ভেতর-বাহির উস্কানি

সঙ্ঘমিত্রা হালদার



মাথাটা অতটা ধারালো নয়, তবে অনেকটা ত্রিভুজের আকার, আর সেই ত্রিভুজের অল্প ফাঁকে কিছু মাথা ঝাঁকড়া গাছ, সুবিধা মতো এক নিঃসঙ্গ ফাঁকে আরও নিঃসঙ্গ এক সূর্যের আভাস। পাহাড় না দেখা অব্দি ছোটবেলার ড্রয়িং খাতায় বিভিন্ন সময় আঁকা এই পাহাড় দৃশ্যই বদ্ধমূল থেকে গেছিল মনে। যার সূর্য বিকেলের হাত ছাড়িয়ে এগোয় না, পিছোয়ও না। তখনও অব্দি পাহাড়ি অন্ধকার ওই ত্রিকোণ ফ্রেমে কোথাও নেই। জ্যোৎস্নার ধারণা আরও অলীক। মানে তখন সে ঠিক পাহাড়ে ওঠার আগেই কোনও এক অলীক বাবুর গেস্ট-হাউসে বিশ্রাম নিচ্ছে। আমার প্রথম পাহাড় দেখার দিন সেও অলীক বাবুর গেস্ট-হাউস ছেড়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে একটা জিপে উঠে বসবে। এবং তারাদের শামিয়ানায় চড়ে সে প্রথমবার দেখা দিতে আসবে আমার পাহাড়কে। কিন্তু না, প্রথম পাহাড়ে চড়ার দশ মিনিটের মধ্যেই এই পাহাড় মেদুরতা কোনও এক অজানা নিষিদ্ধ দুর্গে প্রায় চিরকালের মতো লুকিয়ে পড়েছিল। বরং মেদুরতা পিঠ বদলে দেখা দিয়েছিল বমি জল আর অ্যাভোমিনে।

একটু ধাতস্থ হয়ে কখনও আর পাহাড়ে না-আসার সংকল্প নিয়ে বিকেলের দিকে বাইরে বেরিয়ে দেখি মুখে কপালে অসংখ্য বলিরেখা নিয়ে, পিঠে একটা ভারি বস্তা চাপিয়ে স্বয়ং বিধাতা খাড়াই পথ ধরে নেমে আসছে। আরেক বলিরেখা যেন বুড়ো হো চি মিন। সাদামাটা একটা বাঁকে উবু হয়ে আরও সাদামাটা ভাবে বিড়ি টানছে। মাঝেমাঝে হো চি মিন দাড়িতে হাত বোলাচ্ছে। কয়েকটা অল্পবয়সী ছেলে লো-ওয়েস্ট জিনস আর পুলওভারে, হাতে বর্ষাতি ঝুলিয়ে পাহাড়ী কায়দায় কী ভীষণ অবলীলায় খাড়াই পেরিয়ে একটা হেয়ারপিন বাঁকে অদৃশ্য হল। সঙ্গে সঙ্গে সন্ধেও ভূমিকা ছেড়ে পর্দা টানল। বেশ কিছুটা দূরের পাহাড়ে সমস্বরে অসংখ্য টুনিবাল্ব। পাশের একটা পাহাড়ে তখনও সন্ধে কিছুটা ফিকে। তখনও আসব আসব ভাব। আমার ফাঁকা মাথা প্রথমবারের জন্য জ্বলে ওঠে। এই এতক্ষণের দেখে ফেলা প্রত্যেকটা ফ্রেম – দৃশ্য- সময় সবাই এক একটা চরিত্র’র মতো ঘিরে নেয় নিজেদের। এ-কথা পুরোটা পড়ার আগেই সে-কথা লুফে নেয় আমাকে। দেখি আমাকে সাক্ষী রেখেই এ ওর পাশ দিয়ে হেঁটে পেরিয়ে যাচ্ছে অন্যকে। কিংবা কেউ খুব নিজের মধ্যে একা ও একক ভঙ্গিতে বিড়ি ধরাচ্ছে একটা। মুখে অল্প একটা হো চি মিন দাড়ি। কেউ খিদের মুখে থুকপা তো কেউ পরোটা আচার, কেউ পুরি সবজি।

আমি সমতলের মানুষ। সুতরাং আমি চরিত্রদের বিবর্তন বুঝি। বুঝি পরিণতি। কিন্তু যে পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তার তিনদিকটাই প্রায় দৃশ্যত অধরা থেকে যায়—তার চরিত্রদের কাছে কোন পরিণতি প্রত্যাশা করি আমি! পরেরদিন ঘুরতে বেরিয়ে পাহাড়ি বাঁক না ফুরাতে ফুরাতে এইসব প্রশ্ন ভিড় করে আসে। এক পাহাড় থেকে আর এক পাহাড়, এক চূড়া থেকে আরেক—দৃশ্য মেঘ রোদ রঙ গন্ধ কেবলই পাল্টে পাল্টে যায়। সমে আসার আগেই অন্য অন্য রাগ আর শিরোনাম কেবলই ভেঙে যায়। চারপাশটা দেখতে দেখতে কেমন যেন মনে হয়, সত্যের কোনও মাপজোক নেই। সত্যের ভাই মিথ্যেরও না। তাদের জুতোর মাপও সন্দিহান। এই যে দেখছি এই দেখাকে ভেদ করে আরও একটা দেখা আছে। আরও এক। এই যে দৃষ্টিটা ঠোক্কর খাচ্ছে, এখানে আরও এক দেখার রিহার্সাল। আস্তে আস্তে টের পাই আমার দেখা কেমন যেন আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলছে আমাকে। ভাবি কোন দেখাটা আমি? ভাবনা’র কাঁধে মুখ রেখে ভাবি এই যে ‘ওটা’ও তো আমি! আর হ্যাঁ ‘এটা’ও! ‘তুমি’ও আমি। আর ‘সে’ও। ভাবি সমতলে এই দেখা কি ছেড়ে থাকে মানুষকে? এই যে আমরা সমতলের মানুষ, চারিদিকে চোখ চারিয়ে মুহূর্তের জন্য দেখে নিতে পারি বলেই বুঝে যাই এক নিমেষ স-অ-ব-টা! আমাদের কালোয় সাদা মেশে না। আর সাদায় কালো। মেশে না। এ কি সমতলেরই একটা চাপ? প্রাচীর-অবকাশ নেই বলেই কি এত একমুখীন? ভাবি এই পাহাড় তো প্রতীকী! জীবন সরণী জুড়ে এই যে এত প্রাচীর অবকাশ সে তো কত কিছুই দেখতে শেখায়! পাহাড়-চূড়ায় উঠতে চাওয়ার পরিশ্রম সেই কবে থেকে শুরু হয় মানুষের! তবু কি শিখি কিছু? পা হড়কে যাওয়ার ভয় কী কেবল পাহাড়ে! নিজের নিজের জীবনে নয়? তবুও যত্রতত্র প্লাস্টিক ওড়ে। আর পাহাড়ে খাদের পরিচর্যায় মন দিই। কিন্তু প্লাস্টিক সেখানেও উপচে থাকে। আমরাই ফেলে আসি সেসব।

দৈত্যের বাগানে তার হাত দেখি না, পা দেখি না
প্রথমবারের জন্য দৈত্যের বাগানে ঢুকে তার বিশালতার হাত দেখি না, পা দেখি না। সাষ্টাঙ্গ হব কোন প্রাণের কাছে? সারসার পাইনের অতিকায় হেলানো গ্রীবা, ‘বেড়ে ওঠো’ মনস্কামনায় সে আমাকে, আমি তার, মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ি। সম্বিত ফিরলে দেখি তার কোনও ভাষা নেই। তার সংকেত বড় শিহরিত। ছুরিতেও বিঁধে যায়। রাতের দিকে ব্যালকনির কাচ ফুঁড়ে চোখ চলে যায়। ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখি মহাকাশ এত স্বচ্ছ যে হাত ঠেকে যাবে। শরীর খারাপ লাগার মতো তীব্র কয়েকবার চোখাচোখি হয়। আমি যেমন মহাকাশের, মহাকাশও আমার। মহাকাশের এলিমেন্ট আমার শরীরে। এবং ভাইস ভার্সাও বটে। আচ্ছা মহাকাশেরও কি শরীর কেমন আছে?


কেবলই আমার চোখ চলে যায় দূরের পাহাড়-চূড়ার দিকে। এই যে মানুষ পিঠে অক্সিজেনের বোঝা চাপিয়ে শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়ে যায়, দূরের ওই পাহাড় চূড়াটায় উঠবে বলে। সে কি পাহাড়ের চেপে রাখা অতিকায় দানব কিংবা অতিকায় কোনও সত্যি বা নিদেন পক্ষে সত্যির ভাই মিথ্যেকে দেখবে বলে? তার চেপে রাখা দম্ভের শরিক হবে বলে? দূরের পাহাড়-চূড়া কেন এত সংকেত ভরে রাখে তালুতে চিরকাল? কোন চিঠি রাখা থাকে সেখানে? কে পায়? যে ফেরে? নাকি ফেরেনা? ভাবি সিসিফাস সেই যে কবে থেকে পাথরখন্ডটা পাহাড়ের মাথায় টেনে তোলার চেষ্টা করছে, তার কি কোনও ক্লান্তি নেই? তারপর ভেতর ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখি পাহাড় এক নিরবধি প্রসেস। যে একবার বাধাকে টপকেছে, তার পাহাড়—তার বাধা তো নিরবধি! ভাবনার সুতোয় গিঁট খুলতে খুলতে হঠাৎ খেয়াল হয়—এই যে আমাদের ছোট থেকে বড় হয়ে ওঠা, আরও আরও উন্নতিতে জলরঙের ছাপানো ছবিটায় এমন করে পাহাড়ের ছবিখানা দাগানো থাকে কেন? ভাবি এই জীবন ধর্মে পাহাড় কি শুধুই প্রতীক? কেবলই ছবি? প্রতীকের অন্তরে সিসিফাস? পাহাড়ে ওঠার নিরন্তর চেষ্টা কি সিসিফাসের বিদ্রোহের শাস্তিভোগে—তার তর্জমায় ফুরিয়ে যায় পুরোটা? আর তার নিরুপায় বাঁচা? বাঁচতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা?


একবার হিমাচল থেকে ফেরার পথে বড় বড় পাথরের চাঁই দিয়ে সাজানো দানব-অতিদানব ধারণাকে তুড়ি দেওয়া পাহাড়শ্রেণী দেখে গাড়ি থামিয়ে সন্তর্পণে নেমে যাই। সৃষ্টির শুরুর দিককার ক্রমে কঠিন হওয়া পৃথিবীর ভাবনা কার কেমন জানি না, সাই-ফাইও সেই মুহূর্তে ম্লান লাগে। শুধু ওই ছড়িয়ে থাকা অতিদানব পাথরখন্ডগুলো শুরুর দিকের পৃথিবীর এখনও কিছুটা অবশিষ্ট অংশ হিশেবে ইহজীবনের মতো মাথায় স্টোর হয়ে গেল। পরে বাড়ি ফিরে এসে জেনেছিলাম ওই প্রাণের চিহ্নহীন পাথর-উদ্যানে যে একটা তালা-বন্ধ কাঠের ঘর কখনও খোলে না ভেবে ফিরে এসেছিলাম, তা আসলে একটা গেস্ট-হাউস। বছরে মাস-চারেক গেস্ট-হাউসটি খোলা থাকে। কিন্তু চাবি, বন্ধ তালার পাশেই কোথাও একটা রাখা থাকে। কেউ যদি কখনও বিপদে পড়ে, তাই এই অলিখিত আতিথেয়তা। মুহূর্তের জন্য অনুশোচনা হয়। বন্ধ ঘরের চাবি-কাঠির হদিশ তখন না জানতে পারার জন্য। পরমুহূর্তে ভাবি খোলা-বন্ধ চাবির হদিশ জানলেও আমরা পারতাম না ওই ঘরে ঢুকতে। যে মন দেওয়া-নেওয়া সম্পর্কে ড্রাইভার ভদ্রলোক স্টিয়ারিং-এ হাত রাখছিলেন, কখনও বা আলতো করে পেরিয়ে যাচ্ছিলেন দুর্গম চড়াই-উৎরাই, যেন ঘুম না ভাঙে দৈত্যের— তার মন কতটুকুই বা বুঝি আমরা! যে মন নিয়ে গেস্ট-হাউসের মালকিন ভদ্রলোক তাঁর ঘরের চাবি ছেড়ে গেছেন পরের হাতে, তার চাবি কী সত্যি-ই খোলার উপায় জানি আমরা!

পাহাড় থেকে নেমে এসেও কিছুদিন যাবৎ টালমাটাল থাকে পা-মন-অভ্যাস। কিছুদিনের জন্য সংকল্প থাকে ছোট্ট পাহাড়ি একটা জনপদে বছরের কিছুটা সময় অন্তত কাটিয়ে আসার। তারপর ক্রমে দিনের সোনালি-রূপোলি-রংচটা বুদবুদ, বুড়ো হো-চি-মিন আর বলি রেখার বিধাতাকে আবছা করে দেয়। কখনও ছাদে চিৎ হয়ে শুয়ে এক মহাজাগতিক শরীর খারাপ মুখোমুখি এসে পড়লে, আবার পাহাড় পাহাড় হাওয়া দেয়। কিছুক্ষণের জন্য সমতল থেকে মহাকাশের দূরত্ব কাছে চলে আসে। আলু-চাষীর আত্মহত্যা, ধর্ষনের রাজনীতি, রাজনীতির নামে তৈরি হওয়া বিবমিষায় ক্লান্ত মস্তিষ্ক জুড়ে হাওয়া এসে লাগে। পরক্ষণেই আবার ঝাপটা লাগে। দুর্গম পাহাড়ী এলাকাগুলোতে কোথাও দুই-তিন মাইলের ভেতর এক-দুটো পরিবার, নামমাত্র বিদ্যুৎ, কোথাও আবার তাও নেই, মহান জনগণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের মানচিত্র সীমানায় বসবাস, অথচ স্বাধীনতার আটষট্টি বছর পরেও ন্যূনতম চিকিৎসা পরিসেবা নেই! পাব্লিক ট্রান্সপোর্ট নেই! আমরা সমতলের এবং তুলনামূলক সুবিধাভোগী শ্রেণী। আমাদের নিরাময় ওই পাহাড়! আমাদের ভেতর- বাহির সংযোগ, বাধা আর অতিক্রমের উস্কানিও সে। এবং কিছুক্ষণের বিরতিও বটে!