পাহাড় –মানুষের পা ও হাড় ( A salute to “The Mountain Man’ DASHARATH MANJHI)

অনির্বাণ বটব্যাল


ভূমিকাব্যটুকু
যেখানে অভাবের অনটন নেই , সমস্ত টনটন গা সওয়া হাড়ে পাঁজরের স্বভাবে ।কি খাবে? গা বলতেও গাঁ উজাড়। হন্যে হয়ে কিছু চর্মসার। একমাত্র জ্বালানী খিদে। যাকে হাতিয়ার করা ভীষণ সুবিধে। বাঁচার জন্য যাকে বয়ে নিয়ে যেতে হয় আমৃত্যু। তবু ভীতু হলে থিতু হতে পারবে না কেউ, এই হক বুঝে নিয়েছিল দশরথ।এ দুর্গমতার পথ ,জীবন ও যাত্রার মধ্যে প্রতিনিয়ত তাদের আহুতি চায়, চায় পা ও হাড়ভাঙ্গা খাটুনী। একটু জলের জন্য রক্ত জল করা পা ও হাড়ের এই মজবুরি ... এই পাহাড়। যার তিনশ ফুট মিশিয়ে নিয়েছিল নিজের ঘামে। পাহাড় ডিঙিয়ে কাজে এসেছিল দশরথ।প্রতিদিনই আসে দশরথ মাঝি।চব্বিশের পা ঠেলে দেয় উদ্ধত পাথর । পা থর থর করে না এতটুকু । ঢেলে দেয় টগবগ ...ঠেলে ফেলে দেয় বসবাসের মুসিব্বত সমূহ। পাথরের রুক্ষ্মতায় জেদ শান দেয় গোটা একটা গ্রাম। বিহারের গয়ায় গেহলোর গ্রাম । যে গ্রামকে সভ্যতার থেকে লুকিয়ে রেখেছে ওই তিনশ ফুট যা প্রকৃতই দৃশ্যত। অথচ গ্রাম জুড়ে অগুন্তি অদৃশ্য পাহাড় অচ্ছুৎ করে রাখে খাদ্য... একটু পানীয় জল। পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খায় বন্ধ্যা ইচ্ছারা। প্রতিধ্বনিত হয় শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের কৌতুক, অন্ধকার গড়িয়ে নামে পাথর জীবনে । সাবধানে ডিঙিয়ে যায় দশরথরা । বাঁচার তাগিদে শুধু বাঁচতে জানে। দীর্ঘশ্বাস গিলে নিঃশ্বাস টানতে জানে। নিত্যকার চষতে জানে অন্যের জমি, জানে পাথুরে জমিতে ফসলে কি ভাবে টইটুম্বুর আনে... আর জানে এবং বিশ্বাসে মনেপ্রাণে মানে, এ ফসল ওদের নিজস্ব নয়, হবেও না কোনদিন কোনখানে ।শুধু বোল্ডারের মত গড়িয়ে যাওয়া কিছু কাল...ভাঙতে ভাঙতে বয়সের সকালবিকাল পেরিয়ে ‘কিছু নেই’ খুঁজে পাওয়া... কীইবা থাকতে পারে আর আদিবাসী গুহামানবের নিঃশ্বাসটুকু ছাড়া ... চরৈবেতি মানে আজীবনই জীবনের মহড়া ......

পাথর ভেঙে পা থর থর
হাজার হাজার ফুট পেরিয়ে যায় পা অথচ উচ্চতায় উঠতে পারে না কখনোই। গরমে তেতে ওঠা বা ঠাণ্ডায় কনেকনে পাথর জানতেই পারে না - জানাটুকুই একটা নুড়ি অজানার পাহাড়ে। যেখানে পাহাড়ের সাথে ঠাণ্ডার সম্পর্ক জমতে জমতে গ্লেসিয়ার হয়ে যায় । উষ্ণতার সোহাগে গলে নেমে আসে পাহাড়ের কোলে। কোল একটি অদ্ভুত আদরের রসায়ন । যেখানে চুপটি করে বসে থাকে নিরাপদ ঘুম । ঠিকানা বদল হয় মা থেকে প্রেয়সীর কাছে। হ্যাঁ দশরথেরও আছে। প্রখর রোদের ভিতর একটু বিশ্রামের ছায়া। ক্ষেত থেকে দশরথ তাকিয়ে থাকে । সমস্ত না পাওয়া ভেঙে নেমে আসবে তার ওইটুকু পাওয়া , তার ফাল্গুনী ...মাথায় চাপাটির পুঁটলি কাঁখের কলসীতে জল ... তিনশ ফুট পেরিয়ে বয়ে নিয়ে আসা জিরিয়ে নেওয়ার আরাম ... দু দণ্ড হাসি, কিছু কথা এলোমেলো ... অনর্গল... ...
দশরথ দশ রথের শক্তি নিয়ে মেতে ওঠে ... পাথুরে জমিতে ফসল ও সফল একটাই কথা যার ধাপে ধাপে উর্বরতা নেমে আসে... একাধিক কিন্তু , যদি পেরিয়ে কোনো ঘড়ি নয়, শরীর সময় বলে দেয় । হাওয়া মেখে বলা যায় কোনদিকে বৃষ্টি হয়ে গেল বা রোদ মেখে আজ বৃষ্টি হবে কিনা। বেজে উঠলে চূড়ান্ত খিদের এলার্ম , হুঁশ হয় বেলা পড়ে এল। তাহলে ফাল্গুনী এল না যে ? , পাহাড়ের ছায়া বড় হতে হতে গিলে নেয় দশরথকে... ঘন হয়ে আসে দশরথের চোখে মুখে ... দশরথ পাহাড় পেরোয় রোজ, আজ পাহাড়ের ছায়া পেরিয়ে গেল দশরথকে ... দশরথ ছুটতে থাকে পাহাড়ের দিকে ... ক্রমশঃ পাহাড় বেয়ে খুঁজতে থাকে টুকরো টুকরো ভাঙ্গাচোরা দশরথগুলি... প্রথমে পুঁটলি... তারপর ভাঙা কলসির ভিতরে তখনো কিছুটা জল আরো একটু উপরে থ্যাঁতলানো ফাল্গুনী । নরম পা ও হাড়ের সংযুক্তি মেনে নেয় নি পাহাড়, সুযোগের সদ ব্যবহার.. আজ দশরথকে ভেঙ্গেছে পাহাড় । থর থর করে কাঁপছে দশরথ মাঝি। ভয়ে নয় পাহাড়ের উপর ঘৃণায় অভিমানে রাগে... , পাহাড়ে বেড়ে ওঠা পাহাড়ি শঙ্খচূড় এত ভাঙচুর কখনো দ্যাখেনি আগে । কি করবে সে ? জরুরী অবস্থায় প্রতিটি ক্ষীণ নিঃশ্বাস ক্রমশঃ আরো সৌখীন হয়, পরিচর্যা চায়... সে নিরাপত্তার প্রাণদায়ী প্রসাধন পড়ে আছে ৭০ কিমি দূরে। পাহাড়ের পাক দণ্ডি গলায় চেপে বসেছে দশরথের। দশরথও দাঁতে দাঁত চিপে হাত মুঠো করে , পা বাড়ায়। যেভাবে চিরকাল দূর ও দুর্গমতা মানুষকে সংকল্পে বাঁধে, রাস্তা চিনে নিতে চ্যালেঞ্জ জানায়। কিন্তু না , ফাল্গুনী আর কষ্ট দেবে না তার নিজের মরদটাকে । তার পিয়াস বুঝাতে পারেনি ফাল্গুনী, পৌঁছে দিতে পারেনি তার ভালোবাসার কাছে তৃষ্ণার জল। পানীর সাথে খুনভি শুষেছে রাক্ষুসী পাথর , দশরথকে পাথরে ছুটতে দেবে না আর ফাল্গুনী ... সে টের পায় সময় ফুরিয়েছে তার , তাই আর নয় ,ফাল্গুনীর রাস্তা হারিয়ে যায় চিরতরে... চলা থেমে যায় পাথরে পাথরে ... খুনসুটির উপরে লেগে থাকে রক্তের দাগ , কিছু কান্না নাছোড় ... তিনশ ফুট পাথুরে প্রতিহিংসার সামনে দাঁড়িয়ে পাহাড়ভাঙ্গা দশরথ ... আজকে নিজেই পাথর।



অতএব সংকল্পনা এবং
জীবনের নিচেও লুকিয়ে থাকে গভীরতর চিড়, চৌঁচির সম্ভাবনা ঝুলে থাকে পায়ের নিচে । বরফ ভূখণ্ডে তাকে ক্রিভাস নামে সমীহ কর।তার উপরেও তো জমে ওঠে স্নো ব্রিজ। কালের অধঃক্ষেপনে পায়ের নিচে বিপজ্জনক এক। তবু বিয়োগের পরেই তো যোগ আসে।পূরণ হবে বলেই তো পৃথিবীর অংকে শূন্যের কদর।এত দরাদরি। এবার খেলা সরাসরি তার। দশরথও উঠে দাঁড়ায় । জুড়তে শুরু করে সমস্ত ভাঙা চোরাগুলি । এখন সে চব্বিশ। এখন ১৯৬০ । লাগভাগ আভিভি তিশ সাল বাকী হ্যাঁয় মরনে কা ... কাফি ভি হ্যাঁয় শির উঠাকে জিনেকা ... । কে বড় দেখে নেবে দশরথ – ঐ তিনশ ফুট না বাকী তিরিশ বছরের জীবন। নিশিডাকের মত পাহাড়টা ডাকে আয় আয় । ফাল্গুনীর কান্নায় মিশে দৈব নির্ঘোষ বাজে দশরথের কানে – তুমকোই কুছ করনা হ্যাঁয় বেটা তাকি অউর কোই খুন না গিরি কিসি অউরত কি ... চোয়াল শক্ত হয় দশরথের। এভাবেই কিছু ক্ষত ক্রমশঃ গভীরতর অক্ষত বাঁচার খোরাকি। আমরা হাঁটতে থাকি। হাজার হাজার ফুট খাদের থেকে কেউ তুলে আনে সাহস, অবিরাম তুষারপাতেও সঞ্চয় করে রাখে নিজস্ব উষ্ণতা ... জীবনের সাথে বাজী খেলা মানুষের রক্তে। দশরথও বিক্রি করে দিল প্রিয় পোষা ছাগল দুটি , কিনে ফেলল ছেনি , হাতুড়ী, শাবল। শুরু হল সেই অস্তিত্বের সংগ্রাম ... অসম , কিন্তু অসম্ভব নয় ।এবার লড়াই মুখোমুখি - যে কেউ একজন থাকবে পৃথিবীতে হয় এই দুর্ভাগ্যের পাহাড় নয় দশরথ মাঝি । তিনশ ফুট মিশিয়ে দেবে মাটিতে।
প্রতিটা শুরুর মতই বিস্ময়ে বিস্ফোরিত কেউ। কিছু সন্দেহ সুড়ঙ্গ খোঁজে গাঁওয়ালোদের চোখে। পাহাড়ি সরীসৃপের মত বেঁকে ওঠে সমাজের আদিম নখ দাঁতগুলো । খোলস ছাড়ে। যাবতীয় ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ঠাট্টা টিটকিরি ... পাগল কাঁহিকা ... ছাপিয়ে পুরো গেহলোর গ্রাম শুনতে পায় ঠং ... ঠং... ঠং... দিন নেই রাত নেই পাহাড় কাটছে দশরথ।.. কেউ খেতে দিলে খায় নচেৎ খায় না কিন্তু আওয়াজ থামে না ... বরং কেউ পেরোতে এলে তাকে পার করে দিতে একটু থামে তার হাতুড়ি ... পাহাড়ের পারানী জোটে কিছু খাবার ... তারপর আবার ঠং ঠং ঠং......দশরথের অংক গুজব হতে থাকে।
সমস্ত অংক ভেঙে গুজব সত্যি হলে প্রবাদ হয়ে যায়। প্রমাদ গোনে নিজেই। সন্তর্পণে হাঁটে । ধস নামতে পারে ঝুরো বরফকে বিশ্বাসে।ওখানে মানুষের সবুজ নেই, ট্রি লাইন শেষে ভয়াবহ গিরিপথ আসলে শপথ। উত্তর থেকে প্রশ্ন বরাবর একাধিক শৃঙ্গের পর্বতমালা। এক রিভার্স ট্রেকিং । বোঝা যায় ওঠার চেয়েও নামা বেশী কঠিন। চড়াই উতরাইয়ের হিসাব কষতে কষতে গেহলোর খুঁজে পায় ৭০ কিমি দূরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি এখন ১০ কিমি দূরে... তিন কিমি হেঁটে গেলে ছোটদের স্কুল ... সব ভুল, সংশোধনে নতজানু , কিছু হাত অজুহাত খুলে ফেলে বাড়িয়ে দেয় নিজেদের সামর্থ্যটুকু – আমরাও আছি...আমাদেরও শক্তি দাও বাবা দশরথ... বাবা দশরথ !!! হ্যাঁ দশরথ পিতা হয়ে গ্যাছেন গোটা গ্রামের .. এখন ১৯৮২ অর্থাৎ২২ টি বসন্ত উৎসর্গ করেছেন প্রেয়সী ফাল্গুনীকে নিজের শ্রম ও জেদ। সেকি প্রেম নয় ? একাধিক লোকবল অর্থবল নিয়ে, কথিত বহু কান্নার উপরে দাঁড়িয়ে প্রেমের মিনার শুধু শাহজানের তাজমহল ? না। প্রেম ও প্রতিবাদের নয়া আইকন দশরথ ... তার ৩৬০ ফুট লম্বা ৩০ ফুট চওড়া রাস্তা দিয়ে এখন অনায়াসে ঢুকে পড়ে সভ্যতার আলো ... তবুও থামেন না দশরথ , পায়ে তার রাস্তার নেশা রক্তে পাহাড়ের অদম্য সাহস ... ফাল্গুনী থেকে প্রেম সার্বজনীন হয়ে গ্যাছে তার। পায়ে হেঁটে পৌঁছে গ্যাছেন দিল্লী... দরবার করেছেন একটু শিক্ষা স্বাস্থ্যর জন্য , পাহাড়ের আড়াল থেকে বেড়িয়ে এসেছে গেহলোর গ্রাম ... ওখানেও মানুষ থাকে । সরকার সাহেব দেউলিয়া দশরথকে পাঁচ একর জমি দেয়, একদা ভূমিহীন দশরথ, অন্যের জমি চষতে যাওয়া দশরথ... কি করবে জমি নিয়ে ? বাবা দশরথকে গ্রাম ডাকছে ... বুড়ো দশরথকে ... ফাল্গুনী ডাকছে ... অতএব ইচ্ছা রাখেন এখানে হসপিটাল হোক তারপর ১৭ ই আগস্ট ২০০৭ জয় করলেন শেষ শৃঙ্গটি , রওনা হলেন ফাল্গুনীর কাছে। সমস্ত বাধা বিপত্তির পাহাড় পর্বত গিরিখাত ডিঙ্গিয়ে গ্যাছেন তিনি ...তুই থেকে তুমি পেরিয়ে আপনি হয়ে গ্যাছেন... পায়ে হাড় ফোটার ব্যাথা থেকে হাড়ে হাড়ে পা গজিয়েছিল যার , সত্যি পাহাড়কে জয় করেছেন যিনি ... একাই সরিয়েছেন অশিক্ষার অন্ধকার পাহাড়। নিয়ে এসেছেন জরুরী ব্যবস্থা চিকিৎসার।পাহাড় ভাঙার শ্রম মুছে স্বাস্থ্যের উপশম ।

আমরাও পাহাড়ে ছুটি , ছুটি কাটাই । অথচ পাহাড় কাটাই করে কেউ ছুটি পেয়ে যায়... জীবন থেকে ছুটি। তার জীবনই তখন সমীহ ও শ্রদ্ধার পাহাড় । আমরা মাথা উঁচু করে তার শৃঙ্গ দেখি , স্যালুট করি, নতমস্তকে কুর্নিশ করি , বলি হ্যাটস অফ দশরথ মাঝি , দ্য মাউন্টেন ম্যান এন্ড ইয়োর বিলাভেড লাভ ......