নবারুণ ভট্টাচার্য সেটাই করেন

অনুপম মুখোপাধ্যায়

একজন নবারুণ ভট্টাচার্য কী করেন? তিনি সেটাই করেন, যেটা একজন টেকচাঁদ ঠাকুর করেছিলেন, একজন কালীপ্রসন্ন সিংহ করেছিলেন, কিন্তু একজন বঙ্কিম করতে চাননি। নবারুণ লোকসাহিত্য করেন। লোকের জন্য লেখেন। কৃষ্টির জন্য নয়, সাহিত্যের জন্য ভাষাকে নিয়োজিত করেন। এই কাজ আমাদের সমকালে আর কেউ করেননি, করলেও ব্যর্থ হয়েছেন, ওই মোমেন্টাম তাঁদের ছিল না, নেই।
আজ অবিশ্যি লোকসাহিত্য আর জনপ্রিয় সাহিত্য আমাদের এখানে ঘেঁটে ঘ হয়ে গেছে।
এবং ভিকটোরিয়ান শুচিতার বোধ আমাদের আজও ছেড়ে যায়নি। আমাদের সিনেমায় কোনো বৃদ্ধের বুকে ছোরা মারা দ্যাখানো যায়, ভিলেনের গুলিতে শিশু হিরোর চোখের সামনে লুটিয়ে পড়া বাবা-মাকে দ্যাখানো যায়, কিন্তু অভিনেত্রীর স্তন দ্যাখানো যায়না। মগনলাল মেঘরাজ যেমন বিষকে ‘খারাব জিনিস’ মনে করতেন, আমরা স্তনকে অসভ্য জিনিস মনে করি। আমরা স্তনকে ভয় পাই। আমরা উন্মুক্ত যোনি বা খোলা লিঙ্গের দিকে তাকাতে চাইনা। এদিকে হন্যে হয়ে খুঁজি ‘ছত্রাক’ সিনেমার সেই ক্লিপিং যেখানে পাওলি দামের যোনি চাটছেন অনুব্রত, বা ‘গান্ডু’-তে যেখানে অনুব্রতর লিঙ্গ চুষছেন ঋ। দ্যাখার পরে ‘ইশ! এই মেইছেলেটার কি কোনো হিত্তিপিত্তি নেই গো!’ বলে সেটাকে মেশিন থেকে ডিলিট করে দিই, কিন্তু মনে রেখে দিই।
সেক্স জিনিসটা সাহেবদের জন্য। অথবা আদিবাসীদের জন্য।
আমরা নাগরিক বাঙালি।
আমরা সভ্য। আমরা সম্ভ্রান্ত। আমরা শিশুর মতো সরল ও যৌনভাবে সৎ।
এখনকার গল্প এবং উপন্যাস লেখা হচ্ছে টিন এজারদের জন্য, অর্থাৎ বাজারচলতি লেখকরা জেনে গেছেন, তাঁদের পাঠকদের মানসিক বয়স খুব অল্প, এবং তারা দার্জিলিং থেকে সুন্দরবন অবধি ছড়িয়ে থাকা ভাষাপৃথিবীটির বাংলা ও অ-বাংলা সম্পর্কে অজ্ঞ। আজকের সফল লেখকদের টার্গেট হল সেইসব পাঠক যারা দশ বছর বয়সে কাকাবাবু-সন্তু, ষোল বছর বয়সে তসলিমা নাসরিন পড়ে, এবং তারপর ‘পড়ার সময়’ তারা বেশ কিছুদিন পায়না, পরবর্তীকালে পূজাবার্ষিকী দেশ এমনকি আনন্দমেলা-র মাধ্যমে তারা পড়ার ইচ্ছায় ফিরে আসতে চায়। আমাদের ৯৯.৯৯ % শিক্ষিত বাঙালি লিটল ম্যাগাজিন কাকে বলে জানেই না। ওটাকে তারা পুজোর স্যুভেনিরের চেয়ে আলাদা কিছু ঠাহর করতে পারেনা।
এরমধ্যে একজন নবারুণের ভাষা। সেই ভাষা, যার অঙ্গে অঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির স্বাভাবিকতা।
বঙ্কিমের হাতে জন্ম নেওয়া এবং রবীন্দ্রনাথের হাতে পরিপক্কতা পাওয়া ব্রিটিশ বাংলাকে, তথা বাংলিশকে আক্রমণ করেছিলেন নবারুণ। তাঁর ভাষা এলিট নয়, অথচ অভিজাত। গ্রামবাংলার চন্ডীমন্ডপের আলোচনায় আড্ডায় বিচারসভায় যে স্বাভাবিক বাংলা কেউ-কেউ ব্যবহার করতেন, যা নির্দোষ অথচ লক্ষবেধী, সেটারই এক আশ্চর্য রূপ আমরা নবারুণের গদ্যে পাই। ‘তোর বিছনায় তোর বৌকে চুদে দিয়ে চলে গেল, আর তুই বোকাচোদা পাশে শুয়ে শুয়েও টের পেলিনি!’ অথবা ‘কচি তুই সরে শু, তোর মাসি এসছে।’ অথবা ‘পোঁদে নাই ইন্দি / ভজে রে গোবিন্দী!’ অথবা ‘গাই বেচে দে, দুধ কিনে খা।’ অথবা ‘পোঁদ মারো, ঘটি হারাও।’ অথবা ‘খাপে খাপ, পঞ্চুর বাপ।’... এরকম বাক্য আজও লোকায়ত বঙ্গভূমিতে কান পাতলেই শোনা যায়, বাপ রেগে গিয়ে ছেলেকে বলেন, ‘হতভাগা, তুই মানুষ, না ন্যাড়?!’ কিন্তু বাংলা উপন্যাস বা গল্প তাদের ব্যবহার করে না। একটি গান সবুজ ধানজমিতে ছড়িয়ে পড়তে শোনা যায়... ‘লে হুড়কা’ অথবা ‘আয় না খুকি চড় না আমার হিরো সাইকেলে/ রডে বসে বেড়াতে যাবি...’
এই বাক্যগুলো ‘শ্রাবণমাসের সকালবেলায় মেঘ কাটিয়া গিয়ে কলিকাতার আকাশ নির্মল রৌদ্রে ভরিয়া গেছে।’ বা ‘অমিত রায় ব্যারিস্টার।’-এর চেয়ে অনেকবেশি জীবন ও মাটির গন্ধে ভরপুর, এটা যিনি অস্বীকার করবেন, তিনি বঙ্গজীবনের কেউ নন।
বাংলা উপন্যাস নাকি তার সাহসের সর্বোচ্চ সীমা দেখায় সমরেশ বসুর ‘প্রজাপতি’-তে। ‘প্রজাপতি’ বা ‘রাত ভ’রে বৃষ্টি’-তে আমি সাহস দেখতে পাইনা, শুধু অবক্ষয়ের প্রতি আর অস্বাভাবিকতার প্রতি শহুরে ও এলিট লেখকদের ক্লস্ট্রোফোবিক বিরক্তিই দেখতে পেয়েছি। কিন্তু যৌন শব্দাবলীকে অচ্ছুৎ রেখে শুধু সঙ্গমের বিবরণ বা নায়িকার শরীরের বর্ণনা বাংলা উপন্যাসকে অস্বাভাবিক করে রেখেছে। সে সমরেশ বসুর ভাষা হোক, বা তসলিমা নাসরিনের... শেষ অবধি আমরা এলিট ভাষাই পেয়েছি। টেকচাঁদ বা হুতোম ফসিল হয়ে রয়ে গেছেন আমাদের টেবিলে ও শেলফে।
এ এক পরম সৌভাগ্য যে নবারুণ ভট্টাচার্য তাঁর জেনেটিক কোড মহাশ্বেতার চেয়ে, বিজনের চেয়ে টেকচাঁদ-হুতোমের থেকেই পেয়েছেন। মেন্ডেলের সূত্রগুলো বেকার হয়ে গেছে।
একজন অজিত রায়ের (‘যোজন ভাইরাস’) যে সীমাবদ্ধতা, সেটাকে অতিক্রম করেই নবারুণের যাত্রার শুরুটা হয়। একজন অজিত রায় ব্যক্তিগত বলয়ে রয়ে যান, কিন্তু নবারুণ ব্যক্তির বাহিরে নিজেকে উপস্থিত করেন। নবারুণের ভাষাকে সন্দেহ করা যায় না। অজিত রায়ের ভাষা সমষ্টি থেকে ব্যক্তির দিকে আসে। তিনি দ্রোহী। অজিত রায়ের ভাষার জোর তাই তাঁর বেপরোয়াপনা। বাহিরের লোক ভাবেন নিজেকে। আর একজন নবারুণের ভাষা ব্যক্তি থেকে সমষ্টির দিকে যায়। সে তিনি স্ল্যাং ব্যবহার করুন, আর না-ই করুন। নবারুণ একজন লোকসাহিত্যিক। তিনি বিপ্লবী। ভিতরের লোক বিবেচনা করেন নিজেকে। তাঁর ভাষার জোর তাঁর আন্তরিকতা।
নবারুণ তাঁর ভাষাকে বন্দুক হিসেবে প্রয়োগ করেছিলেন। ১ অস্বস্তিকর বন্দুক। সেটা ফায়ার করতে হয়না, সেটা যে আছে এটাই যথেষ্ট।
লিঙ্গের মতো। লিঙ্গের মতো নয়।
সাহিত্য তিনি মনোরঞ্জনের জন্য করতে আসেননি। একেকটি শব্দকে একেকটি বুলেট হিসেবে রেখেছেন, সেটা ছুটে যায়নি, স্থির হয়ে থেকেছে, বারুদ সঞ্চয় করেছে।
শুক্রাণুর মতো।
শুক্রাণুর মতো নয়।
শুধু এটাই দেখার, নবারুণের জেনেটিক কোড বাংলা গদ্যসাহিত্যে কোন ফুল ফোটায়, ক’টা fool-কে ফোটায়।