কল্পমায়া,পঞ্চম পর্ব

নীলাদ্রি বাগচী



আমার পাশের বাড়ির দাদা দিদিরা এই আবহাওয়ায় হতদ্যম না হয়ে তাদের পাঁচ ব্যাটারির রেডিও চালায় এ সময়ে। রেডিও সিলোন কি বিবিধ ভারতী কিছু একটা। সঞ্চালক সম্ভবত আমিন সাহানি। একটা গানের অনুষ্ঠান। এই ঝড়, এই বিদ্যুৎ, এই প্রবল বাতাসের সম্মিলিত আর্তির ফাঁকে ফাঁকে ওদের বাড়ির রেডিওর ক্ষীণ আওয়াজ আসে। উদগ্রীব কান তার খানিকটা ঠিক গিলে নেয়। হিন্দি সিনেমার গান। আমার বাড়ির এক অঘোষিত বয়কট আছে ওই ভাষা, ওই ভাষার সিনেমা মায় গানের ওপরও। প্রকৃত অর্থে আমার বাড়ি শুধু নয়, সেই মফস্বলের বেশীরভাগ মধ্য- অল্প মধ্য বিত্ত শিক্ষিত পরিবারই হিন্দি সিনেমা ও গানকে খুব গুরুত্ত্ব দিত না। যারা দিত তাদের সবারই বয়স ৩০ বা তার এ পিঠে ২০র ঘরে। পাশের বাড়ির দাদা দিদিদের বড় হওয়ায় অবশ্য এসব সাংস্কৃতিক বিধি নিষেধ ছিল না। তারা যে যার মতো যা খুশি শুনত, দেখতও। ঈর্ষণীয় ও আকর্ষণীয় বড় হওয়া ছিল তাদের। যাহোক সেই গান। গানটি আজ যদি পূনর্গঠন করতে যাই তবে তার বিচ্ছিন্ন কয়েকটা পঙক্তিই শুধু সেই ঝড়ের রাতে শুনেছিলাম। পঙক্তিগুলি যথাক্রমেঃ
১) এক আনজান হাসিনা সে মুলাকাত কি রাত...
২) হায় বো রেশমি জুলফোঁ সে বরষতা পানি...
৩) দিল মে তুফান উঠাতে হুয়ে জসবাত কি রাত...
এ অবধি গানটা প্রায় পুরোটাই টানা শোনা। কিন্তু তুফান এসে গোলমাল করে দেয়। তুফান, অরণ্যদেবের ঘোড়া, সে কিভাবে দিল মে ওইসব ওঠায়? তুফান ভারী সুন্দর। ধবধবে। রাণা প্রতাপের চৈতকের মতো। চৈতক কি সাদা ছিল? এই সমস্যায় আবার বিদ্যুৎ আছড়ে পরে। চরাচর কাঁপান শব্দ, রেডিওর প্রবল কড়কড়ানি শ্রুতির খানিক ধ্বংস করার পর আর কয়েক পঙক্তি কানে আসে
৪) সুরখ আঁচল কো দাবাকর যো নিচোড়া উসনে
৫) দিল পে জ্বলতা হুয়া ইক তির শা ছোড়া উসনে
৬) আগ পানিমে লাগাতি হুয়ি হালাত কি রাত...

এইখানেই সে গানের ইতি। কেননা প্রবলতর করকর আর অবিরাম ব্জ্রপাতের শব্দের আড়ে গান ঢাকা পরে যায়। প্রথম বৃষ্টি তার চুম্বন এঁকে দেয় জনপদে। গলি মফস্বল ভাসিয়ে সে নেমে আসে এরপর, টিনের চালে সে অবিরত ধারাপাত ধ্বনি কি বলব তাকে? Prattle- babble- gabble- chatter? যাই হোক সেই আশ্চর্য একটানা শব্দ বিনিময় গ্রাস করে বিদ্যুৎ কলঙ্কিত অন্ধকার চরাচরকে।

আমার মফস্বল বৃষ্টি ধোয়া মফস্বল। একবার বৃষ্টি তার সঙ্গ পেলে তাকে ছাড়ত না। এই প্রাক মরসুমি কি কালবৈশাখীর বৃষ্টিই সারারাত ধরে ঝরত। যেমন সেদিনও। বৃষ্টি দ্রুত ধুয়ে দেয় বাড়ির সামনের সিঁড়ির ধাপ। তস্য গলিতে জল জমে ওঠে, জমা জলে বৃষ্টিধ্বনি, টিনে সেই prattle আমাকে যত আচ্ছন্ন করতে থাকে, তত দ্রুত আমি সদ্য শোনা হিন্দি গানের পঙক্তির স্মৃতি লুপ্ত হতে থাকি। কেবল বেঁচে থাকে, সুরখ আঁচল কো দাবাকর যো নিচোড়া উসনে...

আঁচল অর্থ জানি কেননা মায়ের আঁচল। বাকি শব্দের মধ্যে দাবাকরে প্রয়োজনীয় জোরের ইঙ্গিত পেয়ে যাই। আর ইস্নে উস্নে কিস্নে মানে কে না জানে? ফলে এক গঠন তৈরি হয় কো যো র ভরসায়। শুধু সুরখ আর নিচোড়ায় সমস্যা। তাও নিচোড়া নিংড়ান ধরে নিই আর সুরখ তাহলে ভেজা হয়ে যায়। কয়েক লাইনে এই যে স্বকল্পিত যুক্তির বিন্যাস খাড়া করলাম বাস্তবে সেদিন সমাধান অত সহজে আসে নি।

প্রবল বৃষ্টি ছাঁট যখন বাইরের ঘরের বেশ খানিকটা ভিজিয়ে দিয়েছে তখন মা ভেতরের ঘর থেকে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়। আমার চরাচর ও প্রকৃতি প্রেম থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করা হয়, বাস্তব ও শুষ্কতার স্বার্থে। বিরসবদন আমি মাঝের ঘরে টিমটিমে লন্ঠনের পাশে এসে বসি। এ ঘরের বারান্দার দিকের দরজাও বন্ধ। ফলে বারান্দায় যাওয়া যায় না। আর বারান্দাতেও প্রবল জল। ওই মৃদু লণ্ঠনের আলোয় বিরক্তিতেই আমার চিন্তাসুত্র গঠন সুত্রপাত হয়। এরপর ওঘরের মেঝেয় খেতে বসি বাবা ও মায়ের নানা আলোচনার মধ্যে। আর পড়াশুনোই যখন বন্ধ তখন একই কারনে লাইব্রেরির বইও, নান্যোপায়, ডাল তরকারি মাছ দিয়ে ভাত মেখেই রাতের খাওয়া সারতে হয়। ফলে খাওয়ায় অমনোযোগী হওয়ার জন্য আমি আরও বেশী আমার চিন্তায় মনোনিবেশ করি। খাওয়া শেষে বারান্দার শেষ মাথায় গিয়ে কুয়োর পাড়ে মুখ ধুতে ধুতে জলছাঁট এসে আদর দিয়ে যায়। গেঞ্জির খানিক মুখ ধোয়া জলে ভিজলেও সেটাকে বৃষ্টির ছাঁটেই ভিজেছে বলে চালানর চেষ্টা করি। যদিও সে চেষ্টায় সন্দেহ নিরসন হয় না। ভ্রু কুঞ্চিত বাবা বেশ খানিকক্ষণ আমায় পর্যবেক্ষণ করে, যা শুয়ে পর, বলে ছেড়ে দিলে আমি আবার স্বাভাবিক শ্বাস প্রশ্বাস ফিরে পাই ও পাশের ঘরে এসে দেখি মায়ের বিছানা করা শেষ। নিভু হ্যারিকেন হাতে মা চলে যায় ও ঘরে। অন্ধকার ঘরে টিনের চালের বৃষ্টিধ্বনি কোনও চিন্তাকেই স্থির হতে দেয় না।

সারা বিকেলের গলি ভ্রমণ, এপাড়া সেপাড়া বেড়ানোর কথা ভাবতে গিয়ে আচমকা খেয়াল আসে সাইকেলের সামনের চাকায় নতুন পাড়ার ও দিকে পাথর কুচি ঢুকে গেছে বোধহয়। কাল চাকা পরিষ্কার না করলে ওই পাথরকুচি টায়ার ফুটো করে, টিউব ফুটো করে লিক এনে দেবে। আর এ তো সবাই জানে লিক মানে সেই বিকেল বরবাদ। প্রথম বিকেলে ব্যাস্ত স্বপনদাকে নানান রকম তেল দিয়েও সাইকেল সারানো যাবে না। অবশেষে বিকেল যখন ঘোর ঘোর তখন বাবা কোনও কারনে গনেশের দোকানে কিছু কিনতে এসে এই করুণ দৃশ্য খেয়াল করে বলবে- সাইকেলটা করে দাও। তারপর স্বপনদা এনামেলের গামলায় কালো ও নোংরা জলে টিউবটাকে চেপে চেপে আবিষ্কার করবে কোথায় ফুটো ও তারওপরে সেই জায়গা কি একটা দিয়ে ঘষে পাতলা করে আর একটা টিউব থেকে ছোট একটা টুকরো কেটে কি একটা ঝাঁঝালো মিষ্টি গন্ধের সলিউশন দিয়ে আটকে ফুঁ দিয়ে জায়গাটা শুকিয়ে সেই টিউবটাকে একবার পাম্প করে খানিকক্ষণ পরীক্ষা করার পর আবার তার পাম্প ছেড়ে টায়ারে লাগিয়ে যখন সাইকেল খাড়া করে দেবে তখন বিকেল দূর অস্ত সন্ধ্যা ব্লেও কিছু থাকবে না। এর মধ্যেই আবার কখন বাবা এসে পেছনে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে আর সব শেষ হলে স্বপনদাকে প্রাপ্য চারআনা দিয়ে দেবে। আর আমাকে সুবোধ শব্দের প্রকৃত অর্থ হয়ে পাড়ার মোড় থেকে বাড়ি অব্দি সেই মেরামত হওয়া চাকার সাইকেল চালিয়ে এসে হাত পা ধুতে চলে যেতে হবে।

তাই চাকা পরিষ্কারের সঙ্কল্প। আর এই সঙ্কল্পের শেষে ঘুলঘুলি দিয়ে বিদ্যুৎ চমক দেখা গেলে আবার মাথায় আসবে, সুরখ আঁচল কো দাবাকর যো নিচোড়া উসনে...
ভেজা আঁচল নিংড়ানোর এক অলৌকিক ছবি তৈরি হওয়া শুরু হবে এবার ভেতরে। কার আঁচল? জানি না। শুধু জানি ওই ভেজা আঁচল আর তাকে নিংড়ানোর দৃশ্য মাথায় নাকি কোথায় তৈরি হচ্ছে সে এক তৃপ্তির অতৃপ্তি এনে দিতে থাকে মন জুড়ে। শরীরও মনের অধীন। ফলে শরীরেও তার রেশ ছড়ায়। টিনের চালে babbling কি prattling কোনও কিছুই স্পষ্ট বুঝতে দেয় না। ঝাপসা অর্ধস্বচ্ছ চিন্তা-চেতন ঘুমের দিকে পা বাড়ায়।
কভি দেখি না শুনি এইসি ইলিস্মাৎ কি রাত বৃষ্টি আচ্ছন্ন থাকে। আকাশে কোনও পূর্ণ যুবতী অনন্ত আঁচল নিংড়োতে থাকে; ভেজা আঁচলের জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামতে থাকে গলি, তস্য গলি, তস্য তস্য গলি, পাড়া- বেপাড়ায়। আমার মফস্বল এক দীর্ঘ স্নানে সোঁদা ও আচ্ছন্ন হয়। আমি ঘুমে জারিত হই, ঘুমে স্বপ্ন- স্বপ্নে তুফান- প্রবল ক্ষুরের শব্দ (হুবহু টিনের চালে বৃষ্টিপাত)- আঁচল- সাদা ও ভেজা...

কাট আনকাটে, যুক্তি, এর বেশী আজ আর কিছু নেই মহম্মদ রফির সেই গানে। গানটা আজ তক আমি দেখি নি; আমার বেশীর ভাগ প্রিয় গানের মতো এই গানও আমার মানসে আছে, তার চলচ্চিত্রায়ণ দেখে তাকে আহত করতে চাই নি আমি। আজ মনে হচ্ছে একবার দেখেই নি। এখন এই আধবুড়ো বয়সে চলচ্চিত্রায়ণ আর আমার শৈশব স্বপ্নের কি ক্ষতি করবে? ফলে, আজ এই অবধিই, এইবার ইউ টিউবে সার্চ লাগাই......

ক্রমশঃ ...