নবারুণ ভট্টাচার্যের সিনে-রচনা

পরিচয় পাত্র

এই মিতায়তন রচনাটি নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য থেকে নির্মিত চলচ্চিত্রের প্রতি খুব একটা উৎসাহ দেখাতে চায় না। অবশ্য এ কথাও সত্য যে তাঁর কাহিনী অবলম্বনে ছবি তৈরি হয়েছে সাকুল্যে গোটাতিনেক, সবকটির পরিচালকই সুমন মুখোপাধ্যায় (এ ছাড়াও ছবি হয়ত থাকতে পারে, আমার জানা নেই)। এই অ্যাডাপটেশন গুলি নিয়ে নানাজন নানাজায়গায় লিখেছেন অল্পবিস্তর। এখানে এইসব ছবি প্রসঙ্গ আসবেও ঘটনাচক্রে, কিন্তু এই প্রবন্ধের মূল আগ্রহ নিবদ্ধ হয়েছে একটি অন্য এবং অপেক্ষাকৃত অচেনা প্রদেশে। এ রচনাটি কথা বলতে চাইছে নবারুণের ছবি ভাবনা নিয়ে, অন্তত যেটুকু বোঝা যায় তাঁর ফিকশন এবং নন-ফিকশন থেকে। সিনেমা কিভাবে নবারুণের কাছে ধরা দিয়েছে, কোন অবয়বে এসেছে তাঁর গল্প-উপন্যাসে এবং সাক্ষাৎকারে, তার একটা সংক্ষিপ্ত হিসেবনিকেশ করতে চাইছে। তা থেকে তাঁর রচনাবলম্বনে নির্মিত ছবিগুলির নানাদিকও উঠে আসতে পারে।

বাংলা গদ্যসাহিত্যের বিশিষ্ট কুশীলবদের মধ্যে কাউকে কাউকে বেশ ভালরকমের সিনেফাইল বলা যেতে পারে। সুবিমল মিশ্রের রচনায় তাঁর ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে গোদার বা এঞ্জেলোপুলসের ছবি দেখার, নানা কাণ্ড করে হলে প্রবেশাধিকার পাওয়ার কথা আছে। আরও বিস্তারিত লিখেছেন সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, তাঁর আত্মজীবনীপ্রতিম রচনাগুলিতে। ১৯৯০ আর ১৯৯৪ এর ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া (ইফি) দেখার বিবরণ দিয়েছেন সন্দীপন, বিশেষ করে কিছু পছন্দের ছবির, যে তালিকায় পড়ে কুরোসাওয়ার শেষ ছবি ‘মাদাদায়ো’, কিসলওস্কির ‘আ শর্ট ফিল্ম অ্যাবাউট কিলিং’ বা থিও এঞ্জেলোপুলসের ‘ল্যান্ডস্কেপ ইন দ্য মিস্ট’। নবারুণের ছবি ভাবনা এঁদের থেকে কিছুটা স্বতন্ত্র, প্রধানত রাজনৈতিক ভিন্নতার কারণে। মনে রাখা ভাল সন্দীপন সিপিআইএম ঘনিষ্ঠ ছিলেন, নবারুণের মত রাজনৈতিক ডিসিডেণ্ট নন। নবারুণের সিনেমা উৎসাহ, তাঁর সাহিত্যোৎসাহের মতই, রাজনীতি সম্পর্কিত।

বিভিন্ন সাক্ষাৎকার এবং অন্যান্য রচনা থেকে দেখা যায় নবারুণ বারবার যেসব ছবির কথা বলছেন তার মধ্যে পড়ে তাঁরই আত্মীয় ঋত্বিক ঘটকের ছবি, সোভিয়েত সিনেমা, জিলো পনটিকার্ভোর ‘ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’ ইত্যাদি। সোভিয়েত সিনেমার ক্ষেত্রে যেমন স্বাভাবিকভাবেই তাঁর পছন্দের তালিকায় আইজেনস্টাইন রয়েছেন প্রথম সারিতে। রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিষয়ে নানা তথ্যচিত্র বা ‘ফল অব বার্লিন’ এর মত ওয়র প্রোপাগ্যাণ্ডা। আমাদের দেশের লিটারারী ও কালচারাল র্যা্ডিকালিজমের (আমাদের কালচারাল র্যা ডিকালিজম বিষয়ে প্রিয়ম্বদা গোপালের বইটি পড়ে দেখা যেতে পারে) একদা বহতা ধারার অন্যতম এবং সম্ভবত সর্বশেষ যথার্থ উত্তরসূরি নবারুণ, তাঁর ছবি উৎসাহেও সেটি বেশ স্পষ্ট। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাৎসি জার্মানির সোভিয়েত আক্রমণ ভারতীয় গণতান্ত্রিক লেখক শিল্পী বুদ্ধিজীবী সংঘকে উদ্বিগ্ন করেছিল। বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ান ছবিগুলি তাই কমিউনিস্ট পার্টির কাছে অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হয়ে ওঠে পরবর্তীকালে। আইজেনস্টাইনের যে ছবিটির কথা ‘হারবার্ট’ উপন্যাসে এনেছেন নবারুণ সেটি ‘আলেকজান্দার নেভস্কি’। মনে রাখা দরকার আইজেনস্টাইন এই ছবিটি করেছিলেন ত্রিশের দশকের শেষে, যখন নাৎসি জার্মানি এবং সোশ্যালিস্ট সোভিয়েতের মধ্যে সম্পর্কের পারদ চড়ছে। ত্রয়োদশ শতকের রুশ প্রিন্স আলেকাজন্দার নেভস্কি বিখ্যাত ‘ব্যাটল অন আইসে’ পরাস্ত করেছিলেন জার্মান এবং এস্তোনিয়ান আক্রমণকারীদের, রক্ষা করেছিলেন রাশিয়াকে, মৃত্যুর পরে তাঁকে ক্যাননাইজ করেছিল রাশিয়ান অর্থোডক্স চার্চ। ইতিহাসের রূপকে জার্মান ইনভেডারদের উপরে সেই রুশ জাতীয়তাবাদী বিজয়কেই স্মরণ করিয়েছেন আইজেনস্টাইন, ছবি নির্মাণের কয়েক বছরের মধ্যেই যে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে। ‘আলেকাজান্দার নেভস্কি’ এবং ‘ফল অব বার্লিন’ দুই ছবিই স্মরণীয় আর একটি কারণে, রুশ ধ্রুপদী সংগীতের দুই নক্ষত্র, যথাক্রমে প্রোকোফিয়েভ এবং শস্তাকোভিচ, এই দুই ছবির সুরসৃজন করেন। বস্তুত সোভিয়েত সংস্কৃতির, বিপ্লব পরবর্তী সিনেমার, গুরুত্বপূর্ণ দলিল এই ছবিগুলি। ঋত্বিক ঘটক বিষয়ক অন্য এক সাক্ষাৎকারে নবারুণ গ্রিগোরি কোজিন্তসেভের ‘হ্যামলেট’ এর নামভূমিকায় ইননোকেন্তি স্মোকতুনোভস্কির অভিনয়ের কথাও বলেন। এইভাবে প্রাক-তারকোভস্কি সোভিয়েত সিনেমার নানা দিক নিয়েই নবারুণ বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছেন।

‘হারবার্ট’ উপন্যাসে সিনেমা আলোচনার কিছু পর্ব পর্বান্তর মনে করা যেতে পারে। ললিতকুমারের ফিল্ম নির্মাণ ব্যবসায় প্রসঙ্গে এসেছে তাঁর সংগৃহীত অ্যালবামের কথা, যেটিতে বোঝাই ক্লাসিকাল হলিউডের চিত্রতারকাদের ছবি। সেই অ্যালবাম দেখেই বড় হচ্ছে কিশোর হারবার্ট, পরে বামপন্থী আন্দোলনের শরিক দাদার সৌজন্যে তার দেখা হয় সোভিয়েত সিনেমা। সিনেমা বিষয়ক একটি সাক্ষাৎকারে নবারুণ ক্লাসিকাল হলিউড এবং তার সাদা কালো সিনেমাটোগ্রাফি প্রসঙ্গ আনবেন। ঋত্বিক বিষয়ে বলতে গিয়ে বিমল রায়ের কাছে সাদা কালো সিনেমাটোগ্রাফি শেখার কথা উঠবে। সিনেমা ঋত্বিকের মতোই তাঁর কাছেও ডিসকার্সিভ, সন্দর্ভপ্রতিম। সাক্ষাৎকারে বলছেন “ফিল্ম একটা দাস ক্যাপিটাল হতে পারে”। মনে রাখা ভাল দাস ক্যাপিটালকে চলচ্চিত্রায়িত করতে চেয়েওছিলেন সেই আইজেনস্টাইন। সোভিয়েত সিনেমার বিপ্লব পরবর্তী পর্যায়ের দিকে এই ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি। অন্যদিকে ঋত্বিকের ছবির শ্যুটিং সংক্রান্ত নানা স্মৃতি ফিরে আসে নবারুণের কাছে, কোমল গান্ধারের সেই বিখ্যাত খণ্ডিত রেললাইনের দৃশ্য বা সুবর্ণরেখার রেসকোর্স, সীতার পাতাল প্রবেশের প্রথম দিনেই ঈশ্বরের ভগিনীগমন, এসব বারবার তাঁর কথায় ফিরে আসে। যুক্তি, তক্কো আর গপ্পো নিয়ে ঋত্বিকের সঙ্গে মতান্তর, পরবর্তীকালে মত পরিবর্তনের কথাও আসে। শেষোক্ত ছবিটির ঐতিহাসিক স্থানাঙ্ক নবারুণের কাছে স্পষ্ট, তিনি হরেকৃষ্ণ কোঙারের সঙ্গে নকশাল নেতাকর্মীদের আলোচনার প্রসঙ্গ আনেন। সুবর্ণরেখার শিশু বিনু হারবার্টে ফিরে আসে নকশাল যুবক হয়ে, নবারুণের নিজের বয়ানেই সেই সচেতন প্রয়াসের সাক্ষ্য মেলে। ‘ব্যাটল অব আলজিয়ার্স’ নিয়ে তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের প্রেক্ষাপটে এক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধই লিখেছিলেন নবারুণ। অর্থাৎ নবারুণের ছবি-ভাবনা থেকে সেসময়ের ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলন, যা বাম কালচারাল র্যা ডিকালিজমের একটা স্বাভাবিক ফসল, সে সম্পর্কে একটা নির্দিষ্ট ছবি মেলে। ফিল্ম সোসাইটির ইতিহাস চিন্তা যারা করছেন, যেমন ইতিহাসবিদ রচনা মজুমদার, তাঁদের কাছে এ জাতীয় লিটারারী সোর্স গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

হালফিলের ছবি সম্পর্কেও নবারুণ যে খবর রাখতেন তার প্রমাণ মেলে ঋত্বিক আলোচনায় তিনি যখন জাফর পানাহির উপরে ফিল্মমেকিংগত নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন। নবারুণের রচনা সম্পর্কে, অন্য অনেক মার্ক্সবাদী শিল্পীর মতই, জেন্ডার সম্পর্কে কিছুটা অসংবেদনশীলতার অভিযোগ আছে, সমকামিতা বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে এই অসচেতনতার কিছুটা প্রতিফলন ঘটে। তাই নবারুণ আত্মপক্ষ সমর্থনে সমকামিতা বিষয়ক একটি ক্লাসিক ছবির প্রসঙ্গ নিয়ে আসেন, ভিসকন্তির ‘ডেথ ইন ভেনিস’।

নবারুণের রচনায় সিনেমা প্রসঙ্গ কিন্তু হারবার্টে থেমে থাকেনা। চলতেই থাকে। এবং এ বিষয়ে যে রচনাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে সেটি, বলা বাহুল্য, ‘ভোগী’। কিন্তু নবারুণের সিনেমা ভাবনা বা বৃহত্তর অর্থে সংস্কৃতিভাবনাকে ছুঁতে না পারলে তাকে পর্দায় আনা যায় না। আমি ‘কাঙাল মালসাট’ দেখিনি, ‘মহানগর @কলকাতা’ নবারুণের কয়েকটি ছোটগল্প অবলম্বনে এবং সেগুলি খুব প্রতিনিধিত্বমূলক নয় বলেই মনে হয়েছে। ‘লুব্ধক’ ছবি হবে বলে শোনা যায়, কবে হবে জানি না। কিন্তু হারবার্ট, যা প্রথম দর্শনে আমাদের অনেককেই মুগ্ধ করেছিল, তার দিকে এখন তাকালে নানা ফাঁক দেখতে পাই। অনেকসময়েই তাকে উপন্যাসের প্রায় আক্ষরিক অনুবাদ মনে হয়। ছবির যে দৃশ্যটি আমার মনে রীতিমত দাগ কেটে গিয়েছিল সেটির আবেদন অবশ্য অনেকখানি থেকেই গেছে, সেই প্রেসিডেন্সীর সিঁড়ির সঙ্গে ‘ব্যাটলশিপ পোটেমকিন’ এর ওডেসা স্টেপস সিকোয়েন্সের জাক্সটাপোজিশন। সুমন সচেতনভাবেই পোটেমকিন এনেছিলেন, আলেকজান্দার নেভস্কির বদলে, কেননা আইজেনস্টাইনের যুদ্ধজাহাজ অনেক বেশি আইকনিক, ওডেসা সিঁড়ি আরও বেশি করে প্রতিনিধিত্বমূলক এবং সার্বজনীন, নেভস্কির স্লাভ জাতীয়তাবাদ সেখানে অনুপস্থিত।

কিন্তু এরপরেও নবারুণের রাজনীতি আর সিনেমার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কথা বাকি থেকে যায়। নবারুণ স্তালিন সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তাঁর ভূমিকায়। সোভিয়েতে নাৎসি আগ্রাসনের সেই সময় ভারতীয় বামপন্থী শিল্পীদের প্রভাবিত করেছে, করছে এবং পরেও করবে, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ উপন্যাসে তার অজস্র ছাপ থেকে গেছে। তাঁর রচনায় আইজেনস্টাইনের যে ছবি প্রসঙ্গ আসে না সেটি হল ‘ইভান দ্য টেরিবল’। এ ছবি যে স্তালিনকেই লক্ষ্য করে তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই, তৃতীয় পর্ব তাই নির্মাণ করাও সম্ভব হয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে নবারুণের সিনেমা চিন্তা পার্টিজান একটা জায়গাতেই আটকে থাকে কিনা। এই প্রশ্নের উত্তর এবার একটু খোঁজা যেতে পারে।

ঋত্বিক আলোচনায় নবারুণ যে কজন ফিল্মমেকারকে বন্ধনীভুক্ত করেন তাদের তালিকা নিম্নরূপঃ তারকোভস্কি, বার্গম্যান, সকুরভ। এই তালিকাই কার্যত নবারুণের জাত চিনিয়ে দেয়, বুঝিয়ে দেয় সোশ্যালিস্ট রিয়ালিজমে শিল্পের সার্থকতা তিনি খোঁজেন না, এবং সেই খোঁজাকে ‘ভালগার মার্ক্সিজম’ নামে আখ্যায়িত করতেও তিনি ক্লান্তিহীন। তালিকার নামগুলি ভাবা যাক। প্রত্যেকেই কপিবুক বামপন্থীদের কাছে অচ্ছুৎপ্রায়। বার্গম্যানের অস্তিত্ববাদী জিজ্ঞাসা, প্রাক-খ্রিষ্টীয় এবং খ্রিষ্টীয় ইমেজ ভাবনা, আংশিক ভাববাদী দর্শন অনেককেই অখুশি করেছে, ঋত্বিককেও করেছে। তারকোভস্কির সঙ্গে সোভিয়েত রাষ্ট্রের দীর্ঘ দ্বৈরথ সর্বজনবিদিত। আর আলেক্সান্দর সকুরভ? তাঁর এস্থেটিক আর ন্যারেটিভ কোনকিছুই তো সরকারি বামপন্থীদের পছন্দ নয়, পছন্দ নয় তাঁর লং টেক নির্ভর কুখ্যাত মন্থরতা, তাঁর স্লাভ জাতীয়তাবাদের নিশান উড়িয়ে পশ্চিম ইউরোপের উন্নাসিক পর্যটককে নাজেহাল করা। আর সকুরভ ততোধিক বিচ্যুত হন, হতেই থাকেন তাঁর জন্য নির্ধারিত মাত্রা থেকে। একনায়কসুলভ ক্ষমতার অসহ্য ধ্বংসাত্মক প্রবণতা নিয়ে তাঁর টেট্রালজি হিটলার, লেনিন, হিরোহিতো সফর সেরে শেষে ইতিহাস ছেড়ে আশ্রয় নেয় মিথে, শেষ ছবির নায়ক ফাউস্ট। প্রচলিত বামপন্থীর কাছে এই ইতিহাসপাঠ সমস্যাজনক। লেনিন বিষয়ক ছবিটি কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আন্দোলনের চাপে বন্ধও করতে হয়েছিল। নবারুণ প্রমাণ করেন পার্টিজান সিনেমা দর্শন তাঁর নয়, তাঁর ছবি ভাবনা অনেক বেশি ইনক্লুসিভ। তাই ‘ভোগী’র মত একটি মক-ফিল্ম তিনি নির্মাণ করতে পারেন, মক-এপিকের মতই। মক-এপিক অষ্টাদশ শতকের ইংল্যান্ডে যারা লিখতেন, ড্রাইডেন ও পোপ, তারা নিজেদের সমসময়কে এপিকের অনুপযুক্ত বলেই গণ্য করেছেন, তাই মক-এপিক। নবারুণের কাছে তাঁর রিয়্যালিটিতে মহৎ সিনেমা অনুপযুক্ত, ফেস্টিভ্যাল-টুয়ারিং বাংলা সিনেমার বাগাড়ম্বর তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, নয়ত ভোগীর শেষাংশ অন্যরূপ হত। তাঁর রচনার সিনেম্যাটিক পসিবিলিটি কতখানি অসীম হতে পারে তা শুধু বুঝিয়ে দেয় ভোগীর উপসংহার বাদে বাকি টেক্সটটুকু।

ঋত্বিক ঘটক তাঁর সময়ে দাঁড়িয়ে সিগফ্রিড ক্রাকাউয়েরকে পড়তে গিয়ে খুব সুবিচার করতে পারেন নি। ক্রাকাউয়েরের বাস্তবতার অনুপুঙ্খ চিত্রায়ণের দাবী আর আধুনিক ইউরোপীয় সভ্যতার অবসানে হতাশা তাঁর অত্যন্ত অসংগত মনে হয়েছিল। তিনি তাঁর প্রিয় ফেলিনির ছবির উদাহরণ দিয়ে, সোভিয়েত রাষ্ট্রের নানা সাফল্যের দৃষ্টান্ত দিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। আজ ক্রাকাউয়ের আর ঋত্বিক দুজনকেই নতুন করে পড়া হচ্ছে। মিরিয়াম হ্যানসেনের ব্যাখ্যায় বোঝা যাচ্ছে ক্রাকাউয়ের আসলে মডার্নিটির ঐতিহাসিক-দার্শনিক ব্যাখ্যাকেই রূপকের মধ্যে দিয়ে ধরতে চান, ধরতে চান আইডিওলজির নানা অস্বচ্ছ অঞ্চলকে। রিয়ালিজম তাঁর কাছে একটি স্টাইলগত, এস্থেটিক প্র্যাকটিস, সিনেমা মাধ্যমের কোন সারসত্য নয়। দুজনেই আধুনিক মানুষের ক্যাপিটালিস্ট-ইন্ডাস ট্রিয়াল মডার্নিটির বিপর্যয় নিয়ে উদ্বেলিত।

এই উদ্বেগ থেকেই ঋত্বিক ইন্ডিজিনাস সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের কথা বলেন, যদিও সিনেমা ভাবনায় তিনি ট্রান্সন্যাশনাল। নবারুণের সাহিত্যও সেই দিকেই পৌঁছয়, ভালগার মার্ক্সিজম যাকে ব্যাখ্যা করতে পারবে না। ভোগীর আদত গল্পটা পার্টিজান সিনেমা রুচিকে প্রশ্ন করবে, প্রশ্ন করবে ফেস্টিভ্যাল-বিহারী জনবিচ্ছিন্ন ফিল্মমেকারকেও। তাই তারকোভস্কির ‘স্যাক্রিফাইস’ প্রসঙ্গ আসে ভোগীতে, তাই নবারুণের কণ্ঠে আলেক্সান্দর সকুরভ, যাঁকে জারিস্ট বলে ভাবতে ভালবাসেন অনেক বাম। ‘রাশিয়ান আর্ক’ উনিশ শতকীয় পশ্চিম ইউরোপের পর্যটকের গেজের সামনে রাশিয়াকে ডিফেণ্ড করে, পুশকিনের কটু সমালোচনায় রত ফরাসী অভিজাতটিকে তর্কে নামায়। অভিজাত হওয়া সত্ত্বেও ডিসেম্বর বিদ্রোহে যোগদানকারী যে কবিকে লেনিন রুশ জাতীয় সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসনে বসিয়ে গেছেন। ফেস্টিভ্যাল ভ্রাম্যমাণ বাংলা ‘অন্যধারার’ সিনেমার কাছে ভোগী তাই না মেলা অংক, দুর্বোধ্য ডাক, “বদর গাজী বাপ/ কেউটে কুমীর ভল্লুক/ যেন করতে পারি সাফ...”