বিপ্লব, প্রতিরোধ, বিচিত্র – নবারুণ ভট্টাচার্যের আন্তর্পাঠ

দিব্যকুসুম রায়

‘ইন্টারটেক্সচুয়ালিটি ’ শব্দটির কোনও সঠিক প্রতিশব্দ জানা না থাকায়, ‘আন্তর্পাঠ’ শব্দটি ব্যবহার করতে হল। এ কথা আমি নিজের বিভিন্ন লেখায় একাধিকবার বলেছি যে বিশেষতঃ মৃত্যুর পর নবারুণ ভট্টাচার্য একজন ‘কাল্ট’- একধরণের সাবকালচারাল প্রতিভূ, যার মতাদর্শ এবং তৎসঞ্জাত বাণী কিছু সমমনস্ক, সমধর্মী, স্রোতের বিপরীতে হাঁটা মানুষকে প্রেরণা জাগায়। দুই গোলার্ধের পাঁচ-দশকীয় সংস্কৃতির ইতিহাসে এমত কাল্টের সংখ্যা কম নয়, এবং তা নিয়ে আলোচনা আমার উদ্দেশ্যও নয়। নবারুণের আন্তর্পাঠ সম্পর্কে এ কথা মনে হবার কারণ— এই কাল্টিজম লেখকের ক্ষতিই করেছে; বৌদ্ধিক-পাঠের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশী। ঐহিকের পক্ষ থেকে আমায় যখন লিখতে বলা হয়, সাগ্রহ সম্মতির সঙ্গে কিছুটা সংশয় আমায় পীড়িত করে। আন্তর্পাঠ, আমার মতে, কৈতববাদের সমতুল্য না; আর নবারুণের নব্য পাঠকগোষ্ঠী, ব্যতিক্রম বাদ দিলে, এক বিশেষ পাঠ ও তার প্রকরণ নিয়ে কিছু বেশী উৎসাহী। অনস্বীকার্য, লেখকের সমগ্র আখ্যানবিশ্বের গ্রহণযোগ্যতার ভেদ থাকবেই; সমগ্র লেখা খুঁটিয়ে পড়ে তবেই কেউ সামগ্রিক মতামত দেবে— এরকম দাবী নবারুণদা নিজেও পাঠকের কাছে করতেননা সম্ভবত। অন্যদিকে আবার zeitgeist কথা কয়ে ওঠে— আমরা নবারুণকে ক্রমাগতঃ ঠেলে নিয়ে যেতে থাকি একধরণের বিপ্রতীপ অবস্থানের দিকেঃ ফ্যাতাড়ু, চোক্তার ভদি, কাটামুন্ডুর নাচ, নুনুকামান প্রভৃতি শব্দবন্ধ ওঁকে আমাদের— উন্নয়নমুখী মধ্যবিত্ত শ্রেণীর— প্রতিবাদবিলাসের হাতিয়ার করে তোলে; আমরা যতই একাত্ম হই ‘কাঙাল মালসাট’-এ, ততই আসলে দূরে সরে যান লেখক নিজে। এ পর্যায়ে, একটু সাহস করে বলা যাক, নবারুণ যথার্থ সিরিয়াস সাহিত্যালোচনা থেকে সর্বার্থে অদৃশ্য।
নবারুণ মানেই ফ্যাতাড়ু না, নবারুণ মানেই সাবকালচারাল বুলি আউড়ে নিজেদের শ্রেণীসচেতন দুঃখবিলাসে ইন্ধন জোগানো না। এই ‘না’-টুকু নবারুণদা অন্ততঃ দুহাজার সন পর্যন্ত অতি-জোরালো ভাবে পরিবেশন করেছেন নিজের গদ্যসাহিত্যে, আকাদেমীয় রহস্যবাদের কুয়াশায় মুড়ে যাওয়ার আগে। ওনার লেখার সাম্প্রতিক আলোচনায় ‘বিস্ফোরক’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হয়, সে অকারণে নয়, যদিও কিছুটা সত্যদর্শীতার অভাব রয়েছে। বাস্তবিকই নবারুণদা অস্বীকার করেছেন প্রচুর- আঘাত, ধ্বংস, নিষ্ঠুর আত্মন্মোচন, কাচের বাসন সপাটে আছড়ে চুরমার করে ফেলার স্পর্ধা- সম্মোহক যতটা, বিপজ্জনক তার চেয়ে ঢের বেশী। যেহেতু নবারুণের আখ্যানবিশ্বের আন্তর্পাঠ আজকের উপজীব্য, তাই প্রথমেই আমরা নিজেকে যথাসম্ভব আলাদা করে নিই ওঁর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাপ্তি থেকে- এ লেখায় ফ্যাতাড়ুর প্রসঙ্গ এলেও নবারুণ ভট্টাচার্যকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী শহুরে ভাট হিসেবে দেখা হবে না। বরং ওনার লেখা যে সর্বার্থেই প্রতিরোধী, এমনকি নিজেকেও সে কড়া চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে সক্ষম, তা নিয়ে সামান্য আলোচনার চেষ্টা করা হবে। আলোচনার সুবিধার জন্য গোটা আর্গুমেন্টটিকে কমবেশি প্রকাশকাল অনুযায়ী, তিনভাগে ভাগ করা গেল। যার মধ্যে প্রথম ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশক, যখন লেখক বিপ্লববাদী প্রতিরোধের বিশ্বাসে স্থির। দ্বিতীয় পাঠ আমাদের নিয়ে যায় নব্বইয়ের দশকের উপান্তে, যখন বিপ্লবী জাড্য কিছুটা ম্রিয়মাণ, এবং প্রতিরোধের মার্জিনেও কিছুটা ছায়া ফেলে রেখেছে সোভিয়েতোত্তর বিষণ্ণতা। এ পর্যায়ে নবারুণ কিছু সংশয়বাদী – দুর্বল নন, কিন্তু ক্লান্ত; প্রতিরোধ ভুলে যাচ্ছেন না, কিন্তু অস্তিত্ববাদের সংকটগ্রস্থ। তৃতীয় পর্যায় আমাদের চেনা পরিবৃত্ত— প্রতিরোধ এবার পুরোপুরি প্রতিষ্ঠানবিরোধী, দ্বিতীয় পাঠের সংশয়কে আত্মস্থ করে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছে সে। নবারুণ এবার জানেন যে নবযুগ হয়ত আসবে না, কিন্তু তার জন্য ঘটমান প্রবাহকে মেনে নেবার কোনও যুক্তি নেই। প্রতিরোধ চলবে— “ড্যামেজ করো... ড্যামেজ”— এবং অন্তিমে পড়ে থাকবে অস্বীকার। আবারও মনে করিয়ে দেওয়া যাক, তিন পর্যায়েই নবারুণের উপজীব্য— “না”। এই নেতিটুকুর সঙ্গে জড়িত আশা, হতাশা এবং এই দুইয়ের অনুপস্থিতি— সেই হল আমাদের আলোচনার ভরকেন্দ্র।
প্রথমেই আমাদের বুঝে নিতে হবে যে নবারুণের কালক্রমিক আন্তর্পাঠ কঠিন শুধু না, ক্ষেত্রবিশেষে বিপজ্জনক। সাধারণভাবে ‘কালক্রমিক আন্তর্পাঠ’ বলতে আমরা বুঝি লেখকের আখ্যানবিশ্বের মূল যোজক বা connecting argument এর বিশ্লেষণ। এর সারার্থ এই নয় যে লেখক সারাজীবন একই আদর্শ বা বিশ্বদর্শন নিয়ে লিখে চলেছেন। ভাবাদর্শ যতই দৃঢ়ভিত্তিক হোক না কেন, পাল্টায়; আশা, হতাশা, প্রাপ্তি, বেদনাবোধ, ক্ষোভ, বিশ্বাস ইত্যাদির সাপেক্ষে। ফলে তার বিশ্লেষণও একরৈখিক হবেনা— ধরে নেওয়া যায়। নবারুণদার ক্ষেত্রে বিষয়টি দ্বিগুণ জটিল যেহেতু ওঁর ক্ষেত্রে এই বিবর্তনটি ঘটেছে তিন ধাপে, এবং প্রচুর ওভারল্যাপিং সহকারে। কিন্তু তাও মনোযোগী পাঠকের পক্ষে নবারুণদার মতাদর্শগত সরণের একটা সূচক খুঁজে পাওয়া অসম্ভব না। সত্তর থেকে আশির দশকের কথাই ধরিঃ ১৯৭০ সালে ‘সপ্তাহ’ প্রত্রিকায় বেরোল ‘স্টিমরোলার’— নবারুণের প্রকাশিত গল্পগুলির মধ্যে দ্বিতীয়। গ্রীষ্মের এক নিদাঘে, কোনও অজানা সময়ে ও শহরে, আচমকা মূর্তিমান বিভীষিকার মত আবির্ভূত হয় এক বিধ্বংসী স্টিমরোলার, যার চালকের আসনে এক বৃদ্ধ শ্রমিক। পৃথিবী নিষ্ঠুর এবং শ্রেণীবিভক্ত, শ্রমিকরা শোষিত অথচ কাঁচঘেরা অফিসঘরে ফুলে ফেঁপে উঠছে মালিকেরা, রাস্তার কুকুরের জন্যও বিন্দুমাত্র ছায়া নেই কোথাও— এরকম অবস্থায় অবদমিত রাগ হুংকারসহ ফেটে পড়ে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে। প্রাণহানি হয়না, কিন্তু স্টিমরোলারের চাকায় গুঁড়িয়ে যায় একের পর এক দামী গাড়ি, আগুন ছিটকে পড়ে, তার আঁচ গায়ে লাগে অফিসবর্তীদের। পুলিশের গুলিতে মারা যায় শ্রমিক, কিন্তু ততক্ষনে স্টিমরোলার ভয় ধরিয়ে দিয়েছে স্থবির সিস্টেমের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দশকপ্রান্তে পৌঁছে নবারুণদা লিখলেন ‘কাকতাড়ুয়া’ (‘সপ্তাহ’, ১৯৭৯)— তথ্যগল্প। ঐ বছরের ১৬ই অগস্ট ঘটে যাওয়া একটি বাস্তব হত্যাকান্ড নবারুণদার মূল উপজীব্য। ঐ রাত্রে বিষাণপুরের ঠাকুর সম্প্রদায়ের পোষা গুন্ডার হাতে খুন হয় নির্ভয় পাসোয়ান, স্থানীয় হরিজন আন্দোলনের নেতা। ঘুমন্ত নির্ভয়ের মাথা কেটে ছুঁড়ে ফেলা হয় জঙ্গলে, প্রতিবাদে মুখর হয়ে ওঠে সরাইবাজারের জনতা, রক্তপাত হয় আরো, কিন্তু অবশেষটুকু লুঠ করে নেয় সিস্টেম। শিবিরে ভাগ হয়ে যায় প্রতিবাদ, অন্যদিকে চলে আসে তথাকথিক বামপন্থী বুদ্ধিজীবি, পুলিশ কেস নিতে অস্বীকার করে। “রাত দুটোর পর কুকুরগুলো আকাশের দিকে মুখ তুলে কাঁদে”। নবারুণ জানানঃ নিপীড়িতশ্রেণী ঐক্যবদ্ধ যদি বা হয়, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ছলচাতুরী করে ঠিকই বৈপ্লবিক জাড্যটুকু হরণ করে আনবে। তবে প্রতিবাদ তাতে থামে না।
এই দুটি গল্প স্রেফ উদাহরণ, কিন্তু বৈপ্লবিক আশাবাদটুকু বোঝা যাচ্ছে বোধহয়। ইতিহাসের টালমাটাল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নবারুণ অতন্দ্র চোখ রেখেছেন এক সোনালী ভবিষ্যতের দিকে, কারণ বিপ্লব আসবেই, এবং তার দ্যোতক হিসেবে মাঝেমাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে প্রতিহিংসা, রোষ এবং প্রতিরোধ। এক নির্ভয় পাসোয়ানের মৃত্যু থেকে জন্ম হয় সারসাওয়া, আলাওলি, চৌথামের আরও অজস্র শ্রমিক নেতার। একইভাবে, বৃদ্ধ শ্রমিক গভীর কাঁপুনি ধরিয়ে দেয় অফিসওয়ালাদের শিরদাঁড়ায়, তাকে মুছে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করা হলেও মনে রাখে রাস্তার কুকুর। অর্থাৎ, এ পর্যায়ে, বিপ্লব ও তজ্জনিত আশাবাদ যেন একটি সিগনিফায়ার— এই অবধি বলেই যতি টানা যাক, কারণ এবার আমরা চোখ ফেরাব পূর্বকথিত ওভারল্যাপিং-এর প্রসঙ্গে। ওভারল্যাপিং শৈলীসংক্রান্ত ততটা নয়, যতটা মতাদর্শগত। সত্তর থেকে আশির দশকের গল্পে একাধিক উদাহরণ রয়েছে এই সুদৃঢ় বৈপ্লবিক চেতনার সরণের। ‘ভাসান’ (‘পরিচয়’, ১৯৬৮), অর্থাৎ নবারুণের প্রথম প্রকাশিত ছোটগল্পের নায়ক এক পাগল, যার বসবাস এক বিচিত্র অস্তিবাচক পৃথিবীতে। গল্পর শুরু থেকেই সে মৃত, কিন্তু তার বিদেহী অস্তিত্ব পরম মমতায় নশ্বর শরীরটিকে বিলিয়ে দেয় পোকামাকড় ও পশুদের খাদ্য হিসেবে। নির্মম শহুরে জীবন ফিরেও তাকায় না সেই দিকে, শুধু ঠায় জেগে বসে এক পাগলি। নবারুণ কি চরম প্রান্তিকীকরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদোন্মুখ? অবশ্যই। এতেও কী রয়েছে অনাগত বিপ্লবের ছায়া? নিশ্চিত হওয়া মুশকিল। প্রতিরোধ এখানেও আছে— পাগলের ভাষা, জীবনবোধ সবই সাধারণ দৃষ্টিতে সুদূর, তার রহস্যময় অস্তিবাদের কারণও হয়ত সমগ্র প্রান্তিক প্রাণমন্ডলকে একত্রিত করতে চাওয়া, কিন্তু কোনও সহিংস প্রতিরোধ নেই এখানে, ঠিক যেমন নেই এই লেখার প্রায় তিন দশক দূরবর্তী ‘অন্ধ বেড়াল’ (‘প্রতিক্ষণ’, ১৯৯৭) গল্পে। নবারুণদার আন্তর্পাঠের সমস্যাটি এভাবে স্পষ্ট হয়ে আসেঃ আমরা বুঝি ওঁর আখ্যানবিশ্বের পূর্ণচ্ছেদ বলে কিছু নেই, কালানুক্রমিক ভেদ যদি করিও, বারবার তা প্রতিহত হয় লেখকের আদর্শগত সরণের পুর্বাভাসের জন্য। নবারুণের লেখা ক্রমিক না, বরং ভবিষ্যতের চিন্তাধারার বীজ বর্তমানে ছড়িয়ে রাখাতে নবারুণদার উৎসাহ বেশী। ‘অন্ধ বেড়ালের’ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। গল্পের ঠিক কেন্দ্রে নিষ্কম্প পাথরের মত বসে থাকে এক অন্ধ বেড়াল নদীর ওপর হেলে পড়া কোনও হোটেলের টেবিলের তলায়, জীবন বয়ে চলে তার চারদিকে— রাজনৈতিক হত্যা, প্রেমিক প্রেমিকার আত্মহনন, মানুষের লালসা আর সুবিধাভোগ, অপ্রত্যাশিত করুণা এবং মনুষ্যত্বের আঁচ। কিন্তু অন্ধ বেড়াল স্থির— প্রতীকী প্রতিরোধের মতই, গল্পের শেষে যখন হোটেলশুদ্ধ হেলে পড়ে বানের দিকে, অন্ধ বেড়াল তাও ঠায় বসে থাকে। জীবন যে প্রান্তিককে নড়াতে পারেনি, মৃত্যুও তাকে ভয় দেখাতে পারেনা। কঠোর প্রতিকূলতার মুখে একগুঁয়ে জীবনের প্রতিবাদ, এর চেয়ে জোরালো, যুদ্ধোন্মুখ কিছুর কথা নবারুণদা এ গল্পে এনেছেন কি? বলা, আবারও, কঠিন।
অন্ধ বেড়ালের দু বছর আগে নবারুণের অধুনা আইকনিক ফ্যাতাড়ু প্রকাশ পেল ‘প্রমা’ পত্রিকায়, এবার সঙ্গে সঙ্গেই সূচনা হল এক নতুন নবারুণীয় কথনের। প্রথমে বিপ্লব, পরে স্থৈর্য, এবং তৃতীয় পর্যায়ে অদ্ভুত রস – এরকম ত্রিধারায় আখ্যানবিশ্বকে বেঁধে ফেলার লোভ, আলোচ্য লেখক নবারুণ না হলে, সামলানো মুশকিল, এবং আবারও আমরা দেখি কিভাবে লেখকের পরিবর্তনশীল মতাদর্শ একটা কালক্রমিক রূপ নিতে নিতেও থেমে যাচ্ছে কোথাও, প্রবেশের আগেই ঘোষণা করে দিচ্ছে নিজের উপস্থিতির। ২০০০ সন থেকে ঐ দশকের মাঝামাঝি অবধি গল্পগুলির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখলেই আমার প্রস্তাবটি স্পষ্ট হয়ে আসার কথা। অদ্ভুত রস— অ্যানার্কি, মুখ ভ্যাংচানো, চোরাগোপ্তা ড্যামেজ— এ পর্যায়ে হয়ত প্রধান, আর ফ্যাতাড়ুর বিখাত গল্পগুলোও কমবেশী এই সময়ে প্রকাশিত, কিন্তু পাশাপাশি রয়েছে “পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট” (২০০৩), “সব শেষ হয়ে যাচ্ছে” (২০০৪), “কড়াই” (২০০৫), “সাংহাইতে এক সন্ধ্যা” (২০০৩)। ফ্যাতাড়ুর (১৯৯৫) আবির্ভাবকে আর আকস্মিক বলে মনে হয়না যখন দেখি পূর্বকথিত দুটো পর্যায়েরই অশরীর এখানে উপস্থিত— বিপ্লবের আশাবাদ এবং প্রতিরোধী স্থৈর্য। নবারুণদা হয়ত সরে এসেছেন বিপ্লবের একমাত্রিক সংজ্ঞা থেকে, তবু বারেবারেই যেন পিছনে ফিরে যেতে চান, ছুঁয়ে দেখতে প্রতিরোধের লাল করাঙ্কের অবশেষটুকু। দুঃখবিলাস? সম্ভবত না, কারন পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট যদিও মারা যান একা, আর তার প্রয়াণে উল্লসিত হয় পৃথিবী, গল্পের শেষে নবারুণ সত্তর দশকের মতই অবিচল, নিশ্চিত- “সারা পৃথিবী জুড়ে কমিউনিস্টরা ফিরে আসবে। আসবেই। আর দশ নয়, দশ হাজার দিন ধরে দুনিয়া কাঁপবে”।
নবারুণ ভট্টাচার্যের কাল্টিস্ট পাঠ থেকে কতখানি সরে এসেছি আমরা! ‘না’ শব্দটি নির্দ্বিধায় খুলে ফেলেছে পোশাক, লীন হয়ে যাচ্ছে সময়ের সঙ্গে, আমরা বুঝতে পারছি ‘না’ বলার— প্রতিরোধ করার— দরজা অবারিত করার রকমফের। “বসন্ত উৎসবে ফ্যাতাড়ু” (২০০৪)-তে ফ্যাতাড়ুরা খেপিয়ে দেয় গোটা বস্তিকে, জনরোষ আছড়ে পরে হিমগিরি আপার্টমেন্টের বসন্ত উৎসবের প্রাঙ্গণে, তুমুল প্রহসনে শেষ হয় বড়োলোকদের এলিট অশ্লীলতা। একই বছরে নবারুণদা আবার বিষণ্ণতার সর্বশেষ ধাপে— “সব শেষ হয়ে যাচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে সব শেষ হয়ে...”। নিউক্লিয়ার উইন্টার ঘনিয়ে এসেছে পৃথিবীতেঃ “সবই অনিত্য, সবই দুঃখ”। আংশিক আত্মজৈবনিক এই গল্পে নবারুণ ‘ব্রয়লার’ জীবনকে আক্রমণ করেন ঠিকই, কিন্তু এই প্রতিরোধ “অন্ধ বেড়াল”-এর প্রতিরোধ— অনড় থেকে অপেক্ষা করা কখন ঘনিয়ে আসবে প্রলয়। ‘না’- কিন্তু বর্জনের ‘না’, যুদ্ধের নয়। “কড়াই”-এর শেষ দৃশ্যে এক বিভ্রম আসে, কথক দেখে ল্যাম্পপোস্টের আলোর তলায় বাঁধা কড়াই যেন চিড়িয়াখানার অতিকায় কচ্ছপ, শেকল ছিঁড়ে চলে যেতে চাইছে কোথাও। মুখ ভ্যাংচানো, ড্যামেজ, রাগী পৌরুষ, স্থবির প্রতিরোধ, ইতিহাস আর বিষণ্ণতা— সব পাশাপাশি, যদিও “সব শেষ হয়ে যাচ্ছে”।
তাই কাল্টিফিকেশন দিয়ে নবারুণকে মাপা সম্ভব না, যতই কৈতববাদের মত শোনাক। বিপ্লব, স্থৈর্য আর ড্যামেজ— এই ত্রিধারায় কোনও ফর্মূলার আভাস পাওয়া গেলেও যেতে পারে, কিন্তু মতাদর্শগত বিবর্তনের দিক দিয়ে নবারুণ যতটা বৈপ্লবিক, ততটাই মধ্যবর্তী; যতটা নিশ্চিত, ঠিক ততখানিই চিন্তিত। তাহলে কি নবারুণের লেখায় আদপে কোনও বিবর্তন নেই? নবারুণ কি সেই বিরলতমদের মধ্যে একজন যারা চিরকালীনভাবেই তাৎক্ষণিক? কিভাবে টানা যায় নবারুণ ভট্টাচার্যের আন্তর্পাঠের রূপরেখা? কোথায় থেমে বলা চলে অভীষ্টের অস্তিসূচক বাচন? নবারুণদা হাসেন, আমরা খুঁজতে থাকি।


গ্রন্থপঞ্জী


নবারুণ ভট্টাচার্য, উপন্যাস সমগ্র, (কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ২০১০)।
 শ্রেষ্ঠ গল্প, (কলকাতাঃ দে’জ পাবলিশিং, ২০০৬)।