প্রতিবাদের পাঠক্রম

সম্রাট সেনগুপ্ত

আলোচনা হচ্ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রম নিয়ে… আলোচনা চলছিল ইংরেজী সাহিত্যের সিলেবাস নিয়ে দুই বন্ধুর মধ্যে। একের মত— অধ্যাপকের দায়িত্ব একটি বইয়ের কেতাবি ইতিহাস— তার সমালোচনার বিভিন্ন ঘরানা তুলে ধরা নব ছাত্রকুলের মাঝে যথাসম্ভব নিরাবেগ ভাষ্যে। অতঃপর কি হবে তার বাছাই— কোন পাঠ সে গ্রহণ অথবা বর্জন করবে, অথবা কি হবে তার নিজস্ব ভাষ্য তা ঠিক করবে সে নিজে। অন্য বন্ধুর মতে কোন পাঠই নয় নিরপেক্ষ, তাই মান্য পাঠের অন্তর্নিহিত রাজনীতির অনুসন্ধানই অধ্যাপকের উদ্দেশ্য। তার কাজ প্রান্তে থাকা স্বর— প্রান্তভাষ্যের মাধ্যমে একটি বইকে আলোকিত করা ও সেই সঙ্গে তুলে ধরা সেই কেতাবের পাঠক্রমে অবস্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব। তারই সাথে স্বভাবতই উচিৎ যা বাইরে আছে তৎকালীন মান্য পাঠক্রমের, তাকে ব্রাত্যায়নের পরিকল্পটাও বুঝিয়ে দেওয়া। সিলেবাসের এই মেকিং ও আনমেকিংই নির্মাণ করে অনুবাদের রাজনীতিকেও। গ্যেটে বা রবীন্দ্রনাথের বিশ্বসাহিত্যের যে ধারনা তার মধ্যে আছে বিশ্বমানবের ও বিশ্বআত্মনের ঐক্য। ঐ ঐক্যই বিশ্বের নানা প্রান্তের ও দেশের সীমা অতিক্রম করে এক মানবতাবাদী অসীমের রচনা করে। এক মানবতাবাদী দর্শন দীর্ঘদিনই সাহিত্য পাঠের চালিকা শক্তি। তারই প্রভাব আমরা দেখেছি জাতীয়তাবাদী সাহিত্যপাঠ এবং তুলনামূলক সাহিত্যপাঠ উভয় ক্ষেত্রেই। হয় এক জাতীর (জার্মান অথবা ব্রিটিশ অথবা ভারতীয়) মানুষ হিসেবে শ্রেষ্ঠত্বের বয়ান, নয়ত মানুষের সাধারণ মানবিক গুণ গুলো যাচাইয়ের তুলনামূলক মানদণ্ড— এই ছিল অনুবাদের উদ্দেশ্য। অনুবাদের মাধ্যমে নিজের দেশের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব অথবা অনুবাদের মাধ্যমে অন্যদেশের অথবা অঞ্চলের সাথে নিজের দেশ ও অঞ্চলের তুলনামূলক বিচারই ছিল মূল।
বিশ শতকের ছয়ের দশক থেকেই এই মানবতার ধারনায় ব্যাপক ভাবে ছেদ পড়ে। সংস্কৃতি ও মানবতা যে দেশ-কাল সাপেক্ষে নির্মাণ এবং যে কোন নির্মাণেই যে থেকে যায় উপেক্ষা ও বিস্মৃতি তা আলোচিত হতে থাকে তামাম বুদ্ধিজীবী সমাজে। তার একটা কারণ অবশ্যই মানবতাবাদের শেষ পরাকাষ্ঠা মার্ক্সীয় চিন্তার দ্বারা উদ্ভূত আদর্শবাদের চোখের সামনে স্বৈরাচারী শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়া অথবা জনসমর্থন হারানো। এর ফলে খোলে নিপীড়নের নানা মুখ— তার নানা ইতিহাস। কেবল শ্রেণী নয়, তার সাথে যুক্ত হয় লিঙ্গ, বর্ণ, জাতি, ধর্ম, যৌনতা ও ঔপনিবেশিক সাংস্কৃতিক ভেদ ষড়যন্ত্রের পাঠ। সাহিত্য এবং তার পাঠের রাজনীতি সেখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে— বিশেষত যখন এবং যেহেতু সাহিত্যের কোন সরাসরি বাস্তবতার দাবী নেই, বরং তার আছে বাস্তবের সমগ্রতার প্রতিরূপ হয়ে ওঠার ক্ষমতা। তাই তো সাহিত্যের মতো করে এবং সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে পুনঃপাঠ করা যেতে পারে বাস্তবতার দাবী যুক্ত ইতিহাস ও সমাজতত্ত্বের মান্য সনদগুলিকে। সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে বোঝা যেতে পারে কারা অবহেলিত— বঞ্চিত ও ইতিহাসের পাতায় অদৃশ্য অথবা কদর্যভাবে পরিবেশিত। সেই মতো পাঠ করা যেতে পারে ইতিহাস। এই চিন্তার ছায়া স্বভাবতই সাহিত্যের মান্য পাঠক্রমকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

ইংরেজীতে পাঠক্রম বোঝাতে অনেক সময় canon শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এই শব্দের মূল অর্থ ধর্মীয় নীতিশিক্ষামালা যা এক সাধক গোষ্ঠীর অবশ্যপাঠ্য। এর মাধ্যমে এক মতবাদ নির্মিত হয়। তাই পাঠক্রম সর্বদা গভীর ভাবে রাজনৈতিক। তার ছায়া অবশ্যই বিদ্যায়তনিক সাহিত্যপাঠেও বর্তমান এবং ছয়ের দশকের রাজনৈতিক চিন্তার প্রশ্নবাণ সেই রাজনীতিকে পুনর্নির্মিত হতে সাহায্য করে— সিলেবাসে ঢুকে পড়ে কালো মানুষের সাহিত্য, নারীবাদী সাহিত্য, ভারতীয় সাহিত্য, সাম্প্রতিককালের দলিত সাহিত্য ইত্যাদি। ইংরেজী সাহিত্যের প্রেক্ষিতে দুঃখ করেন অধ্যাপক হ্যারল্ড ব্লুম ব্রিটিশ ক্যাননের ঐতিহ্যময় যুগাবসানে। তার মতে কি যে পড়বো বুঝে ওঠা দায় এই রিষ আক্রান্ত (ইংরেজীতে জার্মান শব্দ ধার করে বলেন “ressentiment”) রাজনৈতিক বাতাবরণে। এখানে জার্মান দার্শনিক নীৎশে বর্ণিত ressentiment শব্দটির অর্থ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি লেখেন “The slave revolt in morality begins when ressentiment itself becomes creative and gives birth to values... while every noble morality develops from a triumphant affirmation of itself, slave morality from the outsets says No to what is “outside”, what is “different”, what is “not itself” and this No is its creative deed”। এই না বলবার— প্রতিবাদের, প্রতিরোধের রাজনীতিই নির্মাণ করে নবারুণের অনুবাদ শিল্পকে। তার সাথে চলতে থাকে ডায়ালগ— প্রতিরোধ ব্যর্থ হওয়ার যন্ত্রণা, বিপ্লবের মধ্যে প্রতিবিপ্লবের প্রেত ছায়া এবং তদজনিত হতাশা, উদ্বেগ, আবেগ ও প্রতিরোধের পুনর্বিচার, হেরে গিয়েও, ব্যর্থ হয়েও প্রতিরোধী মুহূর্তগুলির সসম্মান ইত্যাদি। তাই নবারুণের প্রতিরোধ সরলরৈখিক হিউম্যানিস্ট নয়। বরং তার সাহিত্যকর্মের মতো অনুবাদেও রয়েছে ভাববাদী, মানবতাবাদী, লিবারাল, এমনকি মার্ক্সীয় সব-খোল চাবির গভীর সমালোচনা। তবুও রয়েছে সেই বয়ানে এক আশ্চর্য সরল বিশ্বাস— ভবিষ্যতের প্রতি। প্রতিবাদের মধ্যেই আসবে বদল এই প্রত্যয় থেকে যায় চূড়ান্ত গ্লানির মধ্যেও। এই দায়বদ্ধতাই করিয়ে নিয়েছে নবারুণ ভট্টাচার্যকে দিয়ে এই বিক্ষিপ্ত অনুবাদগুলি যার মধ্যে আপাতত নেই কোন দেশ ও কালের সমান্তরালতা। শিক্ষকের মতো অনুবাদকের কি দায়িত্ব কোন ভাষা, দেশ অথবা সময়ের “প্রধান” কাজগুলিকে পরিচিত করা, নাকি তার দায়িত্ব সাহিত্যের মান্য পাঠক্রমের বাইরে থাকা, সমাজের মূলস্রোতে উপেক্ষিত প্রান্তস্বরকে অনুবাদ করা— এক প্রতিবাদী সাহিত্যের বিকল্প বয়ান নির্মাণ? নবারুণের অনুবাদ কর্মের মূল— সামাজিক দায়িত্বের নির্ধারণ থেকে প্রান্তবাসীর প্রতি অন্তহীন দায়বদ্ধতার পথে এই যাত্রা। তাঁর নিজের সাহিত্যকর্মও আসলে এই ভাবধারারই অনুবাদ যার বিষয় নবারুণ কর্তৃক অনুদিত ব্রেশটের নাটকের শিরোনাম ধার করে বলা চলে— “যে না বলে”। এই না বলার রাজনীতি আত্মসুরক্ষাবাদী— ভাল থাকার নামে, সুরক্ষার নামে মগ্ন মানবতাবাদী দর্শনকে আক্রমণ করে। ওপরে Genealogy of Morals গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃত নীৎশের জবানীতে বলা চলে “this No is its creative deed”।
অনুবাদ সম্পর্কিত প্রবন্ধ “Translation as Culture”-এ গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক সংস্কৃতিকে এক ক্রমাগত অনুবাদ প্রক্রিয়া মনে করেন। অনুবাদ সেখানে হরেক কিসিমের চিন্তা ও ভাবধারাকে নিজের মাতৃভাষায় অন্তর্ভুক্ত করা। এর মাধ্যমেই নির্মিত হয় সংস্কৃতি। মাতৃভাষা এক ঋণ এবং সেই ঋণ শোধের উপায় এই অনন্ত অনুবাদ কর্ম। এখন কথা হল আমরা কি মাতৃভাষা ও তার দানকে মাপবো এক জাতীয়তাবাদী প্রকল্পে? আমরা কি তবে তাকে মাপবো মানবতাবাদী প্রকল্পে? প্রথম ক্ষেত্রে অনুবাদের আদর্শ হয়ত হবে সাহিত্য আকাডেমির অনুবাদ প্রকল্পের মতো যেখানে প্রধান ভারতীয় ভাষাগুলির মধ্যে অনুবাদের মাধ্যমে এক ভারতীয় সংস্কৃতির মানচিত্র তৈরি হয়ে ওঠে। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে অনুবাদ প্রকল্প ধাবিত হয় এক মানবতাবাদী তুলনামূলকতায় যেখানে দেশ-কাল নির্বিশেষে যোগাযোগ স্থাপন হয়ে ওঠে মুখ্য। নবারুণ ভট্টাচার্যের অনুবাদ সংকলন বিদেশি ফুলে রক্তের ছিটে এর মধ্যে কোন ধারণারই বশবর্তী নয়। কি তবে নবারুণের মাতৃভাষা? কোন সাধারণ ভাষায় অনুদিত হতে থাকেন নবারুণ? যে কবি লেখেন “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না”, কি তার ভাষা, দেশ, সময়কাল? মার্ক্সীয় ঘরানায় দীক্ষিত, দলিত, অন্ত্যজ, উপজাতীয় মানুষের জীবন লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী ও প্রতিরোধের, নবান্নের নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের পুত্র নবারুণের ঋণ কার কাছে? কাদের কাছে? সমস্ত অনুবাদই এক সদা অসম্ভব সদা অসম্পূর্ণ প্রক্রিয়া। কখনোই পরিশুদ্ধ হয় না ঋণ। যে সময়কাল ও সংস্কৃতির কাছে তিনি ঋণী তা পরিশুদ্ধ হয়ে গেলে তো স্তব্ধ হয়ে যায় সব কথা। কিন্তু সেই হেতুই অতীতের সাথে, অপরের কাছে অপরিসীম ঋণ শোধ করতে নবারুণ চালান ডায়ালগ। সেই ডায়ালগে নিয়ে আসেন নানা দেশের ও সময়ের সাহিত্য, যুক্ত করেন বর্তমানের সাথে— যুক্ত করেন বিশ-একুশ শতকের ষাট-সত্তরের দশক ও তার পরবর্তী সময়ের প্রতিবাদী বঙ্গীয় ও ভারতীয় সমাজ ও সাহিত্যের সাথে। এভাবেই জাতীয়তাবাদী ও মানবতাবাদী ঐক্যের বিপরীতে তিনি খাড়া করেন এক বিকল্প ঐক্যকে— নির্মাণ করেন এক প্রতিবাদের পাঠক্রম। আগামী পাঠক আশা করি সেই ঐক্যকে খুঁজতে আবিষ্কার করবেন সেইসব লেখকদের অন্য কবিতা— মেলাবেন নবারুণের নিজের কবিতার সাথে আর অতঃপর নিজের লেখায় যুক্ত করবেন সেই ভাবধারা— হয়ে উঠবেন প্রতিরোধের প্রতিস্পর্ধী অনুবাদক।
নবারুণের কাব্যাদর্শ নীৎশীয় কায়দায় মানবতাবাদী দর্শনে নিয়ত হাতুড়ি চালনা। ভাববাদী ও সংশোধনবাদী চেতনার বুঝিয়ে কাজ হাসিল করে নেওয়ার বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের মেকি ছলনাময় ছকের বিরুদ্ধে নবারুণী এই বিকল্প রণনীতি স্পষ্ট তাঁর কাব্যগ্রন্থ সমূহের নামেই— এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, পুলিস করে মানুষ শিকার, বুলেটপ্রুফ কবিতা ইত্যাদিতে, এমনকি অনুবাদ গ্রন্থটির নামকরণেও— বিদেশি ফুলে রক্তের ছিটে। এই বই একগুচ্ছ কবিতা, কিছু ক্ষীণতনু প্রবন্ধ ও দুটি ছোট নাটকের সংকলন। নবারুণ লেখেন “লেখাগুলি বাছাই করার মধ্যে আমার রাজনৈতিক অবস্থান আশা করি পাঠকদের চোখ এড়াবে না”। প্রথম কবিতা থেকেই তা স্পষ্ট—
দিনের পর দিন
আর বছরের পর বছর
বিগ্রহেরা ভূলুণ্ঠিত হয়
এবং বিগ্রহেরা মাথা তোলে
আজ
আমি উপাসনা করি
হাতুড়ি
(“হাতুড়ি”)
মার্কিন কবি কার্ল স্যান্ডবার্গের কবিতা নিশ্চয়ই মনে করাবে নীৎশের হাতুড়ির দর্শন— “হাতুড়ি যখন কথা বলে” (ঈশ্বরের আলো-আঁধারি) যেখানে লেখেন তিনি— “This new law table do I put over you, O my brothers: Become hard!” এই নব কাব্যাদর্শ আর আইনই নবারুণকেও প্রাণিত করে— শানিত করে। কারো মনে পড়তে পারে নবারুণ ভট্টাচার্যের লেখা নকশাল আন্দোলন নিয়ে প্রবন্ধ “পেট্রল দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা”:
ধুলোর ঝড়ের মধ্যে
চোখ বন্ধ করে
আমি হাঁটতে শিখিনি

একদিন পেট্রল দিয়ে—
সব আগুন আমি নিভিয়ে দেব
সব আগুন আমি নিভিয়ে দেব
পেট্রল দিয়ে—

নবারুণের উদ্দেশ্য অবশ্য কেবল রোম্যান্টিক বিপ্লবী চেতনার আলোয় পৃথিবীকে দেখার নয়। তাঁর কবিতার মতো অনুবাদের বাছাইয়েও মিশে থাকে এক নীরব দুঃখ যা এক জায়মান সংঘর্ষের বিলীয়মান বিস্মৃতপ্রায় দাগছাপ হয়ে কেবলই অস্বস্তিতে ফেলে পণ্যলোভী, আত্মসুখী ও সুরক্ষিত মধ্যবিত্তকে। উক্ত প্রবন্ধে তিনি লেখেন— “এই প্রামাণ্য ইতিহাসের দরকার আজ বড় বেশি। বিশেষ করে সর্বগ্রাসী ভোগবাদের মধ্যে যে প্রজন্ম বড় হচ্ছে… বলার চেষ্টা হচ্ছে মতাদর্শের যুগ শেষ, রাজনৈতিক গণতন্ত্রের যুগ শেষ— এখন চলবে কর্পোরেট ডেমোক্রেসির খেলা”। নবারুণের এই নীরব দুঃখের সাক্ষ্য যেন সোভিয়েত রাশিয়ার কবি লেভ ওজেরেভের নৌকার দাঁড় নিয়ে লেখা কবিতাটি:
সমুদ্রপাড়ের বালিতে একটা নৌকোর দাঁড় পড়ে আছে
সে আমাকে ব্যাপ্তি আর গতি সম্বন্ধে অনেক বেশি বলে
(“একটা নৌকোর দাঁড় পড়ে আছে”)
এই নীরব দাঁড় কতো না লড়াইয়ের স্মৃতি বহন করে। জিন্দেগীর অকূল পাথারে সংগ্রামের ভুলে যাওয়া বিপ্লবী এই দাঁড়। তার নীরবতার মধ্যে শোনা যায় বসন্তের বজ্রনির্ঘোষ— যে অভিধায় একদিন বর্ণিত হয়েছিল নকশালবাড়ির প্রথম লড়াই পিকিং রেডিওতে। এই দাঁড়ের মতোই সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদদের ভিড়ে ভুলে যাওয়া লেনিনের তোবড়ানো বাসন, যাকে নিয়ে নবারুণের নিজের কবিতা—
একজন রাজনীতিককে আমি দেখিনি
অথচ দেখেছিলাম
তাঁর রান্নাঘরে রাখা আছে সাদামাটা তোবড়ানো বাসন
তিনি লেনিন।
(“তোবড়ানো বাসন”)
নবারুণের কবিতা এই ভুলে যাওয়া আদর্শের কঙ্কাল যা আমাদের নিওলিবারাল ভোগবাদী জীবনে প্রেত কঙ্কাল হয়ে জেগে থাকে। বস্তুকে কবিতায় রূপান্তর এক উত্তর-মানবতাবাদী চিন্তার লক্ষণ যা আদর্শের মূল সুরটিকে ধরে রেখেও তার পতন ও ক্ষয়ের যন্ত্রণাঋদ্ধ ইতিহাসকে খোঁজে। প্রাচীন জাপানি কবি কোবাইয়াশি ইসসার হাইকুতে ধরা থাকে সেই ক্ষণিকের বসন্ত-আগমনে জাগ্রত বোধি যা আশাবাদের ঝলক হয়ে জ্বলে ওঠে সময়ের কোন কোন মুহূর্তে—
এখন শুরু হচ্ছে
ভবিষ্যৎ বুদ্ধের রাজত্ব…
বসন্তের পাইন গাছ
(“এখন শুরু হচ্ছে”)

এভাবেই বিদ্রোহের প্রাচীন ও নবীন গতায়াতের চেতনায় ধরা থাকে ভবিষ্যতের বসন্ত। মানুষই বলবে শেষ কথা— তার চেতনা ইভান দ্রাকের “বালতির গান” কাব্যের বালতির মতো। সে বালতিতে কি থাকবে তা মানুষের ওপরই নির্ভর করে আর যার মধ্যে মানুষের অনুপস্থিতি নিয়ে আসে অনন্ত আকাশ— শূন্যতা। এই শূন্যতা উত্তর-মানবতাবাদী প্রতিবাদ-শিল্পী নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য-কর্ম জুড়ে। তার মধ্যে আছে বিষণ্ণতা কিন্তু তা শেষ কথা নয়। বিপ্লবের কথা বলতে গেলেই তৈরি হয় পেট্রল দিয়ে আগুন নেভানোর irony। এখানে দুই ধরনের আগুনের কথা বলা চলে। এক প্রকার আগুন যা ভোগবাদের, শাসক ও শোষকের অন্তহীন লোভ ও সর্বগ্রাসী আগ্রাসন, পিছিয়ে পড়া প্রান্তিকদের ওপর, যা ক্রমশঃ প্লাবিত করে বিশ-একুশ শতকের সুখী মধ্যবিত্তকে। অপরদিকে আরেক আগুন হল বিস্ফোরণের— পেট্রল ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টায়। সেই চেষ্টায় এক নীরব ব্যথার উপস্থিতি নবারুণ স্বীকার করেন। কিন্তু এই বিস্ফোরণ অবশ্যম্ভাবী। অগ্নির বৃহৎ ক্ষুধায় খাণ্ডবদাহন কে আটকায়? তাঁর হারবার্ট উপন্যাসে আমরা দেখেছি এমনি অচেতন, স্বতঃস্ফূর্ত, আকস্মিক বিস্ফোরণ যার বীজ বপ্ত হয় সত্তরের বিদ্রোহ উত্তাল কলকাতায়। নবারুণ সেই বিস্ফোরণের কথা বলেন চিনের পিপলস লিবারেশন আর্মির “তিনটি এটম বোমা” কবিতার অনুবাদে যেখানে বিস্ফোরণ ভাঙে “হাজার বছরের কুসংস্কারের শেকলকে”। তবুও ইয়েভগেনি ইয়েভতুশেঙ্কো বিদায় জানায় ১৯৯১-এর ১৯ আগস্ট রাশিয়াতে ব্যর্থ ক্যু বিপ্লবের রক্তপতাকাকে—
কতিপয় খচ্চর তোমাকে বিদেশি মুদ্রায়
বেচে দিচ্ছে— ডলার, ফ্র্যাঙ্ক, ইয়েন
…কিন্তু লালপতাকা আমি তোমাকে জড়িয়ে আদর করছি
আর দেখো আমার চোখে কত কান্না।
(“বিদায় আমাদের রক্তপতাকা”)
সেই কান্নার আগুন বারে বারে ফিরে আসে বিস্ফোরণ হয়ে। সেই বিস্ফোরণ বিপ্লবের— প্রতিরোধের সব ছিদ্র বন্ধ করে দেওয়া বিশ্ব-গৃহে মুক্তির অগ্নিসংযোগ যা আকস্মিক। মুক্ত বাজারের পৃথিবীর প্রতিটি কোন ম্যানেজমেন্টের খেলায়, বিকল্প রণকৌশল এই দহন, আপাত নিরীহের হঠাৎ জ্বলে ওঠা। “যারা আগুন লাগায়” ম্যাক্স ফিশের নাটক। অনুবাদের শেষে নবারুণ লেখেন— “ওকলাহোমার বিস্ফোরণ বা টোকিও-র পাতাল রেলে মারণ-গ্যাস দেখে আমি বিস্মিত হই না। অমানবিক, অনান্তরিক, ভোগবাদী এক বিকৃত ব্যবস্থা ওই জাতীয় বিকৃত প্রতিশোধের জন্ম দিতে বাধ্য। আগুন লাগছে। লাগবে। এটাই সত্যি খবর”। বিশ্বনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাবাদী প্রকল্পের বড়দারা বিডেরম্যানের মতোই বিশ্বাস করে ভালো খাইয়ে পড়িয়ে খুশ করলেই দূরীভূত হবে অগ্নিসংযোগের সম্ভাবনা— নিজের অজান্তেই তুলে দেন দেশলাই অগ্নিসংযোগের কাণ্ডারিদের হাতে। সে বৃথাই বোঝাতে চায়— “আরে বাবা, ধনীই হই আর গরিবই হই, আমরা কি একই ঈশ্বরের সন্তান নই? তবে এটাও ঠিক যে সবাই সমান নয়। ঈশ্বরের কৃপায় সক্ষম ও অক্ষম থাকবেই। তা বলে হাত মেলাতে পারব না? দরকার একটু আদর্শবাদ… একটু… একটু”। এই স্ট্র্যাটেজির বিরুদ্ধে চোখের সামনেই খেলার ছলে স্মিটস ও আইজেনরিংরা জমাতে থাকে পেট্রলের জ্যারিকেন— চেয়ে নেয় দেশলাই শ্রেণী শত্রুর থেকে। এই বিস্ফোরণের সম্ভাবনা লেগে থাকে নবারুণের লেখার গায়ে গায়ে— তাঁর “বেবি কে” সিরিজের গল্পগুলিতে দাহ্য হয়ে ওঠে বিশ্বায়নের ভোগ্যপণ্য মানব শরীর— পেট্রল খাকি বেবি কে অথবা বেবি খানকির দেহ আমেরিকান সোলজারদের সিগারে হয়ে ওঠে মানববোমা— জায়েন্ট মলোটভ ককটেল। বেবি কে পারিজাত বইয়ের ভূমিকায় লেখেন— “সবকিছুই পুড়ছে। যদিও আগুন দেখা যাচ্ছে না। তবে একসময় তা দৃশ্যমান হবেই”। মানবতাবাদের ছদ্ম ভালোমানুষিকে ভেদ করে এই অগ্নি-দর্শন। দেরিদার “অফ স্পিরিট” গ্রন্থের প্রচ্ছদ কারো মনে পড়তে পারে— অফ স্পিরিট নামের চারিধারে প্রজ্বলিত বহ্নি শিখা। হাইডেগারের কাব্যচিন্তার ব্যাখ্যায় তিনি দেখান কিভাবে স্পিরিট অথবা বিশ্ব-আত্মনের মধ্যে সবসময়ে থাকে জ্বলে ওঠার সম্ভাবনা। এই জ্বলনে স্পিরিট নিজেকে নবনির্মিত করে— মুক্ত করে নিজেরই থাকবন্দী থেকে নিজেকে।
উত্তর ৯/১১ বিশ্বের দার্শনিক চিন্তায় এইসব কথা— কর্পোরেট ম্যানেজমেন্ট তথা নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির বিকৃতি অন্বেষণে গুরুত্বপূর্ণ। যে দুই আগুনের কথা বলা হয়েছে তা বারে বারে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। মানুষের অন্তহীন ভালো থাকার ইচ্ছার আগুন যা একবগ্গা হিংস্র এবং ক্ষমতার প্রান্তে থাকা সর্বহারাদের প্রতি উদাসীন, তার প্রতিরোধে জ্বলে ওঠে প্রতিরোধের আচমকা পেট্রল। নবারুণ এই উত্তর-মানবতাবাদী প্রতিরোধের অনুবাদক যেমন তার ভিনদেশীয় সাহিত্যের ভাষান্তরে, তেমনি নিজের লেখালেখিতে— “৯/১১”, “পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট”, “টেররিস্ট” ইত্যাদি গল্পগুলি সেই সাক্ষ্য বহন করে। ৯/১১-র মৃতদের স্মৃতির প্রতি শোকবার্তা ক্রমশঃ প্রলম্বিত ও বিলম্বিত হতে থাকে ইমানুয়েল অর্তিজের কবিতা “কবিতাটা শুরু করার আগে এক মুহূর্তের নীরবতা”-র অনুবাদে যেখানে প্যালেস্টাইন থেকে শুরু করে আফ্রিকা, হিরোসিমা, ভিয়েতনাম, নিকারাগুয়া, এল সালভাদর অবধি ছড়িয়ে পড়ে অপঘাত মৃত্যুর শোক—
এই কবিতাটা আমি শুরু করার আগে
তুমি এক মুহূর্তের নীরবতা চেয়েছিলে
তুমি বিলাপ করছ যে পৃথিবীটা আর আগের মতো হবে না
এবং আমরা আশা করছি কখনোই তা হবে না।
চিরকাল যেমন ছিল।
(“কবিতাটা শুরু করার আগে এক মুহূর্তের নীরবতা”)

এই শোকবার্তার আগুন স্থির থাকতে দেয় না নবারুণের গদ্য-পদ্যকে। শেল্ডন পোলক তাঁর সম্পাদিত “Literary Cultures in History” বইয়ের ভূমিকায় সাহিত্য আকাডেমির অনুবাদ প্রকল্পের সমালোচনা করে বলেন, কেবল আগে থাকতে চিন্তিত এক ঐক্যবদ্ধ ভারতীয় সংস্কৃতির ধারণাই ওই অনুবাদ প্রকল্পের মূলে। এই ধারণা সাহিত্যের কোন সংজ্ঞা দেয় না। যে কোন ভারতীয় রচনার কল্পিত ভারতীয়ত্বই সেখানে মাপকাঠি, যদিও আঞ্চলিক সাহিত্যগুলি প্রায়শই সেই ঐক্যের ধারণা সম্পর্কে সচেতন হয়ে রচিত হয়নি। অর্থাৎ সাহিত্যের অনুবাদ প্রকল্প থেকে পাওয়া যেতে পারে সাহিত্যের কোন সাধারণ সংজ্ঞা এই আশা আমরা করতেই পারি। অথবা এমনও হতে পারে যে অনুবাদের মধ্য দিয়েই তৈরি হল সাহিত্যের এক রাজনৈতিক অর্থ। অধ্যাপক টেরি ঈগলটন তাঁর “Literary Theory— An Introduction” বইয়ে দেখিয়েছেন মূল্যায়নের মধ্যেই থেকে যায় কাকে বলব সাহিত্য তার রাজনীতি। এভাবেই বদলায় পাঠক্রম। নবারুণের অনুবাদেও নির্মিত হয় এক ভিন্ন বিশ্বসাহিত্যের ধারনা— এক ভিন্ন সাহিত্যের ধারণা ও বিশ্বের ধারণা। যেমন ৯/১১-এ মৃতদের প্রতি শোকজ্ঞাপন হয়ে ওঠে এক নবতর, ভিন্নতর বিশ্ববিষাদ— এক শোকবাহী বিশ্বচেতনা, তেমনি তাঁর লেখা এক কবিতায় (“একটি পারিবারিক কবিতা”, অগ্রন্থিত কবিতা) তিনি নিজের পরিবারের কথা বলতে গিয়ে ছিটকে যান স্বৈরাচারী আক্রমণে খুন হয়ে যাওয়া নানা দেশ ও রাষ্ট্রের অসহায় পরিবারের অবর্ণনায়। বিস্ফোরণের মতো এইসব মৃত্যুও গ্লোবাল পিস প্রোগ্রামের কাণ্ডারিদের কাছে এক দুঃসহ অবর্ণনা। এই উপস্থাপনের অসম্ভাবনার মধ্যে দিয়েই অনুদিত হয় নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্যের ধারণা— জারিত হয় এক ভিন্ন ঐক্য— “বাতাসে বাতাসে রয়েছে আমাদেরই শেষ নিঃশ্বাস”। এই ঐক্যের নাম দেওয়া যেতে পারে অপরাবাস্তব— অথবা অপরের বাস্তব— খুন হয়ে যাওয়া, বিস্ফোরণে জ্বলে ওঠা মানুষের বাস্তব যাকে ইংরেজীতে আমরা বলব— the aesthetics of the othereal— the reality of the other। এই বাস্তব পরাবাস্তবের মতোই সম্ভাবনার মধ্যে এক লুকানো সম্ভাবনা, কিন্তু তাকে আমরা কখনই করতে পারি না সম্পূর্ণ অনুবাদ। অনুবাদ নিয়ে এই লেখা অসমাপ্তই থেকে যাবে— থেকে যাবে প্রতিবন্ধী। অনুবাদের এই অপচেষ্টার শেষ তবে হোক আমার নিজের করা নবারুণের এক কবিতার কয়েক লাইন ইংরেজীতে—
Touching with fingers
I felt all— face, nose, throat
Holding railings I realized it is jail
Cold weight of manacles around neck
Wind and rain came searching for me
Felt philosophy is brail
(“Disabled Three”)
জেলের প্রায়ান্ধকার প্রকোষ্ঠে ছুঁড়ে দেওয়া সংগ্রামীর অভিজ্ঞতা গরাদ ছুঁয়ে দেখা— অনুভব করা বন্দি দশা। Felt philosophy— অর্থাৎ জীবন দিয়ে অনুভব করা দর্শন। নবারুণের মূল পাঠ ছিল— “অনুভব শিক্ষা হল ব্রেল”। ব্রেল— অন্ধের পাঠপ্রক্রিয়া— এই তো অপরের বাস্তব পাঠের— তাকে অনুবাদের দর্শন। অনুবাদের অছিলায় তাকে felt philosophy নামক মানবতাবাদী চিন্তনের পুনঃপাঠ-অনুবাদ করে তুললাম। অনুভবই তো এখানে অসম্ভব— তা অন্ধকার জেলে বন্দীর হাত দিয়ে অনুভব করা বন্দী দশা— অন্ধের অক্ষর পাঠ। কিন্তু এই আত্মদর্শনের মাধ্যমে সোচ্চারিত— প্রতিবন্ধী নয় এ অন্ধ! সে যে পাঠ করতে পারে তার বন্দী দশা! অনুবাদ এভাবেই এগোয়।