নবারুণের লেখায় ইতিহাসবোধ

অভিজিৎ বসাক

“I mourn, therefore I am.”
- Derrida

ইতিহাসের স্বরূপ, তার সত্যতা বিষয়ে প্রাক-প্রাধান্য, তার আদত ‘গুণ’-গত ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে গত শতাব্দীর সত্তরের দশক থেকে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। তবে ভারতে নয়। ইউরোপ ও আমেরিকায়। ভারত ইতিহাস বা দর্শন চর্চা ভুলেছে বহুদিন। সেই সত্তরের দশকেই উত্তাল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সময়। ভুখা বাঙালীর স্বতঃস্ফূর্ত আলিঙ্গন অনিশ্চয়তা, রক্তপাত, ও প্রতিষ্ঠান বিরোধী চিন্তাধারার। এরই মধ্যে উৎপল দত্ত, বিজন ভট্টাচার্য, কিংবা মহাশ্বেতা দেবী’র লেখায় ধরা পরে সেই আগুনে সময়ের কাহিনী। এঁরা প্রত্যেকেই একটি বিশেষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আজীবন লিখেছেন। কোন প্রাতিষ্ঠানিক চোখ রাঙানিকে পাত্তা না দিয়ে। বিজন ভট্টাচার্য ও মহাশ্বেতার ছেলে নবারুণ যে এই ট্র্যাডিশন বজায় রাখবেন তাতে কোন আশ্চর্য হবার কিছু নেই। জাদুকর আনন্দদের মজার তল্পিবাহক বানিয়ে তাঁর লেখায় ইতিহাস আসে কখনও জাদু বাস্তবতার কাঠামোয় কখনও বা কঠিন বাস্তবতার রক্ত মেখে। গতানুগতিক ইতিহাস ও সাহিত্য চর্চার যে জঙ্গম আমাদের আরও চাইতে বাধা দেয়, বা মুড়ি মুড়কি মূলক নরম নরম লেখায় ভুলিয়ে রাখে, নবারুণ সেই গঠনতন্ত্রের বিরুদ্ধে গিয়ে বলতে পারেন যে তাঁর লেখায় বিস্ফোরণের আলকেমি আছে। পাঠকরা স্বাগত, কিন্তু তাঁদের আনন্দ ধারায় আঘাত পড়লে দায়িত্ব লেখকের নয়। নবারুণ সেই বিরল লেখক গোষ্ঠীর মধ্যে পড়েন যাঁরা পাঠক তৈরী করেন, যাঁদের জন্য পাঠক নিজেদের প্রস্তুত করেন। নবারুণের ইতিহাস বোধে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিক আদানপ্রদান বিষয়ক এই লেখায় মূলত তাঁর গদ্য সংকলনগুলোই আলোচ্য। বিলাপ্য সময়ের আখ্যানে আমোদ-রিরংসার প্রতি-পাঠ তৈরীর প্রচেষ্টা— এই ভাবে দেখা যেতে পারে নবারুণের ইতিহাস সচেতনতা/চেতনাকে। নিষ্ঠুর বাস্তবিকতাকে এড়িয়ে না গিয়ে মোকাবিলা করেছেন তিনি এপথেই। ব্যর্থ ক্ষুদ্র অবমূল্যায়ন-দীর্ণ সমাজে বিপ্লবের কার্নিভাল। ওলট পালট হয়ে যায় সব সমীকরণ। আলোচনার স্বার্থে বিলাপী নবারুণ বেশি আসেন, কিন্তু সেই আলোচনার পরেই দেখবো আমোদগেড়ে নবারুণের প্রতিশোধ। পুরন্দর ভাটের ডিসেন্টিং চর্ভট্টি যেভাবে মধ্যবিত্ত লেখাভ্যাসে আঘাত করে, তার পাঠাভ্যাসকে ছারখার করে দেয়, তেমনি সে জড়বৎ-তুষ্ট মানসিকতাকে বালখিল্য’র (pun অনুপান নয় এখানে) স্তরে নামিয়ে দেয়। যে গদ্যসাহিত্যগুলি আলোচ্য সেখানে নবারুণ যে রূপরেখ নির্ণয় করেন তা তাঁর সমস্ত লেখাতেই সমান ভাবে ফলিত তা বলাই বাহুল্য। কমিটেড লেখক মাত্রেই এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। নবারুণের কমিটমেন্ট নিয়ে আমার কিছু বলার ধৃষ্টতা নেই।
শুরু করা যেতে পারে ‘অ্যাকোয়ারিয়াম’ প্রবন্ধিকাগুচ্ছ দিয়ে। লুব্ধক-কে নবারুণের প্রকাশক বলেছেন কুকুর নিয়ে লেখা প্রথম বাংলা উপন্যাস। নবারুণের ভাষায় তাঁর বহুদিনের ইচ্ছের ফসল। লুব্ধক ফ্যাতাড়ুদের জান্তব রূপ মাত্র। রাশিয়া নিয়ে নবারুণের দুর্বলতা সর্বজন বিদিত। কাঙাল মালসাট শুরুই হয় বুলগাকভ দিয়ে। লুব্ধক আসলে লাইকা’র বাংলা সংস্করণ। নেড়ি কুকুর, যারা ব্রাত্য, যারা আদুরে নয়, তারাই যে ‘অসাধ্য সাধন’ করতে পারে নবারুণ তা বিশ্বাস করতেন। লাইকা ও লুব্ধক দুজনেই নেড়ি কুকুর। এই উপমার ভেতরের রাজনীতি পরিষ্কার যখন লেখক স্পষ্টই বলেন: “শুধু কুকুরদের আওতায় ভাবনাটাকে গচ্ছিত না রেখে আরও ছড়িয়ে দিতে পারি আমরা।’’ তবে বাঙালী নবারুণ ফিরে আসেন আরও তীব্র ভাবে। “লজ্জা, এ কি লজ্জা” প্রবন্ধিকায় ১৯৬৯ সালে পুজোয় বেরনো গানকে তিনি ৭০ থেকে ৭২-এর রাজনৈতিক সময়ের সাথে কনট্রাস্ট করে দেখান যে আত্ম বিস্মৃত বাঙালী ২০০৯-এর পুজোতেও জঙ্গল মহলের ঘটনায় বিচলিত হয় না। “মানুষও লজ্জা পেতে ভুলে গেছে”। কাঙ্গাল মালসাট সিনেমা’র দণ্ড বায়স কবীর সুমনের ফেসবুক প্রোফাইল-এর ডিসপ্লে ফটো বলে “ছত্রধর মাহাতর মুক্তি চাই”। ২০১৫ সালে। এলিট সাহিত্য চর্চার ব্যাপারেও নবারুণের মত স্পষ্ট। নাগরিক মোলায়েম আদেখলাপনাকে তিনি অযোগ্য বলে জানিয়ে দেন “ভাববার নাটক” প্রবন্ধিকায়। “খুব সহজ বিষয়— চা বাগানে অনাহারে এক বালিকার মৃত্যু। এরকম তো হয়েই থাকে।’’ সেই অপটু পরিবেশনার ব্যঞ্জনা আসলে শুরু হয় নাটকের শেষে। “গ্রিনরুমে শ্রমিক মেয়েদের কান্না আর থামে না। শোক ও বিলাপ চলতেই থাকে।’’ পেটের জ্বালার চুরি— নবারুণ বলেছেন এই সমস্যাকে। “কিছু আশা, কিছু ভয়”-এ ‘সত্যম’ কেলেঙ্কারি প্রসঙ্গে তিনি বৃহত্তর গ্যাংস্টার ক্যাপিটালিজমকে তৃতীয় বিশ্বের লেখক হয়েও কাঠগড়ায় প্রশ্ন করেন। তেমনি তিনি প্রশ্ন করেন সুশীল সমাজকে, প্রগতিশীলদের। অকুতোভয় নিয়ম ভঙ্গকারী দুর্বৃত্তদের নবারুণ ফ্যাতাড়ু বানিয়ে তোলেন কারণ প্রগতিশীলদের কোনো গতি নেই। আর নেই বলেই ‘নেটো’য় মারে দই। সব, নবারুণের ভাষায়, “গুবলেট! গুবলেট!’’ আর এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হল “ফিউম্যান রাইটস”। “ঘাড় ধাক্কা” নামক লেখায় পাই ২০০৯ সালে ভারতের মানব উন্নয়ন সূচকে স্থান ১৩৪ তম। তবে কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, দেশ থেকে বিদেশ— সর্বত্রই নবারুণের দূরদৃষ্টি ব্যাপ্ত। “নির্বাচন, নর-বানর ও মামায়েভ পাহাড়” প্রবন্ধিকায় তিনি রুশ অর্থোডক্স চার্চ ও শাসক গোষ্ঠীর আঁতাত নিয়ে আশঙ্কিত হন জুন-জুলাই ২০০১-এ। ২১শে জুলাই, ২০১৫-তে বিখ্যাত ঐতিহাসিক টিমথি স্নাইডার তাঁর লেখা “Edge of Europe, End of Europe”-এ একই বিষয় তুলে ধরেন। অ্যাকোয়ারিয়াম-এর শেষ ক’টি প্রবন্ধ নন্দীগ্রামের সময় নিয়ে। বাংলার কম্যুনিস্ট শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নবারুণের জবান। তিনি নন্দীগ্রামের গণহত্যার সাথে পৃথিবীর সব গণহত্যার মিল খুঁজে পান। ১৯৩৭ সালের স্পেনের গৃহযুদ্ধ বা ১৯৬৭ সালের ভিয়েতনামে মার্কিন মারণ তাণ্ডবের কথা তাঁর মনে পরে। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখক-বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা নিয়ে চিন্তিত হন। জুলুম সিপাহীদের বিরুদ্ধে কলম সিপাহীদের প্রতিবাদ সার্বিক নয়। তবে লেখক যেহেতু বারেবারে নিজেকে হিস্টরিকালি অপ্টিমিস্ট বলে এসেছেন তাঁর আশা “যে ভবিষ্যতে এই প্রতিবাদ আরও ব্যাপক হবে, একটা সদাজাগ্রত প্রহরায় পরিণত হবে যাতে ট্রিগারে আঙ্গুল রাখার আগে ঘাতককে দুবার নয়, অনেকবার ভাবতে হবে।’’ “গান্ধীনগরে রাত্রির অন্ধকারে...” প্রবন্ধিকায় চারিত্রিক কৌতুক বোধে নবারুণ খেয়াল করেন “দেখার সেই তালিকায় নবতম সংযোজন গান্ধীনগরের রাত্রির অন্ধকারে নন্দীগ্রামে সূর্যোদয়। হইল ভালো কথা, সে-ও রবীন্দ্রনাথের জন্মদিনে!” বাংলা কলম-সিপাহীদের নাটের গুরুর জন্মদিন যেন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
“আনাড়ির নাড়িজ্ঞান” প্রবন্ধ সংকলনের কেন্দ্রিকতা বহুমুখী। নবারুণ এখানে যেমন তাঁর স্বভাবগত রাজনৈতিক বোধে সোচ্চার তেমনি আবার তিনি তাঁর ছোটবেলা নিয়ে স্মৃতিমেদুর। পরবর্তী “কথাবার্তা” বইএ দেখব এই স্মৃতি চারণাও কি ভাবে ইতিহাস-রাজনীতি সমীকরণের বাইরে নয়। তবে “আনাড়ির নাড়িজ্ঞান”-এ ইতিহাস আসে বৈষয়িক নানাবিধতার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই। লেখক শুরু করেন ১৯৬৭ সালে লেখা তাঁর “ভাসান” গল্পকে মনে করে। সে প্রসঙ্গে উঠে আসে তাঁর প্রকাশক সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের লেখা নিয়ে তাঁর ব্যক্তিকেন্দ্রিক স্মৃতিচারণা। “সোনালি বাঘ-প্রেতের কথা: জীবনানন্দের তিনটি গল্প” আলোচনা প্রসঙ্গে আসে ১৯২৯ সালের ওয়াল স্ট্রিট ক্র্যাশ এবং ১৯৩৪ পর্যন্ত অর্থনৈতিক মন্দা’র কথা। আসে ৪৩ এর মন্বন্তর এর প্রসঙ্গ আর বাঙালী অর্থ পিশাচদের ফিরে দেখা। এরই মধ্যে তিনি এও খেয়াল করেন যে ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত বিভূতিভূষণের “পথের পাঁচালী”তে “পুনরাবৃত্তি বাদ দিয়েও ১১৮টি খাদ্যের পদের উল্লেখ আছে।’’ না, সেই সময়ে খাদ্য বিলাসিতায় মগ্ন হন নি বিভূতিভূষণ। নেহাতই দীন খাবার সে সব। নোনাপাতার পান, তেলাকুচার পটল, কিংবা ডুমুরের সুক্তুনি। আর আছে পানসে পায়েসের কথা। নবারুণ এর চোখ এসব এড়ায় না, কারণ তিনি “পথের পাঁচালী”কে দুর্ভিক্ষের ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পাঠ করেন। এর পরেই নবারুণ চিন ও সোভিয়েত দেশ এর বৈভবময় আইডিওলজিকাল কপর্দক শূন্যতা বিলাপ করতেও দ্বিধা করেন না। এসব তাঁর নিজের চোখেই দেখা। নিজের চোখে দেখা কাগ্রামের জগদ্ধাত্রী পুজো। সেখানে দেবী মূর্তি আর রমজানের ঘোড়া একই শিল্পীর হাতে তৈরী। “সাদামাটা কিছু বারোয়ারী মণ্ডপ”-এর পুজো ভবিষ্যতের সার্বজনীন উৎসবের বার্তা আনে। “হাওলাওয়ালাদের হালাল করো” প্রবন্ধে নবারুণ স্বীকার করেন যে “ছোটবেলা আমার খুব যুদ্ধের গল্প, যুদ্ধের ইতিহাস ও বিবরণ পড়ার শখ ছিল।’’ চীন রাশিয়া’র যুদ্ধ থেকে কিউবা নকশাল-এর সময় পর্যন্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর ইতিহাস পড়ার পরে নবারুণের মনে হয়েছে “নির্মম, হিংস্র ও নিষ্ঠুর শতাব্দীটা আসলে আউসভিৎজ-এই শেষ হয়ে গেছে। কৃত্রিম উপায়ে তাকে ১৯৯৯-এর অন্তিম অবধি বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে...”। অবশ্য নবারুণের মতে সময়ও পণ্য: “জল বা বাতাসের মতোই চুরি হয়ে যেতে পারে। হচ্ছেও।... জাল নোটের মতোই চলছে জাল সময়।’’ প্রবন্ধের নাম “ঘড়ি-ঘরের জেলখানা”। “অপারেশন গ্রীন হান্ট: মোকাবিলা কোন পথে” প্রবন্ধে নবারুণ ব্যাপক মানুষের অভ্যুত্থান নিয়ে কথা বলেন। ইউ.পি.এ. আমলে মাওবাদীদের বিরুদ্ধে সরকার যে দমন নীতি নেয় তার নাম অপারেশন গ্রীন হান্ট। নবারুণ এই নামকরণকে প্রশ্ন করেন। গ্রীন শব্দের মধ্যে যে ভালো গুণ নিহিত থাকে তাকে তোয়াক্কা না করে এই নাম কেন তা খুঁজতে গিয়ে লেখক মত দেন যে এর সাথে নিশ্চয়ই আমেরিকার গ্রীন বেরে সৈন্য বাহিনীর কোন মিল আছে। এই গ্রীন বেরেরাই ভিয়েতনামে গিয়ে মৃত্যুর পাশবিক নিদান দিয়েছিল প্রান্তিক মানুষদের। গ্রীন হান্ট এর উদ্দেশ্য অনেকটাই একই রকম। “লালগড়” প্রবন্ধেও ব্যাপক আন্দোলনের ডাক। এই দুই প্রবন্ধে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে আসে। সেলিব্রিটিদের পলিটিক্স ও পলিটিকাল দালালদের কথা। প্রথমটি থেকে নবারুণের কোন আশা নেই। কিন্তু দ্বিতীয় গোষ্ঠী আরও ভয়ানক। লাল জামা আর লাল চশমা পড়া সখের কম্যুনিস্ট যাদের উদ্দেশ্যই হল পাবলিসিটির ক্ষীর খেয়ে নেওয়া, সেইসব মানুষরা যে তাঁদের নাগরিক হাওয়া মহল ছাড়তে রাজি নন তা নবারুণ হাড়ে হাড়ে জানেন। মধ্যে প্রাণ যায় প্রান্তিক মানুষদের বা গুটি কতক আদর্শে ডানপিটে তরুণদের। শুধু একটাই আশার কথা বার বার তার প্রবন্ধে ফিরে ফিরে আসে। ভবিষ্যতের সময় হয়ত কিছুটা আলাদা, কিছুটা প্রাণোচ্ছল হবে। “কমরেড” (কবীর) সুমন প্রসঙ্গে আলাপচারিতায় নবারুণ এভাবেই ষাট সত্তর আশির দশক থেকে অনাগত ভবিষ্যৎকে মিলিয়ে দেন। বিপ্লবী গানের, মানুষের গানের সুরে।
নবারুণের বলিষ্ঠ রাজনীতি জারিত ইতিহাস চেতনা আবারও স্বর পায় এই বছরের গোড়ায় প্রকাশিত “কথাবার্তা” সংলাপ সংকলনে। তড়িঘড়ি প্রকাশনের তাগিদে প্রচুর মুদ্রণ প্রমাদ, ও সম্পাদকীয় অনাবধনতায় বই-এর বক্তব্য কিছু জায়গায় বিঘ্নিত ও ঘোলাটে হওয়া সত্ত্বেও সব ছাপিয়ে উঠে আসে নবারুণের অটল বিশ্বাসের ছবি। তাঁর লেখার রাজনৈতিক বক্তব্যের শিকড় নবারুণ খুঁজে পান নিজের সময়ে, নিজের দেশে। মানুষের অপমান লাঞ্ছনা বঞ্চনার কথা তাঁর গল্প উপন্যাস কবিতায় ফিরে আসে। অত্যাচার তাঁকে ক্রুদ্ধ করে। এই “এথিকাল” রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই তাঁর সাহিত্য। “আমার রাজনৈতিক জীবন থেকেই আমি হিস্টরিকালি অপ্টিমিস্ট।’’ “নবারুণ ভট্টাচার্য উবাচ” আত্মকথনে তিনি বলেন “... লেখকরা সহজাতভাবেই বেশি সেনসিটিভ।’’ নকশাল থেকে নন্দীগ্রাম সবেতেই তিনি ভীষণ অন্তরালোড়ন বোধ করেন। “ভিতরে ভিতরে প্রবল একটা কষ্ট। এই কষ্ট থেকেই লেখাটা আসে।’’ ক্যাপিটালের আঘাত নেমে এসেছে সমস্ত শ্রেণীর মানুষের ওপরে। এর বিরুদ্ধেই নবারুণের লেখা। পৃথিবীর ইতিহাসে বিপ্লবের সারৎসার খোঁজেন নবারুণ। “সত্তরের গোড়ায় সেই সময়ে শ্রীলঙ্কায় ট্রটস্কাইটদের যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল আমি তাকে সমর্থন জানিয়েছিলাম’’, বলেন তিনি “আমি চাই লোকে আমাকে কমিউনিস্ট কবি ও লেখক হিসেবেই মনে রাখুক” শিরনামী সংলাপে। তাঁর নকশাল আন্দোলন বা তেভাগা আন্দোলনের প্রতি দুর্বলতা কোন বিচ্ছিন্ন বা ‘লোকাল’ রাজনীতির পরিচায়ক নয়। হয়ত এই কারণেই সময় ব্যাপারটাও ‘লোকাল’ নয় তাঁর কাছে। তিনি উত্তরআধুনিক কন্ডিশন এ বিশ্বাসী নন। আবার অক্ষয়কুমার বড়াল বা মানকুমারী বসুকে তিনি সমকালীন বলে মনে করেন। গোবিন্দচন্দ্র দাস-এর কবিতার এনার্জি তাকে উদ্বুদ্ধ করে। “জীবনে আমরা যা যা অনুভব করি সেগুলো ঊনবিংশ শতাব্দীতে তাঁরা অনুভব করেছিলেন যেমন ইতিহাসগত ভাবে আজকে আমি করছি”- নবারুণ বলেন প্রথম দুজন অগ্রজ কবি সম্বন্ধে “দুনম্বরী একটা সময়ের মধ্যে আমরা বাস করছি...” সংলাপে। কলকাতার সময় গতি কোথাও যেন আটকে গেছে। প্রাণহীন। জয়েসের ডাবলিন এর মত। “এটা কি কোন জ্যান্ত শহর? ...এটা একটা প্রেতের শহর’’ (পাতা, ৩০)। আশির দশকেই, বৈপ্লবিক সত্ত্বার সাথেই মৃত্যু হয় এই শহরের। যে কারণেই হয়ত তাঁর লেখায় লোকেল তৈরী হয় চরিত্রের মতোই। কাল্পনিক ভাবে (৩৪)। এই মৃত নগরের ইতিহাস তিনি রচনা করেন তাঁর লেখায় যেখানে বৈপ্লবিক সময়-এর ভূত ফিরে ফিরে তাড়া করে এই শহরের জড় মানসকে, জন মানুষকে।
নবারুণের কথাবার্তা বা গদ্য সাহিত্যে কয়েকটি বিষয় বার বার আবর্তিত হয়। স্ল্যাং-এর ব্যবহার, তাঁর রাজনৈতিক বোধ, তাঁর দেখা সময়, তাঁর বিচিত্র নিম্নবর্গ ঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতা। এসব নিয়ে তিনি বারবার কথা বলেছেন কারণ তাঁকে বুঝতে গেলে এসব ব্যাপারে ওয়াকিবহাল হতে হবে। আর ফিরে আসে ঋত্বিক ঘটক, বিজন ভট্টাচার্য ও মহাশ্বেতা দেবীর কথা। প্রথম দুজন নবারুণ কে জীবনের পাঠ দেন। তাঁদের ইতিহাসনিষ্ঠতা, প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করে যাবার অঙ্গীকার, বাজার এর সাথে আপোষহীন সংগ্রাম এসব নবারুণ আত্মীকরণ করেছেন। তথাপি, মহাশ্বেতা এই বলয়ের বাইরে কোন অন্য ক্ষতের ইঙ্গিত দেন। এই ক্ষত আরও গভীর হয় নবারুণের বিশ্বাস ধারাবাহিক ভাবে আহত হবার প্রবাহে। “আমার যখন বারো বছর বয়স তখন মা চলে গেলেন। এই ঘটনাটা আমার কৈশোরের জীবনকে খুব প্রভাবিত করেছিল। সেই ট্রমা পরবর্তী জীবনকেও তাড়া করে ফিরেছে। ...মায়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়াটা আমার চরিত্রকে অনেকটা মোল্ড করেছে— দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলাতে অনেক সাহায্য করেছে” (কথাবার্তা, ৫৬)। এই ভিত্ত্যাঘাত বা ফাউন্ডেশনাল ট্রমা কিভাবে নবারুণকে ইতিহাস নিয়ে সেনসিটিভ করেছে, বা তাঁর লেখা কিভাবে এই ট্রমা’র সাথে যুঝ্যমান তা নিয়ে বিস্তৃত লেখার পরিসর বা অবকাশ এই লেখায় নেই। তবে সামান্য কথা বলা যেতেই পারে। আধুনিক ট্রমা তত্ত্বের কথায় বললে ইতিহাস, তা ব্যক্তিগত, বা জাতি/সমষ্টিগত যাই হোক, আসলে ক্ষতঋদ্ধ। বিশেষ করে ফাউন্ডেশনাল ট্রমা পরিচয় তৈরী’র ব্যাপারে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নবারুণকে বারংবার সোভিয়েত পতন, বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের (রাজ)নৈতিক অবক্ষয়, চিনের ক্যাপিটালিজমকে আলিঙ্গন করা, বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টিক্র্যাসি এসব ভয়ানক ক্রাইসিস-এর মধ্যে নিয়ে যায়। এর সাথে গোলকায়ন, পুঁজিবাদ, আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ, বুদ্ধিজীবীদের জাড্যতা, বৈপ্লবিক সম্ভাবনার অপমৃত্যু— তিনি ভীষণ বিচলিত ছিলেন, ক্রুদ্ধ ছিলেন। “কষ্ট থেকেই লেখাটা আসে”, তিনি বলেছেন। ধর্ষিতাদের পুঞ্জীকৃত জামা কাপড়ের মধ্যে একটি বাচ্চা মেয়ের ফ্রক দেখে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন (কথাবার্তা, ১৬)। অন্যের অপমান, লাঞ্ছনা (৫৯), মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া (৬১)— বিভিন্ন ভাবে তিনি মর্মাহত হয়েছেন। “৮৪ সালে আমি সোভিয়েত ইউনিয়নে যাই। সেখানেও আমি দেখি অনেক অমানবিক ঘটনা। আমার কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন একটা সাংঘাতিক ঘটনা, আমার সমস্ত অস্তিত্বকে বিদীর্ণ করে দিয়েছে এই অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতার অভিঘাতে আমি ‘হারবার্ট’ লেখার প্রয়োজনবোধ করেছিলাম তীব্রভাবে” (৭৪)। “হারবার্ট” একটি আদ্যোপান্ত ট্রমাটিক টেক্সট। “আ ... টুল অফ হিস্ট্রি” (১৫১) “এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না”-ও। বারাসাতের হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নবারুণের প্রতিবাদ। তবে নবারুণ এই বিলাপমগ্নতায় আচ্ছন্ন হন নি। তাঁর “এথিকস” বোধ তাঁকে সাবভার্সন করতে শেখায়। এ একধরণের working through the trauma। আসে ফ্যাতাড়ুরা। “আ গ্র্যান্ড ডিজাইন অফ সাবভার্সন” (১৪৭)। তৈরী হয় প্রতি-ইতিহাস বা এমনকি বিপ্রতীপ-ইতিহাসের সম্ভাবনা। সাবভার্সন, ট্রান্সগ্রেসন, প্রথা ভাঙ্গা (১৩৬) এসব ট্রমার বিরুদ্ধে প্রতিরোধিক রম্যানুরাগ (jouissance –এর ভালো বাংলা আমার জানা নেই) তৈরী করে। লাকাঁ দ্রষ্টব্য এ ব্যাপারে। নবারুণ নিজেও নিজেকে “আমদগেড়ে” বলেছেন। প্রাত্যহিক জীবনে তিনি “দৈন্য”ন্দিনতার আনন্দ দেখেছেন। দুঃখ নয়। এক “celebration of life’’(৪৮)। ফ্যাতাড়ুরা খিস্তি করে, গণ্ডগোল পাকায়। Disruption নিয়ে আসে। প্রান্ত এভাবেই কেন্দ্র কে নিয়ে ছেলে খেলা করবে। ফ্যাতাড়ুদের যাবতীয় প্রান্তদোষ আসলে তাঁদের প্রতি নবারুণের সম্মান (২০)। পুরন্দর ভাট তো নবারুণ বই অন্য কেউ নয়! অপরায়ন (otherization) এর গভীর চক্রান্তকে এভাবেই বিচলিত করতে হয়। ক্ষমতার খোয়াবনামায় ফ্যাতাড়ুরা দুঃস্বপ্নের মত haunt করে। প্রত্যাহত করে কেন্দ্রের ঔপনিবেশিক ট্রমাটাইজেশনের ক্ষমতা কে।
অপর-কে অপর বলে মেনে নিয়ে তাঁকে সেভাবেই সম্মান করে তাঁদের অস্তিত্ব কে স্বীকার করে নেওয়া কে ফরাসী দার্শনিক ইমানুয়েল লেভিনাস এথিকাল এগজিসটেন্সের পরাকাষ্ঠা বলে মনে করেন। ক্ষমতায়িতাত্ম (empowered ‘self’)-এর এথিকাল অ্যাক্টিভিটি কি হবে তা নির্ণয় করবে ব্রাত্য/প্রান্তজনেরা । সেই কারণেই হয়ত নবারুণের লেখায় দলছুট, প্রান্তিক, ‘নেড়ি’ হাভাতে চরিত্রের এত দাপাদাপি। তাঁদের স্বীকার করতেই হবে আমাদের মত বিলাসি-প্রিভিলেজেড মুল্যায়ণকারীদের। এঁদের বাদ দিয়ে রাষ্ট্র যন্ত্র চলতে চেষ্টা করলে বিনুদের লুকিয়ে রাখা ডিনামাইট হারবার্টদের মৃতদেহের মধ্যে দিয়ে বিস্ফোরণ আনবেই। শুধু সময়ের অপেক্ষা। নুনু কামান বা বাল কবিতা সবেতেই আছে ইতিহাস বদলের আভাস, অনাগতের ইঙ্গিত। অস্ত্র চিনে নিতে হবে। ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে হবে। সাথে থাকছেন কমরেড নবারুণ।*


*একটি বিশদতর লেখার অংশ, তাই গাঠনিক অসামঞ্জস্য ও অনেক কিছুই অব্যাখ্যায়িত হয়তো থেকে গেলো। দায় লেখকের।