একটা সাধারণ মেয়ে কি লিখতে পারতেন না, নবারুণ?

অধীশা সরকার

বেচামণিকে মনে আছে? আমাদের ‘কাঙাল মালসাট’-এর বেচামণি গো। মনে আছে তো? এবার, নবারুণকে নিয়ে এই এক জ্বালা। একবার পড়লে যা মনে হবে, দু’বার পড়লে মনে হবে ঠিক তার উলটো। প্রথমবার পড়ে ভাবলাম, এই বেচামণির কাজটা কি এই গপ্পে? মাঝেসাঝে ভরটর হয়, ভাট বকে। তাতে গল্পের অ্যাম্বিয়েন্স তৈরী হয়। ভদির বেটার হাফ হওয়ার সুবাদে সবরকম প্ল্যানপ্রোগ্রামেই সে আছে, টুকুস-টাকুস মন্তব্যও করছে, কিন্তু তার কথায় তো আর কিছু হচ্ছে না। বেচামণিকে কেমন একটা নেপথ্য শিল্পী মনে হয়েছিল প্রথমবার কাঙাল মালসাট পড়ে। তারপর, আবার পড়লাম। তখন কিন্তু মনে হল, নেপথ্যে যে আছে, তার ভূমিকাটা বেশ বড় মাপের। ক্যানভাসে ছবি আঁকার সময়ে একটা বেস কালার দিতে হয় না, সেরকম। ওই রংটা তো দেখাও যায় না তেমন। কিন্তু ওটা না থাকলে ছবিটা ধরে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা মুশকিল হত। সেরকমই, ভদির জীবনে ও ফ্যাতাড়ু-চোক্তারের মিলিত বিদ্রোহঘোষণার আয়োজনে, বেচামণি যেন নেপথ্যের সেই ক্যানভাস, সেই সুপারভাইজিং ম্যানেজার, যে কিনা একটু দূর থেকে নজর রাখছে, কার্য্য-কারণ মনে করিয়ে দিচ্ছে, আর প্রয়োজনে এখানে একটু প্যাঁচ মেরে, সেখানে একটু পেরেক ঠুকে, প্ল্যানপ্রোগ্রাম মেরামত করে দিচ্ছে। বেচামণির গুরুত্ব কাঙাল মালসাটে যাকে বলে ‘বিটুইন দ্য লাইনস’।
মজা পেলাম একটা ছোট্ট জিনিস লক্ষ্য করে। ভদিকে বেচামণি ‘গদি’ বলে ডাকে। কেন? কারণ ‘সোয়ামী’র নাম মুখে আনতে নেই। এই অব্ধি শুনেই নারীবাদীরা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন তো? স্বাভাবিক। কিন্তু, এক মিনিট। স্বামীর নাম ধরে না ডেকে বেচামণি কি ‘উনি’ বা ‘ওগো’ বলছে? উঁহু। সে নামটা একটু পালটে নিয়ে সেই নাম ধরেই ডাকছে কিন্তু। ভদিকে বলছে গদি। মানে, ভদিকে একটা নতুন নাম দিয়ে, সেই নাম ধরেই ডাকছে। এইটা বুঝতে পেরে অন্তর থেকে ধ্বনিত হয়েছিল, ‘সাব্বাশ!’
নবারুণের শিকড় যদি বুঝতে হয়, তাহলে ‘সাবভার্শান’ শব্দটা মাথায় রাখতে হবে। নবারুণ যাদের কথা বলেন, তারা সমাজের নর্দমার তলায় বাস করে। সিমোন দ্য ব্যুভিওর পৌঁছয়নি তাদের কাছে। এমনকি, আমাদের ঘরের মেয়ে তসলিমা নাসরিনও নয়। তাদের সমাজে বৌ বরকে নাম ধরে ডাকেনা, এটা নিয়ম। সবচেয়ে খাণ্ডারনি বৌটিও এটা শুধুই নিয়ম বলে মেনে চলে, বরকে দু’বেলা ঝ্যাঁটা মারলেও। সেখানে এটাই লক্ষণীয়, যে বেচামণি নিয়মটা মানছে না। বরং, নিয়মটার প্যারোডি করছে একরকম। তাকে বলা হয়েছে স্বামীর নাম ধরে না ডাকতে। সে এই নিয়মটাকে আক্ষরিক নিয়েছে। যা স্বামীর পরিচিত নাম, তা ধরে ডাকছে না। টেকনিক্যালি কারেক্ট আছে সে। একটা নতুন নাম দিয়ে সেটা ধরে ডাকছে। নিয়মের ফাঁক বের করে সেই ফাঁক দিয়ে জিভ ভ্যাঙাচ্ছে। ধরতে গেলে উড়ে পালাবে। ফ্যাঁত ফ্যাঁত, সাঁই সাঁই।
এই হল এক নবারুণের নারী। সাবভার্সিভ। নেপথ্যের পরিচালিকা। যার বাইরেটা মোটাসোটা আহ্লাদী গিন্নীর, কিন্তু ভেতরে ভেতরে মাতাহারি মেটিরিয়াল। সে অর্থে, বেশ রোমহর্ষক।
আবার পুরন্দর ভাটের স্বপ্নের নারী আরেকরকম।
“হব না ননদ, হব না জায়া
হব সরকারী হোমের আয়া।
সুপারের সনে, যাব কচুবনে
রচিতে নধর মিলনমায়া।
না রবে পিত্তি, না রবে হায়া।
হয় এসপার, নয় ওসপার
দেখিবে জগৎ যুগলছায়া
হব না ননদ, হব না জায়া”
এখানে তো প্রত্যক্ষভাবে চূড়ান্ত নারীবাদী ছবি তুলে ধরেছেন নবারুণ। সেই আয়া রচনা করেছেন, যে ননদ ও জায়া হয়ে সামাজিক প্রতিষ্ঠানের শিকলবদ্ধ হতে পরিষ্কার অস্বীকার করছে। বরং সুপাররুপী শ্যামরায়ের সঙ্গে যমুনার অভাবে কচুবনে যুগলছায়া রচনাই তার অভিসন্ধি। ‘না রবে পিত্তি, না রবে হায়া’। সেক্সুয়াল ফ্রিডম। নারী তার নিজের শরীরের অধিকার নিজে বুঝে নিচ্ছে। লজ্জাশরমের চোখরাঙানিকে বক দেখিয়ে। এখানেও সাবভার্শান। সে তো আর নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের বয়স্থা বেকার মেয়ে হয়ে এই যৌন স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখতে পারে না, তা সম্ভব নয়। ফলে, সে আয়ার প্রফেশন বেছে নিচ্ছে, যাতে হাতের কাছে সুপার ও কচুবন দুইই পাওয়া যায়। উপরন্তু, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা দিয়ে ‘নৈতিক’ বাগড়া সামলাতেও যাতে সে সক্ষম হয়। এক ঢিলে দুই পাখি, তথা ফ্যাঁত ফ্যাঁত, সাঁই সাঁই।
কাঙাল মালসাটের মেয়েরা এমনই। subversive and subtle। কিন্তু তারা কোনোভাবেই সফিস্টিকেশনের প্যাকেজে মোড়া পুতুল নয়। আঁতলামির ওড়নাঢাকা বিবিসাহেব নয়। তারা লক্ষীকান্তপুর লোকাল মার্কা। কিন্তু তারা নারী হিসেবে উন্নত। উন্নতির এক অন্য রাস্তা আবিষ্কার করেছে তারা। ঝাণ্ডা নিয়ে ভাংচুর নয়, মিষ্টি হেসে চোখ মেরে বা ল্যাং মেরে কাজ আদায়। নিয়মের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ নয়, মুচকি হেসে নিয়ম ব্যাপারটাকে স্রেফ পাত্তা না দিয়ে কাটিয়ে দেওয়া। আজকালকার ভাষায় একটি শব্দে তাদের ‘বিন্দাস’ বলা যেতে পারে।
অথচ, আবার, কি আশ্চর্য্য, পুরন্দর ভাটের লেখা এই কবিতাটা পড়ে মদন বলে ওঠে— “তোমার দু’টো গানেই দেকচি মেয়েদের হ্যাটা করার একটা ধান্দা”। তাই বলি, নবারুণ খুব ট্রিকি। তাঁকে সহজে বোঝা যায়না। তাছাড়া, এমনিতেও, গল্পের কোন চরিত্রটা যে আসলে লেখক তা তো খুব ধোঁয়াটে একটা বিষয়। কারণ এই কাঙাল মালসাটেই আবার, একটু পরের দিকে, এই ছড়াটি পাওয়া যায়।
“জানি না লো দিদি, কোন দোষে বিধি,
এই কুলাঙ্গার কূলে।
মোরে পাঠাইয়া, রাখিল গাঁথিয়া,
বিরহ বিশাল শূলে”।
“এইমত ট্র্যাজিক অবস্থায় আসিয়া পড়িল কাঙাল মালসাট। সাহারা দেবার কেহই নাই... তাই সে কোনো ধর্মান্ধ রাম-খচড়া রচিত ‘বিধবা-গঞ্জনা’ নামক ‘বিষাদ-ভাণ্ডার’ হইতে ওই গানটাই কাঁদিয়া উঠিল”। এই অব্ধি পড়েই মনে হয়, আজও বিধবাদের ‘সাহারা দেবার কেহই নাই’ একথাও ঠিকই, কিন্তু তাদের কি ‘সাহারা’ (মরুভূমি নয়) প্রয়োজন? তবে, ওই যে বললাম... নবারুণ খুবই ট্রিকি। হঠাৎ আবার ‘রাম-খচড়া’ শব্দবন্ধটিও চোখে পড়ে যায় কিনা? আর বিধবা-গঞ্জনা আর বিষাদ-ভাণ্ডার এই দুই শব্দের প্রয়োগ কোটমার্কের মধ্যে হল কেন? – এই প্রশ্ন মাথায় কুটকুট করতে থাকে।
অন্যদিকে, ডিএস, মদন, পুরন্দর ‘ঢেমনি মাগী’ সম্বোধন করে থাকে পুকুরধারের একলা মেয়েকে। তাকে ‘সাইজ করার ধান্দা’ করে। কিন্তু যেই বড়লোক আসে ‘মোটরগাড়ি বাগিয়ে’, অমনি সেই মেয়ে তাতে উঠে পড়ে। ক্লাস স্ট্রাগল। সে তো বুঝলাম। হ্যাভস অ্যান্ড হ্যাভ নটস। কিন্তু হ্যাভ নটের পীড়া বোঝাতে গিয়ে নবারুণ ‘ঢেমনি মাগী’ ব্যাপারটাকে সেই কমোডিটি হিসেবে উপস্থাপিত করেছেন যা হ্যাভ’দের আছে, আর হ্যাভ নট’দের নেই। খুবই ছোট্ট রেফারেন্স, সন্দেহ নেই। কিন্তু আশঙ্কার কারণ হিসেবে যথেষ্ট। যে সমাজের কথা নবারুণ কাঙাল মালসাটে তুলে ধরেন সে সমাজে এমনটাই স্বাভাবিক তা মেনে নেওয়া গেল। কিন্তু... যা ‘স্বাভাবিক’ তার সাহিত্যে প্রতিফলন কি সর্বদাই শুধু স্বাভাবিকতার খাতিরেই, এবং গল্পের অ্যাম্বিয়েন্স এবং প্লটের স্বাভাবিকতা বজায় রাখার খাতিরেই, অবিকল অমনটাই থেকে যাবে? স্বাভাবিকের অস্বাভাবিকতা কি ফ্যাতাড়ুদের চোখে পড়বে না, এক্ষেত্রে? কারণ, দু’একটা অক্ষর দিয়ে তৈরী একটা বা দু’টো শব্দের ক্ষমতাও কখনো কখনো শব্দটির চেয়ে অনেক বৃহৎ। কারণ শব্দ বহন করে মানে, আর মানে বহন করে ইতিহাস ও সামাজিক প্রেক্ষাপট। যেমন শব্দের মানে এই জিনিসগুলো বহন করে, একইভাবে, গঠনও করে। এই বহন আর গঠন সম্বন্ধে নবারুণ কি খানিকটা উদাসীন নন?
বলা যায় না। চমকপ্রদভাবে, ‘মসোলিয়াম’ উপন্যাসে এসে হাজির হয় ‘খানদানি খানকি’। নাম শুনেই যারা হাঁহাঁ করে উঠবেন তাঁরা বাকিটাও পড়ুন। এই নারীচরিত্র এন্ট্রি নিয়েই এই বক্তব্য রাখে –
“- বিজনেস ইজ বিজনেস। কক সাহেবের নিকট হইতে তিনমাসে যে পরিমাণ রেস্ত কামাইব তাহা দশ বছর কলকেতার বাবুদের সহিত খিটকেল খেলা করিলেও জুটিবে না। ইহা সত্য যে খানকি জীবনে তোমাকেই আমি প্রেমিক বলিয়া পাইয়াছি। কিন্তু সে কারণে জাত ব্যবসায় লালবাতি জ্বালাইতে পারি না।
- তিনমাস পরে যে তুমি ফিরিয়া আসিবে তাহার কি কোনো গ্যারান্টি আছে?
- বিচিত্র এ জীবনে কোনোকিছুতেই গ্যারান্টি নাই শিবনাথ। গরানহাটা হইতে খানকিজীবন শুরু করিয়া আজ কক সাহেবের দয়ায় মাল্টায় যাইতেছি – এমনটি যে হইবে তাহা কি জানা ছিল? ভাবিতাম লম্ফ জ্বালাইয়া পোকা ধরিয়া ধরিয়া কোলাব্যাঙের ন্যায় লাইফ কাটিবে। বলা যায় না, মাল্টা হইতে আবার কোনো সাহেব নয়া বুকিং করিয়া কোনো অজানা বন্দরে লইয়া যায়”।
যদি না এমন চিত্তাকর্ষক নামের নায়িকা একথা বলত, আর যদি না ব্যবসার খুঁটিনাটি বলা থাকত, খুব আলাদা করা যেত কি সংলাপকে আজকের যে কোনো ‘কেরিয়ার-কনশাস’ উচ্চমধ্যবিত্ত তরুণীর ‘অ্যামবিশাস’ বক্তব্যের সঙ্গে? এখানেই নবারুণের ফ্যাতাড়ুবৃত্তি, আবারো, এবং সাবভার্শন। যৌনকর্মীকে উনি ‘খানকি’ বলেন বটে, কিন্তু তাকে ‘ভিক্টিম’ বানান না। সে এক সফল ব্যবসায়ী, এবং সেটা নবারুণের কলমে খুবই সোজাসুজি আসে। সেভাবে ভেবে দেখতে গেলে, যে হাতে কলম ধরে লিখছে সে লেখা বিক্রি হবে বলে, সেও তো শরীরের অংশ বিশেষই বিক্রি করছে, তার মানে। শরীর বিক্রি সেই অর্থে কে না করছে? এবং, যা বিক্রি হচ্ছে তা তো ক্রেতা আছে বলেই বিক্রি হচ্ছে। তবে যৌনকর্মীকে একজন সোজাসাপটা ব্যবসায়ী হিসেবে দেখতে অসুবিধে কোথায়? অনেকেই হয়তো আগেও এ প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু নবারুণ কোনো প্রশ্ন তোলেননি। তিনি শুধু খুব স্বাভাবিকভাবে তাঁর নিজস্ব লজিক দিয়েই দেখেছেন ‘খানদানি খানকি’কে।
এবার যাওয়া যাক অন্যান্য লেখায়। যেমন হারবার্ট। আর তার কাঁচের শো-কেসে দেখা পরি থেকে বুকির স্তন দর্শনের অভিজ্ঞতা। ‘নারী’ ব্যাপারটাকে মনুষ্যপ্রজাতির প্রাণীসমুহ হিসেবে না দেখে একটা ‘কনসেপ্ট’ হিসেবে দেখা। পুরুষের ইল্যুশনে আর যৌবনোদ্গমের প্রাক্কালে নারীমূর্তির যে ভূমিকা, শুধু সেটুকুই। আর অন্যদিকে হারবার্টের জেঠিমা। রীতিমত ডিস্ফাঙ্কশনাল স্বামীকেও যিনি পরম শ্রদ্ধায় বয়ে নিয়ে চলেছেন। অন্যদিকে হারবার্ট আর তার কাকার মধ্যে যে বিরোধ তা থেকে পরোক্ষভাবে হারবার্টকে রক্ষা করলেও, সংসারে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমনটা হয়ে থাকে আর কি। মাঝে মাঝে নস্টালজিয়াগ্রস্ত হয়ে গান ধরেন – ‘সখী, কেমনে যমুনাজলে যাই?’ ওই, যেমনটা হয়ে থাকে আর কি। হারবার্টের নারীরা সাবভার্সিভ নন। তাঁরা শুধুই প্লট এলিমেন্ট। বা তার সামান্য বেশী কিছু। নবারুণের ‘যুদ্ধ পরিস্থিতি’ উপন্যাসের মেখলাও তাই। উদ্বিগ্ন হওয়া, কান্নাকাটি করা, শোকার্ত হওয়া, ‘ভালো’ প্রমাণিত হওয়া, এবং শেষপর্যন্ত এসবের মাধ্যমে একটি নিটোল ট্র্যাজিক হিরোইন হয়ে ওঠা— এছাড়া মেখলার কিছুই করার ছিল না। বিপ্লবের স্বার্থে বলিপ্রদত্ত সেই নারী কি ‘মহান’? কে জানে। কিন্তু তাঁর এই মহত্ব কতটা আরোপিত একজন মেয়ের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, সেটাও প্রশ্ন। প্রশ্ন এটাও, যে ‘বিপ্লবের সেবাদাসী’ হওয়ার মধ্যে আদৌ কি কোনো স্বাতন্ত্র আছে? উপন্যাস হয়তো সেই ট্র্যাজিক হিরোইনই দাবী করেছিল। সে কথা লেখকই জানেন। কিন্তু পাঠক? সেও কি দাবী করেছিল মেখলার চরিত্রে একজন ট্র্যাজিক হিরোইন? হয়তো সেও করেছিল। বা করেনি। অথবা, লেখকের কাজ পাঠকের মন রেখে চলা নয়। তবে, লেখকের কাজ কি পাঠকের মন তৈরী করা নয়?
আবার, অন্যদিকে তাকানো যাক। নবারুণের সেই লাস্যময়ী অনন্যা যার নাম ফোয়ারা। সেই ফোয়ারা, যে গলির মুখে এসে দাঁড়ালে “বৌ পাশে ভদ্দরলোকেরা হাঁদা বনে গরমে যেত”। “ফোয়ারা শুকিয়ে যাচ্ছে আর লোক এত বড়, এত বিদ্বান যে জানবেই না?” বোঝা যায়, নবারুণের চোখ জ্বালা করে ফোয়ারার জন্য। ফোয়ারা যদি মরে যায় তিনি নিলাম হয়ে যাবেন। এতটাই, যে ফোয়ারার গভীর অসুখ তাঁর ভেতরেও বাসা বাঁধে। তাই তাঁর সঙ্গে ফোয়ারার মাখামাখি বেশ কয়েকটা গল্পেই তাঁর “দেমাকের শিকড় ছিঁড়ে” প্রকাশিত হয়ে পড়েছে, অপ্রকাশিত থাকতে পারেনি আর।
নবারুণের নারীদের নিয়ে এই দোলাচল বেশ অবাক করে। উনি ওনার নারীদের নিয়ে অনেকটাই ভাবেন, মনে হয়। কখনো আবার মনে হয়, তেমন ভাবেনও না। ওঁর গল্পের বুনোটে খুব স্বাভাবিকভাবে যে নারীরা উঠে আসে তাদের উনি নেড়েচেড়ে দেখেন। মাঝেমধ্যে, খেয়ালখুশি মত, তাদের এক আশ্চর্য্য সুপারউওম্যান বানিয়ে ছাড়েন। আবার, মাঝেমধ্যে, তাদের প্রতি অসম্ভব নির্লিপ্তি দেখা যায় লেখকের। নারীর ব্যাপারে নবারুণ কি তবে দোটানায় ছিলেন? নাকি গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি কখনো নারীকে?
এসব প্রশ্ন অনেক বড় ক্যানভাস দাবী করে। তবে এর বাইরেও নবারুণের লেখা থেকে একটা সত্য উঠে আসে তাঁর নারীচরিত্রদের সম্বন্ধে। তাদের তৈরী করা হয়েছে এক অতিমাত্রায় রোম্যান্টিসাইজড ইডিওলজিক্যাল একটা মডেলে। তাদের মধ্যে ধুসর উপত্যকা খুবই কম, পুরুষচরিত্রদের তুলনায়। নবারুণের বেচামণি বা খানদানি খানকি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একটা দু’টো ছবি দিয়ে যেতে পারে পাঠককে, কিন্তু নবারুণের দেখা নারীর সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে একরকম ডিসকাউন্ট করেই চলে, বলা যায়।
তবে, উল্টোদিকে এও বলা যেতেই পারে যে সার্বিক দৃষ্টিভঙ্গি কোনটা সেটা কে ঠিক করে দেবে? বেচামণি বা ফোয়ারার যে সামাজিক অবস্থান, সেখানে তাদের ছবিটা বেশ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবেই ফুটে উঠেছে। তাও ঠিক। তবু... নারীসত্বার যে দিকগুলো একদিকে নারীবাদী এবং অন্যদিকে মিসোজিনিস্ট হওয়ার জন্য সবচেয়ে বিতর্কিত, সবচেয়ে রগরগে এবং সবচেয়ে এক্সট্রিম, শুধু সেগুলো নিয়েই কেন ঘেঁটে গেছেন নবারুণ? কেন তাঁর নারীরা হয় উগ্র নয় ম্যাদামারা? হয় তারা অ-সাধারণ অথবা তারা শুধুই গল্পে ঠেকনা দিতে রয়েছে। নবারুণ কি একটা সাধারণ মেয়ের গল্প লিখতে পারতেন না? সেও কি ফ্যাতাড়ু হয়ে ওঠার চান্স পেতে পারত না? এর পর মনে পড়ল বেবি খানকি’র কথা। বেশ কয়েকটা গল্পে সেই পেট্রলখেকো বারাঙ্গনার দেখা পাওয়া গেছে। “ভেরি স্পেশাল। হার ওনলি ফুড ইজ পেট্রল’। শেষ পর্য্যন্ত ‘আমেরিকান পেট্রোম্যাক্স’ গল্পে ৩৭ জন আমেরিকান সোলজার তাকে টেবিলের ওপর তুলে নাচাতে লাগল আর মুখে গুঁজে দিল একটা কিং-সাইজ মার্লবোরো সিগারেট। তারপর ‘বেবি কে’ আকা বেবি খানকি ইতিহাস, থুড়ি, মলোটভ ককটেল হয়ে গেল। যেমন হা্রবার্টের মৃতদেহ হয়ে গিয়েছিল মানববোমা। না, বেবি কে প্রত্যক্ষভাবে বিপ্লবী নারী নয়, হারবার্টও বিদ্রোহী পুরুষ নয়। তারা দু’জনেই নবারুণের বিদ্রোহী সত্বার এক একটি বিস্ফোরনীয় প্রতিফলন। তাদের দিয়েই বিস্ফোরণ ঘটান নবারুণ, কিন্তু তারা সে কথা নিজেরা জানে না। কিন্তু হারবার্টের ওই মানববোমা হয়ে যাওয়ার মূহুর্ত পর্য্যন্ত তার জীবনের যে ধারাবাহিকতা, তার মধ্যে দিয়ে একটা রক্ত-মাংসের মানুষ পাই আমি পাঠক হিসেবে। কিন্তু বেবি খানকির স্বতন্ত্রতাটা তাকে ম্যাজিক রিয়ালিজম’এর আওতায় ফেলে দেয়। রিয়াল হয়ে সে ওঠেনা। হয়ত, সে দরকারও নেই। তার ভুমিকা ওটুকুই। প্রশ্ন হল, তার ভুমিকা ওইটুকুই বা কেন? নবারুণের খানকিরাও স্বভাবতই অসাধারণ। নবারুণ কি একটি সাধারণ, রক্তমাংসের খানকির গল্পও লিখতে পারতেন না?