শেষ মাতাদর

অগ্নি রায়

এই সভ্যতা সবাইকেই অ্যাকোমোডেট করে। যারা চে গুয়েভারা হতে চেয়েছিল তারা চাপরাশি হতে পেরেছে। নবারুণ, তোমার চলে যাওয়াই ভাল। আজ হো চি মিন সরণি জুড়ে শপিংমল।
--সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

সদ্য লিটারেট দাদা বৌদির কোলেপিঠের আহ্লাদে বেড়ে উঠে, অকাদেমির প্রসাদী ফুল বুকপকেটে রেখে যে সব স্পনসরকরোজ্জ্বলেরা কবিতা এবং পাল্প ফিকশনের নামে ছড়াচ্ছেন লোকাল ট্রেন খ্যাত মাজন আর মলম, তাঁদের বাতানুকূল ফিলগুড ডানলোপিলোতে একটি একটি করে ডিনামাইট স্টিক পুঁততে পুঁততে দিগন্তের দিকে ওই তো হেঁটে চলেছেন নবারুণ ভট্টাচার্য।

শারীরিক প্রয়াণের পর এখনও পর্যন্ত যে এক বছরের পথ চললেন তিনি সেদিকে তাকালে এই ছবিটাই ফ্রেম কেড়ে নিচ্ছে। সেই কবেই তো ছাপার হরফে নবারুণ ভট্টাচার্য ঘোষণা দিয়েছিলেন যে এই অস্থির কুটিল সময়ে দাঁড়িয়ে ‘নিরাপদ সাহিত্যের ঢ্যামনামি’ তিনি করবেন না।

‘নিরাপদ সাহিত্য’ কী ও কেন এই নিয়ে অনেকবার অনেক প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল নবারুণদার সঙ্গে। কথা হয়েছিল সেই সব সেফ এবং পলিটিকালি কারেক্ট, শপিংমল-কাঁপানো কবি পরিচালক সাহিত্যিকদের নিয়েও, যাদের অনেকেই অধুনা সরকারি কমিটিগুলির মেম্বারশিপ কুপনের জন্য আখাম্বা জিভ বের করে দৌড়াচ্ছেন। যেন গান, কবিতা, নাটকমেলার বাঁশ ও শালুর টেন্ডারটিও ছাড়া
যাবে না! যতক্ষণ পিচে রান আছে চেটে লে ভাই, জিলে ল্লে (তিন দশক আগে কিমি কাৎকার খচিত টারজান ছবিতে বাপ্পি লাহিড়ীর সেই গানটি এখানে স্মরণীয়)! চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে একঘণ্টা ঠিকঠাক খাঁজে ও খোপে ঘানির তেল ঢাললে বাকি জন্মটা যদি গাদা পেটি-সহ ঘ্যাম ঘ্যাম মাছ ভেজে খাওয়া যায়, তবে তো সেটাই ফায়দামন্দ। ফাঁকে ফোকড়ে পেজ থ্রি-র ডবকিনীর সঙ্গে নঙ্কাই-পঙ্কাই খেলো, জার্সি গরুর মত রূপসীদের নিয়ে ফিতে কাটো সকাল সন্ধ্যায়। সে ছবি প্রচারমাধ্যম আলো করুক। সাহিত্যযশ তখন এমন খেলবে যেন বিজ্ঞাপনের কন্যার কেশদামে জবাকুসুমের মস্তকলন্দর! চাড্ডি অপোজিশনও পোষা হবে মেজারার দিয়ে মাপা।

মোদ্দা এই তো ব্যাপার?

নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য যাপনের স্থানাঙ্ক যদি এই মানচিত্রে খুঁজতে যাই তবে দুর্গন্ধ গোলকধাঁধার মধ্যে ষন্ডমানব মিনটারের দিকে কৃতসংকল্প থিসিউস যাত্রার ছবিটাই ভেসে ওঠে যেন। যার হাতে খাপ খোলা তলোয়ার। বিষয়বস্তুকে যা ভাষার ধার বা ‘এজ’ দিয়ে বারবার আক্রমণ করেছে সবটুকু আদায় উসুল করে নেওয়ার জন্য। আমাদের যৌবন কেটে গিয়েছে দিব্যি এই জেনেই যে ঈশ্বর এবং কবিতা বা ছবির কাছে কেউ মধ্য মেধা আশা করে না। কিন্তু আজ-কাল-পরশু যখন মাঝারি এবং নিম্ন মেধাকে স্টেজে তুলে টুনি-বাতাসা দিয়ে উৎসব কীর্তন করছে— তখন ঠিক এক বছর আগে প্রয়াত এই সাহিত্যিকের ওই চাবুক উক্তিটিকে আবার ফিরে দেখতে ইচ্ছা করে।

শহরের রাতচরা গ্লোসাইন যারা এখনও বাইফোকাল অ্যাডজাস্ট করে পড়তে পারেন, তারা মাত্রই জানেন, যে ষাটের দশকে সিয়া (সি আই এ) যেভাবে বেনামে ডলার ঢালত আভা গার্দ প্রয়াসকে কিনে নিতে, চেষ্টা করা হত তাদের গলার স্বর, লেখার কলম, দেখার চোখ, গিটারের তার— মোটা, ধুর ও বেতো করে দেওয়ার— অধুনা বঙ্গীয় সংস্কৃতিতে সেটাই হয়ে আসছে। ও মশা ও মাছি ও প্রেম ও হাসি— এখন সব্বাইকে যে মহামায়ার দোকান স্পনসর করে থাকে! বরাত অবশ্য এক একক্ষেত্রে এক এক রকম।

নবারুণের একটি ব্যাকহ্যান্ড স্ম্যাশ এখানে উদ্ধৃত করি। ‘‘আমি শুধু এটুকু বলতে পারি যে, যে তাগিদ থেকে আমি লিখি তার সঙ্গে বাজারের সম্পর্ক প্রায় নেই বললেই চলে। ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক রদবদলের যে বিচিত্র ও ট্রাজিক সময়ের আমি সাক্ষী তার অনুরণন আমার আখ্যানে রয়েছে— কখনও আমি অংশীদার এবং সব সময়ই ভিক্টিম।’’ নিজেকে তৃতীয় বিশ্বের লেখক বলে মার্কা মেরে দিয়ে তিনি এ কথাও বলছেন, ‘‘অমানবিকতা এবং তৎসংশ্লিষ্ট আবশ্যিক যে বুজরুকির সার্কাসের মধ্যে আমরা রয়েছি তার সঙ্গে কোনওরকম আপোষ অসম্ভব।’’

এখানে একটি কথা বলে নেওয়া খুব জরুরি। বিজন ভট্টাচার্য এবং ঘটক পরিবারের থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া লাল নিশানটি (যা তাঁর কবচকুণ্ডলও বলা চলে) যে শেষপর্যন্ত গোটা বিশ্বেই একটি স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে তা বুঝতে না পারার মত কাণ্ডজ্ঞানহীন নবারুণ ভট্টাচার্য ছিলেন না। সোভিয়েত পতনের শব্দ তাঁর ঘরের দরজাকে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ক্রমে। কমিউনিজমের পথে মুক্তির দিশা ক্রমশ স্বৈরতান্ত্রিক গুলাগে পরিণত, এবং ক্রমশ তার তাসের ঘরের পরিণতিপ্রাপ্তি তিনি দেখেছেন। নবারুণের বোঝার বাকি ছিল না, পাস্তেরনাক, মায়াকোভস্কি, সনঝেনেতসিন, আখমাতোভার মত লেখক-কবিদের নিয়তি। আর তাই বোধহয় তাঁর প্রথম যৌবন বা মধ্য বয়সের লাল পতাকার স্বপ্ন বিশ্বাস শেষপর্যন্ত জাদুবাস্তব, ইলিউশান এবং কখনও কখনও ফ্যান্টাসির চেহারা পেয়ে গিয়েছে। অনেকেই জানেন, পাশ্চাত্য ধ্রুপদী মিউজিকের আকর্ণ ভক্ত ছিলেন নবারুণদা। তাঁর অন্যতম প্রিয় কম্পোজার চাইকভস্কির শেষ সিম্ফনির (‘প্যাথেটিক’) শেষ মুভমেন্ট ‘ল্যামোন্টোসো’-র মতই পুড়তে পুড়তে শেষ হয়েছে তাঁর বিশ্বাসের রূপবদল। পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে তাঁর ‘খেলনানগর’ উপন্যাসের মত। যেখানে সমস্ত লাশ ডাঁই করে সাজিয়ে পেট্রল জ্বালিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়।

এই প্রসঙ্গে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের নবারুণ সম্পর্কে একটি মন্তব্য মনে করা যেতে পারে। সন্দীপন বলছেন, ‘তার (নবারুণের) পকেট খুঁজলে পাওয়া যাবে গজ ফিতে। গোপনে বা আড়চোখে সর্বদাই নবারুণ দেখে চলেছে কে কতটা বাড় বেড়েছে।’ রাজনৈতিক বিশ্বাসের এই ধ্বস্ত কালবেলায় দাঁড়িয়ে ওই আগুনেরও হিসাব তিনি তলে তলে করে গিয়েছেন তাঁর জীবন ও সাহিত্যে। একইসঙ্গে দু’টি প্রক্রিয়াকে তিনি দেখেছেন এবং দেখিয়েছেন। এক, সুপরিকল্পিতভাবে গত কয়েক দশক ধরে সহজলভ্য এবং রংদার পণ্যের গোত্রে নামিয়ে আনা হচ্ছে সাহিত্যকে। সহজপাঠ্য এবং পাউডার চর্চিত করা হচ্ছে গদ্যভাষা। দুই, ক্ষমতাকেন্দ্র বা শাসক সুকৌশলে সমস্ত কিছুকেই তার নিজের ভিতরে নিয়ে নিচ্ছে। স্বাধীনতা, পরিবর্তন, গণতন্ত্র, মৈত্রীর ধাপ্পা মেরে বাইরে থাকা আভা গার্দ, থার্ড স্টিম, আন্ডারগ্রাউন্ডের সমস্ত নোটস-এর উপর প্যান অপ্টিকান আলো ফেলা হচ্ছে। ক্ষমতার চূড়ায় বসে রয়েছে মুখহীন জোকারটি। তার নজরদারি এবং খবরদারির বাইরে যেন কিছু না থাকে। গোটা নবারুণ-সাহিত্য এই প্যান অপ্টিকান আলোর বিরুদ্ধে একটি পাল্টা এবং তির্যক আলো ফেলতে ফেলতে গিয়েছে বলে আমার ধারণা। যে আলো ছাড়েনি কাউকে। যে সব গণমাধ্যম, রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র, পুঁজিবাজার— বাইরে থেকে যাদের স্বরূপ চট করে বোঝা যায় না— ফ্যাতাড়ু বাহিনী তার উপরে নিরন্তর বিষ্ঠা বর্জনই করেনি, তাদের ন্যাংটো করে ছেড়েছে। নবারুণ জানেন, শুধুমাত্র গুজরাত, পশ্চিমবঙ্গ বা গোবলয়ের ব্যাপার এ নয়, গোটা বিশ্বেই সাংস্কৃতিক দমননীতির মধ্যে এই অদৃশ্য মেঘনাদবাহিনী কীভাবে ছড়িয়ে রয়েছে।

স্টিফেন স্পেনডার তাঁর ‘দ্য সিচুয়েশন অব ইয়ং রেবেলস’ প্রবন্ধে ষাটের দশকের মার্কিন মুলুকের সিআইএ-র যে ভূমিকার কথা জানিয়েছেন, একটু দেশকাল এবং চামড়ার রং বদলে নিলে, আহা তা যেন আমাদের এই বঙ্গসমাজেও খাপে খাপ হয়ে যায়। স্পেন্ডার সাহেব বলেছেন, ‘যুব সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং আন্দোলনগুলিকে কখনও বেনামে ছদ্মবন্ধুর বেশে ডলার যুগিয়ে গিয়েছে সিআইএ। কথনও কংগ্রেস ফর কালচারাল ফ্রিডাম বা অন্য কোনও সংস্থার নামে উদার হস্তে অর্থ ঢালা হয়েছে বিভিন্ন তথাকথিত আভা গার্দ পত্রপত্রিকাকে। তাঁর কথায়, গোপনে এই সমস্ত সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলিকে কোথাও ভোঁতা করে দিয়ে কখনও নিজেদের রাজনৈতিক কাজে লাগিয়ে পত্রপত্রিকার স্বাধীনতার বারোটা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের চোখে পাগল এবং বদমাশ দুই অনুপযুক্ত। এরা যুক্তির বাইরে। কেননা বাইরে রাখলে তাদের শাসন করা যাচ্ছিল না।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিষণ্ণ পতনঘণ্টা শোনার পরেও যে সলতেটি নবারুণ জ্বালিয়ে রেখেছিলেন তাঁর শেষদিন পর্যন্ত সেটি এই ক্ষমতার মেঘনাদ অবতারের বিরুদ্ধেই। তাঁর নিজের কথায়, ‘‘আমি এই সভ্য সমাজ সম্পর্কে খুব স্কেপটিক। এদের দৌড় আমার জানা আছে। সে তো আমরা বাংলার বুদ্ধিজীবীদের সাম্প্রতিক চেহারা দেখেই বুঝতে পারছি। এরা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের যে ঘরানা, ঐতিহ্য সবটাকে নষ্ট করবে। ...এইভাবে এরা সোল্ড আউট হয়ে গেল। লজ্জার ব্যাপার। কি সিনেমা, কি থিয়েটার, কি পেইন্টিং বিভিন্ন ফ্রন্টের লোকেরা এই যে ব্যাপারটা করল তা খুবই লজ্জার, নিন্দার এবং দে হ্যাভ গট টু বি কমব্যাটেড। এবং আমি তা করব। এটা হচ্ছে আমার রাজনৈতিক দায়িত্ব। ফ্যাতাড়ুরা টোটালি আমার পলিটিক্যাল কনসাসনেসের এক্সটেনশান।’’

এটা অবশ্য বলার অপেক্ষা রাখে না। পশ্চিমবঙ্গের মার্ক্সিজমকে যিনি চিরটাকাল ‘ভালগার মার্ক্সিজম, এবং ‘মেকানিকাল মার্ক্সিজম’ বলে আখ্যা দিয়ে গেলেন, নিজে আনখশির কমিউনিস্ট হয়েও মনে করলেন, ‘ভুল মার্ক্সবাদ আমাদের দেশের বারোটা বাজিয়েছে’, ফ্যাতাড়ু সন্ত্রাসকে যে তিনি তাঁর অন্যতম প্রহরণ করবেন— সেটাই যেন স্বাভাবিক। এই প্রসঙ্গে নবারুণ-পাঠক তাঁর কৃশকায় গল্পগ্রন্থটিকেও (‘প্রেম ও পাগল’) আবার স্মরণ করতে পারেন। উপন্যাস ও গল্পের যৌক্তিক কাঠামোর আধারেই তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু অজস্র দগদগে চিহ্ন সারা শরীরে নিয়ে গদ্য সেই কাঠামো থেকে প্রায়ই বেরিয়ে গিয়েছে। চলে গিয়েছে যুক্তির আউটসাইডে। যুক্তি ও যুক্তিহীনতা, অর্থ এবং অর্থহীনতা, পলিটিক্যাল মিথ ও ফ্যান্টাসি, নিরাপদ জীবন এবং অন্ত্যজ রেললাইনের পাশের ছাইগাদার জীবনের মধ্যে তাঁর লেখা নড়াচড়া করছে। যেখানে তৈরি হচ্ছে এবং বহুদিন ধরে চলতেই থাকবে নতুন নতুন বিস্ফোরণের সম্ভাবনা।

কমোডকে রাজসিংহাসন হিসাবে যারা দিব্যি চালিয়ে দিচ্ছে, সেই ‘এনলাইটেন্ড’ শাসককূলের রক্তচাপ ক্রমশই বাড়িয়ে দিয়ে।