মৃত্যুর নবারুণ ধর্মীতা

শুদ্ধসত্ত্ব ঘোষ

মৃত্যুর সব চাইতে মজা হল যে সে নিশ্চিত। জন্ম ততটা নিশ্চিত না। নারী পুরুষের সঙ্গমে জন্ম হবেই এমন কোনো কথা নেই। সেখানে কাজ করছে চান্স ফ্যাক্টর অথবা প্রোবাবিলিটি। কিন্তু যা জন্মাচ্ছে তার মৃত্যু হবেই। বিজ্ঞান ক্লোনিং করছে। মানুষের ক্ষেত্রেও ধরা যাক ক্লোনিং শুরু হল। তাতেও কিন্তু মৃত্যু আসছে। যে দেহে তার প্রাথমিক মনন এবং আমিত্ব গড়ে উঠেছে সেই দেহ ছেড়ে তাকে অন্য দেহ নিতে হবে। চেতনাও যে এক হবে তার এখনো কোনো নিশ্চয়তা নেই। এ ব্যতিরেকে অন্য কোনো ভাবেও যদি মানুষকে অমর করার চেষ্টা করাও হয় তাহলেও দেহ উপাদানের ক্ষয়িষ্ণুতার কারণে তাকে বদলাতেই হবে। অতএব আবারো মৃত্যু। মৃত্যুর এই নিশ্চিত উপস্থিতি থেকে শুরু হচ্ছে আমাদের জীবন প্রবাহ।
মৃত্যুকে নিয়ে আমাদের চেতনায় তাই একটি স্বরাঘাত থেকেই থাকে। লেখকের মধ্যে আরো বেশী করে তার চিহ্ন থেকে যায়। ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, গল্প লেখক, কবি, গীতিকার সকলেই কোনো না কোনো আঙ্গিকে কোনো না কোনো ভাবে মৃত্যুকে রচনা করে থাকেন। জাতি বা রাষ্ট্র মৃত্যুকে রচনা করে থাকে। আদিম মানুষ মৃতদেহকে কবর দিচ্ছে। মৃতের ব্যবহৃত বস্তু কবরে দিচ্ছে পরবর্তী ব্যবহারযোগ্যতার কারণে। যেভাবে পরমাত্মীয়র বিদেশযাত্রায় তার সঙ্গের বিষয়বস্তু গুছিয়ে দেওয়া হয়। এই গুছিয়ে দেওয়ার মধ্যে থাকে তার প্রতি শুভেচ্ছা। এবং এই গুছিয়ে দেওয়া যখন মৃতর ক্ষেত্রে হয় তখন থাকে আত্মপরিচর্যার একটি ধরণও।
মৃত্যু মানে শেষ একে মানতে পারা কঠিন কাজ। অতএব মৃতের পরবর্তী জীবনের কল্পনা। এই মৃতটির যদি পরবর্তী জীবন থেকে থাকে, তাহলে আমারও থাকবে। জীবন পেয়ে গেলে, জীবনের রস পেয়ে গেলে মৃত্যুকে মানতে পারা কঠিনতর। যখন গোষ্ঠীতে ধনবৈষম্য এসে দাঁড়ায়নি তখন সকলের জন্যই এ রসের সমান অবস্থান। অন্যান্য আকাঙ্খাগুলিতে জীবনে কম-বেশী চোট খেলেও তা পূরণের সম্ভাবনা অথবা তাকে প্রতিস্থাপনের সম্ভাবনার জন্যও সময় জীবনে দীর্ঘ হওয়া আবশ্যক। সেই দীর্ঘের কোনো অবসান হয় না। এক আকাঙ্খা থেকে অন্য আকাঙ্খার জন্ম হয়, বাড়তে থাকে। এই বৃদ্ধিই মানুষকে নিয়ে গিয়েছে অমরত্বের খোঁজে।
ধনবৈষম্যের সমাজে এই অমরত্বের খোঁজ একদলের পক্ষে আবশ্যিক হয়ে উঠেছে, অন্যদলের ক্ষেত্রে এ খোঁজের গুরুত্বও কমেছে। ফ্যারাওদের দেহ রাখা হচ্ছে পিরামিডে। তার ভেতরে তার জন্য যাবতীয় ধনরত্নাদি, বিলাস সামগ্রী জীবনের যাবতীয় প্রয়োজন এবং তার ব্যবহারের বিষয় সব সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেওয়ালে দেওয়ালে এঁকে দেওয়া হয়েছে জীবনের কার্ণিভাল। মৃত্যুর প্রখর গাম্ভীর্যকে ভোঁতা করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে ফ্যারাও-এর ক্ষমতা। শিল্প ঐতিহাসিক ভ্যান লুন এই কার্ণিভালকে ধরেছেন। আবার শাসিতের জন্য কিন্তু পিরামিড না।
যদি পয়সা খরচ করার জোর থাকে তাহলে মৃতদেহের নাকের ফুঁটো দিয়ে লোহার আঁকশি ঢুকিয়ে ঘিলু-টিলু টেনে বের করে নেওয়া হবে। বাকী যা বেরোবে না তা ওষুধ দিয়ে বের করা হবে। পেটের দু পাশ ফ্লিট ছুরি দিয়ে কেটে বের করে নেওয়া হবে অন্ত্র ও পাকস্থলী। তারপরে আরো নানা পদ্ধতির ব্যবহার আছে। কিন্তু পয়সা না থাকলে এ সব কিছুই করবে না। সোজা পায়ুদ্বার দিয়ে সিডারের তেল ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। বন্ধ করে দেওয়া হবে পায়ুদ্বার। সেই তেল বেশ কিছুদিন শরীরে থেকে ওই পেছন দিয়েই গলিয়ে বের করে দেবে অন্ত্রাশয় ইত্যাদি। আরো পদ্ধতি তারপরে ব্যবহৃত হবে।
মিশরে মমি তৈরীর পদ্ধতি এগুলো। সোজা কথায় ফ্যারাও হলে পেছনে কিছু হবে না। কিন্তু গরীব হলে মরে গেলেও পেছন মারা হবে। সে কাজ চলতে থাকবে সাধারণ মমি বানানোর পদ্ধতি থেকে সাধারণ কবরের দিকে। এমনকি শাভান্তি পুতুলের সংখ্যার উপস্থিতিতেও তার প্রভাব। প্রাচীন মিশরে জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য যে সব নির্মাণ সে সব নির্মাণের জন্য অধিবাসীদের বছরে একদিন করে স্বেচ্ছাশ্রম দিতেই হত। অসুস্থ হলে বা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকলে তার জন্য বদলি শ্রমিক পাঠাতে হত।
যে ধনী সে অবশ্যই বদলি শ্রমিক পাঠাত। মিশরীয় বিশ্বাস জীবনে যা যা কিছু ঘটে, যা যা কিছু লাগে তার সবটাই লাগে মৃত্যুর পরেও। আইসিসের দরবারেও এমন শ্রম দিতে হয়। অতএব সেই দরবারে শ্রম দেবার জন্যও ধনী লোকটি যতবছর ধরে যতজন বদলি শ্রমিক পাঠিয়েছে ততগুলো শাভান্তি পুতুল তার সমাধিতে দিতে হবে। সেই পুতুলের সংখ্যা দেখলেই বোঝা যায় সমাজে এর ধনগত অবস্থান কেমন! এভাবেই মৃত্যু নির্মিত হতে থেকেছে সমাজে ও রাষ্ট্রে।
এই নির্মাণের বিপরীতে জমে উঠেছে নবারুণের মৃত্যু খেলা। 'মসোলিয়াম' এ মার্শাল ভদিকে মমি করে টাকা ঊপার্জনের ফিকিরটা দেখলেই একটা সূত্র বেরিয়ে আসে। সেই মমি করে রাখা এবং সেই মমিকে দেখিয়ে জনগণ ও পয়সাওলাদের থেকে মাল কামিয়ে নিয়ে ফ্যাতাড়ু, চোক্তার সমূহকে পালন-পোষণ করা। এবং অবশ্যই বুলগাকভের খেলা এ না। বুলগাকভের শয়তান এবং তার সাঙ্গোপাঙ্গরা অনেক বেশী গুরুগম্ভীর। তাঁরা মৃত্যু নিয়ে তির্যক না। নবারুণের ভদি, দন্ডবায়স, বেগম জনসন অথবা বন বেড়াল যথেষ্ট বাঁক সম্পন্ন।
এই বাঁকেরও জন্ম মৃত্যু থেকে। কিন্তু সোভিয়েত দেশে মৃত্যু এবং বাংলায় মৃত্যুর মধ্যে ফারাক রয়েছে। সে ফারাক রচনার ক্ষেত্রও রয়েছে। 'খোঁচড়' গল্পটাকে যদি প্রাথমিক ক্ষেত্র ধরি তাহলে ফারাক আঁকতে সুবিধে। এবং আমরা বিপ্রতীপেই কথা বলব। পুলিশের পোষা খুনের ঘাড়ের কাছের চুলকানিটা খসখস করলেই খুনের সম্ভাবনা জাগে। অস্থির যৌনতা, পায়ুকাম, রিভলভার সব মিলে মিশে একটি সত্তর দশক জেগে ওঠে। যে দশকে পশ্চিমবঙ্গে গভর্নর ডায়াস মানুষের উপকারী পশুদের অবস্থা নিয়ে খুব চিন্তিত থাকেন এবং এমার্জেন্সির মধ্যে দিয়ে অজস্র লাশ কাশীপুর-বরানগর-গান্ধী নগর - যাদবপুর-নকশালবাড়ি কত কত জায়গা থেকে আরো অন্ধকারের দিকে মার্চ করে চলে যায়।
সত্তরের দশক মুক্তির দশক। সত্তরের দশক তেভাগা-তেলেঙ্গানার বিশ্বাসঘাতকতার উপযুক্ত উত্তর দেবার দশক। ব্রিটিশের পায়ের তলায় নানা জাতি মিশ্রিত এক মহাভূমি ধুঁকছিল। তার কিছু শব্দ আমরা 'নবান্ন'-তে শুনেছি এবং শুনতে পাইনি। বিজন ভট্টাচার্য্যের নাটকটির শুরুর দৃশ্যে বাঁশ ফাটার আওয়াজ শোনা যায় নেপথ্যে, যখন গ্রামে হামলা হয়। গুলির শব্দ ছিল সে সব। নাট্য নিয়ন্ত্রণ আইন, সোভিয়েতের সঙ্গে ব্রিটিশের বন্ধুত্বের জন্য ফ্যাসীবিরোধী জোটের যুক্তি মেনে সে শব্দ হয়ে গিয়েছিল বাঁশ ফাটার শব্দ।
সেই বাঁশ ফাটার শব্দ ১৯৪৭-এর পরে আর সম্পাদিত হল না। বুলেটে, রাইফেলে আছড়ে পরছিল। তেভাগা-তেলেঙ্গানায় জনতা লড়াই দিতে উঠে দাঁড়াচ্ছিল। নবারুণের 'বুড়া কাহার' আখ্যানে সেই বুড়া কাহার যে রাইফেল লুকিয়েছিল, তার কাছে চলেছেন সদ্য নির্বাচিত এম এল এ অনিলচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। বুড়া কাহার পুরোনো কমরেড। জোতদারকে জায়গা ছাড়েনি আজ-ও। অনিলচন্দ্রের গাড়িতে জোতদারকে ভেট তুলতে দেয় না। অনিলচন্দ্র ফিরে যান, ছেচল্লিশের কমরেড, অ্যাসেম্ব্‌লিতে জানাবেন রাস্তা দরকার, পানীয় জল দরকার ইত্যাদি। চাপ দেবেন।
অনিলবাবু ফিরে যাবার সময় বুড়া কাহারকে জোতদারের লোক মারে। সেই রণক্ষেত্রে বুড়া কাহার রণদামামা বাজায় একা। আওয়াওয়াওয়াওয়াওয়া! কত লোক এই আওয়াজে একসময় পাল্টা দিত। রাইফেল আর দশটা গুলি লুকোনো। অনিলবাবু - রাজাবাবুদের জমানা হলে জমা দেবে বুড়া কাহার। অনিলবাবু বলে যান জমানা হয়নি, পরের ভোটে যদি হেরে যান তাহলে হবে না। বুড়া কাহারের একা যুদ্ধে আজ কেউ নেই। কেউ আসে না। সব কেমন শান্ত হয়ে গেছে। দৌলতের ব্যাটা ফরমান, জোতদারের ব্যাটা জোতদার মেরে যায় তাকে। পুলিশ এসে দাঙ্গার অভিযোগে ধরে নিয়ে যায় বুড়া কাহারকে।
না, এই প্রেক্ষাপটে মৃত্যু নেই। মৃত্যুর ভূমিকা আঁকা আছে। সেই মৃত্যু আসবে 'খোঁচড়'-এ। গৌতম বিশ্বাসকে খুন করতে বেরোবে থানা থেকে ঘাতকের দল। পাড়ার জলসার মধ্যেই প্রকাশ্যে গুলি করে মেরে দেবে। এক রাউন্ড-এ হয়ে যেত, দু রাউন্ড লাগল, হাত বেশী চুলকেছে ঘাতকের বলে। এই হাত আবার অনেকটাই ব্রেখটের 'লার্নিং প্লে'-র উল্টো মত। সমবায়কে সিদ্ধান্ত নিতে দেওয়া বেশী বুদ্ধিমত্তার কাজ। ব্যক্তির চেয়ে সমবায়ের দৃষ্টি সুদূরপ্রসারী বেশী। এই ছিল ব্রেখটের 'দ্য মেসার টেকেন' নাটকটির মূল বিষয়। এখানে ঘাতকের হাত অতি ক্ষুদ্র এক সমবায়ের দাসত্ব করছে। ইন্দিরা গান্ধীর এমার্জেন্সির দাসত্ব করছে। কংগ্রেস ক্লিকের দাসত্ব করছে।
হেইনে ম্যুলারের পালটা নাটক 'মাউসার' যেখানে দুই ব্যক্তি ক এবং খ দোলাচলে ভুগতে থাকে, তাদের কাজ বিপ্লবের শত্রুকে খুন করা। দুজনেই দোলাচলে আক্রান্ত হয়। খ-কে বিপ্লবের স্বার্থে খুন করেছিল ক। পার্টির আদেশে। ধীরে ধীরে সে খুন করার মধ্যে একধরণের যৌনতার উত্তেজনা পাচ্ছিল। সেই উত্তেজনা একদিন চলে যায়। সে আর খুন করতে পারে না। দোলাচলে পরে। সে দোলাচলের জন্য যখন তাকে মিলিটারি কোর্ট অভিযুক্ত করে তখন সে মেনে নেয় সে দোষী। সমবায়ের সিদ্ধান্তকে সে কাজে পরিণত করতে পারছে না। নাটকের কোরাসের যে মিলিটারি কোর্টের কাজ করছে তার সঙ্গে মিলিত হয়েই সে একসময় নিজেরও মৃত্যুদন্ড দাবী করে। ব্যক্তি সমবায়ের মধ্যে হারিয়ে যায়।
'প্রতিবিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক' আখ্যানে নবারুণ আবার ফিরিয়ে দেন আমাদের সমবায় থেকে ব্যক্তির সঙ্কটে। ম্যুলারের বিপ্রতীপে তিনি এই চরিত্রটিকে আঁকেন যে ভালবেসেছিল, বন্দী ও নির্যাতিত হয়েছিল। যে নিজেকে অনেকদিন যত্ন নেয়নি বলে একদিন যত্নও করতে গেছিল। সে যত্নের পরিণতিতে নিজেকে তার মত আরো কারোর সহযোগিতায় খুন করে। বা আত্মহত্যা করে। করে কি? নবারুণ ধোঁয়াশা রেখে দিয়েছেন। বা রাখেননি। যখন আমরা জানতে পারি যে ম্যুলারের নাটকে খ একদিন ক দ্বারা খুন হবে এবং সম্ভাব্য গ ক-কে খুন করবে আবার। এই শৃঙ্খল ভাঙতে, ধরা পরে অত্যাচারিত না হতে চেয়ে নবারুণের চরিত্রটি তার বিপ্লব সম্ভাবনাকে খুন করে শান্ত স্নিগ্ধ বৌদ্ধ হয়ে বসে। ট্রেনে ওঠে। শেষবারের মত বুধগ্রহ থেকে কলকাতা এসে ফিরে যাবে বলে। আর একটি বিভৎস মৃত্যুকে নবারুণ অতি উদাসীনতার সঙ্গে লিখে দিয়ে যান। চরিত্রটির মাথা রেলের কামরা থেকে বাইরে করে ঘুমন্ত দুলতে থাকা অবস্থায় লাইট পোস্টে লেগে গুঁড়িয়ে, থেঁতলে যায়।
মৃত্যু খুব স্বাভাবিকতায় এসে দাঁড়ায় না। এইখান থেকে বিজন ভট্টাচার্য্যের বিপরীত রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেন নবারুণ।
"যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়
আমি তাকে ঘৃণা করি-
যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে
আমি তাকে ঘৃণা করি-
যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী
প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না
আমি তাকে ঘৃণা করি-
আটজন মৃতদেহ
চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে
আমি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছি
আট জোড়া খোলা চোখ আমাকে ঘুমের মধ্যে দেখে
আমি চীৎকার করে উঠি
আমাকে তারা ডাকছে অবেলায় উদ্যানে সকল সময়
আমি উন্মাদ হয়ে যাব
আত্মহ্ত্যা করব
যা ইচ্ছা চায় তাই করব।"
- এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না
মিশরের ফ্যারাও-এর মৃত্যুর মধ্যে যে মৃত্যুকে অস্বীকার করার লোভী প্রবণতা ছিল তা নবারুণের জন্য না। সত্তরের আগুন ক্রমে নিবে আসে। ভেঙে যেতে থাকে বিপ্লবী সংগঠন দল উপদলে। তার মধ্যেই 'যুদ্ধ-পরিস্থিতি'-র রণজয় পাগলখানা থেকে বেরিয়ে ট্রেনে উঠে বসে। কথায় কথায় লোকজনকে বুঝিয়ে দেয় সে নকশাল। খোঁচড় গল্পের ঘাতক বসাকের চেহারা পেয়ে যায়। লুড়কুৎগুলোকে খুন করে করে যে পোক্ত হয়েছে। রণজয় বুড়া কাহারের মত লুকিয়ে রাখা রাইফেলের খোঁজে আসে কলকাতায়। তার বুধগ্রহ, তার মুক্তাঞ্চল যা মুক্তির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে তার স্বপ্নে, সেই মুক্তাঞ্চল রক্ষা করতে রাইফেল লাগবে। প্রতিবিপ্লবী সে নয়।
সত্তরের ঘাতক বসাককে এর আগে একবার সে অ্যাটেম্পট করেছে। বসাক মরেনি। বসাক ভেবে পায় না কী করে উন্মাদ রণজয় তাকে মনে রাখে। রণজয় কি বসাককে মনে রাখে? নাকি রণজয় মৃত্যুকে মনে রাখে? অজস্র অসংখ্য মৃত্যুই তাকে ফিরিয়ে ফিরিয়ে আনে কলকাতা। যুদ্ধপরিস্থিতিতে ফিরিয়ে আনে। পঞ্চাশে সদ্য ক্ষমতা এল বলে চলেছে, কাজ হচ্ছে এবং হবে। ষাটে বোঝা যাচ্ছিল কাজ হবার থেকে অনেক বেশী অকাজ হচ্ছে। শাসক কংগ্রেসের নেতাদের একচ্ছত্র দুর্নীতি এবং নগ্ন ক্ষমতায়ন, আর উন্নয়নের নামে দেশের যাবতীয় আর্থিক রাজনৈতিক স্বাধীনতা বেচে দেওয়া শুরু হয়ে গিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে এভাবে বেশীদিন নেই। ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়-এর রাস্তা ধরে এল নকশালবাড়ি।
নকশাল আন্দোলন ভেঙেছে নানা কারণে। সে কথার দিনকাল আজ নয়। কিন্তু সত্তর পরবর্তী বেশ কিছুকাল স্বপ্নগুলো রয়ে গিয়েছে আঁচে। রক্তের দাগ, ডুমো মাছির তৃষ্ণা, ঘেমো কারখানার দিনরাত্রি তখনো অনেকের যাপনের অঙ্গ। বুলেটের খোলগুলো, বোমার দাগ সব ধুয়ে দেওয়া যায়নি জলে। সেই সব দাগছাপের মৃত্যু উঠে এসেছে নবারুণের কলমে। সে তখন নির্মম। পাঠকের সত্তর পরবর্তী যে শান্তিপ্রবাহ, যে তিল-তুলসী জীবন, যে দিবানিদ্রার সাহিত্য তাতে রক্ত স্প্রে করে দিতে উঠে এসেছে মৃত্যু।
কিন্তু তখনো শুরু হয়নি কার্ণিভ্যাল। থমকে আছে। ওই লাইনগুলোর আক্ষেপে থমকে আছে। 'সব মরণ নয় সমান'। প্রতিক্রিয়াশীলের মৃত্যু হাসের পালকের মত, বিপ্লবীর মৃত্যু পাহাড়ের। তখনো উঠে আসছে মাত্র কয়েকশো বন্দুক নিয়ে শুরু হয়েছিল লং মার্চ। বেশীরভাগ অস্ত্র সাধারণ জীবনের অস্ত্র। শত্রুর থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে সে অস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে। নইলে অস্ত্র কেনার সামর্থ্য কই? অথবা অস্ত্র কিনতে গিয়ে মাদক পাচার চক্রের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। বিপ্লব বে-লাইন হয়ে যেতে পারে।
নকশালবাড়িতেও পুলিশ ও জোতদারের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে শুরু হয়েছে যুদ্ধ। যে হরেকৃষ্ণ কোঙার সুন্দরবনে গিয়ে কৃষককে লাঠি ধরতে বলছেন সেই হরেকৃষ্ণ কোঙারই শিলিগুড়ির পার্টি অফিস থেকে নামিয়ে দিতে চাইছেন কমরেড মাও-এর ছবি। শিলিগুড়ির কমরেডরা পার্টি লাইন মানে না। পার্টির কোন লাইন? একবার লাইন হচ্ছে ব্রিটিশ বন্ধু, একবার লাইন হচ্ছে শত্রু। একবার লাইন হচ্ছে তেভাগা সামলানোর ক্ষমতা নেই, অন্যবার লাইন হচ্ছে ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়। কোন লাইন? কোন পার্টি? ভেঙেছে এর মধ্যেই। সি পি আই ভেঙ সি পি আই (মার্কসিস্ট)। লাইন ঠিক হচ্ছে না তবু। সি পি আই লেজুড় হয়েছে কং-এর। দিল্লী থেকে আসল গাই/ সঙ্গে বাছুর সি পি আই। তারপর? তাদের সঙ্গেই আবার হাত মিলিয়ে জোট? কোনটা লাইন? উল্টোদিকে আট দলিলের দিন উঠে এসেছে। এই সব স্রোতের মধ্যে আচমকাই নকশালবাড়িতে কৃষক বিদ্রোহে ফেটে পরল।
যুক্তফ্রন্ট। কোঙারবাবুদের মন্ত্রীত্ব। 'কালচার না বোঝা' এক পরবর্তীর রেকর্ডধারী মুখ্যমন্ত্রী তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁদের পুলিশ গুলি চালিয়ে দিল। বুড়া কাহারকে তো ধরে নিয়ে গিয়েছে মাত্র। এখানে পুলিশ শুইয়ে দিল কৃষক রমণী, কৃষক সন্তানদের। পুলিশ কার? রাজ্য কার? দেশ কার? আর যার হোক নয় চাষার! এই সব বিষ্ফোরণের টুকরো আশিতেও বেঁচে ছিল। গন্ধ ছিল বারুদের। তখনো পি ডাবলু জি, এম সি সি, পার্টি ইউনিটি আলাদা। সি পি আই মাওয়িস্ট জন্ম নেয়নি। লিবারেশন তখনো মুখোশ খুলে সোজা সংসদীয় লেজুড় হবার রাস্তা ধরেনি। কাজেই নবারুণের লেখার মধ্যে থেকে যে সব মৃত্যু উঠে আসছে তা ভারী।
তা মানবিকও! অস্ত্র, বিপ্লব, বর্বরতা ছাড়াও মৃত্যু আসে। যেমন ফোয়ারার গল্পে, দেহোপোজীবিনী ফোয়ারার জন্য তার মস্তান প্রেমিকের আকুলতা উঠে এল। এবং সে রাস্তাও আসলে আরেক সামান্য মৃত্যুর অথচ অসামান্য মৃত্যুর হাত ধরে আঁকা। ফোয়ারাকে আমরা যে গল্পে পেলাম সেখানে বেঁটেদাকে পাওয়া গেল। মাসের চারতারিখে মদ খেতে আসে। মাইনে পায় বলে। বাড়িতে বোবা মেয়ে আছে, মা মরা। মানে বেঁটেদার বৌ মরে গিয়েছে। এই মরে যাওয়া বেঁটেকে দুনিয়ায় বার করে দিয়েছে। সে দুনিয়া হাইরাইজের না, এসি ঘরের না, স্কচ, হুইস্কি, ব্লেন্ডারস প্রাইডের না। বউ মরে গেলে সেখানে লোক আরেকটা বউ খোঁজে না, বেশ্যার ঘরে গিয়ে শুয়ে আসে না। সেখানে মানুষ শোয় খুকীর বা খোকার জন্ম হবে বলে।
পুরোনো এক ধারাচলতি দুনিয়ায় বেঁটে থাকে। পাঠককে নিয়ে যান নবারুণ সেই জীবনের দেশে। এবং মৃত্যু সেখানে খুব অসম্মানিত। ফোয়ারার মাস্তান প্রেমিক যে কালে চাইনিজ স্টেন চালিয়েছে, সে মাস্তানি ছেড়ে ট্যাক্সি নামিয়েছে। ফোয়ারার কাছে যায়। ফোয়ারা, বেঁটে, সেই প্রেমিক, রিক্সাওয়ালা পাঁচুগোপাল যে মানুষের খামোখা ভাল করে, বোবা মেয়েদের দেশে আমেরিকান জাহাজী আসে। অনেক টাকা, মদ, সিগারেট নিয়ে। ফোয়ারাকে অসুখ দিয়ে যায়। তার থেকে প্রেমিকের হতে পারে। প্রেমিক ফোয়ারাকে নিয়ে হাতুড়ে ডাক্তার পেরিয়ে মেডিকেলে যায়। সেখান থেকে আমেরিকান জাহাজীর আনা রোগ, আমেরিকান ডাক্তারে দেখে যায়। মানে বাজার খুলে গিয়েছে। প্রভুরা মৃত্যু এনে দেন আহ্লাদ মাখ্যে, প্রভুরাই বুঝে যান কেমন মৃত্যু এল। প্রভুদের নিরাপত্তায় এইডসে কোটি কোটি ডলার ফুটে যায়, ক্যান্সার থেকে ম্যালেরিয়া অচ্ছুৎ থাকে। যত বেশী গরীব দেশের রোগ তত বেশী নীচে তার নাম্বার রাষ্ট্রপুঞ্জে। মাস্তানের বাড়িতে নিজের বৌ পরে থাকে। যখন বোঝে যে ফোয়ারার বাঁচার আশা কম তখন তাকে নিয়ে আলাদা বাসা ভাড়া করে। ফোয়ারার মৃত্যুকে সম্মান দিতে সে উঠে দাঁড়ায়।
না, এ দেশের নীতি নৈতিকতা আলাদা। মিলবে না কারো সঙ্গে। রবিবাসরীয় গল্পের পাঠক বা ইন্টারনেট চমকে বাঁচা পাঠকের দেশ এ না। এখানে পরকীয়ার চমৎকার সুগন্ধ এবং কাঠের মেঝেতে চলাফেরা, দার্জিলিং-এ অপঘাতে মৃত্যু থেকে মিষ্টি মিষ্টি শোক-দুঃখ, দামী তাঁতের শাড়ি পরা পরিচারিকা এ সব নেই। এখানে যে যা করে করবে বলে করে। অগ্র-পশ্চাৎ তারা খুব ভাবে, ভেবে থই পায় না বলে যা পারে করে। ভাল হলে ভাল, মন্দ হলে তারা নিরুপায় ছিল। হাসপাতালে মাঝরাত্রের সেই জগদীশবাবু এই দুনিয়ার বাসিন্দা। তার পকেটে অপঘাতে মৃত্যুর নাইলন দড়ি থাকে। তাই দিয়ে জীবনকে সে বেশ ম্যানেজ করে এনেছে বলে দাবী করে। তার গল্পেও সমান্তরালভাবে বয়ে চলে রাশিয়ায় গ্লাসনস্ত-পেরেস্ত্রৈ ার খবর। গল্পের শেষে বোঝা যায় না জগদীশবাবু জীবিত কী মৃত! অর্থাৎ এটি একটি ভূতের গল্প এই সম্ভাবনা জাগিয়ে গল্প শেষ হয়ে যায়। এবং শেষ হয় না।
এই ভূত, প্রেত, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁক মাখা মৃত্যুর আরেক আখ্যান ফিরে আসবে 'হার্বার্ট'-এ। যৌক্তিক দুনিয়া থেকে সরে যাচ্ছে পরাজিত মানুষের দল। সরে যাচ্ছে তারা যাদের রেশন কার্ডের জীবন থেকে সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বারে যাওয়ার কোনো মানে অবশিষ্ট নেই। দুই নামে আড়ালেই তারা এক ভাবেই বঞ্চিত, শোষিত এবং এই যাতায়াতের মধ্যে তারা আরো আরো বেশী থেঁতলে যাবে। তারা আঁকড়ে ধরছে অস্ত্র। না, বন্দুক নেই তাদের। তাদের রগুড়ে নুনু কামান হবে কোনোদিন। তার আগে তাদের আছে শুধু অভিশাপ দেবার ক্ষমতা। বিজন ভট্টাচার্য্য বলতেন যতকাল দেশের লোক দেবদেবীকে নাচাতে পারবে ততকাল তিনি সে নাচকে নিয়ে কাজ করবেন। বিজনের দেবীগর্জনে শোষিত নারী অথবা ঋত্বিকের যুক্তি-তর্ক-গল্পতে ছৌ নাচের আদলে বঙ্গবালা নাচবেই সেই নাচ। সেই আশা নবারুণে অভিশাপ হয়ে আসছে। ভীত, ত্রস্ত, না পারা মানুষ নিজেকে নিজের উচ্চতা থেকে বাড়িয়ে নিচ্ছে এই অন্ধকার কুসংস্কারের ঢেউ-এ চড়ে। সে আসলে সম্মান চেয়েছে। ডিগনিটি অব লাইফ না থাকায় সে ডিগনিটি অব ডেথ পাচ্ছে না। তাই,
"চৌবাচ্চার তেলাপিয়া গঙ্গাসাগরে চললো।
দোবেড়ের চ্যাং দেকবি? দোবেড়ের চ্যাং
দেকবি? ক্যাট ব্যাট ওয়াটার ডগ ফিশ"
হারবার্ট সরকারের সুইসাইড নোট। এখান থেকে কার্ণিভ্যাল শুরু হয়ে গেছে। বাখতিন কথিত ডায়ালজিকের খেলাও চলেছে অবিরল। কিন্তু কার্ণিভ্যাল শুধু বাখতিনের হলে এখানেই লেখা শেষ হয়ে যেতে পারত। হল না। এ কার্ণিভ্যাল নিতান্ত দেশজও বটে। চড়কের মেলায় পিঠে লোহা ফুঁড়ে যারা চড়কের গাছে চড়কির মত শূন্যে ঘোরে তাদের যন্ত্রণার পূজো। এ পূজো ঠিক রবীন্দ্রসঙ্গীতের 'আমার ব্যাথার পূজা' দিয়ে বোঝা যাবে না। শরীর যন্ত্রণা পায়। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জান চলে যায়। এত প্রাচুর্য্যের দুনিয়ায় ক্লান্ত লড়াকু মানুষ। হাতে তার কিছুই আসে না। সব নিয়ে যায় অনেক উপরে থাকা চিল-শকুনের লোভ। মানুষের মত তাদেরও দেখতে, তবু মানুষের মত নয় কিছুতেই। কেন হয়?
অপরাধ আছে নিশ্চই! জন্মজন্মান্তরের অপরাধ ফাঁদা হয়েছে এই উপমহাদেশে। এখানে মিশরের গল্পটা অনেক দূর এগিয়েছে। মৃত্যুর আগেই জীবনেই স্তর করে দেওয়া হয়েছে। বর্ণ বিভাজন দীর্ঘকাল সামলেছে অনেক কিছু। শাসকের ক্ষমতার রাস্তায় এ এক দারুণ হাতিয়ার। নানা ধরণের শাসক এসেছে, সকলেই কোনো না কোনো পাপের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে শাসিতের ঘাড়ে। কখনো জন্মান্তরের পাপ, কখনো কাফের হবার পাপ তো কখনো বর্বর অইউরোপীয় হবার পাপ। সে সব পাপ মেনে নিয়ে নিতান্ত দেশজ পদ্ধতিতেই চড়কের গাছে ঝুলে গেছে মানুষ। কাফকার K-ও যেমন একদা ভাবতে চেষ্টা করেছিল যে তার পাপ আছে বলেই সিস্টেম তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করছে, তেমনই তার বহু আগে থেকে এখানে মানুষ অপরাধী। বহু আগে থেকে মানুষ গোটা দুনিয়ায় নানা ধর্মের ব্যবস্থায় শরীরকে যন্ত্রণা দিয়ে পাপস্খালন করে। এবং সেই সব মানুষেরা আদপেই দরিদ্র অথবা ক্ষমতাবৃত্তের বাইরের বেশী। তাদের যন্ত্রণার কার্ণিভ্যাল থেকে উঠে আসে কার্ণিভ্যাল।
সে কার্ণিভ্যালের জন্ম আমরা দেখি 'ভোগী' উপন্যাসে। মৃত্যু ঘিরেই এ কার্ণিভ্যাল রচিত। 'ভোগী' এক সাধারণ মানুষ। একদিন সে হঠাৎ দৈববাণী পায় সে 'ভোগী'। তার অলৌকিক ক্ষমতা আছে কিছু। এবারে সে ভোগ করবে। যা চাইবে সাধারণ জীবনের কাছে, মানুষের কাছে তাকে তা দিতে হবে। মানে যারা বিশ্বাস করবে তাকে তারা দেবে। কিছুদিন ভোগ করবে, মানুষের যথাসম্ভব ভাল করবে, তারপরে একদিন চলে যাবে। তার ডাক আসবে। সমুদ্রতীরে তাকে বলি দেবে এক জহ্লাদ। অন্য কেউ, অন্য কোথাও ভোগী হবার ডাক পাবে। ইটালো ক্যালভিনোর গল্পে এমন এক দেশ এবং রাজনেতাদের কথা উঠে এসেছিল, যারা নির্বাচিত হত, দেশ শাসন করত এবং অবশেষে জনগণ তাদের বলি দিত উৎসব করে। নবারুণের লেখায় এই ভোগ ও মৃত্যু উঠে আসে এক রাজনৈতিক স্টেটমেন্টের মত। যারা পায়নি কিছু, হ্যাভ নটস, তাদের থেকে ভোগী আসে। তারা কিছু ভোগ করে। সামান্য সে সব ভোগ। তারা ভাল করে এবং তারা বলি হয়। সুনির্বাচিত এক স্টেটমেন্ট। যা কিছু মানুষের ছিল তাই কুক্ষিগত করার বিরুদ্ধে আবার সেই যন্ত্রণার আড়ালে এক প্রতিবাদ। হিংস্র না, খুব মায়াময়।
এই মায়াময়তা ছেয়ে আছে ফ্যাতারুদের মধ্যে। চোক্তারদের মধ্যে। তাদের ভাবনা এবং কাজের মধ্যে। যুদ্ধ মানে হত্যা না, খুন না, শুধু জীবনের নীচের দিক থেকে দুর্গন্ধগুলোকে উপরের দিকে ছুঁড়ে মারা। যাতে তারা আছে এই কথাটা জানা যায়, এই তথ্যটা চাপা না থাকে। এবং তারা যে আছে, তাদের যে পুতিগন্ধময় অস্তিত্বের খোপে এঁটে রাখা সেই খোপ নিয়ে তারা উৎসব শুরু করে। শিশুর মত সেই উৎসব। সেই কার্ণিভ্যালে মৃত্যু মমির তামাশা হয়ে যায়। বেঁচে থাকা যেখানে ধুরন্ধর তামাশা সেখানে মৃত্যু নিয়ে এক হৈ হৈ শুরু হয়ে যায়। সেই হৈ হৈ এক খেলা, জেনে নিয়ে, মেনে নিয়ে খেলা যে মৃত্যু অমোঘ। অথচ তার আগের জীবন কদাকার হলে মৃত্যুও নোংরা হয়ে ওঠে। এই বিভৎস জীবনের উপমহাদেশে, জীবনের মান বাড়ানোর বক্র খেলা উঠে আসে মার্শাল ভদির মমিতে। সব স্তরের, সব শ্রেণীর মানুষের চিন্তা-স্থবিরতাকে জিভ ভেঙচে সেই মৃত্যু-তামাশা চলে যায়। মৃত্যুর কার্ণিভ্যাল সংলগ্ন হয়ে থাকে জীবনের ছায়া, যে ছায়া তার সম্মান দাবী করে চলে।