শোভা ও সৃষ্টিনাশ

নৈরিৎ ইমু


এক প্রাংশূন্নত গিরির পাদদেশে জঙ্গলাবদ্ধ খাজে খুব মিষ্টি বুনোফুলের গন্ধ নিয়ে চোখ খুললো সে। কাছেই ভেজা মৃত্তিকায় পশুপথের দাগ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে, একতরফা জল ঝরে যাচ্ছে কোথাও আর সেই শব্দ-সুর শোনে বোঝা সহজ একটা ঝরণা, একটা ছোট জলপ্রপাত প্রাণের কথায় ভেসে যাচ্ছে এইদিকেই, আশেপাশেই। সে তাঁর অবসন্ন দেহটি নিয়ে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলো। মস্তিষ্ক ব্যাপারটি ঠিক পূর্বেকার মতো তড়িৎগতিতে গ্রাহ্য করে নিতে পারলো না, ফলত পতন। মুহূর্তের জন্য অন্ধকার, বন্ধ চোখ। একটা শিস দূর দূর থেকে এসে কাছ ঘেষে আবার দূরে হারিয়ে গেলো। মনে হলো কোন পাখির ছায়া অতিক্রম করে গেলো শরীর। তৃষ্ণা খুব তৃষ্ণা। আর সেই তৃষ্ণা-সংশ্লিষ্ট শক্তি সঞ্চারে পূনরায় দাঁড়ানোর চেষ্টা। কাঁপছে শরীর, ঝাপসা লাগছে সব। মুঠোভরে কৃতজ্ঞ গুল্ম ধরে সে ধীরে শান্ত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে পড়ল। সম্মুখে যতদূর দেখা যায় চারণভূমি তারই বুকচিরে বয়ে গেছে ছোটনদী, একপাশে ছায়াময় নিবিড় অরণ্য। কেবল অচল শৃঙ্গে টুকরো আলোর ছটা খেলা করছে। মনে হচ্ছে যেন দূর হতে কোন এক বালকের হাতে দর্পণে সূর্য ফেলে এদিকে তাক করে দিয়েছে সেই বিম্ব-আনন্দ সমস্ত। কিন্তু এখানে কেন? কিভাবে? সে ভাবার চেষ্টা করলো। কিছুই মনে পড়ছে না তার। কৃষ্ণগহ্বরে থেকেই অগত্যা সে সামনে চলার সিদ্ধান্ত নিলো। স্ফটিক জল ছুঁয়ে মুখে দেয়, পান করে। তারপর কিছুদূর এগুতেই একদল রাখাল তাদের চতুষ্পদ জন্তুসকল চরাতে দিয়ে দলবেধে খেলছে ডাংগুলি। তাদের পাশ ঘেষে যেতে যেতে সে দেখলো, কেউ ফিরেও তাকালো না। এমনকি এই রিমঝিম রোদমাখা শস্যমাঠে দাদনে ব্যস্ত নারী ও পুরুষ কৃষক একবার মুখ তুলে দেখলো না পর্যন্ত। তবে তাকে কি কেউ দেখতে পাচ্ছে না? সে কি অদৃশ্য?


আঁকাবাঁকা গ্রামীন কাঁচারাস্তা ধরে ক্যাচক্যাচ শব্দের সাথে গলা ছেড়ে গান ধরা এক গাড়োয়ান তার জোড়াষাঁড় তাড়া দিয়ে উঠছেন হঠাৎ হঠাৎ, আর কেমন অলস যাত্রা। মনে হয় সারাটা জীবন কাটিয়েও বাড়ি ফেরার চেয়েও এই ফিরতে থাকার নেশায় তিনি বুঁদ হয়ে আছেন। একই পথ ধরে দিনে বার দুইবার মটরের গাড়ি ছুটে যায় গঞ্জের দিকে। রাস্তার দুই পাশে তারই চাকার ধূলোময় ছাপ উক্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে সগর্বে। গ্রামীন লোকগুলো নিজেদের ক্ষেতের শাক-সবজি, গৃহ-পালিত পাখি, বন্য হরিণের লাল মাংশ নিয়ে গঞ্জের দিকে যায় বিক্রির অধিক লাভের আশায়। ইদানিং প্রায় নিয়মিত গঞ্জ হতেও অনেকেই আসেন ব্যবসার খাতিরে, বয়ষ্ক শিক্ষার মাষ্টার, ঋণদাতা সংস্থা ও স্বাস্থ্যঅধিদপ্তরের কর্তাও। তারই সুবিধার্থে স্টেশান কেন্দ্রিক কিছু জীর্ণ ছাপড়া দোকান-পাট, গণা-কয়েক মানুষের ভিড় গড়ে উঠেছে। এক অন্ধ ভিক্ষুক তার জং ধরা থালা নিয়ে বসে পড়েছে এক কোণায়। বয়ষ্ক অশ্বথ গাছের ছায়ায় সেইসব অনাড়ম্বর জীবনের গল্প জমে উঠেছে ক্রমে। তাদের নিত্য নৈমত্তিক ধারায় এটুকুই হয়ত গঞ্জের আদলে সৃষ্ট পরিবর্তনের রূপরেখা। সেই স্টেশান অবধি টলমল পায়ে হেঁটে পৌছালো সে। কত পরিচিত অথচ কেমন অপরিচিতের ভিড়ে সে তলিয়ে আছে। অনেক সন্তর্পণে সে নিজের কন্ঠ জাগাতে ব্যর্থ হয়ে আত্ম-সন্তাপে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠল। কিছুতেই তার বিশ্বাস হলো না সে কারো দৃষ্টি আকর্ষণে নিরর্থক প্রচেষ্টা করে যাচ্ছে। তার বোধ বুদ্ধি অহেতুক তাকে তিরষ্কার করে চলেছে। ক্ষণিক বাদেই দানবীয় গর্জন তুলে কালোধোঁয়ার কুন্ডলী উড়িয়ে একটি মটরযান এসে দাঁড়ালো, আর তাতে হুড়মুড় করে নিজেরদের মালপত্রসমেত উঠতে শুরু করলো লোকজন। সে ভাবলো, কোথায় যাচ্ছে! কোথায় যাবার কথা ছিলো তার। আর দ্বিধাদ্বন্দ্বের পাঠ চুকিয়ে শেষমেষ অন্যসকলের মত উঠে পড়লো সেই মটরযানে। থমাকানো ইঞ্জিনের দোল খেয়ে ছুটে যাওয়া যানে বসে তার বমি আসতে চাইলো। পাশেই মধ্যবয়স্ক লোকের ঘামগন্ধে আরও বিরক্ত হয়ে উঠলো সে। তার হাতে একটি পত্রিকায় হঠাৎ চোখ পড়তেই সে বুঝতে পারলো ঐ কালো অক্ষরগুলো চট করে বিঁধে গেছে মগজে, আর যন্ত্রণা হচ্ছে। ভয়ানক হুইসেলের শব্দ। অনেকগুলো লোক একত্রে চিৎকার করছে। তাদের ভেতরকার একজনের একটা বাক্য খুব মন দিয়ে শুনলো সে, আলোচিত পর্ণস্টার শোভা মিত্র নিখোঁজ।


হতদরিদ্র এক গৃহিণী প্রসব করেছিলেন শোভাকে। পিতৃ পদবীযুক্ত হয়ে মিত্র পরিবারের কন্যা হিসেবে সল্পবৈতনিক শিক্ষাদানে নিয়োজিত পিতার মুখের দীনতার ছাপ সন্তানাদি প্রাপ্তসুখে হলেও সে কিঞ্চিৎ ক্ষয় করেছিলো। সেইসব দুর্গত দিনে সাধ-আহ্লাদ অনেকটাই বিদ্রুপের মতো। ভদ্রলোক নিজের ভেতরে রোগ পুষে সম্ভবত নিজের ব্যর্থতার লজ্জার ভার আর বইতে না পেরে একদিন মরে গেলো। সেই শোকে শোভার মা বিভোর হয়ে থাকতে চান নি। বলতেন, কর্তা সারছে। এখন নিজের ঘাড়ের ঘা দেখিয়ে চললে বাচা মুশকিল হবে না? তিনি এতো কঠোর হলেও লুকিয়ে কোন কোনদিন চোখের জল মুছে নি তা নয়। কত বিচিত্র মানুষ! বেদে আক্রান্ত কীট মহার্ঘ শাস্ত্রবাক্যে অন্নসংস্থান করে নেওয়ার ঘটনা অসত্য নয়। কিন্তু এই উদারবাক্য পাঠরত উপাসকের উদরের পাথর গলে না। তাও সমস্ত সৃষ্টি আবিরের মাঝে ডুব দিয়ে মানুষ তার দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছে, নির্মম হচ্ছে, ছুটছে-ঘুরছে আবার স্বর্গবাসী হওয়ার মানসযোগ করতেও ছাড়ছে না। এই ভূ-পৃষ্ট তাই অদ্যপান্ত এক রণক্ষেত্র। সেখানেই যুদ্ধ করতে করতে একদিন বিদ্ধস্ত হয়ে শয্যাসুখী হলেন শোভার মা। তার শুশ্রূষা ও আরোগ্য কামনায় অনেকটা নিরুপায় হয়ে কর্তব্য খাতিরে অথবা নিজ তাগিদে অভিন্ন পথ আবিষ্কারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয় শোভা। সজ্জনহীন বন্ধুর পথে সে একটা মরুউদ্যান দেখতে পেলো। অগ্নি মরুৎ তার দৃষ্টিভ্রম করে দিলো ও কালকূটের তেতোয় নিজের বাঁশিহীন ফুৎকার নিয়ে অসহায়ত্বের কাছে ক্রমশ গুটিয়ে উপায়ন্তের দিকে সংশয় ছুঁড়ে দিতে লাগলো। অথচ তার স্বপ্ন ছিলো অনেক উঁচুতে উঠার। এক নীল পর্বত শৃঙ্গে অস্তলাল সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে বিবর্ত দোল খেলাবে তার ধবল ডানাবহুল জামা। পূর্ণচাঁদ হেসে উঠতেই তার চিৎকার উঁচু-নিচু সমস্ত গিরি ছুঁয়ে ছুঁয়ে এসে প্রতিধ্বনিতে কাঁপিয়ে তুলবে আকাশ-বাতাস। সিন্ড্রেলা... সিন্ড্রেলা...সিন্ড্রেল া... এই স্বপ্ন তার দিনেদিনে গড়া। অনেক অনেক রাত্রির দানা দানা অভিলাষ, স্পৃহায় মনোরথে ভেসে ভেসে ক্রমান্বয়ে গড়ে তোলা প্রত্যয়িত মূর্তিমান হৃদয়ঙ্গম স্বপ্ন তার। আর বক্ষে গোপন কোন কুঠরীতে তাই গুপ্ত করে একটা দীর্ঘশ্বাস উড়িয়ে দিয়ে চৌরাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ায় সে। রুপালী কয়েনের এপিট-ওপিট জয়-পরাজয়, বাজি। জনঅরণ্য কোলাহলে তার কানে বাজে অসুস্থ মায়ের খুকখুক কাশি। সেই হতাশার মেঘাচ্ছন্ন শনি পেরিয়ে সে জুটিয়েও নিয়েছিলো রোজগারের পথ। কিন্তু অফিস মিটিং হেতু এক ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, অল্প এলকোহল, তারপর শীততাপ বদ্ধকক্ষ, কটকটে পারফিউমের গন্ধ এবং সবুজ চাদরের নরমে সংজ্ঞাহীন সময় শেষে একদিন সে ক্ষত নিয়ে ফিরলো বাড়ি। রাতভর শাওয়ারের নিচে ব্যবচ্ছেদের নিপুন সেলাইয়ের দরদ নিয়ে বসে রইলো শোভা, সমস্ত শরীর কাঁপিয়ে প্রকট হয়ে উঠলো জ্বর। প্রতিটা কোষকোষান্তরে ছড়িয়ে পড়লো অপারগতার ক্ষোভ ও তীব্র ঘৃণা। তান্মধ্যে সে আলাদা করতে শুরু করলো কিছু কূট দৃষ্টিভঙ্গি। ওড়না আর বক্ষের ক্ষেত্রফলে জ্যামিতিক মাপ। ঠিকএকই রকম্ভাবে কাকাবাবুর সমাদর, পাড়ার বকাটে ছোকড়া, মুদির দোকানদার শম্ভু বাবু পর্যন্ত তার ষোলআনা হিসেবে মিল খেলে যায় এবং সে শঙ্কায় আৎকে উঠে। ময়ূর পেখমের বিমুগ্ধ প্ল্যাটফর্মে এক উত্তম রঙ্গিন তিলকের ফোঁটা ক্রমে এক সর্প শ্বাসের আঘাতে আঘাতে কালো হতে থাকে। বাস্তব জাদরেল তারই সদ্ব্যবহার করে, ঠান্ডা সূচালো পাথরে ঘষে ঘষে যে একটা ছোরা ধার করছিলো অনন্তকাল ধরে, সেই ছোরাই চালিয়ে দেয় তলপেটে। ব্যাথায় নুয়ে পড়ে শোভা। হায় সিন্ড্রেলা... এই নরক প্রক্ষালন থেকে বেরিয়ে আর কোনদিন অস্তগামী সূর্যকে চুম্বন করা হবে না সুউচ্চ পর্বত চূড়ায় দাঁড়িয়ে। অন্তত প্রাণভরে নিশ্বাস, একটা নাকফুল আর কবিতার পুরুষ। একটু মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো। বাঁচার জন্য বাঁচা স্বাভাবিক অন্য আটদশজনের মতো মুখশ্রী নিয়ে, স্বস্তিতে।


সরস্বতী পূজোর সন্ধ্যায় ঝাকসুদ্ধ ডাহুক ডেকে উঠলো। জেব্রার গায়ের মতো বছরগুলোর অন্যমনস্কতায় এক হাতল ভাঙ্গা তালপাখা দুলে দুলে মৃদু বাতাস দিয়ে যাচ্ছিলো যেন। দুটো তবলার পাশে হারমোনিয়মটা কেঁদেই সারা। আদিম গন্ধে অবিশ্বাসীদের ভিড়ে নিক্বণ রাগ ঝরে পড়ছিলো অবিরাম। মেঘ ও বিদ্যুৎবাজির মধ্যকার অন্ধকার চর্চা দখল করে রেখেছে জনপদ। আর তামাটে চঞ্চুতে শীববাড়ির হুল্লোড় চুষে খাচ্ছে শ্লাঘীছায়া। হঠাৎ কেউ কাঁধ ছুঁয়ে দেয় শোভার। ঘাড় ঘুরাতেই পরিচিতা ফাইন আর্টসের অপর্ণা দি। একটু মেকী হাসি। দিগভ্রান্ত শোভার মঙ্গলাকাঙ্ক্ষা প্রস্তাবে সিদ্ধান্তহীনতায় পরবর্তী সপ্তাহধরে নিজস্ব কাঠগোড়ায় একে একে সকল যুক্তি ভেঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ে সম্মতিসূচকে এসে থামে। খসে যাওয়া নক্ষত্রের মতো ধ্রুব সত্যের কাছে বাস্তবতার সুদৃঢ় বাঁধনে নিজেকে বেঁধে একবার মনে মনে ভাবলো ভাসিয়ে দেই। আর এভাবেই মনচিত্রপটে অধর্মকে ধর্ম মেনে কুণ্ঠাবোধে জড়িয়ে শোভা কালিকে জোরক্রমে রঙ ভেবে ঘাটতে নেমে গেলো। নীতিজ্ঞান তাড়না ও স্বপ্নাবিষ্ট চেতনার মধ্যে একটি পারিজাত ফুল ক্রমান্বয়ে তার যাতনাভুক্ত পাপড়ি ও রেণুখেলায় লিপ্ত হয়ে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করে পর্ণ-কলায়। এ কোন স্বচ্ছ শিল্পধারণায় নয়, এবং সেখানেই বিস্ফোরন। ফলে মাতৃত্বের প্রতি দায়ভার আংশিক ও সাময়িক সমাধান কিংবা পরিত্রানের পরও কোন বাণ বিধানে সে ধূম্রধবান্তে নিজেকে শূন্য করে তুলতে লাগলো। জীবন কোন পিথাগোরাসীয় উপপাদ্য নয় বলেই ধীরে ধীরে সে তার মনস্তাতবিক জগতে একা হয়ে ছিটকে পড়ছিলো সাধারণ গতিপথ হতে, তলিয়ে যেতে লাগলো নিজের রচিত দুর্ভোদ্য কূয়ায়। মানিয়ে নেওয়ার সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা আর বিবেক স্ফুট হয়ে আসা বাষ্পচৈতন্যকে অগ্রাহ্য করে করে সে হাপিয়ে উঠলো। অগনিত রাত কতিপয় প্রবঞ্চক হাত, আঙ্গুল তার তন্দ্রাচ্ছন্নতার ভেতরে এসে খামছে ধরে থ্যাতলানো মুখ। ঝিলিক দিয়ে উঠে দংষ্ট্রী কার্যকলাপ। নিজের সাথে সাথে এই পৃথিবীকে তার নগ্নিকা মনে হয়। আর রুদ্ধ হয়ে আসে প্রশ্বাস। দীর্ঘ পর্দায় ছুটতে থাকা অঙ্গ-অনঙ্গে ইলেক্ট্রিক ঝটকায় ঝলসানো মাংশপিন্ড দেখে যারা হর্ষ-লোভ পিষ্ট কাঙ্ক্ষিত কন্ঠে মধুর মুগ্ধতা বলে গোপনে গোপনীয়তার অতিরঞ্জিত বুলিকে হজম করে তাদের কাছেই যেন বারবার সমর্পণ ভিখেরী শরীর! একটা ঐশ্বরিক চুম্বনের জন্য, ওহি নাজিলকৃত সহবাসের জন্য একজন নারী যে নকশাকে তুলে রাখে সুবর্ণরেখায় অতি ঝংকারের পূন্য মুহূর্তের জন্য কেবল সেই কথা ভেবেই শোভা নৈবেদ্য হতে থাকলো সঞ্চিত অহংকারের নিকট। দিনে দিনে স্মৃতিচিহ্নের পাশে রাখা বিষণ্ণ বনফুলের পচন ব্যাধিতে আ-গন্ধ টের পেতে শুরু করে শোভা। এবং শ্যামাসুন্দর কোন সন্ধ্যায় সে বহুবার রেলব্রীজ হতে লাফিয়ে পড়তে চেয়েছে জলগর্ভে। পঙ্কিল সমান্তরাল মর্ত্যপথে মানুষ্য মনুমেন্টের উপর হতে উদ্দেশ্যর উঠোনজুড়ে সে এক ঘুঙ্গুর পরিহিতা নর্তকী বৈ আর তো কিছু নয়। পোষ্টার আচ্ছাদিত দেয়ালসমূহ জিব বের করে থাকে, ফিচার ও টকশোগুলোতে উন্মোচিত হতে থাকে দেহজসুর অযাচিত কর্কশে। সকল অসহ্য বিশ্লেষনাদির পর দাপুটে ব্যাঘ্র খুইয়ে নেয় চিত্রল কুরঙ্গ-আমিষ। শীৎকারের মিছিলের পর সোডিয়ামের আলো আরও ঘনীভূত হয়, মনে পড়ে সিন্ড্রেলা। অস্তগামী সূর্যের সাথে কথা ছিলো তার। কোন এক সুউচ্চ গিরিশৃঙ্গে তার অনিন্দ্য ইচ্ছারা ঘুমিয়ে আছে। কিন্তু সে তার অস্তিত্বের মনোযোগ খুইয়ে পড়ে আছে পিঙ্গল ক্ষয়সূত্রের মাঝে। আসলে কতটুকু উচ্চতা তার প্রয়োজন ছিলো? কতটুকু দাড়াতে চেয়েছিলো এই বিকলাঙ্গ পা নিয়ে? কতটা প্রশান্তি, প্রাপ্তির জন্য? কোন রহস্য গন্তব্যের দিকে চেয়ে পরিহাসপ্রিয় প্রতিষ্ঠায় তার আত্মনিয়োগ? নিজের ভেতরে নেমে আসে তুমুল ধ্বস।


শোভার কাছে রক্তক্ষয়ী হৃদপিন্ড জুড়ানোর একমাত্র জায়গা মাতৃক্রোড়। সেখানেই প্রকৃত নিজেকে মেলে ধারার কোন বাঁধ নেই। ছলছল চোখের জলরঙ, কম্পিত ওষ্ঠাধর আর অব্যক্ত মায়া, করুণা, তিক্ততা ও নিজের কাছে নিজের তুচ্ছ হয়ে উঠার শান্তনা উচ্চারণের পরম আশ্রয় শুধুমাত্র একটাই। মা যে সন্দেহাতীতভাবে স্পর্শ দিতো তা নিশ্চিত নয়, সেইবোধে এতো কাছে থেকেও রচিত হয় একটা দূরত্ব। আর প্রাপ্তি শর্তেও হতাশার একটা বলয়ে আটকে পড়া শোভা অকস্মৎ এক সকালে অনুভব করলো তার সেই সাকার দূরত্বানুভব আশ্রয়টুকুও হারিয়ে গেছে। সম্মুখের হীম চেতনাহীন জঠরের সুতাটান ছিঁড়ে যাওয়া মা’কে দেখে সে স্রষ্ঠা ক্রোধে দপ করে জ্বলে উঠলো। কিন্তু নির্বাক শোভা নিপুন স্তব্ধতার গভীরে বহুগুন স্তব্ধতার ভেতরে জমাট হয়ে গেলো সম্পূর্ণ। শবদাহ শেষে উদ্মাদপ্রায় শোভা তার লক্ষভ্রষ্ট তীরের দিকে আক্ষেপ ছুঁড়ে গড়িয়ে পড়লো মেঝেয়। জাগতিক সব কিছু তার নিরর্থক মনে হতে লাগলো। সারাটা শরীরজুড়ে অসংখ্য ভায়োলিনের ছড়ি ছড়কে দমবন্ধসুর তুলতে চাইছে কেউ। মনে হলো একটা কাৎ হয়ে যাওয়া শিশি অনর্গল ঢালছে নোংরাতরল, অথচ শিশি ভর্তি কিছু সৌরভ ছিলো। সেইরাতেই নিয়মাতিরিক্ত আঁধারে সে অন্ধের মতো বেরিয়ে পড়ে।


লতা-গুল্ম ঝাড় সরিয়ে সরিয়ে, কাঁটাগাছ বিঁধে, পিছলে গিয়েও শোভা একটা গিরিশৃঙ্গে আরোহনের চেষ্টা করছে। ঘোর অন্ধকারে তার ঘামে ভেজা শরীর আচানক মনে হতে লাগলো লালায় মাখামাখি হয়ে উঠেছে। আবার সেই প্রবঞ্চক হাতগুলো সক্রিয় হয়ে আংগুলগুলো পেচিয়ে যাচ্ছে, বিদঘুটে হাসির শব্দ মিশে যাচ্ছে শৃগাল ক্রন্দনের সাথে। একদলা থুথু ছিটিয়ে সে আরও দ্রুত উপরে যাওয়ার চেষ্টা করে। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে শোভা একবার প্রাণভরে শ্বাস নিলো। পূর্ণচাঁদের স্বপ্ন থাকলেও ঘোর অমানিশার মধ্যে সে মাথা তুলে ধূসর আকাশটাকে দেখলো, যেখানে অজস্র প্রজ্জলিত নক্ষত্র উঁকি দিয়ে জেগে আছে। শোভার কেমন মাথা ঘুরে এলো, নাড়ি ভুড়িসহ গুলিয়ে মুখে বের হয়ে আসতে চাইলো। সহস্র ঝিঁঝিঁ পোকা একসাথে ডেকে চলেছে, তার মনে হতে লাগলো এই ডাক মাথার ভিতরে উৎপন্ন। সে অস্থির অনুভব করলো এবং সম্মুখে তাকিয়ে চিৎকার করলো সিন্ড্রেলা... অদ্ভুত সুরে ভগবান যেন তারই সেই কন্ঠ খন্ড খন্ড করে ফিরিয়ে দিচ্ছিলো সিন্ড্রেলা সিন্ড্রেলা সিন্ড্রেলা। আর তাই শুনে শোভা হাসতে লাগলো, হাসির শব্দও দূরে হারিয়ে গিয়ে ফিরে ফিরে এলো। এই আনন্দে জ্বলে উঠলো চোখ। সে তার দুহাত প্রসারিত করলো এবং একবারের জন্য পাখি হতে চেয়ে নৈঃশব্দ্যে পতনমুখী বিধি সম্পন্ন করলো। আকাশে উড়ছে ধবল ডানাযুক্ত জামা... অদৃশ্য খিড়কী পথে চেয়ে আছে রক্তলাল সূর্য... চাঁদরোয়া অরণ্যে শোভা এক মৃগছানার গায়ে বুলাচ্ছে হাত... চোখ ধাঁধানো আলো, এত্ত আলো, আলো কেন?