হন্যমান আত্ম সমীপে এক বিক্ষুব্ধ কথক ~ নবারুণ সাহিত্যে আত্মহত্যা

কৌশিক দত্ত

আলোর পথযাত্রী, প্রকৃত প্রস্তাবে, যূথবদ্ধ আরশোলা। শ্রেণীচরিত্রে তারা চিরঞ্জীব। নর্দমা থেকে স্ট্রীট ল্যাম্প অভিমুখে তাদের উড়ান। সেই নালা, রাস্তা বা দত্তদের দরজা এঁটো করে কোকা বমি করলেও তাদের কিছু যায় আসে না। ঘুমোলেই ঠিক হয়ে যাবে, এই বিশ্বাস নিয়ে টলোমলো চলে যাওয়া বন্ধুদের ফেলে যাওয়াশালাপাতায় ভাঙাচোড়া চপ তাদের বাঁচিয়ে রাখে রাত বাড়লে। কিন্তু জনবিচ্ছিন্ন ব্যক্তি আরশোলা মরণশীল। শ্যাঁৎলা ধরা দেয়াল আত্মমগ্ন একক আরশোলার জন্য ক্ষুধার্ত টিকটিকি পাঠায়। এই হন্যমানতার দৃশ্যপটে রক্তের গন্ধওলা জলে বাঁ হাতের কবজি ডুবিয়ে শুয়ে থাকে ইহলোক আর পরলোকের কথাবার্তায় মাতাল এক লোক। সে নিজে হয়ে ওঠেমৃত্যুর এক মৃগয়াভূমি। কালো পিঁপড়েরা সুন্তুষ্ট থাকে তার দাঁতের ফাঁকে আটকানো খাবারে, কিন্তু মাংসাশী লাল ও ডেঁয়ো পতঙ্গ ও কীটেরা বেছে নেয় হারবার্টের নাসারন্ধ্র, জিভ, মাড়ি, চোখ। ঝিঁঝিঁ পোকার তারিফযোগ্য অর্কেস্ট্রার তালে তালে আত্ম ও অপর-হত্যার দৃশ্য ‘ওকে’ হয়ে যায় এক টেকে। বন্ধ কাচের ওপাশে ডানা ঘষা পরী সব দেখে এবং ভিতরে আসতে না পেরে দোকানে ফিরে যায় ভোর হবার আগেই।
এইভাবে মৃত্যুর ঘটমানতাকে বাঙালি পাঠকের জীবন লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মেরেছিলেন নবারুণ ভট্টাচার্য। ১৯৯৩। চার বছর আগের তিয়েন-আনমেইন স্কোয়ার, তিন বছর আগে কোলকাতার দ্বারপ্রান্তে ধর্ষিত ও মৃত তিন মহিলা, দুবছর আগের গালফ ওয়ার অথবা শ্রীপেরেমবুদুরে অচানক ফেটে যাওয়া একটি বিশ্বাসযোগ্য ফুলের তোড়া বা পুষ্পবাহী নারী, আগের বছর ভেঙে পড়া বাবরি মসজিদ, সদ্য ঘটতে চলা এবং শেষ অব্দি ১২ মার্চ ঘটে যাওয়া মুম্বাই বিস্ফোরণ, অথবা নরসিম্বা-মনমোহনীয় ভারত সরকারের সোনা বেচা নিও-লিবেরাল অর্থনীতি (বা তার পূর্বসূরী লাইসেন্স রাজাবাবু), ছিয়াশির রাশিয়ায় পেরেস্ত্রৈকা বা হোপ ছিয়াশির আসরে বলিউড নায়িকার পাশে বসা এক প্রবীণ (বা প্রাক্তন) কম্যুনিস্টের লিগ্যাসি, দুবছর না যেতে সেই রুশ দেশে সমষ্টির লৌহমুষ্টি থেকে ব্যক্তির আজাদি এবং গালফ ওয়ার শুরুর সমসময়ে সোভিয়েত সুপারস্ট্রাকচারের চুড়ান্ত ভেঙে পড়া... বন-বাদার-গাঁ উজিয়ে বাজার শুধু বাজার, আর বাজারে নিত্যি ভাঙন-উন্মোচন-নবীকরণ... ছ’শ কোটি আরশোলা বা পেরিপ্লানাটা আমেরিকানা এবং মাংসাশী লাল পিঁপড়ে তখন চারিদিকে নানারকম মৃত্যুর আয়োজন সযত্নে সাজিয়ে রাখছিল। লেখার খাতার বাইরে ঘটে চলা এসব হত্যা ও মেটামর্ফসিসের অনুষঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে নবারুণ ভট্টাচার্যের গল্পে উপন্যাসে দগদগে হয়ে থাকা আত্মহত্যাদের অরাজনৈতিক পাঠ প্রায় অসম্ভব।
‘হারবার্ট’-এর চেয়েও ‘ভোগী’ উপন্যাসে আরো বেশী রাজনৈতিক হয়ে ওঠে আত্মহত্যার প্রকল্পটি। হারবার্টসরকার এক নাগরিক উচ্চবংশীয় অন্ত্যেবাসী। সে মূলত বাঁচতে চেয়েছিল যে কোনো উপায়ে, এমনকি তার আত্মবোধ আজীবন আহত হবার পরেও, যতক্ষণ না তা চুড়ান্তভাবে নিহত হয়। মৃত্যুকে আশ্রয় করে, মৃতদের ব্যবহার করে বজায় থেকেছে স্রেফ বেঁচে থাকার জন্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা, যে বাঁচার মধ্যে বেঁচে থাকাটুকুর বাইরে জীবনের কোনো নিহিতার্থ না খুঁজলেও চলে।নিহত হারবার্টের শরীর আর অবশিষ্ট অস্তিত্বটুকুকেই হারবার্ট স্বহস্তে হনন করেছিল দ্বিতীয়বার। অপরপক্ষেভোগী নাগরিকের দৃষ্টি ও সমাজতত্বে চুড়ান্ত অপর। বিশ্বায়ন, উন্নয়ন বা বাজার যে বর্গের মানুষকে নিয়ে বিশেষ ভাবিত নয়, প্রয়োজনের বোড়ে বা অবর্জনা ফেলার আস্তাকুঁড় হিসেবে মাঝে মাঝে একটু-আধটু ব্যবহার করার সম্ভাবনাটুকু বাদ দিলে... সেই প্রায় অদৃশ্য সমাজের এক ‘নাম না জানা’ মানুষ। তার পরিচয় শুধু তার আত্মহত্যার প্রস্তুতিতে। সে মরবে, খানিক যীশুর মতো, খানিক এথনিক ওরিয়েন্টের বিচিত্র সাধুর মতো। সে নিয়ে যাব পৃথিবীর পাপ সাথে করে। সে মরবে, মুক্ত হবার জন্যে। সে ভোগ করে মরবে বলে।শুধু নামহীনতাই তার পরিচয়হীনতার একমাত্র পরিচয় নয়। টিলা পেরিয়ে সমুদ্রের ধারে পৌঁছানোর পর, পাথরের উপর এবং শানানো কাতানের নীচে গলা দেবার পর, গর্দানচ্যুত মাথা সমুদ্রের ঢেউ লেগে দুলে ওঠার পর সে সহসা হয়ে যায় এক চিত্র নির্মাতার কাল্পনিক চরিত্র। আত্মহত্যার পরবর্তী এই কাহিনী-হত্যায় এক বিচিত্র মানুষ সম্পূর্ণ অনস্তিত্বে পরিণত হয়। বস্তুত তার আত্মহত্যার প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ হয় এভাবে... এমনকি পাঠকের কল্পনায় বেঁচে থাকা অস্তিত্বটুকুর বিলুপ্তিতে।
‘অ্যাক্সিডেন্ট’, ‘নস্ত্রাদামুসের আত্মহত্যা’, ‘মিউচুয়াল ম্যান’, ইত্যাদি ছোটগল্পে গুলিয়ে যায় হত্যা আর আত্মহত্যা। স্পষ্ট জানা যায় না কে মারছে আর কে মরছে। ব্যক্তির মৃত্যুর মধ্যে থৈ পাওয়া যায় না এইসব মৃত্যুর। সন্দেহ হয় এই মৃত্যুরা সামূহিক। যেন একটা শহর, একটা সমাজ, একটা গ্রহ আত্মহত্যা করছে।
এইখানে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হতে হয়। আসলে হত্যা আর আত্মহত্যার মধ্যে তফাৎ কী? মানুষ কি কখনো একা একা মরতে পারে? নিজেকে না মেরে অপরকে বা অপরকে অক্ষত রেখে নিজেকে হত্যা করা কি সম্ভব? মৃত্যু কখন হত্যা হয়ে ওঠে? কতটা গভীরভাবে হত্যা করতে পারলে তবে মৃত্যু সম্যক সম্পন্ন হয়? কোন হত্যাকে আত্মহত্যা বলে? স্ববধবিলাস আর স্বমেহনের মধ্যে কোথায় মিল আর কোথায় অমিল? আত্মহনন কি নিছক পলায়ন? শুধু দুঃখের আর পরাজয়ের ইতিবৃত্ত? কামিকাজে যোদ্ধা, ভালবাসা হারানো তরুণ, কার্ল মার্ক্সের দুই কন্যা, গতর হারানো প্রাক্তন বেশ্যা, বাতিল বৃদ্ধ... সবার আত্মহত্যার কাহিনী বা কারণ একসূত্রে গাঁথা সম্ভব? প্রশ্নবিদ্ধ, শিশ্নবিদ্ধ আর শরবিদ্ধ হবার মধ্যে মিল বা অমিল কতখানি এবং কী কী? কেবল প্রশ্নের অভিঘাতে কি ধ্বংস করা যায় সৌধ; হত্যা করা যায় অপর এবং আত্মকে?
‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’-এর শুরুতেই কামু বলেছেন, দুনিয়ায় একটাই প্রকৃত গুরুত্বপূর্ন দার্শনিক সমস্যা আছে আর সেটা হল আত্মহত্যা। জীবন বেঁচে থাকার যোগ্য কি না, সেই বিচারই দর্শনের মূল প্রশ্ন অথবা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তর। জীবনের মানে খুঁজতে গিয়ে বা অর্থ আরোপ করতে গিয়ে, কী আশ্চর্য, মানুষ কখনো মৃত্যুকে বেছে নেয়। নীতি, ধর্ম, আদর্শ যা কিছু অবলম্বন করে ব্যষ্টি বা সমষ্টি বাঁচতে চায়, সেই সব অবলম্বনদেরই বাঁচাতে গিয়ে তারা শেষ পর্যন্ত জড়িয়ে পড়ে হত্যা বা আত্মহত্যায়। এর সমান্তরালে অনেক অনেক মানুষ জীবনের (আপাত) অর্থহীনতার মধ্যেই... অর্থহীনতাকে সহজে নিয়েই পূর্ণ সময় বেঁচে থাকে। তাহলে কী মূল্য বাঁচার সেই সব অবলম্বনের, যারা জীবনকে ব্যাহত করে? জীবনকে অর্থবহ করতে আদর্শের বলি হয় ভাইপো বিনু, অথচ অর্থহীনতার সাথে স্বচ্ছন্দ হারবার্ট বেঁচে থাকে। দুরূহ মৃত্যুর মধ্যে জীবনের পরিণতি খুঁজে পায় ভোগী, কিন্তু হারবার্ট, কোকা, ডাক্তার, ধননা বেঁচে থাকে পরীস্পর্শহীনতার মধ্যেও সহজে।
কামুর সাথে নবারুণের অমিল বিস্তর রাজনীতিতে, বিদ্রোহে, অস্তিবাদে, জয়ে এবং পরাজয়ে। কিন্তু নবারুণ ভট্টাচার্যের মনুষ্য প্রোটাগোনিস্টরাও প্রায়শঅ্যাবসার্ডিটির স্রোতে বহমান। নবারুণের সাহিত্যে এই অ্যাবাসার্ডিটি অন্য মাত্রা পেয়েছে এলিটিজমের প্রতিস্পর্ধায় নিম্নবর্গীয় অপরের জীবনপ্রবাহের প্রতীক হয়ে উঠে। তাই এই সব চরিত্রে বেঁচে থাকা আর মরে যাওয়া অনুভব করতে জাদু-বাস্তবতার মায়াজালের আড়ালে এই অসম্ভাব্যতা বা অ্যাবাসার্ডিটিকে ছোঁয়া প্রয়োজন।
তাহলে এরা মরে কেন? প্রেমহীনতায়, স্বপ্নহীনতায়, অর্থহীনতায় (নৈতিক ও অর্থনৈতিক) টিঁকে থাকতে জানা হারবার্ট কেন ডান হাতে তুলে নেয় ব্লেড আর তাকে চলে যেতে দেয় বাঁ হাতের কাছে বিপজ্জনকভাবে? এ কি আত্মহত্যা নাকি হত্যা? স্পষ্টতই হারবার্ট হারবার্টকে খুন করেছে দেখার পরেও কি পাঠকের দায় থাকে খুনি খুঁজে বেড়ানোর? কামু বলেছিলেন, জানা প্রয়োজন যে বিপর্যস্ত লোকটি এইমাত্র আত্মহত্যা করল, আজ তার কোনো বন্ধু কি তার সাথে অবন্ধুসুলভ ব্যবহার করেছিল? সে তাহলে দোষী, কারণ অসহায়তা থেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবার জন্যে অনুঘটকের কাজ হয়ত সেই করে থাকতে পারে। তাহলে কি হারবার্টকে হত্যা করলেন যুক্তিবাদী ঘোষবাবু বা সিগারেট টানতে থাকা সাংবাদিক মেয়ে?নাকি ধননা আর তার দুই ছেলে? হারবার্টের অকালপ্রয়াত বাপ? সিফিলিসগ্রস্ত জ্যাঠা?অথবা জ্বরের ঘোরে দেখা দেওয়া ধুঁই? বা বিনুর সেই লুকোনো ডায়েরি? অথবা সেই ডায়রির কথা মনে পড়ে যাবার আকস্মিকতা, যা ‘পরলোকের কথা’ আর ‘পরলোক রহস্য’ নামক বইদুটির সাথে ষড়যন্ত্র করে হারবার্টকে ঠেলে দিয়েছিল মৃতের সহিত কথোপকথনের অফিসের দিকে? অথবা হয়ত খোঁড়ো রবি, যে তাকে প্রথম দেখিয়েছিল আত্মহত্যাকে বেছে নেবার যোগ্য এক সম্ভাব্য পথ হিসেবে; ঠিক যেমন সংগৃহিত দু’শ ঊনত্রিশটি অন্তিম টেস্টামেন্ট বা মরণেচ্ছুর বিদায়ী জবানবন্দি দুর্নিবার হাউন্ড কুকুরের মতো নেটিভ শশক রেবন্তর সংহারের কারণ ও হেতু হয়েছিল। অবশ্য কারণ বা হেতু হবার ক্ষমতা সম্পন্ন সবকিছুই কার্য বা পরিণতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, বা তার নির্ণায়ক ভূমিকা পুণরাবৃত্ত হবে, তার কোনো মানে নেই। দু’শ ঊনত্রিশ প্লাস এক হাতে নিয়ে আপনি চিরকূটে সুইসাইড নোটের বদলে লিখতে পারেন একোয়া টাইকটিস, মকরধ্বজ বটিকা, ডায়াপেপসিন এবং এন্টেরোস্ট্রেপ। আসল প্রশ্ন হল, আপনি কোথায় যেতে চান? অমরত্ব আর ইচ্ছামৃত্যুর মধ্যে কোনটি বেছে নিতে চান?
কেন বারবার আত্মহত্যার অনুষঙ্গ নবারুণের লেখায় ফিরে আসে? ব্যক্তি মানুষটিকে না চিনে, শুধু তাঁর উপন্যাস আর গল্পের মধ্যে শিং উঁচিয়ে থাকা আত্মহত্যাগুলো দেখে কি বলা সম্ভব? অংশত সম্ভব, এবং অংশতই। পূর্ণ বোঝাপড়া তুমুল অ্যাবসার্ড। ‘রেবন্তর স্ববধবিলাস’ গল্পে তীব্রভাবে পৃথক কিছু মানুষের বহুমাত্রিক সুইসাইড নোট এবং আত্মহননের প্রেক্ষিত এক নোটিস বোর্ডে পাশাপাশি টাঙিয়ে তিনি যেন নিজের সারা জীবনের স্ববধভাবনার সংক্ষিপ্তসার রচনা করেছেন। একটি ছোটগল্পের মধ্যে আত্মহত্যার এমন বিশ্বরূপধারী উপস্থিতি সাহিত্যের অন্য কোনো সিন্দুকে আছে কিনা আমার জানা নেই।
‘লিখনে কি ঘটে’ প্রবন্ধে অমিয়ভূষণ মজুমদার বলেছেন যোগী, মাতাল, শিল্পী, সাহিত্যিক সকলেই নিজের মতো করে বাস্তবের অপ্রিয় উপস্থিতি থেকে পালানোর চেষ্টা করে। ঘুম হল দৈনন্দিন পলায়নের সহজতম উদাহরণ। নিশি-স্বপ্নের মতো দিবাস্বপ্নও বাস্তবের লাগাম এড়ানো এক ‘এস্কেপ’। যোগীর সমাধি বা সাহিত্যিকের নিজস্ব জগত রচনা এই পলায়নের অন্য রূপ। নবারুণ ভট্টাচার্যের চরিত্রেরা অনেকেই মদের আশ্রয়ে চলে যায় রোজ। বাস্তবের রুক্ষতা থেকে এই তাদের মোটাদাগের পলায়ন। জাদু-বাস্তবতার আলয়ে গল্পের সহসা চলে যাওয়াকেওবস্তু-বিশ্বে যুক্তিকাঠামোর সীমাবদ্ধতা থেকেএক ধরণের পলায়ন ভাবা যেতেই পারে। আত্মহত্যা কি তাহলে চূড়ান্ত পলায়ন? শ্যাম সমান মরণ? “নিরাপদ সাহিত্যের ঢ্যামনামি” সজ্ঞানে এড়িয়ে চলা লেখক কি শুধু এক পলায়নের কাছে ফিরে যেতেন বার বার? অন্যতর অজস্র কাব্যিক পলায়ন-পথ তো খোলাই ছিল তাঁর সামনে! নাকি এই আপাত পলায়নের ভেতরে লুকোনো থেকেছে এক গূঢ় সাবোতাজ? হত্যা আর আত্মহত্যা সেখানে একই মুদ্রার দুই পিঠ, অথবা দুই পিঠ মিলে একত্রে একটি মুদ্রা... যারা একত্রে অবস্থান করে এবং সংঘটিত হয়... ফিদায়েঁ যোদ্ধার মতো দুম-দুম ধ্বংস করে চুল্লি ও শ্মশান?
ঐ একই প্রবন্ধে অমিয়কুমার নিজেই স্বীকার করেছেন পলায়নে ফাঁক থাকে... স্বপ্ন সর্বদা ঘুমকে নিশ্চিত করে না, বরং তার মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে ‘উচ্চ চিৎকার’। দিবাস্বপ্নেও এমন ঘটে থাকে; সাহিত্যেও। “লিখনেও এরকম হয় যে, আমরা ক্রোধ, দ্রোহ, অসূয়া থেকে উচ্চ চিৎকার করি। ... মনে হতে থাকে, ক্রোধ ইত্যাদি থেকে নিষ্কৃতি, বিরতি নয়, সেগুলোকে আরও উত্তপ্ত করাই এসব লিখনের উদ্দেশ্য।” অর্থাৎ পলায়ন বা শান্তি সাহিত্যিকের উদ্দিষ্ট নাও হতে পারে। কিন্তু অমিয়কুমার সাহিত্যের রস প্রতিষ্ঠা নিয়ে মূলত ভাবিত, তাই তাঁর “সন্দেহ হতে থাকে, সেই ক্রোধের উচ্চচিৎকার যা রসকে বিতাড়িত করে তাকে সাহিত্য বলা যাবে কিনা?” এই জায়গায় তাঁর সাথে নবারুণ ভট্টাচার্যের সাহিত্য ভাবনার তফাৎ আছে। সাহিত্যেররসোত্তীর্ণ হবার কিছু প্রকরণকে নবারুণ ‘এলিটিজম’ বলবেন সন্দেহ নেই। উপরন্তু অমিয়কুমার যেভাবে বলেছেন, “ট্রমা থেকে পলায়ন করতেই হয়,” এবং ‘ট্রমা’-র যে তালিকা তিনি দিয়েছেন, তাতে স্পষ্ট যে তিনি ফ্রয়েডীয় মনঃসমীক্ষণের তত্বগুলি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত। কিন্তু কেবলমাত্র ফ্রয়েডীয় বীক্ষার আলোকে নবারুণের চরিত্রদের আত্মহত্যাকে বুঝতে চেষ্টা করলে ভুল হবে বলেই আমি মনে করি। সব আত্মহনন শৈশবের স্মৃতি থেকে পালানোর প্রচেষ্টা নয়। মৃত্যু কখনো কোথাও অনস্বীকার্য রাজনীতিক। মৃত্যুকামী কখনো নিজের কাঁধে করে সমুদ্রে নিয়ে যায় জগতের পাপের বোঝা, কখনো তার বিশাল শরীর আর অবোধ চোখে লেগে থাকে যুদ্ধ-বিমান আর বোমার সম্বন্ধে অজ্ঞতা এবং অবজ্ঞা, কখনো তার তোষকে বোনা থাকে শ্মশানঘাতি বিস্ফোরণ।
মনে হয়, সাহিত্যের তোষকে ডিনামাইট স্টিকের মতো অভিসন্ধীমূলকভাবে বুনে দেওয়া ইতস্তত উচ্চচিৎকার নবারুণের সবচেয়ে বড় মাপের আত্মহত্যা, যা বস্তুত হত্যার অপর পিঠ। জ্ঞানঋদ্ধ ডিসকোর্স আর মনোগ্রাহী (প্রায়শ প্রায় সুললিত) সাহিত্য-ভাষার মাঝখানে নোংরা পেন্টুল পরে দাঁড়িয়ে পড়ে বস্তিবাসী খিস্তি আর অন্ত্যজ শব্দ-উপমা-আঙ্গিক। তারা উচ্চবিত্ত নাগরিক ললিতকলাকে হত্যা করে, না তাদের সাথে ষড়যন্ত্র করে নিরাপদ সাহিত্য তার পলায়নের প্রয়াস সমেত আত্মহত্যা করে, তা নিয়ে তর্ক হতে পারে। আমি একে সজ্ঞান এবং প্রবলভাবে রাজনৈতিক আত্মহত্যা মনে করি। এই আত্মহত্যা অতি লক্ষ্যণীয় সাফল্যের সাথে সাহিত্যের প্রতিষ্ঠানকে আলোড়িত করেছে। চুল্লির সুইচ অফ করেও তাকে ঠেকানো যায়নি, যদিও সব বিস্ফোরণের মতোই তার উত্তরাধিকার কিছু স্যাটেলাইট বিস্ফোরণের সাথে খানিক বর্জ্য সৃষ্টি করেছে... ভাষার এই সজ্ঞান আত্মহত্যাকে অনেকেই আত্মসাত করার চেষ্টা করেছেন যথোপযুক্ত বোধ, শ্রম বা সম্মান ছাড়াই।

অথচ আত্মহত্যাকে বুঝতে গেলে এই হন্যমানতার সাথেও সাবোতাজ করতে হয়।ঠিক যখন আমি এই লেখাটি প্রথমবার শেষ করলাম, খানিকটা নবারুণীয় আঙ্গিক এবং ভাষা ধার করে, তখনই আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করল। মনে হল, নবারুণ ভট্টাচার্যের বিষয়ে লেখা বা কথোপকথন এইরকম ছাঁচেই হবে বা হতে হবে, পাঠকের এই প্রত্যাশার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করা একান্ত প্রয়োজন; নইলে তাঁর সম্বন্ধে লেখার (অ)নৈতিক অধিকার জন্মায় না। অগত্যা লেখাটি তার আঙ্গিক সমেত আত্মহত্যা করল। তারপর ছাই থেকে এই জন্ম, যেমনটি হয়ে থাকে অপঘাতের ক্ষেত্রে... নাইলনের দড়ি গলায় দেবার আগে এবং পরে যেমন বদলে যায় বর্তমান এবং প্রাক্তন মানুষের রূপ ও চরিত্র।
এইসব হনন পেরিয়ে এখন রইলে তুমি হে নাগরিক, তুমি হে পুলিশ... তুমি এবং তোমার ট্রাম। ট্রাম লাইনের উপর হঠাৎ এসে দাঁড়ালো শববাহী অন্ধ-বোবা-কালা এবং ফাঁকা খুলিওয়ালা চারটি লোক। ট্রামের ধাক্কায় তারা মরল না এবং তোমার পুলিশ অনেক সশস্ত্র পরিশ্রমের শেষে জানতে পারল যে তাদের কাছ থেকে কিছুই জানা সম্ভব নয়।
অথবা হন্যমানতা পেরিয়ে বেঁচে থাকল মিউচুয়াল ম্যান, কমন ম্যান, আরশোলা আর কালো পিঁপড়ে। এরা কেউ ফেকলু পাঁচু নয়। মরণশীল নয়। দুই থানায় কেস খায় আর তিন ঠেকে চোলাই। হত্যা বা আত্মহত্যা এদের বিনষ্ট করতে পারে না। “ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।”বেঁচে থাকা একটা ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। তার মধ্যে আসলে যা বেঁচে থাকে, তা হল বেঁচে থাকার অভ্যেস। আর বাঁচে সিস্টেম।
“মিউচুয়াল ম্যান ছিল। মরে গেল। মিউচুয়াল ম্যান এসে গেল। এই মিউচুয়াল ম্যানও মরে যাবে। মিউচুয়াল ম্যান এসেও যাবে। মিউচুয়াল ম্যান থাকবে।”
ঘড়ি থেমে গেলে, সময় মুক্ত হয়। জনৈক যন্তর যে কবিও ছিল, সে এই সার কথা বুঝতে পেরে লিখে যায়, “ঘড়ির বাইরে খুঁজে নেব এক সময় হারানো দেশ।” আসলে জীবনের মতো মৃত্যুও এক কনস্ট্রাক্ট। ততটা চরম কিছু নয়। বহমানতার কাছে তাকেও আত্মসমর্পণ করতে হয়। দু’শ ত্রিশটা সুইসাইড নোট বগলদাবা করে কেউ সস্ত্রীক পুরো যাত্রা করে।নিহিলিজমের ভেতর দিয়ে যেতে যেতেই মানুষ চলে যায় তার নঞঅর্থক নাগালের বাইরে। মৃত্যু স্বয়ং, তাৎক্ষণিক ভাবে হলেও, আত্মহত্যা করে।হেথায় হোক, হোথায় হোক... আত্মা অথবা সিস্টেমের সৌজন্যে... থেকে যাওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প সম্ভাবনা নেই। মৃত্যুর এহেন মৃত্যুর সাথে সাথে আত্মহত্যার বৃত্ত পূর্ণ হয়।