শাশ্বত চক্কোর

সোমাভ রায়চৌধুরী



খাদের দিকে বেশী ঝুঁকোনা। ওটা তোমার দুর্বলতা। ও পথ তুমি ফেলে এসেছো।
সামনে তাকাও। খাড়াই চ'লে গেছে গন্তব্যে। জীবনটা একটা ট্রেকিং-রুট। সকলের
মতো তুমিও চলেছো সেই পথে। ভয় তো আসবেই। দম নিতে কষ্ট হবে। পা-দুটো যেন
বইতে পারবেনা তোমার ওজন। পথটা দেখো না। দ্যাখো চারপাশটা। কী সৌন্দর্য ও
রোমাঞ্চ দিয়ে সাজিয়েছেন তিনি তোমার চৌপাশ - তোমার ঈশ্বর শেরপা। ভালোটাই
দেখো। খারাপ খুঁজতে গেলে - পদে পদে ঠোক্কর খাবে। তখন রাস্তাটাই তোমায়
দেখতে হবে। নুড়ি পাথরে মুখ থুবড়ে পড়বে, হোঁচট খেতে খেতে।
পাহাড়িয়া এ জীবনে আসবে অনেক পরীক্ষা। তাঁরই সাজিয়ে রাখা। তুমি তাতে
উত্তীর্ণ হতে পারছো কিনা সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি। হঠাত বৃষ্টি ; হঠাত
তুফান। তোমার গতিকে হ্রাস করতে তিনি বিছিয়ে দিচ্ছেন গোলাপ-কন্টকের
গালিচা। অ্যাকই সঙ্গে তোমায় দেখতে হবে পাইন-গাছের সারি, আবার পথটা। খুব
কঠিন এ পরীক্ষা ! আমাদের প্রত্যেককেই যেতে হয় এই রাস্তা ধ'রে। কখনো চড়াই,
কখনো উৎরাই। তুমি যদি তোমার মনঃসংযোগ শুধু পথটার দিকে দাও, তাহলে তোমারই
ক্ষতি। তুমি হয়তো পাহাড়ি রাজার ভাঙা ইমারতটা দেখতে পেলেনা। কিম্বা,
রডোডেন্ড্রন-গুচ্ছ। তোমার "পথের শেষ কোথায়/ কী আছে শেষে...", সেটা তাঁর
হাতেই ছেড়ে দাওনা। যা তুমি অ্যাখোনো দ্যাখোনি, তা নিয়ে ভেবে কী লাভ ?
যখন তুমি এ পথ চলা শুরু করেছিলে, সমতল থেকে, তোমাকে ঘিরে অনেক মানুষ
ছিলো। আদরে আদরে তারা ভরিয়ে দিয়েছিলো তোমাকে। তারপর এই পাহাড়ে যখন তুমি
উঠতে শুরু করলে অনেকে "বিদায় !" জানালো ; অনেক নতুন বন্ধুও তুমি পেলে,
যারা তোমার সহযাত্রী হলো। অনেক শত্রুও পেলে। যারা সুযোগ বুঝে তোমাকে খাদে
ফেলে দিতে চাইলো। তুমি বুঝলে, তোমার উপলব্ধ হলো, আসলে এই রাস্তাটায় তুমি
একা। বাকি যারা তোমার থেকে এগিয়ে যাচ্ছে বা পিছিয়ে পড়ছে, তারা নাম কা
ওয়াস্তে 'বন্ধু' বা 'শত্রু'। সবাই নিমিত্ত-মাত্র। তারাও বুঝে নিয়েছে
রাস্তাটা একার। পাহাড়টা একার। সম্পর্ক শুধু ছিলো ও আছে - তাদের সঙ্গে,
যারা এই পাহাড়টা চিনিয়েছিলো প্রথম। অতীত তোমাকে পেছনে টানবে ; ভবিষ্যৎ
দূর থেকে হাতছানি দেবে ; তোমার পা-দুটো কিন্তু বর্তমানে। তুমি হেঁটে
চলেছো "এই মুহূর্তে" ভর ক'রে। কিন্তু, এই সুন্দর পাহাড়টা তুমি দেখবেনা !?
চারিদিকে রঙের বাহার। শেরপা ঈশ্বর তোমার পথ-নির্দেশক। সারাক্ষণ রাস্তার
দিকে তাকিয়ে থাকলে, তুমি তো পথ চলার আনন্দটাই হারিয়ে ফেলবে ! হ্যাঁ। তুমি
গর্তে পড়বে। হ্যাঁ। তুমি হড়কে যাবে। হ্যাঁ। তোমার শরীরে ক্ষতচিহ্ন দেখা
দেবে। তারপর, হয়তো তুমি দেখা পাবে কোনো সহযাত্রীর, যে রাজী হবে তোমার
সঙ্গে পা মিলিয়ে চলার।
পাহাড়ি গ্রাম। তার গায়ে লেগে থাকা একটা কাঠের বাড়িতে আঁধার নেমেছে।
তোম্বায় চুমুক দিতে দিতে তুমি খুঁজে পাচ্ছো তোমার স্বপ্নের সংসার।
রক্সিতে গলা ভিজিয়ে দেখছো তোমার সন্তানের মুখ। মনে হচ্ছে, একেই হয়তো সুখ
বলে। সন্তান, বৌদ্ধ জপযন্ত্র ঘুরিয়ে, উচ্চারণ করছে - "ওমমণিপদ্মেহুম"।
যেখানে, প্রতিদিনই জন্মদিন, আর প্রতিরাতই বেথলেহেম। পাহাড়ি পাঠশালায়
তোমার সন্তান পাঠরতঃ। এটাও কিন্তু ট্রেকিং-রুটের অংশ। তোমার সন্তানও এই
রাস্তায় হাঁটবে। তোমার সহধর্মিণী তো অনেকটা পথ বিশ্রাম নিয়েছে তোমার
সঙ্গেই। পাহাড়ি পথে এবার তুমি আর তোমার পরিবার।
অ্যাকেকটা গ্রাম পেরোচ্ছো, অ্যাকেকটা মাইলস্টোন। অনেকে মুখ থুবড়ে পড়ছে।
তুমিও যেমন পড়েছো। আবারও পড়বে।
মাথার ওপর নীলাকাশ আর চতুর্দিকে ঘন সবুজ নিয়ে তোমরা হাঁটছো। "কানামাছি
ভোঁ ভোঁ"। আবার যে যার পথে। একসঙ্গে। অথচ, সবাই একা। তোমার সন্তান বেছে
নিয়েছে তার পথ। তোমার সহধর্মিণী পিছিয়ে পড়েছে। বা, তুমি এগিয়ে গেছো।
গাঁটে ব্যথা। এখন পাহাড় দেখছো চশমা চোখে। মাথার সামনের চুলগুলো উধাও
হয়েছে। পাহাড় বদলেছে তার রূপ। ধূসর হয়েছে সে। রঙের ঘনত্ব আর নেই। এখন
তোম্বা বা রক্সিতে পেটের ডানদিকটা ব্যথা করে। হাঁটতে হাঁটতে, মাঝে মাঝেই,
ভারসাম্য ঠিক থাকেনা। ওপরের দিকে তাকালে খাড়াই মনে হয়। নীচের দিকে তাকালে
ভয় করে। আগে প্রকৃতির প্রতিকৃতি দেখে যে অবাক হওয়ার স্বপ্ন কাজ করতো,
সেটা বিদায় নিয়েছে। তখন সব ঋতুই ছিলো বসন্ত। এখন হেমন্ত এসে ভেতরে
সেঁধিয়েছে। তখন "ট্রেকারস' হাট" দেখলে বুকের দরজা হাট ক'রে খুলে যেতো।
এখন আর সেটা হয়না। তাহলে কি ঈশ্বর শেরপা যেখানে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানে তাঁর
বাড়ি-ঘর !? অন্য কোনো রাজ্য-রাজত্ব ! চিরশান্তির দেশ ?
এবার আর তুমি পারছোনা। গন্তব্যের মাইলস্টোনে আট মাইল। যেভাবে হোক, তোমাকে
পৌঁছোতে হবে। পৌঁছোতে হবেই। যা হয় হোক ! তুষার-ঝড় শুরু হয়েছে। ক্রমশঃ,
তোমার মাথার চুলগুলো প'ড়ে যাচ্ছে। দাঁতগুলো নড়বড় করা শুরু হয়েছিলো। এবার
তুমি দন্তহীন হয়ে যাচ্ছো। চামড়ার ভাঁজগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কাশছো...
ভীষণ ঠান্ডা।
যাক। পৌঁছে গেছো তোমার গন্তব্যে। বেদম শীত করছে। সবই তো বরফে ঢাকা,
বরফে-মোড়া। এরপর আর পাহাড় নেই। কিন্তু, পাহাড়ে যা যা থাকে, সবই আছে। শুধু
সমতল। শেষাংশটায় তো এগোতেই পারছিলেনা। হামাগুড়ি দিয়ে দিয়ে পৌঁছেছো।
অ্যাতো সুন্দর জায়গা কোথাও দেখোনি তুমি। বিশ্রাম নিতে জুতো খুলতে গিয়ে...
এ কী ! তোমার পা কই ? নেই। হাত ! নেই। শরীর ? তাও নেই। ঈশ্বর শেরপা
হাসছেন। তোমার কানে একটা কান্নার আবছা ধ্বনি ভেসে আসছে। ঝাপসা একটা দৃশ্য
দেখতে পাচ্ছো। যেখান থেকে ট্রেকিং শুরু করেছিলে, তার ধারে কাছে কোথাও।
একটা শিশু জন্ম নিচ্ছে। তাকে ঘিরে অনেক মানুষ। তুমি জন্ম নিচ্ছো। আবার।
আরেক বিস্মৃতির মধ্যে।