুকবে আমার বডিতে। হাগলে হেগে মরবে দাঁড়কাক। ভদি যেরকম রয়্যাল স্টাইলে মমি হয়ে আচে তেমনই থাকবে।” (মসোলিয়ম)

প্রাণীদের ‘বিস্ট ফেবল’ অনুরূপ ছলচাতুরী ও আগ্রাসী মনোভাবের বিপরীত মেরুতে রয়েছে নবারুণের ছোট গল্পের অন্ধ বেড়ালটি। অসহায়, বৃদ্ধ বেড়ালটি অখ্যাত হোটেল মালিকের বিধবা চাকরানীর ছেলেমেয়েদের দয়া দাক্ষিণ্যে বেঁচে থাকে, যাকে বলে সাবঅলটার্নের বাড়া! অন্ধ হলেও অ্যালান পো-এর কালো বেড়ালের করাল জিঘাংসা বা ক্ষোভের লেশ মাত্র নেই তার গায়। বোমা গুলির আওয়াজেও সে নিশ্চেষ্ট, টেবিলের নিচের আশ্রয় ত্যাগ করে না। হয়ত কোনোদিন নদীর জল এসে গ্রাস করে নেবে তার একদা নিরাপদ স্থানটুকু, না বুঝে তার সাথেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে সে, মরবে ‘কুকুর বেড়ালের মত’ কারণ প্রায়শই খেতে দিতে ভুলে যাওয়া ব্যস্ত হোটেল মালিকের নিশ্চয়ই তাকে সরিয়ে দেবার কথা মনে পড়বে না। তার গল্প করতে গিয়ে ল্যাবরেটরিতে বেড়াল ছানাদের অন্ধ করে তাদের ওপর বীভৎস পরীক্ষা নিরীক্ষা চালানোর সত্যি ঘটনার অবতারণা করে নবারুণ মনে করিয়ে দেন বিজ্ঞানের অগ্রগতির পায়ে নিরীহ পশুদের প্রতিনিয়ত বলি হওয়া, এবং মানুষের ওপর নির্ভরশীল গৃহপালিত জীবদের করুণ পরিণতি।

‘টয়’ গল্পে মিথিল ও মিমির ছোট্ট ছেলে টয় খেলার ছলে অ্যাকোয়ারিয়ামের রঙিন মাছদের ইমারসন হিটার চুবিয়ে মেরে ফেলে। বাবা মা তাকে মনোবিদের কাছে নিয়ে গিয়ে এই শুনে আশ্বস্ত হন যে ছেলেটি এই কাজ বিজ্ঞানমনস্ক কৌতূহল থেকে করেছে। এ কথা বলাই বাহুল্য যে তারা মৃত মাছেদের শোকের থেকে ছেলের বিকারেই বেশি শকড্ হয়েছিলেন। এ ক্ষেত্রে ছেলেটির নামকরণ ‘টয়’ আমাদের কিং লিয়ার নাটকের গ্লস্টারের বেদনাময় উক্তি “As flies to wanton boys are we to th’ gods. They kill us for their sport.” করিয়ে দিতে বাধ্য।

‘ম্যালোরি’ গল্পটিতে আবার মিথিল এক ব্যাগ জীবন্ত কাঁকড়াকে ডীপফ্রিজে বন্দী করে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। অথচ সে অমূল্যর কথা মত ওদের জল ভরা গামলায় ছেড়ে দিলেই পারত। ফ্রিজের তাপমান ইচ্ছে করে কমানোয় যাতে কাঁকড়াগুলো ঠাণ্ডায় মরে জব্দ হয় আবার মাংসটাও তাজা থাকে, তার মধ্যে এক নিষ্ঠুর উদাসীনতা কাজ করে। গল্পের পরিশেষে পরিবেশিত টীকাগুলি মনে করিয়ে দেয় এক অবোধ বালকের পরিত্যক্ত বাড়ির মধ্যে বাতিল ফ্রিজে আটকা পড়ে মর্মান্তিক মৃত্যুর ধূসর ইতিহাস ও নাৎসি বাহিনীর লাল ফৌজের সৈন্যদের ঠাণ্ডায় জমিয়ে মারার ধান্দা। এসবের অবতারণা চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় হতভাগ্য কাঁকড়া গুলোর নিয়তি সমান দুঃখের, অন্যদিকে আবার শুধু বাঙালিকে কাঁকড়া বলেই লেখক থেমে যাচ্ছেন না, সমগ্র প্রজাতিটাই এরকম নিজের মধ্যে খেয়োখেয়ি করেই গেল সেটাও বুঝিয়ে দিচ্ছেন।

ইংরাজি প্রবাদবাক্য ‘এভরি ডগ হ্যাজ হিজ ডে’র মূর্ত রূপ হল লুব্ধক উপন্যাসটি। কথাচ্ছলে নবারুণ একে ‘কুকুর উপকথা’ও বলেছেন। নাৎসি কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের ধাঁচে অসহায়, গোবেচারা কুকুরদের নিশ্চিহ্ন করার নিষ্ঠুর হত্যালীলায় মাতে কলকাতা। ‘গেস্টাপো’ সদৃশ সাঁড়াশি আক্রমণ, পিঁজরাপোলে নির্বাসন, তিল তিল করে না খেতে দিয়ে শুকিয়ে মারা কুকুরের দল ও তাদেরই কিছু অংশের আত্মগোপন ও কলকাতা থেকে ‘মহাপ্রস্থান’ বা ‘এক্সোডাস’ বারংবার মনে করায় ইহুদী বন্দিদের ওপর নাৎসিদের অকথ্য অত্যাচার ও তাদের লুকিয়ে থাকা ও পালানোর ইতিহাস।
“-আসলে কলকাতাটাকে যেভাবে ওরা সাজাতে চাইছে সেই ছবিটার মধ্যে আমরা খুবই বেমানান।
-সে না হয় হল, কিন্তু আগেই প্রশ্ন উঠবে যে কলকাতাটা কি কেবল ওদের? হঠাৎ ওরা বাদে অন্যরা ফেলনা হয়ে গেল?”
জিপসি ও কান গজানোর মধ্যে এই কথোপকথনে শ্রেণী সংগ্রামেরও মূল বক্তব্য উঠে আসে। মানুষ ও কুকুর যথাক্রমে ধনী (have) ও সর্বহারার (have not) ভূমিকা পালন করে।

কিন্তু এক মাঘে শীত যায় না বা শেলির বিখ্যাত উক্তি “If Winter comes, can Spring be far behind?” অনুসরণ করেই হোক, এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কুকুররাও তলে তলে বিদ্রোহ ভাঁজতে থাকে ছায়া কুকুরদের নেতৃত্বে। সিরিয়াস নক্ষত্রপুঞ্জের দুটি তারা, ক্যানিস মেজর ও মাইনরকে গ্রীক পৌরাণিক শিকারী অরিয়নের অন্যতম শিকারী কুকুরের আরেক রূপ বলে গণ্য করা হয়। যারা ‘লেপাস’ (শশক) এবং ‘টরাস’ (বৃক্ষ) নক্ষত্রকে আকাশ পথে তাড়া করে বেরায়। আবার তাদের সাথে প্রাচীন গ্রীসের চাঁদের দেবী, আর্তেমিসের শিকারি কুকুরদের মিল উল্লেখযোগ্য। ওভিডের ‘মেটামরফসিস’ অনুযায়ী আরেক প্রবাদ প্রতীম শিকারী অ্যাক্তিয়ন কৌমার্যের দেবী আর্তেমিসকে স্নানরতা অবস্থায় দেখে ফেললে রুষ্ট হয়ে তিনি তাকে একটি হরিণে রূপান্তরিত করেন। না চিনতে পেরে নিজেরই অনুগত শিকারী কুকুরদের হাতে তার প্রাণ যায়। রবার্ট গ্রেভস-এর ‘গ্রীক মিথস’ বইতে আবার এই আর্তেমিসই হিংসুটে অ্যাপোলোর কথায় ভুলে সমুদ্রের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অরিয়নকে নরাধম ক্যানাডন ভেবে তীর ছুঁড়ে মেরে ফেলেন এবং ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাকে নক্ষত্রে রূপান্তরিত করেন। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে নবারুণ শিকারীর শিকারে রূপান্তরিত হওয়ার মেটাফোরটি অসাধারণভাবে ব্যক্ত করেছেন—
“কলকাতা এমন এক অসাড়, অপেক্ষমান পিঁজরাপোল। তার শাস্তি মৃত্যু।”
প্রসঙ্গত কুকুরদের দলপতি লাইকা আবার সোভিয়েত রাশিয়ার মহাকাশযান স্পুটনিকের তথা মহাকাশে মানুষের আগে যাওয়া অন্যতম প্রাণী (পড়ুন কুকুর) ও বিজ্ঞানের বহু পশুবলির একজনও বটে। যাই হোক, তাদের বার্তা পৌঁছে দিতে পৃথিবীতে (কলকাতায়) নেমে আসে খোদ আনুবিস যাকে দেখে বৈজ্ঞানিকরা খাবি খেতে খেতে বোঝেন কাজটা ভালো হয়নি, শেয়াল/কুকুরমুখী মিশরীয় দেবতাটি স্বয়ং মৃত্যুর দেবতা কি না! আসলে নিরীহ কুকুরদের ওপর অকারণ অত্যাচার দেখে অমোঘ নিদান ঘোষণা করেছে লুব্ধক বা সিরিয়াস (কুকুর) নক্ষত্র, (যেখান থেকে আফ্রিকার ডোগোন উপজাতিকে জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি শেখাতে এসেছিল ‘নম্মস’ বলে ভিনগ্রহের অত্যাধুনিক জীবরা) কলকাতা মাত্র সাত ঘণ্টা ব্যবধানে এক গ্রহাণুর আঘাতে চিরতরে মিলিয়ে যাবে। অতঃপর এই চরম স্বার্থপর শহর ছেড়ে পালে পালে কুকুর চলে যেতে থাকে, ট্রাক, বাস, গাড়ি, ট্রাফিক সার্জেন্টকে অচল করে রেখে, যাকে ‘এক্সোডাস’ তকমা দিয়ে ক্যামেরায় বন্দী করতে তৎপর হয়ে ওঠে বিবিসি ও সিএনএন। মোশীর সাথে এমনিভাবে মিশর ত্যাগ করেছিল হাজার হাজার মুক্ত ইজরায়েলী, লোহিত সাগরে ডুবে ধ্বংস হয়েছিল তাদের মারতে আসা মিশরীয় ফারাওয়ের সৈন্য বাহিনী। আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে নির্বিচারে কুকুর নিধন, কুকুর প্রজাতি ও কতিপয় পশুপ্রেমী ব্যতীত কোথাও বিশাল আলোড়ন সৃষ্টি করেনি, অথচ একদিন কুকুরের ভিড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাই হয়ে উঠল ব্রেকিং নিউজ!

অন্যদিকে আবার বাদামী, বাহান্ন ও তদ্রূপ সাহসী কুকুরদের শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তোলা বিলক্ষণ মনে করিয়ে দেয় রুশ বিপ্লবের আণ্ডারগ্রাউণ্ড অপারেশনের কথা, রোজকার মার খেয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখা প্রোলেতারিয়েতকে, যার অপেক্ষার পরিসমাপ্তি ঘটেছিল ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিনে’। ‘পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট’ গল্পে রুবাকভের মৃত্যুর পড়ে যেমন নতুন করে জেগে ওঠে বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ, পাঁজরভাঙা, অন্ধ, দিকভ্রান্ত, অস্থিচর্মসার বুড়ো কুকুরদের ‘কোল্যাটারাল’ ও স্বেচ্ছামরণই জন্ম দেয় কুকুরদের বিদ্রোহ।
“আর দশ নয়, দশ হাজার বছর দিন ধরে দুনিয়া কাঁপবে।”

এভাবেই ‘আন্ডারডগ’দের কথা, তাদের শোষণ ও ছিবড়ে করে দেওয়ার রাজনীতির কারবার উঠে আসে ‘ইকো-মার্ক্সিস্ট’ নবারুণের কলমে। মার্ক্সবাদ যে শুধু সাম্যবাদ ও স্বাধীনতার বুলি কপচানো নয়, তার সাথে মানুষের পাশাপাশি পশুপাখি, সমগ্র প্রকৃতিরও স্বার্থ যুক্ত তাই ঘোষণা করে তার বলিষ্ঠ লেখা।