হাওয়া আর টুনুর দেওয়া ডায়েরী

রাজর্ষি মজুমদার


চুপ থাকা কীরকম দানা বেঁধে উঠেছে। কথা না বলার মধ্যেও যে আনন্দ , তাকে
পাশে ফেলে - মনখারাপের অভিনয় করেছি আমরা। মনখারাপ আসলে টানেলের মতন।
শেষেও পাহাড়, পাশেও ...

টুনু বলত, আমার টান নাকি দূরের দিকে। কাছে এলে আমায় ওর হাওয়া মনে হয়।
খেয়াল করে দেখেছি - এই কথাটা ভাবলেই যেন হাওয়া দেয় হঠাৎ - আর আমিও জানালা
খুলে রাস্তা দেখতে থাকি। নিজেকে ছোঁয়ার আনন্দে আমার টুনুকেই মনে পড়তে
থাকে শুধু।

আজ অনেকদিন বাদে সেরম কিছু হলনা - আমি ভয় পেলাম - আয়নায় মুখ দেখতে লাগলাম
ভয়ে। টুনুকে ফোনে করতে গিয়ে মনে হল - ও নিশ্চই ধরবেনা।

নদীর ধারে পাহাড় কীভাবে থাকে? আর তাদের দামাল হাওয়াগুলো - আমার মনখারাপ
শুরু হল সেই নুড়ি গুলো নিয়ে - যারা গড়িয়ে পড়েছে কোনো একটা কুড়িয়ে পাওয়া
বেলায়। পাহাড় থেকে নদীকে সাজাবে বলে।

**********

১৬/৩/৯২ - ঘাটশিলা

এই সময়টাতে এখানে খুব অদ্ভুত লাগে। কাল যেমন দুফোঁটা বৃষ্টিও হয়েছে -
ফ্যান অফ করে আরো কুঁকড়ে শুয়েছিলাম আমি - মাঝে মাঝে বেডশীটের একটা দিক
তুলে গায়ে জড়াচ্ছিলাম তাও মনে আছে। দাঁত মাজার জন্য ফ্লোরের মাঝখানে যে
ব্যালকনি মতন জায়গা আছে সেখানে এসে দাঁড়ালাম। পাহাড় দেখতে দেখতে দাঁত
মাজার এই অভ্যেস্টাই আমায় বড়লোক করে দিচ্ছে। কোয়ার্টারের ভেজা ঘাসগুলো
ছাপিয়ে বাউন্ডারী ওয়াল - তারও দূর নদীর ঢালের দিকে ব্রীজ ছাড়িয়ে - ওইইই
দিকের পাহাড়গুলো আমায় আটকে রেখেছে এখানে। বাড়ি যেতে দিচ্ছেনা।
শুরু শুরু তে ভাবতাম কতদূর আর - মাসে দু তিন বার যাওয়াই যায়। শেষ বোধহয়
গেছি মাস চারেক আগে।

ঠিক আর দেড় ঘন্টা বাদে প্রথম সাইরেন বাজবে - আমি সাদা থুতুগুলো নীচের
দিকে ফেলতে থাকলাম। আস্তে আস্তে বাড়িগুলো জেগে উঠছে - ওপাশের অফিসার্স
কোয়ার্টারের দিকে সরমা বৌদি বেড়ার সামনে দাঁড়িয়ে মালিকে কী যেন বলছেন।
এবারেও দারুণ ফুল ফুটেছিল শীতে। তিমির স্যার - আশপাশের সবাইকে ডেকে
পাঠিয়েছিলেন ফুল দেখার জন্য - বিকেলে চা জলখাবার খেয়ে তবে ফেরা।

পাজামা ছেড়ে, ট্র্যাকসুট পরে নীচে নেমে এলাম আমি - লন দিয়ে হেঁটে গেটের
দিকে যেতে যেতে মনে হল - পাহাড় পাহাড় পাহাড় - চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে
আমায়। বাঁচিয়ে দিয়েছে। আলতো হেসে আমি মনে করতে থাকলাম পাহাড় চেনার
দিনগুলো - ছোটোবেলা , সেই সাদা বাড়িটা ...

চাকডিঙার জমিদার বাড়ি। আমাদের গ্রামের আর দুটো গ্রাম পর। আমার এক দূর
সম্পর্কের পিসি ছিলেন সে বাড়ির বড় বৌ। শীতে, গরমের ছুটি, পুজোর ছুটিতে দু
তিন দিন করে থেকে আস তাম আমি। ছোট্টো বেলায় যেবার প্রথম বাড়িটা দেখি -
মনে হয়েছিল বাড়িও এত্ত বড় হয়! পাহাড়ের মতন চোখ তুলে দেখতে হত। সাদা
চুনকাম তখন আস্তে আস্তে ফিকে হতে শুরু করেছে। আমার পিসেমশাই ছিলেন বাড়ির
বড় কর্তা - আর অন্য দিকটায় থাকতেন তার ভাই। বড় বড় দুপুর বেলায় সারাদিন
ছুটে বেড়াতাম আমি - ক্লান্ত হয়ে গেলে উঁকি মারতাম বড়কর্তার ঘরে - তিনি
ডাকতেন - আমি পাহাড়ের গল্প শুনতে চাইতাম। সেই বরফ জমা পাহাড় - ওক আর
বার্চ গাছের জঙ্গল ওয়ালা - তার পাশেই বরফে ঢাকা লেক - সেখানে সবাই ট্রাউট
মাছ শিকার করতে যায়। রাত্তিরে আমি খেতে বস তাম বড়কর্তার পাশেই - তিনি
মাছটা - পায়েসটা তুলে দিতেন আমার পাতে - দেখে অল্প অল্প হাসতেন পিসিমা।
হলুদ ল্যাম্পের আলোয় খেতে খেতে বড় ঘড়িতে নটা বাজার ঘন্টা শুনতাম - ঠিক সে
সময়েই ছোট গিন্নী দরজায় এসে দাঁড়াতেন। কিরম একটা লজ্জায় মাথা নামিয়ে আবার
খেতে শুরু করতাম আমি। চোখ চলে যেত দরজার এককোণে ওর পায়ের পাতায়... আলতার
লাল গুলোতে।

আজ এসব পুরোনো কথা ভাবছিলাম হাঁটতে গিয়ে। শংকরের অখানে ব্রেকফাস্ট করতে
গিয়েও যেনো ঘোর কাটছিলোনা সেই দিন গুলোর ...

ছোটগিন্নী যখন পালঙ্কে শুয়ে বই পড়তেন - আমি তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতাম -
ওর চুলের গন্ধ দরজার বাইরেও চলে আসতো - উনি দেখতে পেয়ে ডাকলে ছুট্টে
পালিয়ে আসতাম পিসিমার ঘরে। সরোজ ম্যানেজার বড়কর্তার কাছে আসতো মাঝে মাঝে
- তখন দেখতাম ছোটো গিন্নী বারান্দায় এসে দাঁড়াতেন - সরোজের চুলে হিট
দেওয়া , সরু গোঁফ - বেল বটম প্যান্ট পরত। শীতের দুপুরে আমি ঘুড়ি দেখতে
যাওয়ার নাম করে ছাদের এক কোণে গিয়ে বসে থাকতাম। ওখানের থেকে ওর জানালাটা
স্পষ্ট দেখা যেতো - উনি বই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন কখনও - ওর নির্লোম
পায়ের গোছগুলো দেখতাম এক মনে। গা শির শির করে উঠতো ...

আসলে পাহাড় এই জন্যেই আমার ভালো লাগে। বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চ, হাতছানি।
নিজের মত সব কিছু খুঁজে পাওয়ার আনন্দ।


************


টুনু আমাকে এই ডায়েরীটা এনে দিয়েছিল - ওই বুড়োটার থেকে কিনে। ভদ্রলোকের
নামটাই লেখা নেই ডায়েরীতে। ন্যারেশানটা অবশ্য খারাপ নয়।
গান শুনতে শুনতে সব ঝগড়া ভুলে যাচ্ছিলাম আমি - টুনুকে আবার ভালোবাসছিলাম খুব।

মনে পড়ছিলো এক নতুন কবির কবিতা - সে বোধহয় পাহাড়কে ভালোবেসে লিখেছিলো -
লিখেছিল কাছে যাবার ইচ্ছেতে - অনেকটা ভালো থাকার আশায় – আমার সে কবিতা পড়তে গিয়ে আগতজন্মের কথা মনে হয় ... পাহাড়ের জন্যে আরেকবার বেঁচে উঠতে ইচ্ছে করে খুব।


আমার এই ছোট্ট টং ঘরে একটা গোটা সকাল যেন পাহাড় হয়ে যাচ্ছিল কোথাও - আমার বাবাকে মনে পড়ছিল খালি
- জানালা খুলে হাওয়া ঢুকিয়ে দিচ্ছিলাম ঘরে - কলকাতা ছাড়িয়ে আমি খুঁজছিলাম
আরো অনেক দূর ...
আরো অনেকটা নিজেকে ছুঁয়ে নেবার আনন্দ।