পাহাড়ের নির্মাণ, লোককথার পাহাড়

প্রবুদ্ধ যিষ্ণু ঘোষ


পাহাড় ছায়া ফেলে, অন্তরঙ্গ স্নিগ্ধতার মতন। পাহাড় গড়ে ওঠে; পাহাড় জুড়ে থাকে সুনিবিড়। মিশে যায় দৈনন্দিনে ক্ষতে শুশ্রুষায়। পাহাড় আঁকা হয় লোককথায়। আহা! সব পাহাড়ে না-ই বা জমল অভিমানের মেঘ। সব পাহাড়ের বুক চিরে না-ই বা লাজুক হাসল শত ঝরণার জল। কিছু পাহাড় তো আগলে রাখে প্রিয়জনেদের। নিজের দু’হাত আঁজলা পেতে দেয়, মন কৃষিকাজ জেনে নেয়। সেইসব পাহাড়ের কোলে বসতি; যাপনসন্ধান। কথোপকথন মুখ থেকে মুখে বাতাসের মতন বয়ে নিয়ে চলে আখ্যান। কথনে দুঃখ, কথনে সমৃদ্ধি। কথক আস্তে আস্তে হারিয়ে যায়, হারিয়ে যাওয়াটাই বাধ্যতা। কিন্তু, ব্যক্তিগত সমষ্টিসুখ সমস্ত আখ্যান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। পাহাড় উপত্যকায়। তারা হারিয়ে যায়না, তারা মুছে যায়না, তারা হয়তো জন্মও নেয়না; শুধু রূপান্তরিত হয়ে বয়ে নিয়ে চলে হা হা দীর্ঘশ্বাস বা হাঃ হাঃ সুখগল্প। প্রমিথিউসের মত মানুষ বাঁধা থাকে পাহাড়ে, রোজ তাকে ছিঁড়ে খায় শতদুঃখ, তবু ঠিক মিথের মতই জুড়ে যায় অবয়ব ফের পরদিন দিনগত অন্বেষণ দিন ছিঁড়ে ছিঁড়ে সূর্য ডোবার ক্ষণ, তারপর কথক ছড়িয়ে দেয় অতীতকথন ‘সে অনেক দিন আগের কথা’, এও এক বৃত্ত আপাতত্রিভুজ পাহাড়ে স্পর্শ করে থাকে...

#
গাঁয়ের পাশের ওই পাহাড়ে বুড়ো গেল। বরফ-জমা পথে পাহাড়ে উঠল। পাহাড়ে ওই উঁচুতে পাথরের বাজকে বসিয়ে দিল। ওই দেখ, আজও বাজ ডানা মেলে এখানে পাহাড়ে বসে আমাদের গাঁ পাহারা দিচ্ছে। কবে থেকে দিচ্ছে, কেউ জানে না।... আমরা বাজকে পুজো করি। বাজ আমাদের দেবতা। নিজের জীবন দিয়েও সে আমাদের জন্য আগুন এনে দিয়েছে।
অথবা, সেই বাজের মৃত্যু পাহাড়ের চাইতেও ভারি। পাহাড়ি গাছের উঁচু ডালে থাকত, সদ্যোজাত শাবকদের নিয়ে। বরফের দিনে সেই প্রবল জমে যাওয়া রাতের মতন দিনে বুড়ো মানুষ তাকে বলেছিল সূর্যের আগুন এনে দিতে। দিয়েছিল। ঝলসে যাচ্ছিল, তবু এনেছিল। চিরন্তন সেই আত্মাহুতির কাহিনী। দধীচির পাঁজরে ঝলসে উঠেছিল বজ্র। আর, এখানে বাজপাখিটির দেহ, ঠোঁটের খড়কুটো ঝলসে মানুষ পেল আগুন। বড়ই সম্মানের, পাহাড়ের মতই উঁচু। পাহাড় থেকে আগুন নেমে আসে উপত্যকায়। উপত্যকা থেকে প্রাজ্ঞ ব্যক্তি পাহড়ে উঠে প্রতিষ্ঠা করে আসে মূর্তি। আইকন। মিথ পরম্পরা চলতেই থাকে। পাহাড় বলতেই আমার মনে পড়ে পড়ে মিথ-দৃশ্যের ভেসে বেরানো। ওই যে, মুজতবা আলি-র গল্পে সেই ভয়ঙ্কর সুন্দর পাহাড়ে বাঁক ঘুরতে ঘুরতে যাওয়া। হঠাৎই একটি বাঁক ঘোরার মুখে রক্ত ঠাণ্ডা! খাদের ধারেই ভাঙ্গাচোরা গাড়ির কঙ্কাল। অলিখিত সাবধানবাণী। আপনাতেই স্লো হয় স্পিডোমিটার, শান্ত। সেই গাড়িটি আত্মত্যাগ করে বাঁচিয়ে দিয়েছে পরবর্তীতে বহু জীবন! আচ্ছা, ‘কোমল গান্ধার’-এর ওই জায়গাটা মনে পড়ল হঠাৎ, কে যেন পাহাড়ের কথা উঠলেই গেয়ে উঠত ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা বিশ্বভরা প্রাণ...’। অনসূয়া বদ্ধ শহরের একলা জানলা দিয়ে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টি ছুঁয়েই বলে ওঠে, ইচ্ছে করে পাহাড়ে গিয়ে ভিজি। ওই যে নীতা কেবলই পাহাড়ে যেতে চাইতি, সত্যবদ্ধ দিনরাত্রি থেকে ছুটি নিয়ে পাহাড়, বিশাল, চারদিক খোলা, হা হা বাতাসকে ছুঁতে চাইত; দাদাকে রাজি করাত গভীর অনুনয়ে। আর, শেষে ওই যে মিথ হয়ে ওঠা সংলাপ, পাহাড়ে পাহাড়ে ক্যামেরা প্যান করছে, ঘুরছে ঘুরছে কথারা নীতার মুখ থেকে আমাদের বুকে ক্রেয়ন দিয়ে এবরো-খেবরো ব্যথাছবি এঁকে দিচ্ছে... আমরা পাহাড়ের ওই বিশালতায় গিয়ে বিন্দুর মতন আমাদের জীবনযাপনের দৈনন্দিন ব্যর্থতাকে চীৎকার করে ছুঁড়ে দিতে চাইছি। আর, নীতা প্রবল আকুতিতে ফিরতে চাইছে তার সেই কিচ্ছু না-পাওয়া সামতলিক অভিঘাতে... সে হেরে গেছে, সে জিতে যাচ্ছে জীবনের কাছে। আরেকটা লোককথা শোনা যাক- যখন বহু বহুকাল আগে প্রলয়ে ভাসছে গোটা দনিয়া, ডুবে যাচ্ছে সব তখন শুধু জেগে থাকছে দু’টি পাহাড় তারা ভাইবোন; ভাই টেন্‌ডোং আর বোন মানোম্‌। প্রলয় বাড়ল আরো। ভাই টেন্‌ডোং প্রবল যুঝেও হার মানল শেষে, তার চূড়ার ওপর দিয়ে বয়ে গেল প্রলয়বারি। কিন্তু বোন মানোম্‌ সইল বন্যার দাপট, ক্ষইল, আঘাত পেল, যন্ত্রণায় বিদগ্ধ- কিন্তু হার মানল না জারি রাখল বোবাযুদ্ধ। “একদিন জল কমতে লাগল। আর, জল কমছে, অল্প অল্প করে ভাইয়ের মাথা জেগে উঠছে। শেষকালে সব জল নেমে গেল। ভাই দেখল, তার বোন জলের কাছে হার মানেনি, সে মাথা উঁচু করেই দাঁড়িয়ে ছিল। ভাই লজ্জা পেল- পুরুষ হয়ে সে জলকে হার মানাতে পারেনি, কিন্তু মেয়ে হয়ে বোন হার মানেনি প্রলয়ের কাছে। ভাই বোনের সামনে মাথা নোয়ালো, বোনকে প্রণাম জানাল ভাই। তাই আজও তোমরা দেখতে পাবে ওই টেন্‌ডোং পাহাড় মাথা নুইয়ে আছে বোন মানোম্‌ পাহাড়ের পাশে। ওই দেখ পাশাপাশি দু’টি পাহাড়।”
পাহাড় আর প্রলয়ের জুড়ে থাকা অনেক লোককথায়। কখনো প্রলয়ে নোয়ার নৌকা নয়, জেগে ওঠে পাহাড়, আশ্রয়দাতা। কখনো কাঞ্চনজঙ্ঘা আদিমাতার মমতায় আগলে রাখে সন্তানদের। আগুনের কাঠ, ক্ষিধের ফল, তেষ্টার জল, ছায়ার গাছ। হয়তো বিশ্বাস, এখনো আদি মানব-মানবী ঘর বেঁধে রয়েছেন আদিমাতার কোলে। সে বড় পবিত্র, সে বড় শ্রদ্ধার। সে চিহ্নে যেতে নেই, ছুঁতে নেই চূড়া। দম্ভ শুধু যে মানায় আদি মানব-মানবীকেই। তবুও, লোকচলাচল। মরসুমে মরসুমে, বাড়ে। যাদের লোককথা ছেয়ে আছে পাহাড়ি পশুপাখিদের ভালবাসায়, রডোডেনড্রনের গানে সেখানেই হয়তো গড়ে ওঠে রিসর্ট, সেই পথেই প্লাস্টিকসারি নেমে আসার পথ দেখিয়ে দেখিয়ে গড়িয়ে আসতে থাকে, হুড়মুড়িয়ে।
আর, বোবা যন্ত্রণায় শিউরে ওঠে পাহাড়। সে শুধু প্রতিধ্বনি দিতে জানে অন্যদের কথার। সে শুধু কারোর দুঃখের চীৎকার শোনে, সুখের ফিসফিসানি শোনে। কিন্তু, নিজের কথা ফিরিয়ে দিতে পারেনা। তারও তো সুখ আছে, তারও যে কথন আছে। অথচ, বোবা উৎসবে সেও তো সামিল হতে চায়। বজ্রের কত গভীর আঘাতে যে মেঘ ফেটে জল বেরোয়, পাহাড় দেখে খুব কাছ থেকে। সাধ হয়, সে ক্ষতে প্রলেপ দিতে, পারে না। ইচ্ছা হয় আহত বৃক্ষের হয়ে আকাশের দিকে, সমতলের দিকে অভিশাপ ছুঁড়ে দিতে, পারে না। স্থবিরতা তার উড়ান আঁকড়ে রাখে। গহীন অনুতাপে সে শুধু নিয়মমাফিক বইয়ে দেয় নদী। “আগে বনভূমি ও পাহাড় কথা বলতে পারত। কিন্তু জলের খোঁজ নিতে গিয়ে বনভূমি ও পাহাড় দেবতাকে মিথ্যে কথা বলেছিল। তাই সেদিন থেকে তারা কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলল। সেদিন থেকে তারা বোবা হয়ে গেল। দুষ্টু অশুভ শক্তির জলকে মাটির ভেতরে আর পাহাড়ের পেটে লুকিয়ে রেখেছিল। এবার সেইসব জল বেরিয়ে এল। এমনি করেই তো পৃথিবীতে নদী এল। আর সেইদিন থেকে মানুষ আর পশুপাখির জলের কোনো কষ্ট রইল না।”


অথচ, পাহাড় এক দুর্লঙ্ঘ্য অভিমান। পাথুরে, রুক্ষ। কেমন যেন বেধে গেছে চলাচল। অভিমানী আলো বলেছিল একটু ওপারে গিয়েই ফিরবে তাড়াতাড়ি; কিন্তু সে এক অগ্যস্তযাত্রা। অভিমান বিন্ধ্য-পর্বতের মতন অহং-কে বলেছিল, একটু নিচু হও। সে-ই থেকে নিচু। প্রত্যাশী। কিন্তু, কী যেন নির্বাসন হল। কিছুটা যেন ক্ষয় যেমন নির্মাণের চুন-কলি খসে। অথচ, নির্মাণ বড় যত্নলালিত। আদুরে হাওয়ার ঢঙে চুল এলোমেলো করে দেয় খানিক। অথবা, সেই ক’দিন প ছিলনা এখানে। সে আগুন খুঁজতে গেছিল দূরতর জনালয়ে। ঝাড়খণ্ড সীমানার এক নামহীন, পর্যটকহীন পাহাড়ে। সেখানে থাকে তার কমড়েডরা। এক অসম যুদ্ধে অন্য কমরেডদের মতাদর্শেই প চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে রাষ্ট্রকে। আপাততঃ সপ্তাহ দু’য়েক থাকবে তারা এখানে। শহর থেকে এসেছে প, এখানে কিছু জরুরি কাজ করে, শিখে নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় যুদ্ধকৌশল, আলোচনা করে কিছু শহরের গণআন্দোলনের ঘটমান; ফিরে যাবে আবার। পাহাড়-জঙ্গলে ভরা এই লোকালয়ে বেশ শক্ত ঘাঁটি তাদের, অপরিসীম উদ্যোগে এখানকার মানুষদের সাথে নিয়েই স্বেচ্ছাশ্রমে গড়ে তোলা হয়েছে ছোটবাঁধ, স্কুল। স রয়ে গেছে শহরে। সে মানতে পারেনি, প-র এই কয়েকদিন না-থাকা। কিছু অনুনয়, কিছু রাগ দেখিয়েছে। অভিমান তাকে বুঝিয়েছে, মেনে নিতে; ফিরে আসবে প, বিরতির পর। প তো ভুল কিছু করছে না, প ব্যক্তিগত স্বার্থে নয় বরং তত্ত্ব-বাস্তবকে মেলাতে যাচ্ছে। প যাচ্ছে, স-র কাছে ফিরে আসবে বলেই, স্বপ্নের সেতু আরেকটু নির্মাণ করবে বলেই। প একদিন সেই অরণ্যময় পাহাড়ে বসে থেকেই লিখে ফেলল একটা চিঠি। ওখানে গোধূলির মত বিকেল। যে গোধূলি এতদিনের চেনা শহরে, তার থেকে অনেক আলাদা। ধূলো আর শব্দ অত তাড়াতাড়ি সন্ধে নামিয়ে দিচ্ছেনা, বরং খুব শান্ত মায়াময় চোখের মতন ধীরে ধীরে মিশিয়ে নিচ্ছে নিজেকে বাঙ্ময় অন্ধকারে। অথবা মেঘ কি’রম যেন অস্থির আদরে পাহাড়ের সাথে খেলা করে। কখনো পেলবতায় ছুঁইয়ে দেয় কখনো আগ্রাসীভাবে পাহাড়কে ঢেকে ভিজিয়ে দেয়; অনন্ত বৃষ্টির রেশ গড়িয়ে গড়িয়ে। এরকমই এক মেঘমেদুর প্রাক্‌সন্ধেয় ত্রিপলের ক্যাম্পের ভিতর বসে, আলো নিভে আসার আগে যত দ্রত সম্ভব স-কে লিখছিল প... ‘গতকাল রাত ১০টায় এই ক্যাম্পে এলাম। নতুন পাহাড়। নতুন জঙ্গলের ডেরা। সারাটা পথ জোনাকির দেখানো আলো। কমরেডেদের সাথে পা মিলিয়ে এক বাসা ছেড়ে অন্য বাসা। স্থিরভাবে বাঁচা, নিস্তরঙ্গতা কোনদিনই টানেনি আমায়। আজও টানে না। আর, গোটা সময়টাই যখন অস্থির তখন... ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে দুর্হমে যাওয়ার অনিশ্চয়ে যাওয়ার এই যে নেশা তা হল জীবনের নেশা। আমি এই নেশায় আসক্ত! নতুন উড়ান। পাথুরে পরিবেশেও জীবন্ত জীবন খোঁজার নেশা। সবুজ বিপদসঙ্কুল অরণ্যেও প্রাণের অদম্য নেশা। এলোমেলো পথ, পাথরে হোঁচট খেয়ে ফের উঠে দাঁড়ানো। বহু নিচের সরু নদী থেকে জল ভরে ভরে আনা উপরে। মানুষের জন্য লড়াইয়ের রসদ জোগাড়... বিলাসিতা আর ‘ভাল থাকা’র পুরু চামড়া গণ্ডারের চামড়া হয়ে গেছিল। আর, এই বেঁচে থাকায় সবার আগে সেই চামড়াকে টেনে খুলে ফেলতে হয়। শ্রেণিগন্ধ পুড়তে থাকে দারুণ অনুতাপে...। এখন মেঘ জমে আছে পাহাড়ের সবুজ মাথায়। ধূসর আর সবুজ মিশে গেছে। মেঘ যেন পাহাড় খেয়ে নিচ্ছে। আর, তার মধ্যেই মাথা তুলে দাঁড়ানোর এক অনন্ত প্রচেষ্টা পাহাড়ের। স, তোর সাথে হেঁটে যাচ্ছি পাহাড় থেকে পাহাড়ান্তরে, ভাবি...’ এভাবেই ছেঁড়া ছেঁড়া অনুভূতি অস্থির আবেগ ভরে উঠছিল লেখাটায়। তারপর আর জানা যায়না সেই লেখাটা কিভাবে শেষ হয়েছিল। জানার দরকার নেই স সেই লেখাটা কখনো পড়েছিল কি না। জানা যায়নি প যখন লেখাটা লিখছিল আর র, অ, श, छ বসে গল্প করছিল, তখনই ক্যাম্পে অ্যাটাক করেছিল কি না সিআরপি। জানা যাবেনা কোনোদিন ঠিক সেই মুহূর্তটাকে। শুধু জানা থাক, সেই পাহাড়টা রামগিরি পাহাড় নয়; কিন্তু, সেই দিনটা আষাঢ়ের প্রথম দিন ছিল। কোনো মেঘের দায়িত্বেই কি উড়ে যায় এই লেখা পাহাড় থেকে সমতলে? ভেসে যায় নোনতা বৃষ্টিতে?
“তস্মিনর্দ্রৌ কতিচিদবলাবিপ্রযুক্ত স বাণী/ নীত্বা মাসান্‌ কনকবলয়ভ্রংশরিক্ত প্রকোষ্ঠঃ/ আষাঢ়স্য প্রথমদিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং/ বপ্রক্রীড়াপরিণতগজপ্র েক্ষণীয়াং দদর্শ”


পাহাড় আর পাহাড়ের কোলের জঙ্গল। সেইখান থেকেই বেঁচে ওঠে নতুন প্রাণ; আর, সেইখানেই আসন্ন ভবিষ্যঝড় ওঁত পেতে থাকে। পাহাড় উঠিয়ে নেয় জীবনে দিকে, পাহাড় লুকিয়ে রাখে অনেক সত্যি শুধু দৃষ্টি শুধু শ্রবণ শুধু মুচকি হাসি। সেই যে কিথাইরোন পাহাড়ে রাখাল পা-বাঁধা শিশুকে নিয়ে গেছিল; হত্যা করতে। সেই যে দূত সেখানে রাখালের থেকে শিশুকে নিয়েছিল। সেই যে লাইয়ুসের রাজাদেশেও মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ ্ত অবোধ শিশুকে মারতে পারেনি রাখাল। সেই যে শিশুটি কোরিন্থের রাজপরিবারে বড় হয়ে উঠেছিল। আর, সেই শিশুটিই অনেক পরে তার সেই বেঁচে ওঠার ইতিহাসকে ঘৃণা করবে। কিথাইরোন পাহাড় নির্বাক দেখে যাবে থীবেস নগরীর প্রহেলিকা, পতন, উত্থান। শিশুটি পাহাড়ের স্তব্ধতা জেনে যাবে একদিন, পাহাড়ী জঙ্গলের ভেড়াপালক দূত আর রাখালের থেকে রহস্য জেনে জেনে সত্য জানবে সে। আর, পাহাড়ে ধ্বসের মতই হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে যাবে সযত্নলালিত প্রাপ্তি, রাজবোধ, অহং। অয়াদিপাউস বরফের মত গলে গিয়ে মিথের নদীতে নদীতে নেমে আসবে, বয়ে যাবে নিরন্তর অসংখ্য ব্যাখ্যায়। অথবা, পাহাড় ঠাণ্ডা, মৃত্যুর মতন শীতল। তার মাথায় ঘন হয়ে জমে হিম, উজ্জ্বলতা আলো নিভিয়ে ওঁত পেতে ঘাতক অপেক্ষায়। খাড়াই পাহাড় অন্ধকারের দিকে উঠে গেছে। মৃত্যুর গ্রাম অতীতের দিকে নিয়ে যায় কিংবা রুঢ় বাস্তবে। “Of the mountains in the South Luvina is the highest and the rockiest. They call it crude stone there, and the hill that climbs up toward Luvina they call the crude stone hill… In Luvina the days are cold as the nights and the dew thickens in the sky before it can fall in the earth.” পাহাড়ে ঘেরা সে উপত্যকাতেই হয়তো লালিত এল-দোরাদোর সোনার মিথ্‌। সেই যে পাহাড় পেরিয়ে কয়েকশো খচ্চর-বোঝাই সোনা যাচ্ছে, যাচ্ছে যাচ্ছে; আসছে উপনিবেশ। সেই যে ইতিহাস বইগুলোতে পড়েছিলুম পাহাড় পেরিয়ে যুদ্ধে যাচ্ছে, ধূলো উড়ছে বিজিতের কথন ঢেকে দিচ্ছে বিজয়ী। কোথাও বা অরণ্য-পাহাড় উঠে আসছে রাজাকে হারাতে। কোথাও বা বিজিত মানুষ জীবন ক্ষয়ে ক্ষয়ে উঠে আসছে পাক্‌দণ্ডী বেয়ে; অথবা চড়াই পেরোচ্ছে সন্তর্পণে ছেড়ে যাচ্ছে হাত আঁকড়ে রাখছে প্রিয়-হাত। তারপর, পাহাড়ি গুহায় এঁকে রাখছে আলতামিরার ছবি। আর, সেই সিসিফাস... পাহাড়ে পাথর তুলছে নেমে আসছে ফের তুলছে আশাহত উদ্যমের মধ্যেই যুগান্তরের অভিনয় চলছে। সমুদ্রের বিস্তারে বিষাদ জমে জমে কখন যেন পর্বত হয়ে উঠছে; মুখর ঢেউয়ের আলো-আবছায়া কথকতা শুনবে তখন স্তব্ধতার গান। টেথিস বদলে যাচ্ছে হিমালয় স্তব্ধতায়।
“এই প্রথম পিতা পৃথিবীতে পাহাড় সৃষ্টি করলেন। ছোট বড়ো উঁচু নিচু সুউচ্চ পাহাড়ের সৃষ্টি হতে লাগল। আগে পৃথিবীতে কোথাও কোনো পাহাড় ছিল না। এবার হল অসংখ্য পাহাড়।
পিতা মা’কে বললেন- আমি অনেক পাহাড় তৈরি করলাম যাতে মানুষ পাহাড়ের নানা কিছু জানতে পারে। তারা অনেক পাহাড়ে উঠবে, তাতে বসতিও করবে। তোমাকে রেখে দেব এক পাহাড়ে, কিন্তু সেই পাহাড় হবে অন্যরকম, দুর্গম, বরফঢাকা, এবড়োখেবড়ো। সেই পাহাড়চুড়ো মাথা উঁচু করে মেঘের রাজ্যের কাছাকাছি থাকবে। অনন্তকাল পরেও কোনো মানুষ সেই পাহাড়চুড়োয় পৌঁছতে পারবে না। আর যদি মানুষ সেখানে উঠতে চায়, মানুষ তো বড়ো পাজি।, তোমার আমার সন্তান হলেও অসম্ভব পাজি, মানুষ তা পারবে না, তারা পাহাড়ের ওঠার পথে বরফ-ঢাকা পথে মারা পড়বে। কেউ তোমার সন্ধান পাবে না, তোমার নাগাল পাবে না। আর, তুমি ফিরে আসার পরেও তাদের কোনো অনুশোচনা হবে না। কেননা, আর আদি জননীকে মানুষের প্রয়োজন নেই। তুমি আকাশরাজ্যে আসতে পারবে না, কিন্তু আমার কাছাকাছি থাকতে পারবে।
অনেক পাহাড়ের মধ্যে তিনি সবচেয়ে উঁচু একটা পর্বতচূড়া সৃষ্টি করলেন। সেই পর্বতের নাম চোমোলুন্‌গ্‌মা, আদি জননীর নামে। আমাদের আদি জননী ফিরে গেলেন পর্বতচূড়ায়। সেখানেই তিনি থাকেন, তিনি তো আর আকাশরাজ্যে ফিরে যেতে পারেননি।”


আসলে, পাহাড় থাকে প্রতিমুহূর্তে। জীবনভর। কখনো সুখের আলতোমুহূর্তে ধোঁয়ায় ঢাকা পড়ে যায়। কখনো বা ডুবোপাহাড় চুপিসাড়ে জেগে ওঠে। পাহাড়ি রাস্তার বাঁকগুলো বারবার চলে আসে, এদিক-ওদিক বেঁকে, বেখেয়ালে বা বুঝেসুঝে চলতেই হয়, থামতে নেই। অনেকগুলো পাহাড় হঠাৎ উঠে যায় চারদিকে। জানা-অজানা শত্রুরা মুখ বা মুখোশে নেমে আসছে। আর, সেইসব অবশ্যম্ভাবী পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায় দাঁড়িয়ে একজন। পাহাড় সবসময় ওপরে ওঠার সুখানুভূতি, ভ্রমণকাহিনী, ছবি, কবিতা না-ও তো দিতে পারে; যদি দেয় কেবলই হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ার বোধ! আর, উৎরাইয়ে নেমে আসার আচমকা ভয়? সেই উপত্যকায় দাঁড়িয়ে যোদ্ধা। যুঝে নিতে হবে সমস্ত বিপদ, পেরোতে হবেই পাহাড়। পাহাড় পেরোতে পেরোতেই শুরু হোক স্বপ্নের উড়ান। আর, সব উত্তরণের লোককথা নির্মিত হোক, ছড়িয়ে পড়ুক...