গুপ্তঘাতক ও ক্রান্তদর্শী

মালিনী ভট্টাচার্য

বিভিন্ন শহরের রক্তস্নাত রাজপথ দিয়ে হেঁটে চলে একটি মানুষ, সমস্ত ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে। সে এটা করতে পারে তার কারণ সে মাঝে মাঝে পরিণত হয় এক দণ্ডবায়সে। তখন সে স্বচ্ছন্দে উড়ে যায় রাশিয়া, কোরিয়া, ইরাক, ইরান এমন কি তার নিজের শহর কলকাতায়। তখন তার এক অদ্ভুত ক্ষমতা জন্মায়। তার বুদ্ধিদীপ্ত চোখদুটো অর্জন করে ত্রিকাল দর্শনের ক্ষমতা। সে অনুসন্ধান করে “এত রক্ত কেন?” সে উত্তর খোঁজে অতীত থেকে বর্তমানের কিছু চরিত্রের মাধ্যমে যারা তার মানসচক্ষে ফুটে ওঠে। টাইম মেশিনে কিছুটা পিছিয়ে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে সদ্যলব্ধ স্বাধীনতা পাওয়া এবং দাঙ্গার স্মৃতি বুকে আঁকড়ানো কলকাতায় সে দেখে ললিতকুমার ও তার সদ্যজাত পুত্র হারবার্টকে।

“হারবার্ট সরকার। পিতা ললিতকুমার। মাতা শোভারাণী। হারবার্টের আবির্ভাব ১৬ই সেপ্টেম্বর ১৯৪৯। ললিতকুমার যুদ্ধের বাজারে কামানো টাকা ফিল্মে লড়িয়ে বুরবক বনে যান। ১৯৫০-এ হারবার্টের এক বছরের জন্মদিনের পরে পরেই চলচ্চিত্রে ব্যর্থ নায়িকা মিস রুবীর সঙ্গে দার্জিলিং-কার্শিয়াং রুটে জিপ দুর্ঘটনায় আরও দুই আরোহী ও ড্রাইভার সমেত খতম।”

ললিতকুমারের বর্ণনায় বেশ একজন ‘মনে ইঙ্গ, রূপে বঙ্গ’ ভদ্রলোককে আমরা দেখি যাঁর নবজাতক পুত্রের নাম তিনি ‘হারবার্ট’ রেখেছেন। তখন কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর সময়। অতএব বিবেকানন্দের ‘পরিব্রাজক’ গ্রন্থের “সাধ করে শিখেছিনু সাহেবানি কত, গোরার বুটের তলে সবই হইল হত” হওয়ার মত, বা বলা ভালো শ্বেতাঙ্গ মনিবকে খুশি করার জন্য ভেক ধরার প্রশ্ন ওঠে না। তবু নবজাতকের নাম ‘হারবার্ট’, হারাধন নয়। কেন এমন ঘটলো তা পর্যালোচনা করতে করতে দন্ডবায়সবুঝল যে স্বাধীনতা লাভকরলেও বেশীরভাগ মানুষ এখনও রুডিয়ার্ড কিপলিং-এর মতাবলম্বী হয়ে বিশ্বাস করে যে White Man’s Burden অনুযায়ী, বাদামী বা কালো চামড়ার মানুষজন নিকৃষ্ট প্রকৃতির এবং তাদের যা কিছু আলোকপ্রাপ্তি হয়েছে তা ওই সাহেব প্রভুদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে অনুসরণ করে এবং পরে ক্রমাগত বিরোধী আন্দোলন হয়ে থাকলেও কোথাও এই ধারণা সকলের মজ্জাগত হয়ে গেছে। তার থেকে আজও বঙ্গদেশে ‘জাম্বো’, ‘টিউলিপ’, ‘কিটো’, ‘ব্রুনো’-দের ছড়াছড়ি।

হারবার্টের সেরকমই এক উত্তরসূরির নাম ‘টয়’। নামটি ভারী ইঙ্গিতবহ। আজকের যুগের ব্যস্ত বাবা-মায়ের কাছে সন্তানের অবস্থানের কিছুটা নির্ধারকও হয়তো।। ইঁদুরদৌড়ে দৌড়তে দৌড়তে বাবা-মায়েরা কুমোরটুলিতে না হোক ফার্টিলিটি ক্লিনিকে অবশ্যই অর্ডার দিয়ে আসে এক নবজাতকের। সঙ্গে থাকে কিছু জন্মসূত্রে পাওয়া যাবে এমন কাঙ্ক্ষিত গুণের ফিরিস্তি। অবশ্য যে শিশু প্রাকৃতিক নিয়মে ভূমিষ্ঠ হয় তার ক্ষেত্রেও কিন্তু এই ফিরিস্তির ব্যত্যয় হয় না। এই গুণাবলীর অন্যতম হচ্ছে বিজ্ঞান মনষ্কতা। যথেষ্ট যুগোপযোগী চাহিদা। যতটা ‘ক্লিনিকাল’ মাইন্ড, ততটাই ‘পড়শির ঈর্ষা— অভিভাবকের গর্ব’। সেই চাহিদার ফলে একটি শিশুমন কখন পরিণত হচ্ছে নিষ্ঠুর প্রাণীহন্তায় তা চক্ষুগোচর হলেও মনোগোচর হয় না। অনেক সময় মনস্তত্ত্ববিদ হলেও নয়। তাই অ্যাক্যুয়ারিয়ামের সমস্ত মাছকে ইমারসন হিটার ডুবিয়ে মেরে ফেলার পরও টয় রেহাই পায় কারণ কিছুদিন বাদে টয়ের বাবা-মা ‘বিদেশী’ ম্যাগাজিনের মাধ্যমে জানতে পারে জনৈক ফরাসি মনস্তত্ত্ববিদ বলেছেন “যে রকম ঠাণ্ডা মাথায়, নির্লিপ্তভাবে এরা (ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের কয়েকজন হত্যাপরাধী শিশু) নিজেদের অপরাধের বর্ণনা দিয়েছে তাতে মনে হয় যে এর মধ্যে কোথাও একটা বিজ্ঞানমনষ্কতার ব্যাপারও রয়েছে”। টয়ের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যতের বড় বৈজ্ঞানিক হওয়ার সম্ভাবনা। তাই টয়ের বাবা-মা এবং মনোবিদ আপাত স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু চাঁদের উলটো পিঠের মতোই টয় যে কোনদিন ‘দ্য ভেল্ট’ গল্পের ওয়েন্ডী-পিটারের মতো পিতৃ-মাতৃ ঘাতক বা স্কুলে আক্রমণ করে শতাধিক লোকের প্রাণ নাশ করা কিশোরদের মতো ঠাণ্ডা মাথার নরহন্তা হয়ে উঠতে পারে তা কারুর মনে হয় না।

দণ্ডবায়স উপলব্ধি করল যে নেশা, যে মাদক এখনো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ঔপনিবেশিক শাসনের ক্ষমতা ধরে রেখেছে তা অনেকটা স্লো পয়জনিং-এর মতো। দশক ভেদে কাল ভেদে এর অনেক নাম— ইকোনমিক ইম্পেরিয়ালিজম, কালচারাল ইম্পেরিয়ালিজম বা এক কথায় নিওকলোনিয়ালিজম। ঘর-বারান্দা এবং গৃহী মানুষদের মনস্তত্ত্বের আঙিনা ছেড়ে বিশ্ব দরবারে রয়েছে কিছু দলিল দস্তাবেজ। যেমন জাঁ-পল সার্ত্র তাঁর ‘কলোনিয়ালিজম অ্যান্ড নিওকলোনিয়ালিজম’ গ্রন্থে ওরিয়েন্টালদের প্রতি অক্সিডেন্টালদের মনোভাব ব্যক্ত করে বলেছেন,
“But the basic attitude has not changed: the natives are killed less frequently but they are scorned collectively, which is the civilized form of massacre; the aristocratic pleasure of counting the differences is sevoured.”
অতএব এই ‘ডিফারেন্স’ মেটাতে এবং হেয় হওয়া এড়াতে সকলে বদ্ধ পরিকর। এই মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান কিন্তু শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের ঔপনিবেশ স্থাপনের থেকেও এক সাংঘাতিক আক্রমণ। ক্বোয়ামে ক্র্যুমা’র বক্তব্য অনুযায়ী,
“In place of colonialism, as the main instrument of imperialism, we have today neocolonialism… [which] like colonialism, is an attempt to export the social conflict of the capitalist countries…”
এই যে ‘সোশ্যাল কনফ্লিক্ট’ তার রপ্তানির প্রারম্ভিক সূচনা কিন্তু ঘটে কতকগুলি শৌখিন সামগ্রীর মাধ্যমে— অন্য স্বাদের খাবার, পানীয়, ভিন্ন পরিধান ইত্যাদি। যারা নিয়ে আসে তাদের নাম মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি। এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জনপ্রিয় দুটি প্রোডাক্ট দেখে বা চেখে দণ্ডবায়সের মন গুনগুন করে বলে ওঠে—
“ঢেপসিরা পেপসিতে লাগায় চুমুক
যত বড় পাছা তার তত বড় বুক”,
আর
“বোকা ছেলে পুচুপুচু কোকাকোলা খায়
বোকাচোদা বাপ তার পয়সা যোগায়”।

এবার দণ্ডবায়স দেখে এই মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলির কাজের ফলে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি কি দাঁড়াচ্ছে। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে ‘আউটসোর্সিং’ শব্দটি এখন অতীব পরিচিত। বিভিন্ন বড় বড় ব্র্যান্ড তাদের ফ্যাক্টরি, আউটলেট আর শোরুম এইসব ধুঁকতে থাকা দেশগুলোয় খুলেছে। সে বিস্ময়ে হিসেব করে নাইকি কারখানার সি.ই.ও একদিনে যত রোজগার করেন তা ওখানকার এক সাধারণ শ্রমিকের ‘৯৮৬৪৪’ বছরের আয়! এবং সেখানে বহিরাগত ডেভিড যখন শ্রমিক আইন এবং অধিকারের প্রশ্নে আন্দোলন করতে চায় তখন আশ্চর্যভাবে সে অপহৃত হয় সে দেশেরই গুণ্ডাদের দ্বারা এবং প্রাণে বাঁচে ইয়োরোপীয়, বা বলা ভালো শ্বেতাঙ্গ হওয়ার দৌলতে। মাল্টিন্যাশনালরা বোঝে তথাকথিত ‘ভালো’ জিনিসের এই ভরা বাজারে খারাপগুলো চালিয়ে দিতে পারলেই বা মন্দ কি! পেপসি খেয়ে ঢেপসি হওয়ায় যে শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতির লক্ষণ চোখে পরেতা তো সবে মাত্র কলির সন্ধ্যে। সিসা মেশানো নুডলস্ খেলে ওই ‘আনকালচার্ড ব্রুট’ গুলোর কি আর এমন যাবে-আসবে! বা যদি ওদের দেশে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলা যায় নিজেদের নাগরিকদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ব্যাহত না করে? বা যদি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ও তার ফলাফলের জন্য ওই দেশগুলোর, আর ওখানকার গিনিপিগগুলোর, ব্যবহার করা যায়? কেমন হয় তবে? বেশী কিছু না— সৃষ্টি হতে পারে এক ‘খেলনা নগরের’।

দণ্ডবায়স ভবিষ্যতের গর্ভে এমন একটা শহরের দেখা পায় যেখানে আছে অতীতের রক্তলোলুপ অধুনা অচল পুতুলের কারখানা, আছে বিষাক্ত একটি নদী, আছে রোগক্লিষ্ট, পুতুলের মতো কিছু জীবন্মৃত মানুষ, আছে শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখা হাতকাটার দল, আছে ভয়ে সাদামুখ, আছে বুদ্ধিবৃত্তি স্থগিত হয়ে যাওয়া বামন, আছে পেপসির বড় ভাই কাফিড্রিলের নেশা, এক্সপায়ারি ডেট পার হওয়া ক্যানড্ ফুড— এবং— তবুও আছে প্রেম, আছে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখা, বন্ধ কারখানা খোলার আশা রাখা ‘৮’ ও ‘৯’। এছাড়াও খেলনা নগরের প্রতীক, বা বলা ভালো অধিষ্ঠাত্রী দেবী হিসাবে আছেন একটি আধপোড়া বার্বি পুতুল যিনি এই সভ্যতার শ্মশানে উচ্চতম স্থানটিতে বিরাজ করেন। বারবারা বা আদুরে সম্বোধনে ‘বার্বি’ এক বালিকার আবদারে প্রথম তৈরি করেছিলেন তার মার্কিন খেলনা কোম্পানিতে কাজ করা মা। মেয়ের আশ মিটছিল না ছোট পুতুল খেলে— তার প্রয়োজন ছিল এমন পুতুলের যে বেশ প্রাপ্তবয়স্কসুলভ কাজ করবে। যেমন ধরা যাক নিজের রূপ-যৌবনের কুহক দিয়ে অন্যের মাধ্যমে স্বার্থসিদ্ধি। আশ্চর্যভাবে সুদূর পশ্চিমের সেই বালিকার ইচ্ছে বহুল জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বর্তমানে খেলনা নগরের ধ্বংসস্তূপে তার দেখা মেলার কারণও কিন্তু সেই কারখানার মালিকের মেয়ের খুব প্রিয় পাত্রী হওয়া। এই খেলনা নগরে যা কিছুই বলি হোক— জন্তু বা মানুষ— সবই তার সামনে লম্বিত হয়।

দৈনন্দিন গতানুগতিকতা ভেঙে একদিন খেলনা নগরে আবির্ভূত হয় একটি শকুন। বেশ্যারা নিদান দেয় যে তা অশুভ শক্তির ও মৃত্যুর প্রতীক। শকুন ছাড়াও পুতুল ঘোরানোর মাধ্যমে ফুটে ওঠে তাদের কুসংস্কার। দণ্ডবায়স শোনে খেলনা নগর থেকে অনেক দূরে বিনু নিজের হারবার্ট কাকাকে কুসংস্কার সম্বন্ধে বোঝাচ্ছে—
“যতদিন হাতে গোনা কয়েকটি লোক লাখ লাখ মানুষকে বোকা বানিয়ে খাটিয়ে মারবে, তাদের ঠকাবে, ততদিন ভূত, তারপর তোমার গিয়ে ঠাকুর-দেবতা-ধর্ম— এই সবই চলবে।”
হাতকাটা ও তার দলবল শকুনটাকে নিকেশ করে ভাবে মৃত্যুকে এড়ানো গেছে। কিন্তু যে মৃত্যু মানুষের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত তা তাদের চোখ এড়িয়ে মৃত শকুনের পেটের ঝুলন্ত ধাতব তার ও ব্যাটারি হয়ে উপহাস করে। আপদ বিদায় হয়েছে ভেবে যখন সকলে উল্লসিত তখন বিপদ কখন যে উইন্ডচিটারের রূপ ধরে এসে দাঁড়ায় তা সকলের নজর এড়িয়ে যায়।

অদ্ভুত জীব উইন্ডচিটার। সে নিজে পরিশেষে নিজের সংজ্ঞা দেয় শুধুমাত্র ‘চিটার’ হিসাবে। সে একদিকে স্বপ্ন দেখায় বিপ্লবের, একদিকে শাসন কায়েম রাখার বন্দোবস্ত করে। সে খেলনা নগরকে পুনরুজ্জীবিত করার কথা বলে, আবার বামন সমেত সেখান থেকে পালানোর ব্যবস্থাও করে। যদি ডান হাতে নির্দেশ করে আনে জীবনদায়ী পরিশ্রুত জল, তবে বাঁ হাতে তাতে অবলীলায় বিষ মিশিয়ে সূচনা করে অ্যাপোক্যালিপ্টিক যুদ্ধের। উইন্ডচিটারের আগমন ঘটে হলিউডি সিনেমার আগত অ্যাপোক্যালিপ্স থেকে একা হাতে সমগ্র মানবজাতির রক্ষাকারী হিরোর মতো, অথবা আমেরিকান ডি.সি কমিকসের সুপারহিরোর মতো, কিন্তু এখানে আদতে তার ভূমিকা বিপরীত। সে স্বয়ং অ্যাপোক্যালিপ্সের অনুঘটক। এই ‘রোল রিভার্সাল’ অন্য রূপে, অন্য মাত্রায়, এক নিদারুণ ব্যঙ্গের মাধ্যমে দণ্ডবায়সের আপনজন ফ্যাতাড়ুদের মধ্যেও দৃষ্ট হয়। ফ্যাতাড়ুরা ডি.সি কমিকসের সুপারহিরো ব্যাটম্যান বা সুপারম্যানের মতোই ‘ফ্যান্টাসটিক’ ক্ষমতার অধিকারী। তারা উড়তে পারে। কিন্তু তারা আদতে অ্যান্টি-সুপারহিরো— তারা এই সিউডো-সুপারহিরোইজমকে শেষ পর্যন্ত ব্যঙ্গ করে। তারা কোন ইউটোপিয়ান পৃথিবীতে আমাদের নিয়ে যাওয়ার বদলে এক ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীকে তুলে ধরে। যে সিস্টেমের চরম অবজ্ঞার ফলেই তাদের জন্ম হয়েছে, এবং যে সিস্টেম ক্রমাগত আমাদেরও পুতুল বানিয়ে চলেছে— সেই সিস্টেমকে আক্রমণের মাধ্যমে তারা তার ঘাটতি, অক্ষমতা, অসহায়তাকে তুলে ধরে। এই সিস্টেমও কিন্তু অপরাজেয় নয়! ফ্যাতাড়ুরা হয়ে ওঠে সিস্টেমের বিরুদ্ধে সর্বদা অবহেলিত, লাথ খাওয়া মানুষের প্রতিভূ। কিন্তু উইন্ডচিটার তা নয়। সে সিস্টেমেরই প্রতিভূ। এই ‘উইন্ডচিটার’ আসলে সেই অশুভ এবং অসীম শক্তিধর দেশগুলির প্রতীক যারা চাইলে প্রবৃত্ত হতে পারত তৃতীয় বিশ্বের কল্যাণেকিন্তু আদতে যারা কেবলমাত্র সেগুলিকে নিজেদের অর্থনীতির সাহায্যকারী খোলাবাজার হিসেবে দেখে এবং প্রয়োজন ফুরোলে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধিৎসার নামে চূর্ণ করে দেয়। উইন্ডচিটার খেলনা নগরের সমস্ত প্রতিকূলতার হাওয়ার বিরুদ্ধে বর্ম হতে পারত কিন্তু সে ‘চিটার’ তাই নির্মম ভাবে নরমেধ যজ্ঞের আয়োজন করেছিলো সকলের। প্রেমিকযুগল কুমার ও জিশাকে দেশান্তরী করার কথা রেখেছিলো জিপবন্দী ব্যাগে তাদের মৃতদেহ গবেষণাগারে স্থানান্তরিত করে। ব্যবচ্ছেদে হয়তো নর-নারীদেহে ফিশনের প্রভাব ছাড়াও বিশ্লেষণ করা হবে কিভাবে এত অভাব-অনটনে প্রেম বেঁচে থাকে!

প্রবল ক্ষমতাশালী হওয়ার পরেও কিন্তু একটা জিনিস অস্বীকার করতে পারেনি উইন্ডচিটার। কম্যুনিস্টদের হত্যা করা অত সহজ নয়। তাই ‘৮’ আর ‘৯’-এর হয়েছিল ‘স্পেশাল বন্দোবস্ত’। হাতকাটাদের দলের প্রাণঘাতী প্রহারের পর তাদের উলটো করা মৃতদেহ ঝোলানো হয়েছিল বার্বিদেবীর সম্মুখে। বলা যায়না যদি নিউক্লিয়ার ফিশনও ওদের না মারতে পারে! এবং তার আশঙ্কা অমূলক না। তাই ‘পৃথিবীর শেষ কমিউনিস্ট’ মারা যাবার রাতেই বাল্টিক নৌ বহরের নাবিকরা বিদ্রোহ করবে, ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিস্টরা অভ্যুত্থান ঘটাবে, অস্ট্রেলিয়ার বন্দরে ছড়িয়ে পড়বে ধর্মঘট, বলিভিয়ায় টিন শ্রমিকরা বিদ্রোহ করবে, আর “লেনিন ও চে-র ছবি নিয়ে লাতিন আমেরিকার প্রত্যেকটা রাজধানী অচল করে দেবে ছাত্র ও মধ্যবিত্ত মানুষ। শ্রমিক ধর্মঘটে অচল হয়ে যাবে ফ্রান্স, ইতালি, গ্রিস, স্পেন... খবর আসবে আফ্রিকা থেকে, আরব দুনিয়া...”। ‘৯/১১’ গল্পে অনেক দূরে রাশিয়ায় দুই কম্যুনিস্টকে দেখা যাবে নতুন একটি খেলা সম্বন্ধে আলোচনা করতে যাতে বিভিন্ন জিনিসকে গুঁড়িয়ে ধূলিস্যাৎ করলেই বেশি করে পয়েন্ট পাওয়া যায়। এমন খেলা খেলছে মূলত আরব সহ বিভিন্ন তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির মানুষ। এক সময়ে এই খেলা ভার্চুয়াল রিয়েলিটির সীমানা পেরিয়ে হয়ে ওঠে রিয়েল। বিশ্বের সর্ব শক্তিমান দেশের স্পর্ধিত মাথা খেলার ছলেই পরিণত হয় গ্রাউন্ড জিরোতে। খেলা একই, অথচ টেবিল ঘুরে গেছে— আর্থার কোনান ডয়েলের অমোঘ বাক্যের মতো— “Violence, in truth, does recoil upon the violent”। তখন দন্ডবায়সের কানে ভেসে আসে পৃথিবীর অন্য প্রান্তের ডেভেলপিং একটি দেশের সর্বহারা হারবার্টের সদর্প ঘোষণা—
“বাওয়াল কেউ থামাতে পারবে না বাবা। সায়েবরা তো রাতদিন ধরে মারল। পারল? সায়েবরা হেদিয়ে গেল তো এরা এল— আরে বাবা ইংরিজি ঝাড়লে যদি বাওয়াল ঠেকানো যেত তাহলে আর দেখতে হত না...”

তবে কম্যুনিস্টদের মত উইন্ডচিটাররাও কিন্তু রক্তবীজের ঝাড়। ক্রমাগত আক্রমণ চলতে থাকে আফগানিস্তানের মত রাষ্ট্রে— জঙ্গিদের সন্ধানে বলি হয় সাধারণ মানুষ। দণ্ডবায়স তার লড়াই থামায় না। না, সে ঘাতক নয়। তার কাজ শুধুমাত্র উইন্ডচিটারদের রক্ষাকর্তার ভণ্ড মুখোশ টেনে খুলে ফেলার— স্বরূপ প্রকাশ করার গুপ্তঘাতকদের। সেই লড়াই সে চালিয়ে যায়, আজীবন— আমৃত্যু। তার মানুষ অবতারের নামেই যে তার কাজ লুকনো আছে। সে জানে তাকে সমস্ত অজ্ঞানতার অন্ধকার ও গুপ্তঘাতকদের ষড়যন্ত্রকে শাণিত আলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে হবে— “সব লণ্ডভণ্ড করে দিতে হবে। নকড়া ছকড়া করে ফাঁৎরা ফাঁই করে বিশ্ব সংসারে একটা তাণ্ডব লাগিয়ে দিতে হবে”। দণ্ডবায়সের অপর নাম যে ‘নবারুণ’!